Latest News

বাহিরীর ভিতরে

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এখন ঘরের বাইরে বেরোতেও মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। শুয়ে, বসে, গার্হস্থ্যকর্ম সেরেও সময় যেন কাটছে না। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

শহরগুলির ওপর মাত্রাতিরিক্ত মনোযোগের ফলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের বর্ধিষ্ণু জনপদগুলির কথা আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। কিছু কিছু অঞ্চলের এত গৌরবময় ইতিহাস আছে যা কেবল কৌতূহল উদ্রেককারীই নয়, চমকে যাবার মতো। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, মানুষ ভ্রমণ করে আনন্দের জন্য, ইতিহাস জানার জন্য কি? যদি ঘুরতে ঘুরতে সেই জায়গার ইতিহাস কিছুটাও জানা যায় তাহলে ভ্রমণ মনে হয় সর্বাঙ্গসুন্দর রূপ পায়। ভ্রামণিকের মুখে মুখে ঘুরতে থাকা ইতিহাসের অন্তরালে জায়গাটিও তার গুরুত্ব বজায় রাখতে পারে। ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া হলেও বাহিরীর মতো প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু জনপদের কথা লিখতে গেলে এটুকু ভূমিকা কিছুই নয়। পুরাকীর্তি সমৃদ্ধ এই গ্রামটি না ঘুরলে পূর্ব মেদিনীপুর ঘোরা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

কাঁথি মহকুমার বিখ্যাত ঐতিহাসিক গ্রাম বাহিরী। বাহিরী নামে কোনও স্বতন্ত্র গ্রাম নেই। পাশাপাশি থাকা পাইকবাড়, বিধু বাহিরী, ডিহি বাহিরী, দেউলবাড় গ্রামগুলির মধ্যবর্তী স্থান বাহিরী নামে পরিচিত। বাহিরী বলতে দেউলবাড় মৌজাকেই বোঝায়। দেউলবাড় গ্রামের উল্লেখযোগ্য পুরাকীর্তি হল পুরীর মন্দিরের আদলে জগন্নাথ মন্দির। পূর্বমুখী জগমোহন-সহ ইটের তৈরি চির উন্নত শিখর দেউল। সমতল ভূমি থেকে অনেক উঁচু এক ঢিবির ওপরে এই দেউল। জগমোহনে প্রবেশপথের দু’পাশে নিবদ্ধ পোড়ামাটির কয়েকটি পদ্মফুল। মন্দির ও জগমোহনের মাথায় চারটি লম্ফমান সিংহ। বর্তমানে মন্দিরটি পরিত্যক্ত, কোনও দেবতার মূর্তি নেই। মন্দিরের গর্ভে তিনটি পাথরে খোদাই করা ওড়িয়া হরফে লেখা সংস্কৃত শ্লোকের তিনটি লিপি রয়েছে।

প্রথম লিপি থেকে জানা যায়, কাশীরাম দাসের বংশে পদ্মনাভ দাসের পুত্র বিভীষণ দাস মহাপাত্র আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি মন্দির নির্মাণ করে বলরাম, জগন্নাথ, সুভদ্রা ও গোপাল স্থাপন করে ব্রাহ্মণ দ্বারা প্রতিষ্ঠা করেন। জনশ্রুতি যে, জগন্নাথের নামে বাহান্ন বাটী অর্থাৎ এক হাজার চল্লিশ বিঘা জমি ছিল। বর্তমানে তেমন কিছু নেই। মন্দিরের পূজারী ছিলেন গদাধর নন্দ। তিনি নিষ্ঠাভরে পূজার্চনা করতেন। ক্রমে ক্রমে দুশো বছর পার হয়ে যায় এবং মন্দিরের সোনাদানা, মূল্যবান রত্ন অপহৃত হতে থাকে। জগন্নাথকে রক্ষা করার তাগিদে লোকালয়ে আর একটি মন্দির নির্মাণ করে সেখানেই চারটি মূর্তি স্থানান্তরিত করা হয়।

বর্তমানে মন্দিরটি জগন্নাথ মন্দির নামে পরিচিত। মন্দিরটি ছিমছাম, সুন্দর। প্রবেশপথে উঁচু এক স্তম্ভে করজোড়ে গরুড়ের মূর্তি বিদ্যমান। বাহিরী এলাকার কোনও এক জায়গা খননকালে দুটি কৃষ্ণমূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। মূর্তিদুটি বাসুদেব মূর্তি হিসাবে চিহ্নিত। অনেকে এগুলিকে পালযুগের নিদর্শন বলে মনে করেন। বড় মূর্তিটি মন্দিরের দেওয়ালে প্রোথিত রয়েছে আর ছোটটিকে কলকাতার আশুতোষ মিউজিয়ামে রাখা হয়েছে। মন্দিরের জগন্নাথ, বলরাম সুভদ্রার মূর্তিগুলি খুবই সুন্দর তবে এগুলি প্রাচীন মূর্তি নয়। কারণ, প্রতি ১২ বছর অন্তর মূর্তিগুলির দারু পরিবর্তন করা হয়। মন্দিরের উত্তর দিকে, ঈশান কোণ ঘেঁষে একটি বেদি আছে। ওই বেদির নীচে পূর্বের মূর্তিগুলি সমাহিত আছে। এই মন্দিরের মূল উৎসব রথযাত্রা।

জগন্নাথ মন্দিরের পাশে দেউলবাড় শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান ও মা সারদা শিশু রক্ষণাগার গড়ে উঠেছে। ওই জগন্নাথ মন্দিরের দক্ষিণে বিরাট নিচু জলাভূমি এলাকা রয়েছে। এর নাম কালীদহ হলেও লোকে বলে কালদা মাঠ। এখানে নাকি প্রচুর সাপের বসবাস ছিল, তাই থেকে এহেন নাম।

বাহিরী গ্রামটি বর্তমানে পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি হাইস্কুল ও একটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র নিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম। গ্রামটির অলংকার হল একটি-দুটি নয়, চার-চারটি বিশাল পুকুর যেগুলি সাগর নামে অভিহিত। যথা ভীমসাগর, হেমসাগর, চাঁদকোনিয়া এবং চৌদ্দোমানিয়া। কথিত আছে, বিভীষণ মহাপাত্র পরহিতের জন্য গভীর করে পুকুর খনন করে পুত্র ভীমসেনের নামে নাম দেন ভীমসাগর। এই পুকুরের পরিসর অতীব বিশাল। আয়তন ১৫ বিঘা। পুকুর খোঁড়ার সময় প্রাচীন দুটি কূপের অস্তিত্ব মিলেছিল যা বৌদ্ধ সংস্কৃতির নিদর্শন বলে ধরা হয়।
যোগেশচন্দ্র বসু মহাশয় তাঁর ‘মেদিনীপুরের ইতিহাস’ বইতে উল্লেখ করেছেন যে, কূপগুলিতে ব্যবহৃত ইটগুলি ১৩-১৪ ইঞ্চি দীর্ঘ, ৭ ইঞ্চি প্রস্থ এবং ২ ইঞ্চি পুরু অর্ধবৃত্তাকার ধরনের। এই কূপ খননকালে অসংখ্য পুঁতির মালা, প্রচুর পাথরের মূর্তি পাওয়া যায় যেগুলি কিছু রক্ষিত আছে কলকাতায় আশুতোষ মিউজিয়ামে আর স্থানীয় বিবেকানন্দ সংগ্রহশালায়। কেবল কূপই নয়, বছর কুড়ি আগে পুকুর সেচার সময় চারপাশে চারটি ঘাটও দেখা যায়। আরও অনেক নিদর্শন প্রমাণ করে যে প্রাচীনকালে ওই স্থানটি ছিল বেশ সমৃদ্ধশালী।
সুশীল স্নিগ্ধ জলে পরিপূর্ণ হেমসাগর প্রায় পাঁচ-ছয় বিঘা জমি নিয়ে বিস্তৃত। বর্তমানে পুকুরটি ‘বাগানপুকুর’ নামে পরিচিত কারণ ভীমসাগর পুকুরের উত্তর পাশে বৃহৎ আয়তনের জায়গা নিয়ে ছিল বাসুদেবপুর রাজাদের বাগানবাড়ি। এই বাগানের মধ্যেই এই পুকুর অবস্থিত। ওই বাগানবাড়িকে অনেকে গড়বাড়িও বলে থাকেন। গড়বাড়ি চারিধারে একসময় যে পরিখা ছিল তারও নমুনা পাওয়া যায়।
দেউলবাড় দেউলের পূর্ব দিকে রয়েছে চাঁদকোনিয়া পুকুর আর বড় মঠের পশ্চিম পাশে চৌদ্দমানিয়া পুকুর। এই পুকুরটি রাজাদের থেকে পাওয়া চোদ্দো বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে এরূপ নামকরণ হয়েছে। গবেষকদের অনুমান, একদা এখানে বৌদ্ধ প্রভাব ছিল। বৌদ্ধবিহারের নিদর্শনস্বরূপ দেখা যায় চারটি বড় স্তূপ, যাদের নাম পালটিকরি, শাপটিকরি, ধনটিকরি, গোঠনটিকরি। টিকরি ওড়িয়া শব্দ, যার অর্থ টিলা বা উঁচু স্থান। দেউলবাড়ের দেউলটি সম্ভবত চারটি স্তূপের কেন্দ্রে অন্য একটি স্তূপের ওপর তৈরি হয়েছিল।
অনুমান করা হয়, খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে নবম শতকে বাহিরীতে গড়ে উঠেছিল বেশ কিছু বৌদ্ধ সংঘারাম ও বৌদ্ধ স্তূপ। সপ্তম শতাব্দীতে যখন হিউয়েন সাং তাম্রলিপ্ত বন্দরে এসেছিলেন তখন বৌদ্ধ ধর্মের প্রবল স্রোত তমলুকে বইছিল। সেই ঢেউ বাহিরীতে আছড়ে পড়বে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। সম্ভবত ‘বিহার’ শব্দ থেকেই বাহিরীর উৎপত্তি। এছাড়াও, গ্রামের মধ্যে ‘বড় মঠ’ ও ‘ছোট মঠ’ নামে দুটি প্রাচীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বড় মঠটিতে রামচন্দ্র এবং সীতাদেবীর ও দ্বিতীয়টিতে নারায়ণ এবং বিষ্ণুর পূজা হয়। এই মঠগুলিও প্রাচীনকালের বৌদ্ধ ভিক্ষু শ্রমণদের সংঘারামের স্মৃতিমাত্র।

গ্রামের পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে বিস্তৃত ‘রসনালা’ নামে একটি মজা নদীর চিহ্ন পাওয়া যায়। মজা হলেও নদীর গভীর জমি বর্তমানে চাষের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর উভয় দিকের পাড় এবং গভীরতা লক্ষ করলে মনে হয়, এর মধ্য দিয়ে নিশ্চয় কোনও নদী প্রবাহিত ছিল। নদীটি বিভিন্ন গ্রামের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রসুলপুর নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে দূরের দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটাতে সাহায্য করত। বিভিন্ন দেশের বণিকরা ওই পথে পণ্যদ্রব্য জাহাজে করে নিয়ে আসতেন। নদীর পাড়ে ছিল এক বিশাল তেঁতুলগাছের অবস্থান। বণিকরা ওই গাছেই নিজেদের জাহাজ বা বড় নৌকা বেঁধে রাখতেন। সেজন্য এই গাছে ধীরে ধীরে শেকলের দাগ আঁকা হয়ে যায় আর সে পরিচিত হয় ‘জাহাজ বাঁধা তেঁতুল গাছ’ নামে। ক্রমে ক্রমে নদী বিলীন হয়ে গেলেও তার স্মৃতি বহন করে চলেছে গাছটি। বর্তমানে গাছটির বেড় ২২২ ইঞ্চি। বয়স তার প্রায় ছয়শোর কাছাকাছি। শেকলের দাগ আজ আর খুঁজে পাওয়া না গেলেও অতীতের সাক্ষী হিসাবে তাকে দেখলেও রোমাঞ্চ জাগে। বর্তমানে ওই গাছের পাশ দিয়ে পিচের রাস্তাটি চলে গেছে নামালডিহার দিকে।

নন্দকুমার-দিঘা রাজ্যসড়কে মারিশদা বাস স্টপে নেমে পূর্বমুখী পিচঢালা রাস্তায় তিন কিলোমিটার গেলেই পাওয়া যাবে বাহিরীকে। বাহিরী গ্রামের গ্রামবাসীদের আবেদন, বাহিরীকে ঘিরে গড়ে উঠুক পর্যটন কেন্দ্র। সংরক্ষণ করা হোক এখানকার শিল্পকর্ম। পর্যটন মানচিত্রে ঠাঁই না পাওয়া বাহিরী যদি তার যোগ্য সন্মান পায় তাহলে তা পূর্ব মেদিনীপুরের এক উল্লেখযোগ্য পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হবে এ কথা হলফ করে বলা যায়।

বাহিরী থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে চণ্ডীভেটী গ্রাম। বাংলার কালো ষাঁড় বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের জন্মস্থান তথা বাসভূমি। বসতবাটির বর্তমানে ভগ্নদশা। কিছু অংশ টিকে আছে আর বাকি অংশে গড়ে উঠেছে সরকারি উদ্যোগে সংগ্রহশালা। ৯ কার্তিক তাঁর জন্মদিন পালিত হয় সমস্ত গ্রাম জুড়ে। বাহিরী ঘুরতে গেলে পায়ে চণ্ডীভেটী গ্রাম ঘুরে নেওয়াই যেতে পারে।

রাত্রিবাসের ঠিকানা : তিলোত্তমা হোটেল ও লজ, কাঁথি। আপনজন লজ, কাঁথি।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

You might also like