Latest News

‘টুইনডেমিক’ কী, কেন এত আতঙ্ক, বাঁচার উপায়ও বললেন বিশেষজ্ঞ

 

করোনা চোখ রাঙিয়েই আছে। অতিমহামারীতে বিশ্বে পয়লা নম্বরে আমেরিকা। মারণ ভাইরাসের সঙ্গেই এবার সংক্রামক ফ্লুয়ের আতঙ্কও প্রবল হচ্ছে। শীতের আগে এই ফ্লু বা ভাইরাল ফিভার জাঁকিয়ে বসে মার্কিন মুলুকে। শীতকাল তাই সেখানে ‘ফ্লু সিজন’।  একে করোনাভাইরাসের আতঙ্ক, অন্যদিকে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু ভাইরাস, এই দুইয়ের জোড়া আক্রমণে যে ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে তাকেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘টুইনডেমিক সিচুয়েশন’ ।

শীতের সময় করোনাভাইরাসের দাপট আরও বাড়তে পারে। এমনটাই আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। পশ্চিমের দেশগুলিতে করোনার তৃতীয় ঢেউ যে সজোরে ধাক্কা দিতে পারে এমন সম্ভাবনার কথা অনেক আগেই বলা হয়েছে। এর মধ্যে যদি ইনফ্লুয়েঞ্জার উৎপাত বাড়ে, তাহলে আরও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হবে।

 

টুইনডেমিক নিয়ে কেন এত আতঙ্ক?

ঋতু বদলে জ্বর, সর্দি-কাশির হানায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো আছে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট। আর ইনফ্লুয়েঞ্জা ধরা পড়লে তো কথাই নেই। আরও এক সংক্রামক ভাইরাস যা শরীরকে রীতিমতো নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। এতদিন ভাইরাল ফ্লু নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছিল মানুষজন, এ বছরে চেপে বসেছে করোনাভাইরাস। ইনফ্লুয়েঞ্জার সমগোত্রীয় না হলেও রোগের ধরনে মিল আছে। আবার করোনার কোপে নিউমোনিয়া, জ্বর, সর্দি-কাশি তথা ভাইরাল ফ্লুয়ের সব উপসর্গই পরপর দেখা দেয়। তাই ভাইরাল জ্বরে আক্রান্ত হলে করোনার সংক্রমণ শরীরে ঢোকার শঙ্কা বেশি। আবার করোনা ও ইনফ্লুয়েঞ্জা একই সঙ্গে সংক্রমণ ছড়াতে পারে শরীরে। টুইনডেমিক হচ্ছে সেই অবস্থা যেখানে এই দুই সংক্রামক ভাইরাসই একসঙ্গে হানা দেবে। তাই করোনা ও ইনফ্লুয়েঞ্জার জোড়া সংক্রমণ নিয়ে বেশি চিন্তায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

কোভিডের সঙ্গেই হানা দিচ্ছে মরসুমি ভাইরাল জ্বর

টুইনডেমিক পরিস্থিতির সম্ভাবনা বেশি পশ্চিমের দেশগুলিতেই। বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। অক্টোবর থেকেই ‘ফ্লু সিজন’ শুরু হয়ে যায় আমেরিকায়। আর ফ্লু ও কোভিড সংক্রমণের উপসর্গ প্রায় একই। জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাসের সমস্যা, পেশীতে ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। তাই এই অবস্থায় সতর্কতা বেশি দরকার। শীতের শুরু থেকেই ভাইরাল জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। একই সঙ্গে করোনার প্রকোপও বাড়বে। তাই সবদিক দিয়েই প্রস্তুত থাকতে হবে স্বাস্থ্য দফতরকে। আগামী দিনে একই সঙ্গে দুই মহামারীর আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। গত জুলাই মাসে আমেরিকায় করোনা সংক্রমণের হার ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। হাসপাতাল-নার্সিংহোমগুলিতে রোগীদের ঠাসাঠাসি ভিড়। নর্থ ডাকোটা, উইসকনসিনে গত ৬ মাস ধরেই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। অন্যদিকে, দক্ষিণ ক্যারোলিনা ও উটাহ-তে জুলাই মাস থেকে করোনার সংক্রমণ ফের বৃদ্ধি পেয়েছে।

কোভিড-১৯ ও মরসুমি ভাইরাল জ্বর এই দুইয়ের প্রকোপই ফের মহামারীর চেহারা নিতে পারে আমেরিকায়। সিজনাল ফ্লু-এর প্রকোপ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ভাইরাল জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। অক্টোবরে এই সংখ্যা এক ধাক্কায় কয়েক হাজার বেড়ে গেছে। স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি খুলে গেছে। স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না অনেক জায়গাতেই। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীরা বেশি আক্রান্ত। অন্যদিকে, শিশুদের মধ্যেও ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েছে।  ‘আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স’ সংস্থার তথ্য বলছে, গত এক মাসে আমেরিকায় প্রায় চার লক্ষ শিশু করোনায় আক্রান্ত হয়েছে।

 

শীতের শুষ্ক বাতাসে বেশিদিন টিকবে ভাইরাস

শীতকাল আর টুইনডেমিক পরিস্থিতি—এই দুই নিয়েই এখন মাথা ঘামাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। আসলে, বিটা-করোনাভাইরাস পরিবারের সবচেয়ে সংক্রামক সদস্য হল সার্স-কভ-২। এই ভাইরাসের জিনের গঠন বিটা-করোনা পরিবারের বাকি সদস্যদের থেকে আলাদা। তার উপর ক্রমাগত জিনের গঠন বিন্যাস বদলে (জেনেটিক মিউটেশন)এই ভাইরাল স্ট্রেন আরও সংক্রামক হয়ে উঠেছে। মানুষের শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কৌশল শিখে নিয়েছে। সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেনের ইনকিউবেশন পিরিয়ড বা টিকে থাকার সময় বাড়ে তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতার উপরে। তাপমাত্রা যদি কম থাকে এবং বাতাস শুষ্ক হয় তাহলে ভাইরাল স্ট্রেন এয়ার ড্রপলেটে দীর্ঘক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে। ড্রপলেট বা জলকণা থেকে খসে গেলে মাটিতে বা কোনও পদার্থের উপরেও দীর্ঘ সময় জমে থাকতে পারে। তাপমাত্রা যদি হিমাঙ্কের নিচে নেমে যায়, তাহলে ভাইরাসের টিকে থাকার সময় আরও বেড়ে যায়। তবে তাপমাত্রা বাড়লে বেশিদিন এই ভাইরাল স্ট্রেন বেঁচেবর্তে থাকতে পারে না। সেদিক থেকে ভারত ও এশিয়ার কিছু দেশে শীতে সংক্রমণ অধিক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা কম। তুলনায় ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধির সম্ভাবনা জোরালো।

 

টুইনডেমিক থেকে বাঁচতে ফ্লু ভ্যাকসিন মাস্ট

‘আমেরিকান লাঙ অ্যাসোসিয়েশন’ তাদের একটি সমীক্ষায় বলেছিল, প্রতি বছর ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের দাপটে ৪০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় আমেরিকায়। বিশ্বজুড়েই ভাইরাল জ্বরের কারণে প্রতি বছর মৃত্যু হয় বহু মানুষের। তাই ডাক্তাররা, ফ্লু ভ্যাকসিন নিয়ে রাখতে বলেন। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস করোনার মতো অত দ্রুত ছড়ায় না। অসুখ ধরা পড়ে ২-৩ দিনের মধ্যে। ১০৩-১০৪ ডিগ্রি জ্বর উঠতে পারে, সেই সঙ্গে মাথা যন্ত্রণা, গলা ব্যথা, সর্দি-কাশি, পেশীর ব্যথা, খিঁচুনি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়। বাড়াবাড়ি হলে নিউমোনিয়ার পর্যায়ে চলে যেতে পারে। ফ্লু ভ্যাকসিন সেক্ষেত্রে সুরক্ষা দেয়। এইসব উপসর্গ দেখা গেছে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও। যদিও করোনার সংক্রমণে উপসর্গ দেখা দিতে সময় লাগে ৭-১৪ দিন, কখনও বা তারও বেশি। অনেক সময় উপসর্গ দেখাই দেয় না। জ্বর হলেও নামতে চায় না, ওষুধে কাজ করে না খুব একটা, শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয় রোগী। কৃত্রিম অক্সিজেন সাপোর্ট বা ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়ার প্রয়োজন হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্লু ভ্যাকসিনে শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় তা কিছুটা হলেও এইসব রোগ থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারে। করোনাভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে পারবে না এই ভ্যাকসিন, তবে কোভিড সংক্রমণের কারণে যে রোগগুলি হচ্ছে বা হওয়ার ঝুঁকি থাকছে তার থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে। কিছুটা হলেও শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়াতে পারবে এই ভ্যাকসিন, যা এই সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

You might also like