Latest News

অচেনা উখরা

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুস করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

প্রাচীনতা ও বিশালতা নিয়ে উখরা এক স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম। অণ্ডাল থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে বাসে সহজেই উখরায় পৌঁছনো যায়। যে সময় অণ্ডালের কোনও অস্তিত্ব ছিল না সে সময় ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে উখরায় প্রসিদ্ধি ছিল। উখরার কথা জানতে হলে একটু পিছনের ইতিহাস জানতে হবে।
গোপীনাথ মন্দিরে সাম্প্রতিক বসানো প্রস্তরফলকে হাণ্ডা বংশের যে ইতিহাস লেখা আছে তা থেকে জানা যায়, ‘কেবলরাম তাঁর পিতার সহিত ব্যবসা উপলক্ষে ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে লাহোর শহর থেকে মুর্শিদাবাদে আসিয়াছিলেন। রামচন্দ্র শেরগড়ে (বর্তমানের উখরায়) আসিয়া ঘনশ্যাম কাপুরের কন্যাকে বিবাহ করেন। মেরুচন্দ্র নবাব আলিবর্দি খানের দেওয়ান পদে অধিষ্ঠিত হইয়া প্রভূত ধনসম্পত্তির অধিকারী হইয়া উঠিয়াছিলেন। পরবর্তীকালে এক অবাঞ্ছিত কারণের জন্য মেরুচন্দ্র মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করিয়া সপরিবারে (শেরগড়ে উখরায়) চলিয়া আসিয়াছিলেন। ১১৪৭ সনে মেরুচন্দ্র শ্রীশ্রী রামসীতা জীউ ও শ্রীশ্রী দামোদর জীউর জন্য মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। মেরুচন্দ্রের কন্যা বিষণকুমারী ওরফে বিষ্ণুকুমারীর সহিত বর্ধমানাধিপাতি ত্রিলোকচাঁদের বিবাহ হয়।’

আবার ইতিহাসবিদ যজ্ঞেশ্বর চৌধুরীর বর্ধমানের ইতিহাস সম্বন্ধে প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘বর্ধমান : ইতিহাস ও সংস্কৃতি’-র ১৮৫ পাতায় লেখা আছে, ‘উখরার খ্যাতি শুরু হয় মেহেরচাঁদ হাণ্ডার আগমনের পর থেকে। তাঁর কন্যা বিষণকুমারী দেবীর সঙ্গে রাজা ত্রিলোকচাঁদের বিবাহ হয়েছিল। ফলে মেহেরচাঁদ এতদঞ্চলের জমিদারি লাভ করেন।’ প্রস্তরফলকে লেখা ও যজ্ঞেশ্বর চৌধুরীর লেখা থেকে প্রমাণিত হয় যে, মেরুচন্দ্র ও মেহেরচাঁদ হাণ্ডা একই ব্যক্তি। উখরার জমিদারের সঙ্গে বা কিছু পরে পাঞ্জাব থেকে কাপুর ও মেহেরা পরিবারও এসেছিল এই গ্রামে। এঁরাও ব্যবসার মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। উখরায় ঘুরে বেড়িয়ে মন্দির ও অন্যান্য স্থানগুলি দেখতে ভাল লাগবে।

গোপীনাথ মন্দির ও রামচন্দ্র মন্দির : উখরার প্রধান দর্শনীয় স্থান হল এই মন্দির এলাকা। মন্দিরের সামনেই প্রশস্ত ফাঁকা জায়গা মেলা বা অনুষ্ঠানের জন্য। মূল মন্দিরের প্রবেশপথের দু’ধারে অষ্টকোণাকৃতি রাসমঞ্চ ও দোলমঞ্চ। এই মঞ্চগুলি সুদৃশ্য গৃহের আকৃতির। দোল ও রাসের সময় গোপীনাথজিকে এখানে এনে উৎসব হয়। প্রবেশপথ দিয়ে গিয়ে সামনেই রয়েছে বড় নাটমন্দির। নাটমন্দিরের বামে রামচন্দ্রজির মন্দির ও নাটমন্দির পেরিয়ে গোপীনাথজির মন্দির। রামচন্দ্রজির মন্দিরটি পাঁচ চূড়াবিশিষ্ট পাথরের এক প্রাচীন মন্দির। ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে মেরুচন্দ্র হাণ্ডা এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। তিন ফুট একটি ভিত্তিবেদির ওপর দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে প্রায় ২৪ ফুট নিয়ে মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ৪০ ফুট। মন্দিরের গায়ে পাথরে খোদিত বেশ কিছু দেবদেবী ও পশুপাখি মূর্তি আছে। মন্দিরটি রক্ষণাবেক্ষণের ফলে এখনও সুন্দর রয়েছে। এখানে রাম-লক্ষ্মণ-সীতা ও হনুমান এবং নারায়ণ শিলার নিত্যপূজা হয়। মূর্তিগুলি অতীব সুন্দর।

এই মন্দিরের কাছেই ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে বক্তার সিং-হাণ্ডা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত গোপীনাথ জীউয়ের মন্দির আছে। বক্তার সিং হাণ্ডা ছিলেন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। তিনি গোপীনাথের অপরূপ মূর্তি দাঁইহাটের ভাস্করদের দিয়ে করিয়েছিলেন। উখরার সর্বপ্রাচীন মন্দিরের দেবতা শ্যামরায় বর্তমানে গোপীনাথ মন্দিরে পূজিত হন। বর্তমানে গোপীনাথ মন্দির এলাকার সমস্ত দেবদেবীর পূজার জন্য এখানে মঠ নির্মিত হয়েছে। মন্দিরের অনেক দেবোত্তর সম্পত্তি আছে। একটি কমিটি সব পরিচালনা করে।
সারাবছর ধরে এখানে জন্মাষ্টমী, দোলযাত্রা, রাস, ঝুলনযাত্রা, গোষ্ঠযাত্রা, রথযাত্রা প্রভৃতি উৎসব পালিত হয়। উখরায় রথযাত্রা উৎসব মহাসমারোহে হয়ে থাকে। গোপীনাথ জীউ ও রাধিকাকে রথে বসিয়ে হাজার হাজার মানুষ রথ টানেন। আগে রথ টানা হত দুর্গাবাড়ি পর্যন্ত। বর্তমানে নিরাপত্তার কারণে বাজপেয়ী মোড় পর্যন্ত রথ যায়। পূর্বে নয় চূড়াবিশিষ্ট পিতলের রথ ছিল, তা অব্যবহার্য হওয়ায় নতুন রথ তৈরি হয়েছে। এই উপলক্ষে মেলা বসে রাস্তার দু’ধারে।

মন্দিরের সবচেয়ে জনপ্রিয় উৎসব হল ঝুলনযাত্রা। বাংলার ১২২০ সালে শম্ভুনাথ লক্ষ্মণ সিং হাণ্ডা ঝুলনযাত্রা শুরু করেছিলেন। এখনও সমারোহে পালিত হয়ে আসছে। মন্দিরের সামনের জায়গায় অস্থায়ী দোকান ও বাজপেয়ী মোড়ের কাছে মূল মেলাটি বড় আকারে বসে। এছাড়া রাস ও দোলের সময় গোপীনাথ জীউকে বাইরের মঞ্চে এনে উৎসব হয়। সব মিলিয়ে সারাবছর মন্দির এলাকা জমজমাট থাকে।

চাঁদনিবাড়ি : গোপীনাথ মন্দির থেকে কাছেই রথতলায় রয়েছে জমিদারবাড়ি। বাড়ির এলাকার মধ্যেই রয়েছে জমিদারদের প্রতিষ্ঠিত চাঁদনিবাড়ি বা দুর্গামন্দির। মন্দির ও নাটমন্দির একসঙ্গে নির্মিত হওয়ায় এক বিরাট অট্টালিকার মতো লাগে এই চাঁদনিবাড়ি। ফ্রেসকো ও স্ট্যাকো পদ্ধতির মতো চুন-সুরকির সাহায্যে ফুল, পাখি, লতাপাতার অলংকরণে সুন্দর সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়েছে। এই মন্দিরে দুর্গাপূজা হয় আবার শ্রীকৃষ্ণের গোষ্ঠে আসার স্থানও এটি।

মন্দিরের সামনেই পাশাপাশি দুটি শিব মন্দির আছে। মন্দিরদুটি রেখদেউল রীতির অর্থাৎ রথের আকৃতির মতো কিছুটা ওপর থেকে ডিম্বাকৃতি গম্বুজ উঠে গেছে। প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার এই মন্দিরদুটির সামনে বিভিন্ন দেব-দেবীর টেরাকোটার মূর্তি, মানুষের মূর্তি, ফুল ও অলংকরণ রয়েছে। মন্দিরে শিবলিঙ্গের নিত্যপূজা হয়। চাঁদনিবাড়ি ও শিবমন্দির একই সময়ে তৈরি হয়েছিল বলে মনে হয়। বিশেষজ্ঞরা এগুলি অষ্টাদশ শতকে নির্মিত বলে মনে করেন।

শ্যামরায় মন্দির : উখরা গ্রামের সর্বপ্রাচীন মন্দির। ১৬৮৬ খ্রিস্টাব্দে ঘনশ্যাম দাস কাপুর এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে গ্রামের শেষে সুকোপাড়ায় কয়েক বিঘা জমির ওপর ভগ্ন ও পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। প্রায় ৪ ফুট ভিতের ওপর প্রায় ৩৫ ফুট উচ্চতার চারচালা আকৃতির প্রাচীন মন্দিরটি বেলেপাথরের তৈরি। মূল মন্দিরের চারদিকে বারান্দা আছে। এখনও বেশ কিছু অলংকরণ ও মূর্তি মন্দিরের গায়ে রয়ে গেছে। সামনে দাঁড়ালে সম্ভ্রম জাগে। আশার কথা, গৌড়ীয় মঠের একটি শাখা এখানে স্থাপিত হয়েছে ও তারা মন্দির বাঁচানোয় উদ্যোগী হয়েছে।
এছাড়া দেখে নেওয়া যেতে পারে গ্রামের শেষে বেলেপাথরের তৈরি ৩০০ বছরের প্রাচীন শিব মন্দির, রথতলার শিব মন্দির, ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে তৈরি দাসপাড়ার শিব মন্দির, পাথরের তৈরি ধর্মরাজের মন্দির প্রভৃতি।

উখরার ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায় যদি না মহান্ত অস্থল সম্বন্ধে উল্লেখ করা হয়। বর্ধমান অঞ্চলের মহান্ত নরহরিদেব তাঁর শিষ্য দয়ারামদেবকে উখরায় গোপাল বিগ্রহ স্থাপন করে অস্থল নির্মাণের আদেশ দেন। তাঁরা কীর্তিচাঁদের কাছ থেকে ২৫১ বিঘা জমি দেবোত্তর পান। অস্থলে নির্মিত হয় গোপাল জীউ ও বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দির। অস্থলের মধ্যে শ্যামসুন্দর মন্দিরও আছে। মেহেরচাঁদের আমলে দাঁইহাট থেকে কয়েকজন ভাস্করকে এনে এইসব বিগ্রহ নির্মাণ করা হয়েছিল। এছাড়া এই গ্রামে সারাবছর ধরে বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা হয়। খ্যাপা দুর্গা, ভয়ংকরী, বীজখেকো মা, মা-সন্ন্যাসী প্রভৃতি নামে বিভিন্ন সময়ে কালীপূজা হয়। মা সন্ন্যাসী দেবীকে স্থানীয় অধিবাসীরা অত্যন্ত জাগ্রত দেবী বলে মনে করেন। কালীপূজায় সাড়ম্বরে বাৎসরিক পূজা ও কয়েকশো ছাগবলি হয়। সারা বছরই উখরাবাসী পূজা, মেলা ও উৎসব নিয়ে প্রাণচঞ্চল থাকেন।

সরপী

উখরা থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে সরপী গ্রাম। সরপীতে দুর্গাপুর থেকেও আসা যায়। এটি ফরিদপুর থানার মধ্যে হলেও উখরা থেকে ঘুরে নেওয়া সুবিধের। জঙ্গলের মধ্যে সরফরাজ খানের কাছ থেকে জমিদারি নিয়ে অর্জুন রায়চৌধুরী সরফপুর গ্রামের পত্তন করেছিলেন। সরফপুর পরে লোকমুখে সরপী হয়েছে। মূল রাস্তা থেকে দূরে সরপী গ্রামটি বেশ সুন্দর।

এই গ্রামের উল্লেখযোগ্য দ্রষ্টব্য হল দুর্গা মন্দিরের কাছে গোপাল জীউয়ের নবরত্ন মন্দির। ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে অর্জুন রায়চৌধুরীর পৌত্র ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। চারপাশে বড় বড় বাড়ির মধ্যে ৪০ ফুট উচ্চতার মন্দির এখনও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। মন্দিরের সামনের দিকে সুন্দর টেরাকোটার কাজ ছিল। পৌরাণিক দেবদেবী, ফুল, লতাপাতার অলংকরণ সামনের দেওয়ালের অংশ ও দুটি থামে রয়েছে। বর্তমানে মূর্তিগুলি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এর ওপর রঙের প্রলেপও পড়েছে। মন্দিরের কাছেই আছে রাসমঞ্চ।

এই মন্দিরের কাছেই আছে দুর্গা মন্দির। প্রায় ৩০০ বছর আগে জমিদার অর্জুন রায়চৌধুরী এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখন এটি তরফ দশ আনির। ১৪১৫ সনে মন্দিরটির নবকলেবর হয়েছে। পাশের দুর্গা মন্দিরটি তরফ ছয় আনির, এটি ১১৫০ বঙ্গাব্দে অর্জুন রায়চৌধুরীর পুত্র কল্যাণ রায়চৌধুরী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর দশম প্রজন্ম তরফ ছয় আনির সেবাইতরা ১৪১৬ বঙ্গাব্দে মন্দির সংস্কার করেছেন। মন্দিরের সামনে দুটি শিব মন্দির আছে। পতিতপাবন শিব মন্দিরটি ১২৮২ সনে প্রতিষ্ঠা করেন ভক্ত রামদেব সম্মতা, তার পাশের শিবমন্দিরটি ১২৮২ সনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হৃদয়বলো। এছাড়া পাশে রামেশ্বর শিব ও একটু দূরে দুটি প্রাচীন শিব মন্দির আছে। গ্রামে বামাকালী মন্দিরের কাছে চারটি শিব মন্দির একত্রে আছে। গ্রামে রামসায়র দিঘির পাড়ে বেলেপাথরের দুটি প্রাচীন ভগ্ন শিব মন্দির আছে।

সরপী প্রকৃতি ভ্রমণ কেন্দ্র : সরপী গ্রামে ঢোকার রাস্তার পাশেই তৈরি হয়েছে সরপী ইকো ট্যুরিজম পার্ক। এটি দুর্গাপুর-ফরিদপুর পঞ্চায়েত সমিতি ও ইছাপুর গ্রামপঞ্চায়েতের সৌজন্যে নির্মিত। ২০১৭ সালে এটি উদ্বোধন করেছেন জেলাশাসক সৌমিত্র মোহন। পার্কটি গাছের সারি, ফুলের বাগান, সিমেন্টের হাতি, জিরাফ, ময়ূর প্রভৃতি দিয়ে সাজানো। বাচ্চাদের জন্য খেলার প্রচুর ব্যবস্থা রয়েছে। বড়দের হাঁটার জায়গা, বসার জায়গাও আছে। পিকনিক শেড তৈরি হচ্ছে, ভবিষ্যতে থাকার ব্যবস্থাও হবে। নির্মীয়মাণ পার্কটি ভবিষ্যতে ভ্রমণ মানচিত্রে জায়গা করে নেবে।

উখরা ও সরপী গ্রামের মাঝে পড়ে বাঁকালো গ্রাম। এখানে কোলিয়ারি আছে। দেবী বাঁকালেশ্বরী ও বাঁকালেশ্বর শিবের নতুন মন্দির আছে। ঘুরে দেখতে ভাল লাগবে।
রানিগঞ্জে রাত্রিবাস করে দেখে নেওয়া সুবিধার হবে, রাত্রিবাসের ঠিকানা : আর কে কন্টিনেন্টাল, এন এস বি রোড, রানিগঞ্জ, দূরভাষ : ০৩৪১ ২৪৪৪৬০৪।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

You might also like