Latest News

অল্পচেনা ক্ষীরপাই

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুস করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

ক্ষীরপাইয়ের সবচেয়ে বেশি খ্যাতি তার বাবরশা মিষ্টির জন্য। খ্রিস্টীয় আঠেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে তাঁত ও রেশমের কারবারে ক্ষীরপাই বেশ সমৃদ্ধি লাভ করে। সেই সময় ইংরেজ ও ফরাসিরা তাদের বাণিজ্যকুঠি এখানে স্থাপন করেছিল। এক রেশমকুঠির ইংরেজ কুঠিয়াল এডওয়ার্ড বাবর স্থানীয় ময়রাদের কাছে একটি নতুন মিষ্টি খেতে চান। পরান আটা নামে একজন ময়রা সাহেবের জন্য ময়দা, ঘি ও চিনির রস দিয়ে যে নতুন খাবারটি তৈরি করেছিলেন তার নাম ছিল বাবরশা। এডওয়ার্ড বাবরের সন্মানে মিষ্টির নাম বাবরশা হয়েছিল। আজও সমান তালে প্রচলিত এই বিখ্যাত মিষ্টি।

অতীতে ঘাটাল, চন্দ্রকোণা ও হুগলি জেলার কিছুটা নিয়ে ছিল ক্ষীরপাই মহকুমা। মহকুমার কার্যালয় ছিল ক্ষীরপাইয়ে। পরে জেলার বিভাজনে এই অঞ্চলগুলি মেদিনীপুর জেলায় আসে ও হুগলির মহকুমা কার্যালয় চলে যায় আরামবাগে। ফরাসি, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ, ইংরেজ সবাই বাণিজ্য করেছে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দ বা তার আগে থেকে। সেই সময় থেকেই ক্ষীরপাই তাঁত ও রেশম, সুতিবস্ত্র ও হস্তশিল্পজাত ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে খ্যাত ছিল। পরবর্তীকালে এই অঞ্চলে ব্রিটিশরা জোর করে নীলচাষ করতে বাধ্য করায় বস্ত্র তৈরির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। একসময় ব্যবসা ও বহু মানুষের বাসের জন্য ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ক্ষীরপাই পুরসভার মর্যাদা পায়। পরবর্তীকালে সে তার গৌরব হারিয়ে অখ্যাত গঞ্জে পরিণত হয়।
ক্ষীরপাইয়ে রাস্তার ধারে অন্যতম দর্শনীয় স্থান হল উত্তমানন্দ আশ্রম। ধ্রুবানন্দ গিরি এই আশ্রমের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৩৩৬ সনে। আগে এই স্থান জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। এই আশ্রম এলাকার মধ্যে একটি প্রাচীন ভগ্নপ্রায় মন্দির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর আশ্রমিকদের চেষ্টায় মন্দিরটি নবকলেবর ধারণ করেছে। প্রায় ৪০ ফুট উচ্চতার মাকড়া পাথরে তৈরি পঞ্চরত্ন মন্দির। এটি অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে নির্মিত। আশ্রমের সামনে চালায় ধ্রুবানন্দ গিরি ও সচ্চিদানন্দ গিরির মূর্তি রোজ পূজিত হন। অন্যান্য মন্দিরের সঙ্গে ধানের মড়াই, বিরাট দিঘি ও গাছপালায় ঘেরা আশ্রমের পরিবেশটি বেশ সুন্দর।

ক্ষীরপাইয়ের হাটতলায় রয়েছে শীতলানন্দ শিবের মন্দির। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট। এখনও কিছু পোড়ামাটির কাজ রয়েছে মন্দিরে। ক্ষীরপাইয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মন্দির হল ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত দয়ালবাজার এলাকার রাধাদামোদর ও শীতলার পঞ্চরত্ন মন্দির। মন্দিরটিতে প্রচুর টেরাকোটার কাজ আছে। পাহাড়িপাড়ায় আছে ১৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এলাকার সবচেয়ে প্রাচীন সিংহবাহিনী দেবীর মন্দির। শহরের দক্ষিণ-পূর্বে গায়েনপাড়ায় আছে লক্ষ্মী-জনার্দন মন্দির। মন্দিরের দেওয়ালে কৃষ্ণলীলা, দশাবতার ও রামায়ণের কাহিনীর টেরাকোটা রয়েছে। মন্দিরের দরজাটিতেও বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি খোদিত আছে।

ক্ষীরপাই-ঘাটাল রাস্তায় বাসস্ট্যান্ড থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে মালপাড়ায় রয়েছে প্রায় ২৭ ফুট উচ্চতার রাধাদামোদরের পঞ্চরত্ন মন্দির। ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরের দেওয়ালে রাম-রাবণের যুদ্ধ, কৃষ্ণলীলা, দশাবতার-সহ ফুলের নকশার টেরাকোটা আজও সমান আকর্ষণীয়। এই মন্দির থেকে কিছুটা উত্তরে রয়েছে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত ৩০ ফুট উচ্চতার খড়গেশ্বর মহাদেবের মন্দির। মন্দিরটিতে টেরাকোটা ও পঙ্খের কাজ আছে। এখান থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত প্রায় ২৭ ফুট উচ্চতার শিবমন্দির রয়েছে গঙ্গাদাসপুর গ্রামে। মন্দিরের ভেতরে একটি কষ্টিপাথরের সূর্যমূর্তি আছে যেটি দশম-একাদশ শতাব্দীর।

ক্ষীরপাই থেকে এক কিলোমিটার দক্ষিণে কাশীগঞ্জ গ্রাম। অতীতে রেশম ও নীলচাষের কেন্দ্র ছিল এবং ইংরেজ ও ফরাসি বণিকরা এখানে কুঠি নির্মাণ করেছিল যার ধ্বংসাবশেষ আজও দেখা যায়। পরবর্তীকালে এখানে নীলকুঠিও তৈরি হয়। এখানকার নীলডাঙা নামটি নীলকুঠির সঙ্গে জড়িত। সেই সময় খুব সমৃদ্ধশালী অঞ্চল হয়ে উঠেছিল কাশীগঞ্জ। আজ শুধুই পড়ে আছে ভগ্নাবশেষ। এখান থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে বেড়াবেড়ে গ্রামে সাহেবদের কয়েকটি জীর্ণ সমাধি আছে।
ঘাটাল অথবা চন্দ্রকোনা রোড বা মেদিনীপুর শহর থেকে ক্ষীরপাই অঞ্চল দেখে নেওয়া যায়। ক্ষীরপাই থেকে ঘাটাল ১৫ কিলোমিটার, চন্দ্রকোনা টাউন ১২ কিলোমিটার ও মেদিনীপুর শহর প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সমস্ত জায়গার সঙ্গেই বাস যোগাযোগ রয়েছে ক্ষীরপাইয়ের।

জাড়া

ক্ষীরপাই থেকে রামজীবনপুর যাবার রাস্তায় ৮ কিলোমিটার দূরে জাড়া গ্রাম। এখানকার প্রসিদ্ধ জমিদার ছিলেন রায়বাবুরা। এঁদের সমৃদ্ধির সময় বিরাট অট্টালিকা, বহু মন্দির, বাজারহাট স্থাপিত হয়। জাড়ায় বহু মানুষের বসতি গড়ে ওঠে। গ্রামে বহু মন্দির তৈরি হয়। জাড়ায় জমিদারদের বিশাল অট্টালিকার মধ্যেই আছে ঠাকুরবাড়ি, দুর্গাদালান, নাটমণ্ডপ, সংলগ্ন রামেশ্বর শিব, কামেশ্বর শিব, ভুবনেশ্বর শিব মন্দির, শীতলা মন্দির। ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত রামেশ্বর শিব মন্দিরই প্রথম শিব মন্দির।

জাড়া জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা রামগোপাল রায় ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ ১১৫৫ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে কালীপূজার মাধ্যমে গৃহপ্রবেশ করেছিলেন। পরবর্তী জমিদার মদনমোহন রায়, এঁরা স্বামী-স্ত্রী মিলে কামেশ্বর ও ভুবনেশ্বর শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর রাজীবলোচন রায়, ইনি রামমোহনের বন্ধু ছিলেন। তারপর শিবনারায়ণ রায়, শম্ভুচন্দ্র রায় প্রমুখ।
বিশাল অট্টালিকার আজ অনেকটা ধ্বংসপ্রাপ্ত। একধারে বর্তমান বংশধররা বাস করেন। এখনও দুর্গা, কালী প্রভৃতির পূজা হয়। জমিদারদের রমরমার সময় নাটমণ্ডপে কবিগানের আসর বসত। বিখ্যাত অ্যান্টনি কবিয়ালও এখানে গান গেয়েছেন। পুরাতন ঘাটের পাশে রয়েছে ১৮১৪ সালে নির্মিত প্রায় ৪০ ফুট উচ্চতার গঙ্গাধর শিবের আটচালা মন্দির। এছাড়া ময়নাপুকুরের উত্তর পাড়ে ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত দুটি শিব মন্দির, ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত উমাপতি শিব মন্দির ছাড়া সামান্য পশ্চিমে কাশীনাথ ও পার্বতীনাথ শিবের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জমিদাররা। শিব মন্দিরগুলি সবই দালানরীতির। এছাড়া গ্রামভ্রমণে ঘুরে দেখে নেওয়া যায় কুমোরপাড়ায় নীলকণ্ঠ শিব, তার পশ্চিমে শান্তিনাথ শিবমন্দির, চকবাজারে বাঁকা রায় ও ভুবনেশ্বর শিব মন্দির, গ্রামের প্রাচীন দেবতা কালু রায়, গ্রামে চৌধুরী পরিবারের বড় দালানরীতির সিংহবাহিনীর মন্দির, সরকারপাড়ায় রায় পরিবারের কালী মন্দির, এটি ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। এছাড়া এই পাড়াতেই সরকার পরিবারের শিব ও বিষ্ণু মন্দির, বারিকপাড়ায় রঘুনাথের মন্দির, নায়েকপাড়ায় ঠাকুরবাড়ির বৃহদাকৃতি দুর্গাদালান প্রভৃতি।

রামজীবনপুর

ক্ষীরপাই থেকে যে রাস্তাটা সোজা আরামবাগের দিকে গেছে সেই রাস্তায় প্রায় ১৬ কিলোমিটার গেলেই রামজীবনপুর গ্রাম। এই অঞ্চলটি বেশ প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু। চন্দ্রকোনা রাজার সচিব রামজীবন হাজরার নামানুসারে জায়গার নাম রামজীবনপুর হয়েছে বলে কথিত। সুবর্ণবণিক, গন্ধবণিক ও তাম্বলী এই তিন শ্রেণির ধনী বণিকরা ও এলাকার ভূস্বামী মিলে এখানে বহু মন্দির, দেবালয় তৈরি করেছিলেন। তার মধ্যে একটি মন্দির হল নতুনহাট এলাকার বুড়োশিবতলায় বুড়োশিবের মন্দির। মন্দিরটিতে পৌরাণিক দেবদেবী, দশাবতার প্রভৃতি টেরাকোটার কাজ আছে। পুরাতন হাটতলায় পার্বতীনাথ শিবমন্দির রয়েছে যা নির্মিত হয়েছে ১৮০২ সালে।

এই এলাকায় দামোদরের একটি পঞ্চরত্ন মন্দির আছে। গোকুলবাজারে পালেদের একটি ২০ ফুটের পঞ্চরত্ন মন্দির আছে। বাজারপাড়ায় কালীতলায় হোতা পরিবারের জোড়া পঞ্চরত্ন মন্দির আছে। প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার একটি মন্দিরে শিব ও অপর মন্দিরে দণ্ডী জনার্দন দেবতা রয়েছেন। পিরিপাড়ায় তিনটি পঞ্চরত্ন মন্দির আছে। তার মধ্যে টেরাকোটার কাজ দেখা যায় পিরিদের দামোদর পঞ্চরত্ন ও শ্রীধরলালজীউয়ের পঞ্চরত্ন মন্দিরে। অপর মন্দিরটি প্রামাণিকদের দামোদরের পঞ্চরত্ন মন্দির। দত্তপাড়ায় দামোদরের পঞ্চরত্ন মন্দিরে কিছু টেরাকোটার কাজ আছে। এছাড়াও রামজীবনপুরে আরও বহু মন্দির আছে। চন্দ্রকোনা রোড বা মেদিনীপুরে রাত্রিবাস করে দেখে নেওয়া সুবিধার হবে।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

You might also like