Latest News

কয়েক হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে আসে পরিযায়ী পাখিরা, এই শীতে কোথায় দেখা মিলবে তাদের?

শাশ্বতী সান্যাল

ভারতের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশে বেড়াতে যাওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় নিঃসন্দেহে শীতকাল। আর যদি পরিযায়ী পাখি নিয়ে আগ্রহ থাকে, হ্যাঁ, তাহলেও ভ্রমণের সেরা সময় সেই নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এইসময় সাইবেরিয়া অঞ্চল থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে আসে পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের নানা প্রান্তের জলাভূমিগুলোতে। শুধু সাইবেরিয়াই নয়, ইউরোপ, রাশিয়া, চিন, কিংবা তিব্বতের শীতার্ত এলাকাগুলো থেকে এই ঋতুতে নানা প্রজাতির পাখি উড়ে আসে তিনদিক সমুদ্রে ঘেরা তুলনায় উষ্ণ ভারতের মাটিতে৷ আবার শীত কমতে শুরু করলেই পুরোনো পথ ধরে তারা ফিরে যায় নিজেদের দেশে যার যার পুরোনো আস্তানায়। শীতকাল ছাড়া সারাবছর এসব পাখিদের দেখা মেলে না বলেই এরা ‘অতিথি পাখি’ বা ‘পরিযায়ী’ পাখি৷

কেন আসে পরিযায়ী পাখিরা?

নির্দিষ্ট প্রজাতির কিছু পাখির প্রতি বছর বা কয়েক বছর পরপর একটি নির্দিষ্ট সময় বা ঋতুতে অন্তত দুটো অঞ্চলের মধ্যে আসা-যাওয়া করার ঘটনাকে পাখি পরিযান বলে। আর এখান থেকেই তৈরি হয়েছে ‘পরিযায়ী পাখি’র ধারণা। বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করে দেখেছেন, এই পৃথিবীর প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখির মধ্যে ১৮৫৫ সংখ্যক প্রজাতিই পরিযায়ী, অর্থাৎ তারা বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে পুরোনো বাসা ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে নতুন বাসা গড়ে তোলে। আবার ঋতু অতিক্রান্ত হলে পথ চিনে ফিরেও আসে। কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ, এক দেশ থেকে অন্য দেশ, এক গোলার্ধ থেকে অন্য গোলার্ধে অবলীলায় উড়ে যায় এই পরিযায়ীরা।

এই শীতকালে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের কিছু কিছু এলাকায় অস্বাভাবিক বরফ পড়ে৷ কয়েক ইঞ্চি বরফের পুরু আস্তরণের তলায় ঢাকা পড়ে যায় মাটি। বরফে ঢেকে যায় হিমালয়, তিব্বত, চিন-জাপান মঙ্গোলিয়ার মতো দেশও। পাখিদের জীবনধারণের জন্য এই আবহাওয়া খুবই প্রতিকূল। তাছাড়া ভীষণ শীতে, বরফপাতের মধ্যে তাদের স্বাভাবিক খাবারের ভাঁড়ারেও টান পড়ে এসময়। তুলনায় উষ্ণ একটা আস্তানা আর খাবারের খোঁজে তখন তারা দলে দলে পাড়ি জমায় দক্ষিণের দিকে। ভারত-বাংলাদেশের বিভিন্ন কোণে এসময় একটু উষ্ণতার খোঁজে ভিড় করে আসে পরিযায়ীরা। বাদ যায় না আমাদের সাধের বাংলাও।এখানকার জলাভূমিতে আরামদায়ক শীতে পোকামাকড় আর ঘাসপাতার অভাব নেই৷ পাশাপাশি দক্ষিণ গোলার্ধের এই উষ্ণতা পরিযায়ীদের ডিম পাড়ার জন্যও আদর্শ। শীত তাদের প্রজননেও সহায়তা করে। ফলে দেখা যায় শীতকালটাকেই পরিযায়ী পাখিরা তাদের মেটিং সিজন হিসাবে পছন্দ করে। আবার শীতশেষে যখন গরম হাওয়া বইতে শুরু করে, তখন তাদের গত ক’মাসের অস্থায়ী ঘরবাড়ি ছেড়ে শীতদেশের পাখিরা আবার নতুন করে পাড়ি দেয় পুরোনো পাড়ায়। উত্তরেও সে সময় শীতের শেষে বরফ গলতে শুরু করেছে। জন্মাচ্ছে নতুন ঘাসপাতা, আর প্রচুর পোকামাকড়। ফিরে আসা পাখিদের খাবারের অভাবও মিটে যায় সেসময়।

বছর বছর একই দিশায় , পথ হারায় না তারা?

এক মহাদেশ থেকে অন্য আরেক মহাদেশ, কয়েক হাজার কিলোমিটারের পথ। অথচ দেখা গেছে প্রতি বছর সেই দীর্ঘ পথ পার করে একই দিশায় উড়ে আসে পরিযায়ী পাখিরা। মাঝপথে বিশ্রাম নেয় একই জায়গায়। বছর বছর পথ চিনে ফিরে আসে একই জলাশয়ে, হাওরে, বিলে, একই গাছের মাথায়। ছোট ছোট পাখির এই বিস্ময়কর প্রতিভা দেখে অবাক হবেন যে কেউ! মনে প্রশ্ন জাগে, পথনির্দেশ খুঁজে কীভাবে ফিরে আসে তারা একই ঠিকানায়?

পরিযায়ীর দল

পরিযায়ী পাখিদের এই আশ্চর্য দিকনির্ণয় প্রতিভার কারণ নিয়ে আজও মানুষের জিজ্ঞাসা মেটেনি। এ ব্যাপারে নানা মুনির নানা মতের মতো একাধিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তবে অধিকাংশ বিজ্ঞানীর মতে-

আমাদের পৃথিবীর নিজস্ব একটি চুম্বক-ক্ষেত্র বা ম্যাগনেটিক ফিল্ড আছে। এই চুম্বকক্ষেত্রই পথের ধারণা দেয় পরিযায়ীদের। পরিযায়ী পাখিদের মাথার একটা অংশে থাকে ‘ম্যাগনেটাইট’ নামে এক বিশেষ ধরণের মিনারেল থাকে, যেটা একটা ছোট্ট কম্পাসের কাজ করে। এর সাহায্যেই দিক নির্ণয় করে পরিযায়ীরা । আবার কেউ কেউ বলেন এইসব পাখিদের চোখের মণির একটা আলাদা বিশেষত্ব থাকে। চোখের সাহায্যেই তারা ওই চুম্বকক্ষেত্রকে অনুভব করে উত্তর- দক্ষিণ দিক চিনে নেয়।

কিছু পাখি আবার সূর্য তারার অবস্থান থেকেও পথ চিনে নেয়। আকাশে ওড়ার সময় সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির উপস্থিতি টের পায় তারা। এই অনুভূতিও পথ দেখায় তাদের। সূর্যের অবস্থান থেকে দিক নির্ণয় করতে পারে তারা, বিশেষত সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের সময়। মেঘমুক্ত রাতে একইরকমভাবে আকাশে তারাদের অবস্থান দেখেও পথ খুঁজে নেয় কোনও কোনও প্রজাতির পাখি৷ মেঘলা রাত্তিরে পথভ্রষ্ট হয়ে বিপদেও পড়ে মাঝেমাঝে।

এই বাংলার কোথায় কোথায় দেখা মেলে পরিযায়ীর?

সুন্দরবন  বাংলায় পরিযায়ীদের কথা উঠলেই প্রথমেই আসে সুন্দরবনের নাম। শীতের শুরুতেই ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি ভিড় জমায় এই হাওর,বিল, খাঁড়ির দেশে। সুন্দরবন পাখিরালয়ের জলাশয় সহ মিনাখাঁ, সন্দেশখালি, হিঙ্গলগঞ্জের নানা জায়গায় এসময় দেখা মেলে বিদেশি পাখিদের। আয়লা-আমফানে, মানুষের অসাবধানতায়, নানান সরকারি প্রকল্পের ধাক্কায় যদিও ধুঁকছে সুন্দরবন, নষ্ট হয়ে গেছে ম্যানগ্রোভ অরণ্য- তবু আজও পথ চিনে নিজেদের ছেড়ে যাওয়া ঠিকানার খোঁজে প্রতিবছর ফিরে আসে টেরেক স্যান্ডপাইপার, কমন রেডশ্যাঙ্ক, প্যাসিফিক গোল্ডেন প্লোভার, গ্রে হেডেড ল্যাপউইং বা ধূসর খঞ্জনা, ইউরেশিয়ান কারলিউ, টেমেনিঙ্ক স্টিন্টের মতো পরিযায়ীরা।

গজলডোবা  শীত এলেই নানা দেশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি চলে আসে উত্তরবঙ্গের গজলডোবায়। ভিড় জমায় পশ্চিমের মহানন্দা আর পূর্বের তিস্তা নদীর তীরে সাদা বালির দেশে। কাছেই ফুলবাড়ি মহানন্দা ব্যারেজেও উড়ে আসে দলে দলে যাযাবর পাখি। নানা জাতের শ্রাইক, পেলিক্যান, ওয়াগটেল, রাডি শেলডাক, কানঠুটি, লাল পা ডেঙ্গা ও আইবিস বা কাস্তেচরার দল বাসা বাঁধে এসব অঞ্চলে।

পূর্বস্থলীর চুপিচর  শীত পড়তেই সুদূর ইউরোপ, হিমালয়, মঙ্গোলিয়া থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি উড়ে আসে বর্ধমানের পূর্বস্থলির বিলে। দুর্লভ প্রজাতির রেড ক্রেস্টেড পোচার বা রাঙামুড়ি হাঁসের দর্শন পেতে সারা শীত এখানে ভিড় জমায় পক্ষীপ্রেমীরা। এ ছাড়াও দেখা পাওয়া যায় ব্রাহ্মণী হাঁস বা রাডি শেলডাক, হোয়াইট ওয়্যাগটেল, নর্দান শভেলার, অসপ্রে, পায়েড কিংফিশার, গ্রে হেরন, কটন পিগমি হাঁস, কালো মাথা আইবিস, পার্পল হেরনের মতো পরিযায়ীদেরও।

তিলপাড়া প্রতি বছর নভেম্বরে সাইবেরিয়া থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ীর দল উড়ে আসে বীরভূমের তিলপাড়া ব্যারেজে। সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, কোরিয়া, জাপান, চীন, মায়ানমার, থাইল্যান্ড থেকে উড়ে আসে এইসব হরেক প্রজাতির রংবেরঙের পাখি, যাদের দলে রয়েছে বার হেডেড গুজ বা দাগি রাজহাঁস, মেটে হাঁস, বালি হাঁস, বড়দিঘা, সরাল বা নর্দান পিনটেলের মতো পাখি। শুধু তিলপাড়াই নয়, বোলপুর-রামপুরহাট এলাকার বল্লভপুর ‘‌ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি’‌ সহ একাধিক জলাশয়েই এসময় দেখা মেলে অতিথি পাখির।

সাঁতরাগাছির ঝিল কলকাতার খুব কাছে সাঁতরাগাছির ঝিলেও নভেম্বরের শুরু থেকে উড়ে আসতে শুরু করে অতিথি পরিযায়ীরা। হাওড়ার সাঁতরাগাছিতে স্টেশন চত্তরের গা লাগোয়া লম্বা ঝিলের জলে শীতের ক’মাস ঘাঁটি গাড়ে হুইসলিং ডাক, পিনটেল ডাক, পায়েড কিংফিশার, ওয়াইল্ড স্প্যারোর মতো পাখিরা। ঝিলের জলের মধ্যে জেগে ওঠা ঘাসের ছোট ছোট চরেই এই ঠান্ডার ক’মাস তাদের গায়ে গা লাগা আড়ি-ভাবের সংসার।

পাখিদের কোনও দেশ হয় না। ডানায় বাতাস ভরে যখন যে দেশে পাড়ি দেয় তারা সে দেশই তার ঘরবাড়ি৷ আর এদেশের মানুষও বিশ্বাস করে ‘অতিথি দেব ভব’তে। তাই ছোট ছোট গ্রামের অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত মানুষেরা কখনও কখনও দুহাতে আগলে রাখেন এই ‘অতিথি পাখি’দের ঘরবাড়ি। অবশ্য উলটো ছবিরও দেখা মেলে। প্রশাসনের নির্বুদ্ধিতায়, স্থানীয় মানুষদের অবিবেচক সিদ্ধান্তের কারণে কিংবা অতিউৎসাহী পক্ষীশিকারীদের তাণ্ডবে মারা পড়ে ছোট পাখিরা, নষ্ট হয় তাদের বাসস্থানের শান্তি, ভেঙে যায় ডিম। তাই পাখি দেখার আগে ভালোবাসুন পাখিদের। শীতের এই সুদূর অতিথিদের ঘরবাড়ি বিপদমুক্ত হোক, প্রকৃতির বুকে বেঁচে থাকুক রঙিন পরিযায়ীরা।

You might also like