Latest News

জল-জঙ্গলের গোসাবা ও সজনেখালি

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুস করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

অনেকে মনে করেন গোসাপ থেকে গোসাবা নাম হয়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন গোরু, সাপ আর বাঘের আদ্যক্ষর নিয়েই গোসাবা নাম হয়েছে। গোসাবা ছোট একটি জনপদ ও সুন্দরবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্লক। সুন্দরবন ভ্রমণের প্রবেশদ্বার গোসাবা। গোসাবা সুন্দরবনের একটি দ্বীপ যার আয়তন প্রায় ৩৩ বর্গকিলোমিটার। প্রায় ২০টি দ্বীপ, বিদ্যা, গোমর, দুর্গাদোয়ানী, গাড়াল, রায়মঙ্গল প্রভৃতি নদী-নালা, বহু জনবসতিপূর্ণ গ্রাম, সংরক্ষিত অরণ্য প্রভৃতি নিয়ে প্রায় ২৯৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গোসাবা ব্লক। কলকাতা থেকে ট্রেনে ক্যানিং আর সেখান থেকে ট্রেকারে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে গদখালি ফেরিঘাট, এখান থেকে নদী পেরোলেই গোসাবা আসা যায়।

স্কটল্যান্ডের অধিবাসী প্রথিতযশা স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটন ১৯০৩ সালে গোসাবা আসেন। এখানকার দারিদ্র, অশিক্ষা, অস্বাস্থ্য প্রভৃতি দেখে তিনি এখানে একটি সমবায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের মধ্য দিয়ে মানুষকে স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন দেখেন। তাঁর চেষ্টায় এখানে সমবায় ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, ভারতবর্ষে সমবায় আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। এই প্রচেষ্টা রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজিকেও অনুপ্রাণিত করেছিল। গোসাবাতে তিনি সমবায়, সমবায় ব্যাঙ্ক, মহাজনমুক্ত গ্রাম, একটাকার নোট, মডেল ফার্ম, রাইস মিল প্রভৃতি তৈরি করেছিলেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যর ওপরেও জোর দিয়েছিলেন। গোসাবা অঞ্চলের কথা এলে তাই সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন ও সমবায় আন্দোলনের পথিকৃৎ স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটনকে ছাড়া ভাবা যায় না।

বিদ্যা নদীর ধারে গোসাবার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপার। এখানে পায়ে পায়ে দেখে নেওয়া যায় কয়েকটি জায়গা। বাজারের ভিতর দিয়ে কিছু এগিয়ে গেলেই ফাঁকা মাঠ, তার পাশেই আছে সুদৃশ্য হ্যামিলটন বাংলো। এখানেই তিনি থেকে কাজগুলি করেছিলেন। প্রাকৃতিক কারণে ঝড়, জল, বন্যা থেকে বাঁচতে শক্ত খুঁটির ওপর তৈরি বাংলোটি, নীচে ফাঁকা, ওঠার জন্য সিঁড়ি আছে। ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলী ও বাংলা চালা অনুসরণে এটি তৈরি। কাঠের তৈরি এমন সুদৃশ্য বাংলো বাংলায় খুব কম আছে। বাংলোর সামনে পুরনো বড় জলাশয় আছে। এর সামনে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি তর্পণ ফলক দেখতে পাওয়া যায়।

মাঠের ধারেই দোতলা বড় ভবনে স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটন চ্যারিটেবল ট্রাস্ট এস্টেট অফিস, নীচে হ্যামিলটনের আবক্ষমূর্তি রয়েছে। ট্রাস্ট এখনও অনেক সেবামূলক কাজ করে। এই ভবনের পাশের রাস্তা দিয়ে একটু গেলেই গোসাবা রুরাল এনার্জি ডেভলপমেন্ট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের ৫০০ কিলোওয়াট বায়োমাস বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ক’দিন আগেও এখানে কাঠের আগুন থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হত, বড় উদ্যান ছিল এখানে। বর্তমানে এটি বন্ধ আছে, এখানে ট্রান্সফর্মার বসেছে। উৎসাহীরা অনুমতি নিয়ে পুরনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দেখতে পারেন।

খেয়াঘাটে ফিরে এসে দক্ষিণে বাঁধের ওপরের রাস্তা ধরে কিছুটা গেলে পড়বে থানা, সৎসঙ্গ বিহার। সৎসঙ্গ বিহারের সাদা মন্দিরটি সুন্দর, নদীর ওপরের গদাখালি থেকে দেখা যায়। আর কয়েক পা এগোলেই বেকন বাংলো, চারিদিকে বারান্দাসহ কাঠের তৈরি এই বাংলোয় স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের আমন্ত্রণে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ১৯৩২ সালের ৩০ ও ৩১ ডিসেম্বর এখানে অবস্থান করেছিলেন। ২০০৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পূর্ত দপ্তর এটি সংস্কার করেছে। এছাড়া ঘুরে দেখে নেওয়া যায় বাজারের ভিতর কালী মন্দির, দুর্গা মন্দির, হরি মন্দির প্রভৃতি। ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চটিও অন্যতম দ্রষ্টব্য। গোসাবার বাজার সকালে মাছপ্রেমীদের স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠে। একসঙ্গে নদীর টাটকা এত মাছ দেখার সুযোগ সচরাচর পাওয়া যায় না, হরেকরকম চেনা-অচেনার মাছে রঙিন হয়ে থাকে গোসাবা বাজারের সকালবেলা। গোসাবায় থাকার ব্যবস্থা আছে। এখান থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটারের মধ্যে পাখিরালয় ও সুন্দরবনের সজনেখালি অভয়ারণ্য।

গোসাবা থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার গেলেই রাংগাবেলিয়া গ্রাম। গ্রামে বিদ্যালয় ও তার আশপাশ নিয়ে আশ্রমিক পরিবেশ। সম্ভবত ১৯৬৭ সালে রাংগাবেলিয়া হাইস্কুলে প্রধানশিক্ষক হয়ে আসেন তুষার কাঞ্জিলাল। সুন্দরবন এলাকার দুর্দশা দেখে তিনি শিক্ষাবিস্তারের সঙ্গেসঙ্গে সাথে চাষবাস, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নের কাজে নিজের জীবন সমর্পণ করেন। দূর দ্বীপভূমি থেকে পড়তে আসা ছেলে-মেয়েদের হোস্টেল, খেলার মাঠ, বিদ্যালয় ভবন, শিক্ষার মানের উন্নতি নিয়ে বিদ্যালয়টি খুব সুনাম অর্জন করে। গ্রামোন্নয়নের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন টেগোর সোসাইটি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট। এর অধীনে মহিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, রবীন্দ্রভবন প্রভৃতি। রাংগাবেলিয়ায় গেলে নদীর ধার, তার পাশে গ্রামজীবন, তুষারবাবুর কর্মকাণ্ড প্রভৃতি ঘুরে দেখতে ভাল লাগবে। রাংগাবেলিয়া মহিলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল কো-অপারেটিভের শোরুম থেকে এখানকার মহিলাদের হাতে তৈরি বিভিন্ন জিনিস কেনাটা সুন্দরবন ভ্রমণের স্মৃতি হয়ে থাকবে। টেগোর সোসাইটির গেস্ট হাউস আছে, আগে যোগাযোগ করলে থাকার ব্যবস্থাও হয়ে যাবে।

সজনেখালি

গোসাবা থেকে ভ্যান-রিকশায় পাখিরালয়, সেখান থেকে নৌকায় গোমর নদী পার হলে সজনেখালি বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য। ১৯৭৬ সালে প্রায় ৩৬৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে এই সজনেখালি ওয়াইন্ড লাইক স্যাংচুয়ারি ঘোষণা করা হয়। সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের বাফার এলাকার মধ্যে সজনেখালি অবস্থিত। কোর এলাকায় কোনও ভ্রমণকারীদের প্রবেশাধিকার নেই, বাফার এলাকায় ভ্রমণকারীদের যাতায়াত করার সুযোগ আছে। সুন্দরবনকে ভালভাবে দেখা ও চেনার জন্য তাই বাফার এলাকায় অন্যতম সেরা ঠিকানা হল সজনেখালি। প্রায় ৩৬৩ বর্গকিলোমিটারের এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যে নানান গাছ, অজস্র পাখি, হরিণ, বাঁদর, বুনো শূকর, সাপ সহ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমি এই অভয়ারণ্য। সংরক্ষিত এই জঙ্গলে ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়ানো নিষেধ, শুধুমাত্র বনবিভাগের নির্দেশিত কয়েকটি জায়গায় কাঁটাতারে ঘেরা অল্প জায়গার মধ্যে প্রবেশ করা যায়।

এখানে আছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের কাঠের তৈরি ট্যুরিস্ট লজ, খুব সুন্দর সব ব্যবস্থা আছে এখানে। রাত্রিবাসের জন্য যোগাযোগ করতে হবে ট্যুরিজম সেন্টার, ৩/২ বিবাদি বাগ, কলকাতা–১, এই ঠিকানায়। সুন্দরবনে জঙ্গলের মধ্যে যাবার পর্যটন বিভাগের একমাত্র বাংলো এই সজনেখালি, এখানে ওয়াচ টাওয়ারে বসে উপভোগ করা যায় সুন্দরবনের জল-জঙ্গলের রূপ। এখানে বসে সহজেই দেখা যায় জঙ্গলের বন্য চিতল হরিণ, বানর, গোসাপ, পাখি প্রভৃতি। বাঘের বা বুনো শূকরের দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এখানে বসে কাটিয়ে দেওয়া যায়। সকাল ও সন্ধ্যাবেলা খুব মনোরম এই নজরমিনার। বোঝা যায় কেন Sunderban Tiger Reserve, A paradise on earth, A bonanza for nature lovers.

এখানে আছে বনবিবি ও দক্ষিণ রায়ের মন্দির। বনবিবি হলেন জঙ্গলের দেবী ও দক্ষিণ রায় হলেন জঙ্গলের অধিকর্তা, বাঘরূপে তিনি বিপদের কারণ। আর আছে শাহ জঙ্গলী, বনবিবির ছোট ভাই, বনবিবির আদেশে শত্রু দমন করেন। আর দুখে হল বিধবার একমাত্র সন্তান, জঙ্গল মহল করতে আসা দুখেকে দক্ষিণ রায়ের হাত থেকে রক্ষা করেন মা বনবিবি। বিপদে তাই সবাই মাকে স্মরণ করেন। পৌষ মাসের সংক্রান্তির দিন হিন্দুরা মূর্তি তৈরি করেন ও মুসলমানরা হাজত করে পূজা করেন। প্রতি শুক্রবার মায়ের প্রতিষ্ঠা হতে পারে।

সজনেখালির ম্যানগ্রোভ ইন্টার প্রিটেশন সেন্টারটি অবশ্যই দেখা উচিত, তাহলে সুন্দরবনের গাছপালা, পশু, পাখি, নদী-নালা প্রভৃতি সম্বন্ধে একটি ধারণা তৈরি হবে যেটি সুন্দরবন ভ্রমণে অনেক কাজে লাগবে। এই সেন্টারে বিভিন্ন ছোট মুভিও দেখানো হয়। এখানে কুমির পুকুরে কুমিরের স্বচ্ছন্দে বিচরণ, কচ্ছপ পুকুরে কচ্ছপদের অলস জীবনযাপন দেখতে ভাল লাগবে। এখানে বেশ কিছু ম্যানগ্রোভ গাছ আছে যা প্রত্যক্ষ করা যাবে।

সুন্দরবনের ভ্রমণের মূল প্রবেশদ্বার ও প্রাণকেন্দ্র হল সজনেখালি। সুন্দরবন ভ্রমণের বনবিভাগের অনুমতিপত্র এখান থেকে পাওয়া যায়। মাথাপিছু প্রতিদিন হিসাবে একটি প্রবেশমূল্য, বোটের অনুমতি মূল্য, ভিডিও ফটোগ্রাফির অনুমতির মূল্য, স্টিল ফটোগ্রাফিতে ছাড় আছে। এছাড়া বিধিসম্মতভাবে একজন ট্যুরিস্ট গাইড নিতে হবে নির্ধারিত মূল্য দিয়ে, অনুমতি মিললে জঙ্গলে অন্যন্য স্থানে যাওয়ার অনুমতি মিলবে। স্বাভাবিক কারণে সজনেখালি সবসময় সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ব্যস্ত। এত অনুমতিপত্র থাকলেও প্রতি ভ্রমণার্থীকে জঙ্গলে ঘোরার নিয়মকানুন কঠোরভাবে পালন করতে হবে। এখান থেকে সরাসরি লঞ্চ বা প্রাইভেট লঞ্চে সুধন্যখালি, দোবাঁকি, নেতিধোপানি প্রভৃতি স্থানে ঘুরে আসা যায়।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

You might also like