Latest News

আগরপাড়া ও ব্যারাকপুরের ‘দক্ষিণেশ্বর’

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুস করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

দক্ষিণেশ্বর ছাড়াও আশপাশে রানি রাসমণির নিকটজনের তৈরি করা বেশ কিছু মন্দির আছে। কলকাতা থেকে অল্প দূরে এমনই দুটি মন্দির রয়েছে আগরপাড়া ও ব্যারাকপুরে। মন্দিরদুটি প্রথমদর্শনেই চমকে দেবে। কারণ দুটি মন্দিরই দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের আদলে।

গিরিবালা ঠাকুরবাড়ি : আগরপাড়ায় রয়েছে রাধাগোবিন্দ জীউ মন্দির। হঠাৎ করে এক ঝলক দেখলে দক্ষিণেশ্বরের মন্দির বলে ভ্রম হতে পারে। এই মন্দিরের সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মায়ের মন্দিরের এতটাই মিল যে অনেকে এই মন্দিরকে ছোট দক্ষিণেশ্বরও বলে থাকেন। এই মন্দিরের অবস্থান গঙ্গার তীরে। কলকাতার জানবাজারের রানি রাসমণির নাতবউ গিরিবালা এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। প্রয়াত স্বামী গোপালকৃষ্ণ দাস ও তিন পুত্রের স্মৃতিতে এই মন্দির নির্মিত হয়েছিল। গিরিবালা দাসী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বলে মন্দিরটি গিরিবালা ঠাকুরবাড়ি নামে পরিচিত। দক্ষিণেশ্বরে যেমন দক্ষিণা কালী তেমনই এই ঠাকুরবাড়ির মূল দেবতা রাধা গোবিন্দ জীউ।

মন্দিরের প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ করলেই সামনে পড়বে চওড়া বাঁধানো চাতাল। এরপর নাটমন্দির এবং এর উত্তর দিকে মূল মন্দির। সুদৃশ্য নাটমন্দিরটি পঞ্চাশ ফুট লম্বা ও প্রায় চল্লিশ ফুট চওড়া, মেঝে শ্বেতপাথরে বাঁধানো। নাটমন্দিরের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে রয়েছে স্তম্ভ বোধিকা। নাটমন্দিরের বড় বড় সুদৃশ্য থাম, ছাদের কারুকার্য অবাক করে দেবার মতো। পাঁচিলে ঘেরা মন্দির প্রাঙ্গণের ঠিক মাঝখানে রাধাগোবিন্দের মন্দির। প্রাঙ্গণ থেকে মন্দিরের মেঝে প্রায় ৭ ফুট উঁচু। মন্দিরে ওঠবার জন্য সিঁড়ি আছে, সিঁড়ির দু’পাশে দুটি পাথরের নারী, হাতে কাচের বাতিদান। মন্দিরের গায়ে রঙিন কাচের কারুকার্য। গঙ্গার তীরে ছয়টি শিব মন্দির কামেশ্বর, রাজেশ্বর, গোপেশ্বর, তারকেশ্বর, ভুবনেশ্বর ও গিরিশ্বর। প্রতিটি মন্দিরের দরজায় খিলানের ওপর রাধাকৃষ্ণের বিভিন্ন লীলার ছবি আঁকা আছে। কামেশ্বরে রয়েছে যুগল মিলন, রাজেশ্বর মন্দিরে মথুরানাথ, গোপেশ্বর মন্দিরে গোষ্ঠলীলা, তারকেশ্বর মন্দিরে অনন্তশয়ান, ভুবনেশ্বর মন্দিরে রাই মিলন ও গিরিশ্বর মন্দিরে কালিয়াদমনের ছবি আঁকা।

প্রাঙ্গণের পুব দিকে অর্থাৎ শিব মন্দিরগুলির দিকে মুখ করে সারি সারি ঘর, কোনওটা ভোগের, কোনওটা ভাঁড়ার, কোনওটা সেবকের ও কতগুলি ভক্তদের আশ্রয়স্থল। মন্দির সংলগ্ন প্রশস্ত গঙ্গার ঘাট। মন্দিরের পরিবেশটি বড় মনোরম। এত বড় মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার গগনচন্দ্র বিশ্বাস এবং এস এম ঘোষ অ্যান্ড কোং। গিরিবালা ঠাকুরবাড়ি অর্থাৎ মূল মন্দির, নহবতখানা, ছ’টি শিবমন্দির ও সুদৃশ্য নাটমন্দির সব মিলিয়ে নির্মাণ করতে তৎকালীন সময়ে ব্যয় হয়েছিল তিন লক্ষ টাকা। ১৯৮৫ সালের ২৩ জানুয়ারি মহামণ্ডলেশ্বর শ্রী শ্রী শিবানন্দ গিরি মহারাজজির তত্ত্বাবধানে হরিদ্বারের ভোলানন্দ সন্ন্যাস আশ্রম এই মন্দিরের দায়িত্ব গ্রহণ করে। বর্তমানে এটি ‘ভোলাগিরি স্নেহনীড়’ নামেও পরিচিত।
মন্দিরের দেউড়ির ঠিক বাইরেই ছিল বিশাল কাছারি বাড়ি যেটি পরিত্যক্ত ভগ্ন অবস্থায় পড়ে আছে।

রানি রাসমণি এমনই এক ব্যক্তিত্ব যে তাঁকে ভোলা প্রায় অসম্ভব। দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণী মন্দিরের সঙ্গে তাঁর নাম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, তিনি চিরপ্রণম্য। কিন্তু এরকম একটি কীর্তির অধিকারিণী গিরিবালা দাসী আজ প্রায় বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেলেও একমাত্র এই মন্দিরের নামের সঙ্গে তিনি বেঁচে রয়েছেন।

ব্যারাকপুরের অন্নপূর্ণার মন্দির : বাংলায় বিভিন্ন দেবদেবীর মন্দিরের আধিক্য থাকলেও মা অন্নপূর্ণার মন্দির তুলনামূলকভাবে অনেক কম চোখে পড়ে। জনশ্রুতি, নদীয়া জেলার রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদার বঙ্গে অন্নপূর্ণা পূজার প্রচলন করেন। পরবর্তী কালে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে এই পূজা শুরু হয়।

দক্ষিণেশ্বরে রানি রাসমণি কর্তৃক ভবতারিণী মায়ের প্রতিষ্ঠা হয় ১৮৫৫ সালে। ভবতারিণী মায়ের প্রতিষ্ঠার ঠিক ২০ বছর বাদে অর্থাৎ ১৮৭৫ সালের ১২ এপ্রিল চৈত্রসংক্রান্তির দিন ব্যারাকপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় মা অন্নপূর্ণার মন্দির। ব্যারাকপুর ও টিটাগড়ের মধ্যে তালপুকুর বাসস্টপে নেমে মিনিট সাতেকের হাঁটাপথে পৌঁছে যাওয়া যায় এই মন্দিরে। মন্দিরের পূর্ব দিকে রয়েছে সিংহমূর্তি যুক্ত লোহার ফটক। শোনা যায়, মন্দিরের সিংহতোরণটিকে নাকি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ভেঙে ফেলতে চেয়েছিল কারণ সিংহ ছিল ব্রিটিশদের নিকট আভিজাত্য ও বৈভবের প্রতীক। ফলে শুরু হয় আইনি টানাপোড়েন। শেষ পর্যন্ত মন্দির কর্তৃপক্ষ এই লড়াইয়ে জিতে যান আর তাই আজও প্রবেশদ্বারের মাথায় সিংহ স্বমহিমায় বিরাজিত।

লোহার ফটক দিয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে মন্দিরটিকে দেখলে চমকে যেতে হয়। হুবহু দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মায়ের মন্দিরের আদলে গড়া এই মন্দির যেন যমজ মন্দির। তার কারণ হল ভবতারিণী মন্দিরের স্থপতির পরিকল্পনাতেই এই মন্দির নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল রানি রাসমণির কনিষ্ঠা কন্যা জগদম্বার ইচ্ছানুসারে। অন্নপূর্ণা মন্দির প্রতিষ্ঠার পেছনে একটি ছোট্ট জনশ্রুতি আছে। ১৮৪৭ সালে রানি রাসমণি তাঁর জামাতা মথুরামোহন বিশ্বাস সহ অন্যান্য আত্মীয়স্বজন ও দাস-দাসী নিয়ে কাশীযাত্রা করেছিলেন মা অন্নপূর্ণা দর্শনের অভিপ্রায়ে। রাতে রানিমা দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাঁকে নির্দেশ দেন যে কাশী না গিয়ে যেন গঙ্গার পূর্বপাড়ে দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পূজাপার্বণের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর রানি কাশীযাত্রা স্থগিত রেখে দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিণী মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন ১৮৫৫ সালে। কাশীর অন্নপূর্ণা অদর্শনে মথুরামোহনের মনে একটি আক্ষেপ থেকে যায়। তাই তাঁর সুপ্ত ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপদান করেন তাঁর যোগ্য সহধর্মিণী জগদম্বাদেবী। কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয় মথুরাবাবু চানকের (ব্যারাকপুরের তৎকালীন নাম) এই মন্দিরটি দেখে যেতে পারেননি। মন্দির প্রতিষ্ঠার যাবতীয় ব্যবস্থা করেন জগদম্বা ও মথুরামোহনের পুত্র দ্বারিকানাথ বিশ্বাস।

মন্দিরটি নয়টি চূড়াবিশিষ্ট নবরত্ন মন্দির, সঙ্গে বড় একটি নাটমন্দির, দুটি নহবতখানা। পশ্চিমদিকে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর ছয়টি আট চালার শিবমন্দির। প্রত্যেকটি মন্দিরে বিরাজ করছে তিন ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ। ছয়টি শিবলিঙ্গ যথাক্রমে কল্যাণেশ্বর, কামেশ্বর, কিমরেশ্বর, কেদারেশ্বর, কৈলাসেশ্বর ও কপিলেশ্বর। মন্দিরটি দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের মতো দেখতে হলেও দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে কিছুটা কম, উচ্চতা একটু বেশি। মন্দিরের প্রতি দিকেই পাঁচটি করে খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। খিলানগুলো প্রবেশপথের ওপর পাখার মতো সজ্জিত। প্রবেশপথের সিঁড়িগুলো শ্বেতপাথরে মোড়া। মন্দিরের দ্বিতল এবং ত্রিতলে যে নয়টি রত্ন সেগুলি খাঁজকাটা দেউলাকৃতি। প্রতিটির মাথায় চক্র স্থাপিত।

গর্ভগৃহে শ্বেতপাথরের বেদি, অবস্থান করছেন শিব ও অন্নপূর্ণা। বেদীর ওপর রুপোর সিংহাসনে অষ্টধাতুর সালঙ্কারা দেবী অন্নপূর্ণা বিরাজ করছেন। অন্নদাত্রী মাতৃমূর্তি যাঁর ডান হাতে অন্ন দান করার হাতা আর বাঁ হাতে অন্নপাত্র। দেবীর ডানপাশে মহাদেব যাঁর একহাতে ত্রিশূল, অন্য হাতে ভিক্ষাপাত্র। প্রতি মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে বিশেষ পূজা হয়। মন্দিরে দেবীকে প্রতিদিন অন্নভোগ নিবেদন করা হয় যাতে মাছ থাকা আবশ্যক। অন্নপূর্ণা পূজার দিন হয় অন্নকোট উৎসব এছাড়াও আরও একদিন অন্নকূট উৎসব হয় সেটি হল কালীপূজার পরের দিন। অন্নপূর্ণা পূজা ছাড়াও মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবসে (চৈত্র সংক্রান্তি) উৎসবের আয়োজন করা হয়। এছাড়া, মঙ্গলচণ্ডী, বিপত্তারিণী, অম্বুবাচী, জন্মাষ্টমী, দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা, কালীপূজা ও জগদ্ধাত্রী পূজাতেও বিশেষ পুজো ও অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা হয়। এই মন্দির দেবোত্তর এস্টেটের দ্বারা পরিচালিত। দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণী মন্দিরে যে পরিমাণ ভক্ত সমাগম হয় তার কিয়দংশ ভক্ত সমাগম হলে মন্দিরটির রক্ষণাবেক্ষণ বা সংস্কারের কোনও অসুবিধা হত না। বিশেষ পূজানুষ্ঠান ছাড়া এত সুন্দর মন্দির ফাঁকাই পড়ে থাকে।
শিবমন্দিরগুলির মাঝ বরাবর একটা সোজা রাস্তা গিয়ে মিশেছে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ঘাটের ওপর চাঁদনিতে পাকা ছাদ, আর সেখান দিয়েই সোজা সিঁড়ি নেমে গেছে নদী পর্যন্ত। মূল মন্দিরের উত্তর দিকে রয়েছে ভোগের ঘর। পুরো মন্দিরটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিল তৎকালীন যুগে প্রায় তিন লক্ষ টাকা। এটি একটি পুণ্যভূমি কারণ মন্দিরের দ্বার উন্মোচন করেছিলেন ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব। তিনি এই মন্দিরে চার চার বার এসেছিলেন।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

You might also like