Latest News

বড়জোড়ার পাশে ছোট ছোট গ্রাম

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুস করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

দুর্গাপুর–বাঁকুড়া সড়কপথটি জেলার অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা। দুর্গাপুর থেকে বাঁকুড়া যাওয়ার পথে দামোদর পেরোলেই প্রথম পড়ে বড়জোড়া থানা, তারপর বেলিয়াতোড় থানা হয়ে বাঁকুড়া শহর। এই থানা এলাকা উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্র না হলেও এই এলাকাতে এমন কিছু অঞ্চল থেকে গেছে যেগুলি না দেখলে বাঁকুড়াকে জানা অনেকটাই খামতি থেকে যাবে।

কাদাসোল : বাঁকুড়া-দুর্গাপুর সড়কে বড়জোড়া মোড়ে নেমে যে রাস্তাটি মেজিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে গেছে সেই রাস্তায় দেড় কিলোমিটার মতো গিয়ে ডান দিকের রাস্তাটি ধরে প্রায় এক কিলোমিটার মতো গেলে কাদাসোল গ্রাম। এই গ্রামের ঘোড়ুই পরিবারের প্রায় ৩৫ ফুট উচ্চতার পঞ্চরত্ন মন্দিরটির টেরাকোটা কাজগুলি এত নিখুঁত ও সজীব যার জন্য এই গ্রামে একবার যেতেই হবে। কৃষ্ণলীলা, দশাবতার, রাসমণ্ডল এবং সামাজিক দৃশ্যগুলি খুব সুন্দর। ঘোড়ুই পরিবারের সদস্যরা এই মন্দিরের শালগ্রাম শিলারূপী বিষ্ণুর পূজা করে চলেছেন। মন্দিরের ওপর দিকে ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। এই পরিবারের ক্ষমতা নেই প্রায় দুশো বছরের প্রাচীন মন্দিরকে রক্ষা করার। মন্দিরটি দেখার জন্য ও যদি বাঁচানোর চেষ্টা করা যায় তার জন্য অবশ্যই একবার যাওয়া উচিত।
ঘুটগেড়িয়া : রাজারা কখনও নিজের ইচ্ছায় আবার কখনও তাঁর রাজ্যের সীমানার মধ্যে সামন্তদের অথবা স্থানীয় জনগণকে খুশি করার জন্য কিছু মন্দির তৈরি করেছিলেন। এরকমই একটি মন্দির হল ঘুটগেড়িয়ার পাথরের রেখ দেউল যেটি খ্রিস্টীয় সতেরো শতক বা তারও পরে মল্লরাজাদের উৎসাহে নির্মিত হয়েছিল বলে পুরাতত্ত্ব বিভাগ মনে করে। মন্দিরটি ওড়িশার খিচিং স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে তৈরি। এটি একটি দর্শনীয় পুরাকীর্তি। প্রতিষ্ঠালিপি পাওয়া যায়নি। মন্দিরে কোনও বিগ্রহ নেই কিন্তু মন্দিরগাত্রে সামনের দিকে ব্রহ্মা, অনন্তবিষ্ণু, ইন্দ্র এবং কৃষ্ণলীলা বিষয়ক ভাস্কর্য থেকে অনুমান করা যায় কৃষ্ণপূজা প্রচলনের জন্য মল্লরাজারা এটি হয়তো প্রতিষ্ঠা করেছেন। বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত। কাদাসোল থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে ও বড়জোড়া মোড় থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে ঘুটগেড়িয়া। গ্রামের বাইরে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ধানখেতের মধ্যে প্রায় ৩০ ফুটের এই রেখ দেউলটি অবস্থান করছে।

মালিয়াড়া : ঘটুগেড়িয়া থেকে আরও কিছুটা মেজিয়ার দিকে এগিয়ে গেলেই পড়ে বর্ধিষ্ণু, গ্রাম মালিয়াড়া। বড়জোড়া মোড় থেকে দূরত্ব ১৩ কিলোমিটার। মালিয়াড়াতে বসতি স্থাপনের কাহিনি বেশ চিত্তাকর্ষক। তখন ষোড়শ শতকের শেষ সময়। আকবরের সেনাপতি মানসিংহ ওড়িশা অভিযানের সময় এখানে তাঁবু ফেলেছিলেন। ফেরার পথে অভিযানের অন্যতম সদস্য কান্যকুব্জীয় ব্রাহ্মণ দেব আধুর্য এখানে থেকে যান এবং বসতি স্থাপন করে এখানে পল্লির প্রবর্তন করেন। পরে তিনি মুঘল সুবাদারের কাছ থেকে রাজা উপাধি পান। পরবর্তী বংশধর বাসুদেব আধুর্য এই গ্রামে একটি পাথরের নবরত্ন মন্দির নির্মাণ করেছিলেন সতেরো শতকের প্রথম দিকে। এটি বোধহয় পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম নবরত্ন মন্দির। কালের গতিতে এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত। পরবর্তী অন্য বংশধরেরা এখানে বিশাল রাজবাড়ি, ঠাকুরদালান, মন্দির ও অন্যান্য জিনিস তৈরি করেন। বংশধরেরা বর্তমানে বিভক্ত হয়ে বড়বাড়ি ও ছোটবাড়ি নামে পরিচিত হয়েছেন। দুটি বাড়িতেই রয়েছে নাটমন্দির-সহ ঠাকুরবাড়ি।
ঠাকুরবাড়িগুলি দেখার মতো। বড় বড় থাম, রঙিন ঝাড়বাতি, দুর্লভ চিত্রকলায় সজ্জিত। বিভিন্ন পূজা-পার্বণে ঠাকুরদালানগুলি জমজমাট হয়ে ওঠে। বড় রাজবাড়ির বাইরে একটি কমপ্লেক্সের মধ্যে শিবমন্দির, উঁচু ভিতের ওপর রাসমঞ্চ-সহ অনেক কিছু দেখার আছে। রাসমঞ্চে এখনও কিছু পঙ্খের কাজ রয়েছে। শিবমন্দিরে কিছু টেরাকোটার কাজও রয়েছে। ইতিহাসে যাদের ঝোঁক আছে, যারা রাজবাড়ি দেখতে আগ্রহী তাদের একবার মালিয়াড়া গ্রামে ঘুরে আসা উচিত। কেবল রাজবাড়ি, ঠাকুরবাড়ি বা প্রাচীনত্ব নয়, গ্রামটিও বেশ সুন্দর, ঘুরে বেড়াতে মন্দ লাগবে না।

সাহারজোড়া : বড়জোড়া থেকে বাঁকুড়ার দিকে দেজুড়ি মোড় তিন কিলোমিটার, সেখান থেকে আরও সাড়ে তিন কিলোমিটার গেলে সাহারজোড়া গ্রামে পৌঁছনো যায়। এই গ্রাম বিখ্যাত দেবী অম্বিকার জন্য। মায়ের মন্দিরটি চারচালা ও সাম্প্রতিক কালে নির্মিত। দেবী চতুর্ভুজা ও সিংহবাহিনী। শারদীয় দুর্গোৎসবের দশমীর দিন প্রধান পূজা ধূমধামের সঙ্গে হয় ও মেলা বসে। এই গ্রামে নন্দলাল, মদনমোহন ও কালাচাঁদের তিনটি মন্দির আছে। প্রথমটি ১৭২০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ৩০ ফুট উচ্চতার ত্রিখিলান দালানযুক্ত মাকড়াপাথরের একরত্ন মন্দির। দ্বিতীয়টি বহু সংস্কারে বৈচিত্র্যহীন এবং তৃতীয়টি অতীতে ইটের পঞ্চরত্ন মন্দির ছিল, বর্তমানে চারটি চূড়া ভেঙে যাওয়ায় একরত্ন মন্দিরের মতো দেখায়। এটির উচ্চতা প্রায় ২৫ ফুট।

মুক্তাতোড় : সাহারজোড়া থেকে আরও আড়াই কিলোমিটার গেলে মুক্তাতোড় গ্রাম। এই গ্রামে ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ১৬ ফুট উচ্চতার নাড়ুগোপালের দালান মন্দিরটি কায়স্থপাড়ায় অবস্থিত। মন্দিরে এখনও কিছু টেরাকোটার কাজ আছে। আরও কতগুলি মন্দির এই গ্রামে আছে।

পখন্না

বড়জোড়া থানার হাট-আসুরিয়ার মোড় থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার গেলে পখন্না। পখন্নায় পৌঁছে প্রথমেই দেখা উচিত ধর্মরাজের সুদৃশ্য মন্দির যেখানে রয়েছেন দেবতা ধর্মরাজ ও বেশ কিছু পুরাসম্পদ যেগুলি মূর্তি হিসাবে পূজিত হয়। গ্রামের কালীমন্দিরের চাতাল ও অন্যান্য অনেক দেবতার স্থানে অনেক পুরাসম্পদ পড়ে রয়েছে খোলা আকাশের নীচে যেগুলি পূজিত দেবতা হিসেবেই রয়েছেন। এত সব দামি পুরাসম্পদ সিঁদুর-তেলে চর্চিত হয়ে, রোদে-জলে পুড়ে, ভিজে কীভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দেখলে কষ্ট হয় কিন্তু একথা ভাবার বিষয় যে যেহেতু পুরাসম্পদগুলি দেবতা হিসাবে পূজিত হচ্ছেন, সেহেতু গ্রামবাসীরা মূর্তিগুলিকে সযত্নে আগলে রেখেছেন নতুবা কবেই মূর্তিচোরদের হাত ধরে সাফাই হয়ে যেত।

এই পখন্না গ্রামের বসতি মৌর্যযুগ কী তার চেয়েও বেশি প্রাচীন এবং এটি পালযুগের প্রথম অবধি অর্থাৎ খ্রিস্টীয় নবম-দশম শতক অবধি অবিচ্ছিন্ন ছিল বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। শুশুনিয়া পাহাড়ে যে শিলালিপিটি রয়েছে তা থেকে জানা যায় সিংহবর্মণের পুত্র চন্দ্রবর্মণ পুস্কর্ণার অধিপতি ছিলেন এবং আজকের পখন্নাই যে চন্দ্রবর্মণের সময়ের পুস্কর্ণা এ বিষয়ে পণ্ডিতরা সকলেই একমত পোষণ করছেন।

১৯২৭-২৮ খ্রিস্টাব্দে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের রিপোর্ট, ১৯৯৪ সাল থেকে অন্তত পাঁচ বার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উৎখনন থেকে পখন্নার গুরুত্ব বেড়েছে। এই অঞ্চল থেকে মৌর্য, কুষাণ, শুঙ্গ আমলের মৃৎপাত্র, তামা ও লোহার তৈজসপত্র, বেশ কিছু প্রস্তরমূর্তি পাওয়া গেছে। উৎসাহীরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ মিউজিয়ামে এগুলি দেখে আসতে পারেন।
মদনপুর : সোনামুখী থানার মদনপুর পখন্না থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার। এখানে মল্লরাজাদের তৈরি একটি ইটের শ্যামসুন্দর মন্দির রয়েছে যার উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট, এটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত। এখান থেকে কিছুটা দূরে দামোদরের তীরে কালভৈরবের পূজিত স্থান আছে, আসলে এটি জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীরের মূর্তি যা দ্বাদশ শতাব্দীর বলে মনে করা হয়। হাতে সময় থাকলে এটিও দেখা উচিত প্রত্নতত্ত্বে উৎসাহীদের।

নদীর ধার : বড়জোড়া থানা এলাকায় দামোদর নদের ধারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন কেড়ে নেয়। দুর্গাপুরের দিকে ব্যারাজ ও নদীর ধারকে কেন্দ্র করে যে সৌন্দর্যায়ন হয়েছে সেভাবে বাঁকুড়ার দিকে হয়নি, তবুও বিভিন্ন পাল-পার্বণে বিশেষ করে পৌষ সংক্রান্তির দিনে স্নান উপলক্ষে বহু মানুষের সমাগম হয়। রঙিন হয়ে থাকে নদীর ধার। সারা বছর ধরে নদীর সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে নদীর ধারে বাংলো বানালে পর্যটকদের যেমন নতুন জায়গার সন্ধান হয় তেমনই স্থানীয় প্রশাসনও আয়ের মুখ দেখতে পায় ও নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়।
বাঁকুড়ায় রাত্রিবাস করে জায়গাগুলি দেখে নেওয়া যায়। রাত্রিবাসের ঠিকানা : লজ প্রিয়দর্শিনী, স্কুলডাঙ্গা, বাঁকুড়া, চলভাষ : ৯৪৭৫৪৬৪৮৮৬।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

You might also like