Latest News

প্রকৃতির কোলে কিছু গ্রাম

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুস করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

খামার

পুরুলিয়া ভ্রমণে খামার একটু অচেনা নাম হলেও এটি ঝালদা থানার অন্তর্গত রূপাই নদীর তীরে বেশ বর্ধিষ্ণু গ্রাম। স্কুল, বনদপ্তর, দোকানপাট সব নিয়ে বেশ জমাটি। এই গ্রামের মুকুট হল রূপাই নদীর সামনেই চামতু হিলস আর সেই মুকুটের পালক হল হিলস থেকে নেমে আসা রূপসী ঝরনা। চারিদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এককথায় অনন্যসাধারণ। রূপাই নদী ধরে খানিকটা পথ এগিয়ে গেলে গজাবুরু (২০২০ ফুট) পাহাড়কে দেখা যায়। স্থানীয়রা এটিকে আসরা পাহাড় বলেন। এই পাহাড়কে দেখে মনে হতে পারে এটি বলরামপুরের ঘাটবেরা থেকে দেখতে পাওয়া গজাবুরু, কিন্তু তা নয়। এটি একদম একরকম দেখতে আর এক গজাবুরু। দুটি পাহাড়ের একই নাম, একইরকম দেখতে, এ বোধহয় এ বঙ্গেই সম্ভব। আসরা পাহাড়ের কোলের ডাকাই, পান্ড্রি গ্রামগুলিও খুব সুন্দর।

খামার এক নির্জন, নিভৃতবাসিনী সৌন্দর্যের রানি। খামারে পৌঁছতে হলে ঝালদা থেকে চাতামঘুটু, খানবন্দি, ওনা, ওলগারা হয়ে যাওয়া যায় আর অন্য পথ হল ঝালদা-বাগমুন্ডি রাস্তার ইঁচাগ হয়ে। এই গ্রামে থাকার জায়গা নেই, তাঁবুই একমাত্র ভরসা। যারা পায়ে হেঁটে জঙ্গল-পাহাড়ে যান তাদের কাছে খামার হল ইউটোপিয়া। অন্য ভ্রমণকারীরা ইচ্ছা হলে গাড়ি নিয়ে এক বার ঘুরে যেতে পারেন।

নওড়াহাড়া ড্যাম

ঝালদা থেকে কাছেই প্রকৃতির কোলে নির্জনে সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে রয়েছে নওড়াহাড়া ড্যাম। ঝালদা শহর থেকে নামোপাড়া মোড়, চাতামঘুটু, গোপালপুর হয়ে এখানে পৌঁছনো যায়। ঠ্যাংকাটা জোড় বেঁধে তৈরি হয়েছে এই ড্যাম। এর সামনে দাঁড়ালে যে কেউ মুগ্ধ হবেনই।

নির্জনে চারপাশের গাছে রংবেরঙের পাখির নানাবিধ কূজন, হাতের নাগালের মধ্যে চাষের খেতে ময়ূরীর অবাধ বিচরণ, নীল আকাশ আর সামনে ছোট্ট বাঁধ নওড়াহাড়া। যাওয়ার জন্য কোনও রুটের গাড়ি নেই। অটো রিজার্ভ করে, রিকশাতে অথবা হেঁটে এখানে যাওয়া যায়।

বরুয়াকোচা

আপন খেয়ালে গজিয়ে ওঠা প্রকৃতির মাঝে মাঝে ছোট আদিবাসী গ্রামগুলি পুরুলিয়া জেলার বিউটি স্পট। লাগামবুরু পাহাড়ের কোলে এ রকমই এক গ্রাম হল বরুয়াকোচা। ঝালদা থেকে বেগুনকোদরের পিচ রাস্তা ধরে কাঁটাডি, দঁড়দা হয়ে পিচ রাস্তা ছেড়ে ডান দিকের কাঁচা পথ ধরে এগোলেই একটি শান্ত, নিরীহ গ্রাম বরুয়াকোচা। অন্যান্য আদিবাসী গ্রামের বৈশিষ্ট্য যেমন মাটির নিকোনো দেওয়াল, নিকোনো উঠোন, তার সবই বিদ্যমান এ গ্রামে। বাঁদনা পরবে (কালীপূজার সময়) এলে মাটির দেওয়ালগুলি থেকে চোখ ফেরানো যায় না কারণ প্রত্যেকটি দেওয়াল জুড়ে অনবদ্য সব ক্যানভাস।

দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে লাগামবুরুর রূপও বদলায়। তার প্রতিফলন ছড়িয়ে পড়ে গ্রামটিতে। ভোরের সূর্য লাগামবুরুকে লাল আবীরে রাঙিয়ে দেয় আবার চাঁদনি রাতে রূপোগলা আলোয় চরাচর যখন ভেসে যায় তখন ভাসিয়ে দেয় বরুয়াকোচা ও তার সরল আদিবাসীদের। তারা মেতে ওঠেন বাঁশির সুরে, ধামসা-মাদলের বোলে। এই গ্রাম থেকে পায়ে চলা পথে জঙ্গলের পথ ধরে নোয়াগড়, গুড়রাবেড়া হয়ে ৬/৭ কিলোমিটার হেঁটে মুরগুমা। আবার চলতে চলতে অযোধ্যা চলে যাওয়া যায়।

কাঁড়িয়ার শিব

কোটশিলা থানার রিগিদ গ্রামপঞ্চায়েতের অধীনে কাঁড়িয়ার শিবমন্দির অবস্থিত। কাঁড়িয়ার শিবের মাহাত্ম্য দিনে দিনে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে, ফলে প্রতি বছরই এই শিবের কাছে যাওয়ার পুণ্যার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। কেবলমাত্র পুরুলিয়াই নয়, দেবতার কাছে মানতপূরণের জন্য জামশেদপুর, রাঁচি, বোকারো প্রভৃতি জায়গা থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থী আসেন। যদিও এই শিবের কাছে পৌঁছনো সাধারণের কাছে এক দুর্গম যাত্রা।

ঝালদা থেকে গোলা রোড ধরে কাঁসরা পেরিয়ে মাহাতোমারার আগে ডান দিকের রাস্তা গেছে কাঁড়িয়ার শিব পর্যন্ত। শেষ ৫ কিলোমিটার রাস্তা পাহাড়ি পথে হেঁটে উঠতে হবে। মোটরবাইক চালানোয় যারা দক্ষ তারা মোটরবাইকে পাহাড়ি পথ ধরে অনায়াসে শিবমন্দির পর্যন্ত চলে যান। শিবরাত্রির সময় বহু পুণ্যার্থী এই পথে পাড়ি দেন।

জাবর বন

সিমনি ও জাবর কোটশিলা থানার অধীনে পাশাপাশি দুটি বিখ্যাত গ্রাম। গ্রামবাসীরা একসঙ্গে সিমনিজাবর গ্রাম বলেন। এই গ্রামের জাবর বনের জাবর পাহাড় থেকে পুরুলিয়ার বিখ্যাত নদী কাঁসাই উৎপন্ন হয়েছে। কাঁসাই নদীর ধার ধরে পুরুলিয়া জেলার বিখ্যাত প্রাচীন তীর্থ ও মন্দিরগুলি গড়ে উঠেছিল। দক্ষিণমুখে প্রবাহিত এই নদীটির প্রাচীন নাম ছিল কপিলা।

ঝালদা থেকে টালি সেন্টার হয়ে সিমনি ও জাবর গ্রাম পেরিয়ে জাবর বন। এই স্থান পর্যন্ত চার চাকার গাড়ি চলে যাবে। এর পর জঙ্গলের মাঝে সাইডেরা অবধি দু’চাকার গাড়ি যাবে অথবা হাঁটা পথে যেতে হবে। সাইডেরা থেকে বুজবুজি বা বুরবুরি অবধি প্রায় ২ কিলোমিটার পথ হেঁটে উঠতে হবে। উঠলে দেখতে পাওয়া যাবে কাঁসাই নদীর উৎপত্তিস্থল। একটি ছোট কুণ্ড থেকে আপন খেয়ালে জল মাটির নীচে থেকে বেরিয়ে আসছে যা সাধারণের কাছে বুরবুরি বা বুজবুজি। যারা পাহাড়, জঙ্গল ভ্রমণের উৎসাহী তাদেরই এ পথে যাওয়া উচিত।

আনন্দনগর

ঝাড়খণ্ডের কোল ঘেঁষে কোটশিলা থানার মধ্যে পড়ে আনন্দনগর। কোটশিলা, খটঙ্গা, চিতমু হয়ে আনন্দনগরে পৌঁছনো যায়। এছাড়া ট্রেনে পুরুলিয়া থেকে পুন্ডাগ হয়েও আনন্দনগর যাওয়া যায়। আনন্দনগর হল আনন্দমার্গীদের সদর দপ্তর। প্রতিষ্ঠাতা হলেন শ্রীশ্রীআনন্দমূর্তিজি যাঁর পূর্ব নাম ছিল প্রভাতরঞ্জন সরকার (১৯২১-৯০)। মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা প্রকৃতির সেবার মধ্য দিয়ে চলে তাদের কার্যকলাপ, এর সঙ্গে আছে ধ্যান, যোগ, তন্ত্রের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্ম্যচেতনার উন্নতি।

পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত প্রান্তরে শিক্ষাদানের জন্য আনন্দনগরে আছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক থেকে মহাবিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থা, আশপাশের ৬০টি গ্রাম এতে উপকৃত হচ্ছে। আছে দরিদ্রের মধ্যে খাদ্য, বস্ত্র বিতরণ, পুকুর খনন, বৃক্ষরোপণ, প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বর্জনসহ হাজারো কর্মযজ্ঞ। নানান কর্মযজ্ঞকে ঘিরে আনন্দমার্গীদের আনন্দনগর পুরুলিয়ার এক দ্রষ্টব্য স্থান।

সিরকাবাদ

পুরুলিয়া শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে সিরকাবাদ। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে সিরকাবাদ একটি পরিচিত নাম। সিরকাবাদ থেকে হেঁটে জঙ্গলের পথ ধরে অযোধ্যা পাহাড়ে যাওয়া যায়। বান্দু নদীর পাশে বনবিভাগের বাংলো। সে এখন আর থাকার উপযোগী নয়। সিরকাবাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন কেড়ে নেয়। বাগমুন্ডি যদি হয় অযোধ্যার পশ্চিম দিকের দুয়ার তবে পূর্ব দিকের দুয়ার হল সিরকাবাদ। সিরকাবাদ ফরেস্ট অফিসের মাঠে শাল, সেগুন পিয়ালের নীচে অনেকে তাঁবু ফেলে থাকেন। পাশেই এঁকেবেঁকে বান্দু নদী চলে গেছে। কাছেই বাঁধের পাশে বসে থাকলে মনটা উদাস হয়ে যায়।

সিরকাবাদ থেকে জঙ্গলে হাঁটা পথে অযোধ্যা পৌঁছতে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগে। পথে বান্দু ঝোরায় বিশ্রাম। যারা হাঁটতে নারাজ তারা বাসে চেপে অনায়াসেই অযোধ্যায় যেতে পারবেন। সিরকাবাদের দুর্গাপূজা ও মহরম উৎসব খুব প্রাচীন। দুর্গাপূজার মেলাতেও সিরকাবাদ মেতে ওঠে। পুরুলিয়া শহর থেকে সরাসরি বাস যোগাযোগ আছে। পুরুলিয়া থেকে অযোধ্যা পাহাড়ে যাওয়ার যে সরাসরি বাস যোগাযোগ আছে সেই বাস সিরকাবাদ হয়েই যায়।
ঝালদায় রাত্রিবাস করে দেখে নেওয়া সুবিধার হবে। রাত্রিবাসের ঠিকানা : আমন্ত্রণ লজ, ঝালদা, চলভাষ : ৮০০১৫৫৭২৫১, দূরভাষ : ০৩২৫৪ ২৫৫৬৬৬।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

You might also like