Latest News

ফুটপাথের ফুড-আবেগে রাশ টানুন, রোগভোগের শহরে রাস্তার খাবারই আসল ভিলেন

সঞ্জীব আচার্য

কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

ভ্যাপসা গরম হোক বা ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি, স্ট্রিট ফুডের (Street Food) দোকানে সেই ‘ঠাঁই নাই’ রব।  করোনার কারণে গত এক বছরে স্ট্রিট ফুডের রমরমা কিছুটা কমেছিল, এখন আবার যে কে সেই হাল। অফিসপাড়ার ফুটপাথে বিরিয়ানির দোকানের সামনে লম্বা লাইন, ফুচকার স্টল ঘিরে হল্লা, রাস্তার পাশে বেঞ্চে বসে ঝাল ঝাল মোমোয় কামড় দিয়ে আড্ডা চলছে।

চাঁদনি পাড়া হোক বা চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ ঘেঁষা ম্যাডান স্ট্রিট, স্ট্রিট ফুডের দোকানের সামনে লম্বা লাইন দেখলে মাথা ঘুড়ে যাবে। আঢাকা বরফের চাঁইয়ে মাছি ভনভন করলেও, সে বরফ মিশিয়ে রঙিন সরবর খেতে একটুও অনীহা নেই শহরবাসীর। সে যতই বর্ষার শহরে অসুখবিসুখ বাড়ুক আর অজানা জ্বর হানা দিক। গরমে অনেকেই আবার ডিমের ঝোল, মেটের কষা, মাছ-মাংসের হাতছানি উপেক্ষা করে দই-লস্যি বা চিঁড়ে দইয়েরও খোঁজও করছেন। সেখানেও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানীরা। পেটের রোগ যতই নাজেহাল করুক, ফুটপাথের ফুডে আবেগের কমতি নেই এতটুকুও।

Street Food in Kolkata - Nativeplanet

টালা থেকে টালিগঞ্জ, সেক্টর ফাইভ থেকে বেহাল, এলাকাটাই বদলায় শুধু। ছবিটা সেই এক।  ফুটপাথ জুড়ে সকাল থেকে রাত হরেক খাবারের পসরা। বিরিয়ানি থেকে পোলাও, ফিশফ্রাই,  মোমো, রোল-চাউমিন, নানা ধরনের তেলেভাজা, ডালের বড়া— বাদ নেই কিছুই। সেই সঙ্গে কাটা ফল, রঙিন সরবতের ঢালাও বিক্রি তো আছেই। এই স্ট্রিড ফুড শরীরের জন্য যে কতটা মারাত্মক হতে পারে তা জেনেবুঝেও সচেতনতা আসে না। একদিকে ডায়েরিয়া, অজানা জ্বর নিয়ে হূলস্থূল চলছে, কিন্তু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার খাওয়ার বিরাম নেই। জলবাহিত, খাবার, কাটা ফলে জন্মানো কতরকমের ব্যাকটেরিয়া রোজ শরীরে ঢুকছে তার হিসেবই রাখছেন না কেউ।

Street Food of Kolkata - 20 Famous Dishes & Places - Holidify

এই যে  প্রতি দিন পেট ভরাতে মোমোয় কামড় বসাচ্ছেন, তা আদতে কতটা স্বাস্থ্যকর? সেদ্ধ খাবার ভাজাভুজির তুলনায় কম ক্ষতি করে এমনটা ভেবে মোমো অনেকেই খান, কিন্তু ব্যাপারটা হল সস্তায় মোমো বানাতে যে ময়দা ব্যবহার করা হয় তাতে মেশানো হয় বেঞ্জাইল পারক্সাইড। শুধু তাই নয়, মোমোর গায়ে তেলা ভাব আনতে মেশানো হয় অ্যালোক্সেনের মতো ক্ষতিকারক রাসায়নিক, লিভারের জন্য মারাত্মক বিষ, কৃমির সমস্যা বাড়ায়।

Street Food of Kolkata - 20 Famous Dishes & Places - Holidify

ফুচকায় যে জল মেশানো হয় তার সঙ্গে কতরকম যে ব্যাকটেরিয়া শরীরে ঢোকে তার ইয়ত্তা নেই। দোকানদার নিজে কতবার হাত পরিষ্কার করেন তা বলাই বাহুল্য, আর এই নোংরা হাতেই খাবারে মিশে যায় সালমোনেল্লা, ই কোলাই, এস অরিয়াসের মতো ব্যাকটেরিয়া। জলবাহিত হয়ে শরীরে ঢোকে সালমোনেল্লা, ভিব্রিও কলেরি, যে মারাত্মক ডায়েরিয়ার জন্য দায়ী। রোল, চাউমিন, ভেজিটেবল বা চিকেন স্ট্যুতে পচা-বাসি সব্জি, পশুর নাড়িভুঁড়ি মিশিয়ে দেওয়ার প্রবণতা থাকে অনেক সময়েই। এই বাসি সব্জির সঙ্গেই ব্যাসিলি, ক্লট্রিডিয়াম জাতীয় প্যাথোজেন শরীরে ঢুকে দাপাদাপি শুরু করে দেয়।

Kolkata People Enjoying Cool Healthy Lassi | 20 rs per Glass | Street Food  India - YouTube

বাজারচলতি বার্গার, পিৎজা ইত্যাদি বানানো হচ্ছে প্রসেসড মিট দিয়ে। প্রসেসড মিট বেশি খেলে পাকস্থলিতে কিছু ক্ষতিকারক ব্যাকটিরিয়া দ্রুত গতিতে বাড়তে শুরু করে৷ যা মাংসের কারনিটিন নামের উপাদান ভেঙে গিয়ে ট্রাইমিথাইল্যামিন যৌগে পরিণত হয়। রক্তে শোষিত হয়ে, লিভারের বিপাক ক্রিয়ায় ভেঙে ট্রাইমিথাইল্যামিন-এন-অক্সাইডে পরিণত হয় যা হার্টের সূক্ষ্ম রক্তনালিতে চর্বি জমিয়ে ইসকিমিক হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

Best Street Food Outlets of Kolkata - Tripoto

ফাস্ট ফুডের প্যাকেজিং এবং সংরক্ষণের জন্য যে প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয় তা এককথায় ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। এই সব খাবারের প্যাকেজিংয়ে ব্যবহার করা হয় গ্রিজ প্রুফ পেপার। যার মধ্যে থাকা ফ্লোরিনেটেড যৌগ বাড়িয়ে দেয় ক্যানসারের ঝুঁকি।

রাস্তার বিক্রি হওয়া এ সব খাবারে বেশিরভাগ সময়েই অত্যন্ত নিম্ন মানের উপাদান ব্যবহার করা হয়। ক্রেতাদের আকর্ষণের জন্য মেশানো হয় নানা ধরনের রাসায়নিক রং। যা থেকে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এখন কম বয়সীদের মধ্যে হৃদরোগ, পেটের অসুখ, ক্যানসার, স্ট্রোক, স্নায়ু রোগের প্রবণতা বাড়ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ সবের জন্য দায়ী আমাদের খাদ্যাভ্যাস। কারণ এগুলো খাদ্যবাহী রোগ। রসনা-বিলাসে অতএব কিছুটা বিরতি দিন, করোনা ও রোগভোগের শহরে এখন স্ট্রিট-ফুডে সংযম রাখাই ভাল।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকাসুখপাঠ

You might also like