Latest News

অগ্রদ্বীপ ও গোপীনাথ

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুস করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

কাটোয়া থানার অন্তর্গত অগ্রদ্বীপ একটি প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম। কাটোয়া লোকালে অগ্রদ্বীপ স্টেশনে নেমে রিকশায় অথবা হেঁটে গঙ্গার তীরে এসে নৌকায় পার হয়ে অগ্রদ্বীপে পৌঁছনো যায়। বৈষ্ণবতীর্থ হিসেবে অগ্রদ্বীপের খ্যাতি বহুকালের। এখানকার গোপীনাথ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র। ৮টি গোলাকার থামের ওপর দালানরীতিতে প্রায় ২০ ফুট উঁচু গোপীনাথের মন্দির নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরে রয়েছে প্রায় ২ ফুট উঁচু কষ্টিপাথরে নির্মিত গোপীনাথ, পাশে অষ্টধাতুর রাধিকা মূর্তি। কষ্টিপাথরের অপরূপ মোহন মূর্তিটি ৫০০ বছর আগে গড়েছিলেন পাশের গ্রাম দাঁইহাটের কোনও এক ভাস্কর।

ভাগীরথীর গর্ভে চড়া পড়ে প্রথমে যে দ্বীপ বা ভূখণ্ডের সৃষ্টি হয়েছিল তাই অগ্রদ্বীপ। অগ্রদ্বীপের ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরে ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। তার প্রসিদ্ধি শুরু হয় গোপীনাথ বিগ্রহ ও গোবিন্দ ঘোষের প্রতিষ্ঠার পর থেকে।
গোপীনাথ বিগ্রহ ও গোবিন্দ ঘোষের কথা বলতে গেলে আশ্রয় নিতে হবে এক আশ্চর্য কিংবদন্তির যার বয়স ৫০০ বছরের বেশি। মহাপ্রভু শ্রীক্ষেত্র যাবার কালে যে ক’জন তাঁর সঙ্গ নেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম গোবিন্দ ঘোষ। অগ্রদ্বীপের আগের কোনও গ্রামে মহাপ্রভু আহারান্তে একটু হরীতকী চেয়েছিলেন মুখশুদ্ধি হিসাবে। গোবিন্দ তা সংগ্রহ করে দেন এবং যদি প্রভু আবার চান, তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে এক টুকরো কাছে রাখেন। পরের দিন আহারান্তে গোবিন্দ ঘোষ প্রভুর দিকে এক টুকরো হরীতকী এগিয়ে দিতেই প্রভু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন এ হরীতকী তিনি কোথায় পেলেন? গোবিন্দ বলেন, ‘আপনার সেবায় যদি লাগে, তাই রেখে দিয়েছিলাম।’ প্রভু খুশি হওয়ার বদলে রুষ্ট হয়ে বলেন, ‘গোবিন্দ, তুমি এখানেই থেকে যাও কারণ তোমার সঞ্চয়ের বাসনা এখনও যায়নি। সন্ন্যাসী মানুষের সঞ্চয়ের বাসনা থাকা উচিত নয়।’ গোবিন্দ ঘোষ বলেন, ‘প্রভু, সঞ্চয় যদি করে থাকি, সে তো নিজের জন্য নয়, আপনার জন্য।’ চৈতন্যদেব বললেন, ‘যার জন্যই করে থাকো, সেটা তো একধরনের স্বার্থেরই কথা, ওতে বৈরাগ্য হয় না। তুমি এখানেই থাকো, এইখানে বিয়ে করে গৃহী হও।’
চোখের জলে প্রভুকে বিদায় দিয়ে গোবিন্দ ঘোষ রয়ে গেলেন এই অগ্রদ্বীপেই। একদিন গঙ্গাস্নানের সময় তার পায়ে ঠেকল কালো রঙের কী একটা বস্তু। তখন দৈববাণী হল, ‘ওটা নারায়ণ শিলা, এই শিলা দিয়ে বিগ্রহ বানিয়ে বাৎসল্যভাবে আমার পূজা করিয়ো।’ অগ্রদ্বীপের পাশে দাঁইহাটের পাষাণশিল্পী এসে গড়ে দিলেন অনিন্দ্যসুন্দর গোপীনাথের মূর্তি। মূর্তির চোখদুটিতে শ্বেতশঙ্খ বসানো, অদ্ভুত এর নির্মাণ পরিকল্পনা। শিল্পী কী অদ্ভুত কল্পনায় এমন মূর্তি গড়েছিলেন তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।

গোপীনাথ বিগ্রহ ও গোবিন্দ ঘোষের সম্পর্ক ছিল পিতা-পুত্রের। গোবিন্দ ঘোষের স্ত্রী আগেই পরলোকগত হয়েছিলেন। একমাত্র পুত্র ইহলোক ত্যাগ করায় গোপীনাথ গোবিন্দ ঘোষকে মনস্তাপ করতে নিষেধ করেন। গোপীনাথের প্রতি বাৎসল্যভাবে সেবাপূজা করায় স্বয়ং গোপীনাথ নাকি বলেছিলেন ঘোষঠাকুরের মৃত্যুর পর তাঁর শ্রাদ্ধাদিকার্য গোপীনাথের দ্বারাই সম্পন্ন হবে।
একদা বারুণী উৎসবের আগে চৈত্র মাসের একাদশী তিথিতে ঘোষঠাকুর ইহলোক ত্যাগ করেন। জনশ্রুতি এই যে, সেদিন গোপীনাথের চোখে বিন্দু বিন্দু অশ্রুকণা দেখা দিয়েছিল। ঘোষঠাকুরকে দাহ না করে মন্দিরের পাশে সমাধিস্থ করা হয়। দ্বাদশ দিবসে স্বয়ং গোপীনাথ শ্রাদ্ধের বস্ত্র ও কুশাঙ্গুরীয় পরিধান করে পুত্ররূপে ঘোষঠাকুরের শ্রাদ্ধকার্য সম্পাদন করেন। এখনও প্রতি বছর ওই তিথিতে বিগ্রহকে শ্রাদ্ধের বসন পরানো হয় এবং পূজারীরা মন্দিরের মেঝেয় কুশ বিছিয়ে বিগ্রহের হাতে পিণ্ড তুলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে বাইরে আসেন। কিছুক্ষণ পরে দরজা খুলে দেখা যায়, কুশের ওপর পিণ্ড পড়ে আছে। যেখানে আত্মজ একবার বাৎসরিক কাজ করে দায়মুক্ত থাকে জগৎপতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ায় সুদীর্ঘ ৫০০ বছর যাবৎ আজও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতি বছর চৈত্রের নির্দিষ্ট তিথিতে শাস্ত্রানুযায়ী সপিণ্ডকরণ করে যাচ্ছেন। এই একটি দেখার মতো উৎসব। গোপীনাথকে কাছা পরিয়ে কেশহীন অবস্থায় গোবিন্দ ঘোষের সমাধিমন্দিরে নিয়ে এসে কুশ ও পিণ্ড তাঁর হাতে রাখা হয়। পরে শ্রাদ্ধের কাজ শেষ হলে মন্দিরে ফিরিয়ে এনে রাজবেশ পরানো হয়। উৎসব বেশ কয়েকদিন চলে। প্রথম দিনে কেউ অন্নগ্রহণ করে না। দই-চিঁড়ে-কলা খেয়ে চিঁড়ে মহোৎসব পালন করে। দ্বিতীয় দিনে অন্ন মহোৎসব, তৃতীয় দিনে বারুণী স্নান, চতুর্থ দিনে দোল উৎসব হয়। এই উৎসব ও অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন এবং উৎসবের অঙ্গ হিসাবে গঙ্গার তীর পর্যন্ত আখড়াগুলি থেকে অন্নদান ও অন্নগ্রহণ চলতে থাকে।

মূল মন্দিরের ডানদিকে রয়েছে যাত্রীনিবাস। মেলার সময় যাত্রীরা এসে থাকেন। শৌচাগার, পানীয়জলের ব্যবস্থা আছে। একটু দূরে কয়েকটি বাঁধানো চৌবাচ্চা রয়েছে। মহোৎসবের সময় রান্না করে এখানে ঢালা হয়।
অগ্রদ্বীপের গ্রামীণ মেলার যে রূপ ছিল, শহরবাসীর চাপে ও হুজুগে তা এখন নষ্ট হয়ে গেছে। আগে রান্না হত মেটে হাঁড়িতে, নাড়াঘাঁটা হত বাখারি দিয়ে, পরিবেশন হত নারকেলমালার হাতা বানিয়ে, খাওয়া হত কলার পাতায়। লম্বা করে কেটে বানানো হত উনুন। রাঢ়ের মাটি, কাদা নেই। তাই গর্তের মতো কেটে তার মধ্যে ঢালা হত ডাল, ভাত, তরকারি। শহুরে মানুষ, চিৎকার, মাইকের আওয়াজে গ্রামীণ মেলার রূপ ও আনন্দ গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে। বারো দোলের সময় গোপীনাথকে কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হত। প্রথমে নৌকা করে, পরে পালকিতে। বর্তমানে গ্রামবাসীরা আর গোপীনাথকে পাঠান না। তাই তিনি এখন অগ্রদ্বীপের মন্দিরেরই বাসিন্দা।

নতুনগ্রাম

নানা ভাষা, মত, পরিধানের দেশ আমাদের। কত রঙিন এই দেশের মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি। কত শিল্পসুষমাময় তাদের সমাজ। দেশের মানুষের জীবনযাত্রাই যেন এক একটি আর্ট গ্যালারি। এরকম দেখতে হলে বেশি দূরে নয়, হাতের কাছেই রয়েছে অগ্রদ্বীপের নতুনগ্রাম। ব্যান্ডেল-কাটোয়া লাইনের একটি ষ্টেশন অগ্রদ্বীপ। এই স্টেশনের দক্ষিণ দিকে মাইল খানেক আলপথ দিয়ে গেলেই নতুনগ্রাম। গ্রামটি ছোট হলেও লোকশিল্পের আলোচনার ক্ষেত্রে তার বিশেষ খ্যাতি আছে। বিস্ফারিত চক্ষুর পেঁচা, রাজা-রানি, হাততোলা গৌর-নিতাই– ঐতিহ্যবাহী এই তিন ধরনের কাঠের পুতুলই গড়তেন নতুনগ্রামের শিল্পীরা। এঁদের পদবি সূত্রধর, উপাধি ভাস্কর। এঁরা কাঠ খোদাই করে বিভিন্ন আকৃতির পেঁচা, পুতুল ও রথ নির্মাণ করে থাকেন। এঁরা যে শুধু পূর্বপুরুষের সৃজনচর্চা সজীব রেখেছেন তাই নয়, নিত্যনতুন কল্পনার মিশেলে তা দিন দিন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কখনও কাঠের পেঁচা দিয়ে টেবিল, কখনও পেঁচার আদলে রাজা-রানি, কখনও সার সার পেঁচা দিয়ে ওয়াল হ্যাঙ্গিং, গণেশ, বিশ্বকর্মা, দুর্গা– যেগুলি নতুন রুচিসম্পন্ন আধুনিক ফ্ল্যাটের জনপ্রিয় গৃহসজ্জার উপকরণ।

পুতুলগুলো তৈরি হয় মূলত শিমুল, মাদার, ছাতিম, আতা ইত্যাদি সস্তা কাঠ দিয়ে। রং বলতে লাল, হলুদ, নীল, সবুজ আর রেখা দিতে কালোর সঙ্গে সাদা। আগে রং ছিল প্রাকৃতিক। এখনও আছে, তবে স্থায়িত্ব বা ঔজ্জ্বল্য বজায় রাখতে রাসায়নিক রং বা সিন্থেটিক এনামেল ব্যবহার করা হয়। কতগুলি পদ্ধতির মাধ্যমে পুতুলগুলো তৈরি হয়। প্রথমে কাঠের তৈরি পুতুলে সাদা খড়িমাটি লাগানো হয়। এই খড়িমাটি লাগানোকে শিল্পীরা বলেন পোচাই। তারপর তেঁতুল বীজের আঠা আর কস্টিক সোডা মিশিয়ে প্রাকৃতিক রংগুলিকে ব্যবহারের উপযুক্ত করা হয়। কস্টিক সোডা কীটনাশকের কাজ করে। তেঁতুলের আঠা হল রংগুলির মিডিয়াম। সবশেষে গর্জন তেল দিয়ে পুতুলে লাবণ্য সংযোজিত হয়। বর্তমানে কিছু কিছু পুতুল সরাসরি পালিশ করে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয় এবং চাহিদাও মন্দ নয়। তবে বেশ কিছুদিনের পুরনো, খানিক রংচটা পুতুলের আবেদন অন্যরকম। মানুষ যেমন জীবনের আঁচে পুড়ে ওঠে, সময় ও দূষণ যেমন তার ত্বকের ওপর বলিরেখার আঁচড় টানে, এই পুতুলগুলোও তেমনই ক্ষয়ে যাওয়া কাঠে, চটে যাওয়া রঙের সঙ্গে নিজের বিনম্র অস্তিত্বকে উজ্জ্বল করে।
এই গ্রামে আছেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত কয়েকজন শিল্পী। বর্তমানে পেঁচার কদর দেশ ছেড়ে বিদেশ অভিমুখী। কলকাতার পুজোর থিমেও পেঁচা অংশগ্রহণ করতে পিছিয়ে নেই। গ্রামের পরিবেশটি বেশ চমৎকার। এখানে থাকার জন্যে সরকারি সহায়তায় অতিথিনিবাস তৈরি হয়েছে।
নতুন গ্রামে কাঠিয়াবাবার আশ্রম ও এখান থেকে কাছে বহড়া গ্রামে বাংলা সংবাদপত্রের জনক গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের জন্মস্থানটিও দেখে নেওয়া যেতে পারে। কাটোয়ায় রাত্রিবাস করে দেখে নেওয়া সুবিধার হবে।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

You might also like