Latest News

ফুসফুসে সূঁচ, নিপুণ দক্ষতায় বের করে কিশোরীকে রক্ষা করল এসএসকেএম

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেলাই করতে গিয়ে আস্ত একটা সূঁচ গিলে ফেলেছিল মেয়েটা। তারপরেই শ্বাসকষ্ট। গলায় ব্যথা। সূঁচটা তখন কাঁটার মতো বিঁধছে গলায়। ঘন ঘন জল খেতে শুরু করে মেয়েটা। তাতে বিপত্তি আরও বাড়ে। সূঁচ গলা ছেড়ে সোজা ঢুকে যায় ফুসফুসে। গেঁথে বসে যায় ফুসফুসের নীচের অংশে। এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে মেয়েকে নিয়ে এসএসকেএম হাসপাতালে ছুটে যান অভিভাবকরা। চমৎকার হয় সেখানেই। জটিল অস্ত্রোপচার অত্যন্ত সহজভাবে করে অনায়াসেই ফুসফুস থেকে সূঁচ বের করে আনেন ডাক্তারবাবুরা। চরম ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যায় কিশোরী।

মেয়েটার বয়স ১৭ বছর। নাম রেহানা খাতুন। বর্ধমানে বাড়ি। গত শনিবার সেলাই করতে গিয়ে সূঁচ গিলে ফেলে অসাবধানতায়। তারপরেই কাশি, গলা ব্যথা, শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে শুরু করে। প্রথমে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু হয়। কিন্তু ফুসফুসের এমন বিপজ্জনক জায়গায় সূঁচটা বিঁধেছিল যে তা অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি নেওয়া যায়নি। কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে রেফার করেন ডাক্তাররা। এসএসকেএমের ‘ইনস্টিটিউট অব ওটোরাইনোল্যারিঙ্গোলজি অ্যান্ড হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি’ বিভাগের চিকিৎকদের দক্ষতায় বড় বিপদের হাত থেকে বেঁচে গেছে রেহানা।

এসএসকেএমের ইএনটি বিভাগে ‘ইনস্টিটিউট অব ওটোরাইনোল্যারিঙ্গোলজি অ্যান্ড হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি’-র প্রশংসা শোনা যায় গোটা রাজ্যেই। বিভাগীয় প্রধান ডাঃ অরুণাভ সেনগুপ্ত ও সিনিয়র রেসিডেন্ট ডাঃ সায়ন হাজরার তত্ত্বাবধানে এই চিকিৎসা হয়েছে। মেডিক্যাল টিমে ছিলেন আরও অনেকে তাঁদের মধ্যে ডাঃ কৌস্তভ দাস বিশ্বাস (সহ অধ্যাপক) ও সৌরভময় বন্দ্যোপাধ্যায় (পিজিটি)। ডাক্তারবাবুরা বলছেন, ব্রঙ্কোস্কোপি করে মেয়েটির ফুসফুস থেকে সূঁচ বের করে আনা গেছে। ফুসফুসের কোন অংশে সূঁচটা গেঁথে গেছে সেটা জানার পরেই ব্রঙ্কোস্কোপি করে কম সময়ের মধ্যেই তা বের করে আনা সম্ভব হয়। ডাঃ সায়ন হাজরা দ্য ওয়ালকে বলেছেন, “এই ধরনের অস্ত্রোপচার খুব জটিল। তাই অনেক হাসপাতালই ঝুঁকি নেয় না। কলকাতায় এসএসকেএম হাসপাতালেই এই সুবিধা আছে। প্রশিক্ষিত ডাক্তার ও অস্ত্রোপচারের আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলে তবেই সহজে এই জটিল সার্জারি করা যায়। মেয়েটির ফুসফুসে আটকে থাকা সূঁচও সেভাবেই বের করা হয়েছে।” এসএসকেএমের ইএনটি বিভাগে ‘ইনস্টিটিউট অব ওটোরাইনোল্যারিঙ্গোলজি অ্যান্ড হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি’ বিভাগে এমন অনেক অস্ত্রোপচার সফলভাবে হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাক্তারবাবুরা। ডাঃ অরুণাভ সেনগুপ্ত ও ডাঃ সায়ন হাজরা বলছেন, প্রায়ই এমন জটিল পরিস্থিতিতে পড়ে রোগীরা আসেন। সুস্থ হয়ে ফিরে যান। আমাদের রাজ্য শুধু নয়, প্রতিবেশী বিহার, ওড়িশা ও ছত্তীসগড় থেকেও রোগীদের রেফার করা হয় এখানে। ভিন রাজ্য থেকেও রোগীরা নিয়মিত চিকিৎসা করাতে আসেন।

কীভাবে করা হয় ব্রঙ্কোস্কোপি?

ব্রঙ্কোস্কোপি হল এক ধরনের এন্ডোস্কোপি পদ্ধতি যেখানে একটি সরু ও ধাতব নল সোজা নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের পথে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এই নলকে বলে ব্রঙ্কোস্কোপ। এই ব্রঙ্কোস্কোপ ঢুকিয়ে ডাক্তাররা গলা, ল্যারিংক্স বা স্বরনালী, ট্রাকিয়া বা শ্বাসনালীর পরীক্ষা করে থাকেন। শ্বাসনালী কোনও ‘ফরেন পার্টিকল’আটকে গেলে বা সংক্রমণ হলে, এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা করেন ডাক্তাররা। অনেক সময় বুকের এক্স-রে বা চেস্ট এক্স-রে তে সবটা ধরা পড়ে না। তখন ব্রঙ্কোস্কোপির সাহায্য নেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে শ্বাসনালী বা ফুসফুসে ব্লকেজ থাকলে সেটাও ছাড়ানো যায়। আবার বায়োপসির জন্য কোষ বা মিউকাসের নমুনাও সংগ্রহ করা যায়।

এই ব্রঙ্কোস্কোপি দুই ধরনের হয়—ফ্লেক্সিবল ব্রঙ্কোস্কোপি ও রিজিড ব্রঙ্কোস্কোপি। ফ্লেক্সিবল ব্রঙ্কোস্কোপিতে একটি সরু, লম্বা নল বা টিউব শ্বাসনালীতে ঢুকিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এই ধরনের ব্রঙ্কোস্কোপিতে অ্যানাস্থেসিয়া দেওয়ার দরকার পড়ে না। আর রিজিড ব্রঙ্কোস্কোপিতে ফাঁপা ধাতব নল বা টিউব ঢোকানো হয় শ্বাস-প্রশ্বাসের পথে। এই ক্ষেত্রে অ্যানাস্থেসিয়া দেওয়ার দরকার পড়ে।

মেয়েটির সূঁচ বের করে আনার জন্য এই রিজিড ব্রঙ্কোস্কোপিই করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাঃ সায়ন। তিনি বলেছেন, এই পদ্ধতি আর একটু জটিল। বড় কোনও সমস্যা হলে এই ব্রঙ্কোস্কোপি করা হয়। যেমন নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে কোনও বস্তু, খাবারের টুকরো বা ধারালো কোনও বস্তু বা ধাতব কিছু ফুসফুসে আটকে গেলে তখন এই ধরনের ব্রঙ্কোস্কোপিই করা হয়। শ্বাসের পথে যদি রক্তক্ষরণ শুরু হয় তখন এই পদ্ধতিই কাজে আসে।

ডাক্তারবাবু বলছেন, মেয়েটির ফুসফুস থেকে দ্রুত সূঁচটি বের করা না গেলে ক্ষত বাড়ত। ফুসফুসের দেওয়ালে সংক্রমণ হতে পারত, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারত মেয়েটি। সেই বিপদ কেটেছে। মেয়েটি এখন স্থিতিশীল।

You might also like