Latest News

বাংলার হেঁশেল- ভালোবাসার গন্ধমাখা দুটো পদ

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

শহর এখন ছাতিম ফুলের গন্ধে মাতাল। উৎসব এখনও শেষ হয়নি। মাঝখানে একটু বিরতি। তাই হালকা খাওয়াদাওয়া। এরই ফাঁকে কেউ একজন এসে মনটাকে ভরিয়ে দিয়ে যায়। কে সে? সে কে? সে হল প্রেম। মাত্র দুটো অক্ষরের ছোট্ট একটা কথা।
অথচ মাপার উপায় নেই। প্রেম কতটা গভীর সেটা মাপার মত কোনও যন্ত্র এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। শুধু অনুভব করতে হয়। কে কতটা কার হৃদয় ছুঁতে পেরেছে, কষ্টের ওপরে প্রলেপ লাগাতে পেরেছে, পুরোনো ক্ষতের ওপর ঠোঁট নামিয়ে বলতে পেরেছে পাশে আছি!
মনে যখন ভালোবাসা নামক অনুভূতিটা জন্ম নেয়, তখন মানুষের মনের মধ্যে নানারকম পরিবর্তন ঘটে। গান শোনা, বারবার আয়না দেখা, মনের ভুলে দুপায়ে দুরকম জুতো পরে রাস্তায় বেরিয়ে পড়া, পরিষ্কার সমতল রাস্তায় হোঁচট খাওয়া, বারবার বারান্দায় দাঁড়ানো, পাঁচ মিনিটের মধ্যে পঞ্চাশবার তার প্রোফাইলে ঢুকে চেক করা– এসব বাইরের পরিবর্তন! আসল পরিবর্তনটা তো হয় ভেতরে! অসহিষ্ণুতা কমে আসে। অকারণ বাদানুবাদ, অযথা তর্ক- সব যেন টুপ করে মনের গহীনে তলিয়ে যায়। ভেসে ওঠে প্রেম, ক্ষমা, আনুগত্য। সে একটা ভাব বটে! তবে সে ভাবের ব্যালান্স ঠিকমত বজায় রাখাটাও জরুরি।
অতিরিক্ত হলেই যেকোনও বিষয় বিষে পরিণত হয়। প্রেমও। তখন আবারও সেই অসহিষ্ণুতা, অশান্তি, তর্ক। খারাপ থাকা।প্রেম আর পরকীয়াকে অনেকে এক করে ফ্যালেন।
কিন্তু প্রেম শব্দটার সঙ্গে আর কোনও শব্দ জোড়া উচিতই নয়। দুটো আলাদা আলাদা সংসারের মানুষ যখন সমমানসিকতায় এক হন, তখন তাদের মধ্যে একটা ভালো সম্পর্ক বা সখ্য গড়ে উঠতেই পারে! সেটা প্রেমের দিকে ধাইলেও ধাইতে পারে। একটা নির্জন রাস্তায় অনেকক্ষণ ধরে পাশাপাশি হাঁটা অথবা কোনও একটা নামহীন নদীর ধারে বসে মনের সুখদুঃখ ভাগ করে নেওয়ার নাম নিশ্চয়ই পরকীয়া হতে পারে না! এগুলো লুকিয়ে করার ব্যাপারও নয়। অথচ লুকোতে হয়। সমাজের বাঁধাধরা কিছু রীতিনীতি আর চোখরাঙানিতে এই গোপন দেখাগুলো অপরাধের শামিল হয়ে ওঠে। সংসারে যত্ন, প্রেম বা কোমল অনুভবগুলোর অভাব ঘটলেই মানুষ প্রেমের খোঁজ করবে। চৌকি দিয়ে, গোয়েন্দা লাগিয়ে, লাল চোখ দেখিয়ে প্রেমের এই অন্বেষণ কেউ কোনওদিন বন্ধ করতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। তবে খবরের কাগজে মাঝেমাঝে যে খবরগুলো বেরোয়… বাইরের মানুষের সঙ্গে ভালোবাসা করে নিজের সংসারের সদস্যের ওপরে অত্যাচার করা, নির্যাতন করা, ঘাড় ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় বের করে দেওয়ার ঘটনা- তখন বুঝতে হবে মানুষটি আদপে প্রেমিক মানুষই নয়। সে একটা সুবিধাবাদী স্বার্থপর ভণ্ড মানুষ।

সংসার বিরক্তির কারণ হয়ে উঠলে, আর একসঙ্গে থাকা যাচ্ছে না- এমন অবস্থা হলে, আইনের পথে গিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়াই উচিত। তাহলে নতুনভাবে শুরু করার ক্ষেত্রে মানসিক দ্বন্দ্ব, অপরাধবোধ কাজ করবে না।
অন্যথায়, সংসারের সব কাজকর্ম, দায়িত্ব পালনের পর একটু সময় বের করে ভালোবাসার মানুষ দুটো নরম আলোয় মুখোমুখি বসলে জগতের কী এমন ক্ষতি হয়ে যায়!
একটা সহজ-সরলভাবে হয়ে যাওয়া প্রেমকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধার প্রয়োজনই পড়ে না! অমুক কোরো না, তমুক কোরো না, এইটা কেন করলে, সেইটা কেন বললে- প্রেম এত জবাবদিহি চায় না। বাঁধনবিহীন সেই যে বাঁধন… সেই প্রেম মনে শত পুষ্প ফুটিয়ে তোলে। সঠিক মানুষের সঙ্গে ভালোবাসাবাসি হলে পরিবেশ পরিস্থিতি বিগড়োবার পরিবর্তে সামলানো যায় সবকিছু। প্রেম অনুপ্রেরণা দেয়। ঠিকঠাক একটা প্রেম ভালো বইয়ের মত, সারা জীবনের সঙ্গী। কপাল ভালো হলে সেই প্রেম বাড়িতে পাবেন, নইলে বাইরে অন্য কোথাও, অন্য কোনওখানে…
এই প্রসঙ্গে আমার একটা দৃশ্যের কথা খুব মনে পড়ে। একটি মহিলা সম্ভবত কারও গৃহিণী, সে তার প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে শেয়ালদা স্টেশনে। পুরুষটির জন্য ঘুগনি বানিয়ে এনেছে। আর পুরুষটি মেয়েটির জন্য এনেছে একটা মলম আর একটা নতুন ২০০ টাকার নোট। জল ঘেঁটে ঘেঁটে মেয়েটার দুই হাতের আঙুলে ঘা। চোখে মুখে ক্লান্তি। পুরুষটি মেয়েটির পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল, আর মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। নানান ট্রেনের হরেকরকম ঘোষণার জন্য তাদের সব কথা শোনা যাচ্ছিল না। শুধু বুঝেছিলাম তারা ন’মাসে ছ’মাসে একবার মনের জ্বালা জুড়োতে এইখানে আসে।
এইরকম প্রেম জীবনে এলে মনে হয় একটিবার তাকে সামনে বসিয়ে খাওয়াই। খুবই সাধারণ খাবার। আড়ম্বর নেই, কিন্তু আন্তরিকতা আছে। আজ থাকলো সেইরকম দুটো ভালোলাগা রেসিপি।

লাউপাতায় ডিম ভাপা
উপকরণ: ২ টো সেদ্ধ ডিম আধখানা করে কাটা, অল্প পোস্ত আর নারকেল কোরা বেশ শক্ত করে বাটা, কাঁচালংকা বাটা, নুন, হলুদ, সর্ষের তেল, সাদা তেল, কচি লাউপাতা চারটে, অল্প বেসন।
প্রণালী:  একটা বাটিতে ডিমসেদ্ধর সঙ্গে পোস্ত বাটা, নারকেল কোরা বাটা, নুন, হলুদ, কাঁচালঙ্কা বাটা আর এক চা চামচ তেল দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিতে হবে। এবারে লাউ পাতাগুলো ফুটন্ত গরম জলে একটু ডুবিয়ে রেখে তারপর তুলে নিয়ে ভালো করে মুছে শুকনো করে নিতে হবে। একটা বাটিতে বেসন গুলে তাতে নুন, হলুদ, লংকার গুঁড়ো দিয়ে ফেটিয়ে রাখতে হবে।এবারে এক একটা
লাউপাতার মধ্যে মশলা মাখানো আধখানা ডিম রেখে পাতাগুলো বেশ করে মুড়িয়ে বেসনের গোলায় চুবিয়ে গরম তেলে ভেজে নিতে হবে।

কুঁদরি ভাজা
উপকরণ: ২০০ গ্রাম কুঁদরি ধুয়ে আধখানা করে নেওয়া, ঝিরি ঝিরি করে কাটা পেঁয়াজ, কাঁচা লংকা, নুন, হলুদ, পরিমাণ মতো সর্ষের তেল, দু চা-চামচ পোস্ত।
প্রণালী: কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করে পেঁয়াজগুলো দিয়ে দিতে হবে। একটু স্বচ্ছ হলে কুঁদরিগুলো কড়াইতে ঢেলে দিয়ে নুন হলুদ দিয়ে নেড়েচেড়ে ঢেকে দিতে হবে। আঁচ কমিয়ে দিয়ে হবে। কম আঁচেই বেশ কিছুক্ষণ রাখতে হবে নরম করার জন্য। নরম হয়ে এলে ওপর থেকে পোস্ত ছড়িয়ে আর একটু ভেজে নামিয়ে নিতে হবে।
সকলে খুব ভালো থাকুন এবং ভালোবাসায় থাকুন। ভালোবাসার পবিত্র আগুনে ঘৃণা বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা পুড়ে ছাই হয়ে যাক।

লেখিকা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা, ভালোবাসেন রকমারি রান্না আর রন্ধনবিষয়ক আড্ডা।

https://three.pb.1wp.in/news/state/opinion-blog-about-some-authentic-hilsa-recipes-of-bangladesh/

You might also like