Latest News

শুধু পেশা নয়, ডাক্তারি আমাদের ধর্মও! আমরা না করলে কে করবে চিকিৎসা: ডক্টর বি.ডি. চ্যাটার্জী

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সদ্য পার হয়েছে ১ জুলাই, চিকিৎসক দিবস। ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়ের জন্মদিন উপলক্ষে সারা দেশে পালিত হয় এই দিবস। গত বছরের মতোই এবছরও এমন একটা সময়ে এই দিবসটা এসেছে, যখন চিকিৎসকরা তাঁদের জীবনের এবং পেশার এক অন্যতম চ্যালেঞ্জিং সময়ের মধ্যে দিয়ে পার হচ্ছেন। এই দিনেই এই যুদ্ধকালীন সময়টি নিয়ে দ্য ওয়ালের মুখোমুখি অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশ্যালিটি হসপিটালের অর্থোপেডিক বিভাগের ডিরেক্টর ডক্টর বুদ্ধদেব চ্যাটার্জী।

দ্য ওয়াল: গত দেড় বছরের এই কোভিড পরিস্থিতি, কীভাবে দেখছেন, কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন এই সময়কে?

ডক্টর চ্যাটার্জী: কোভিড পরিস্থিতি একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। যে কোনও দিক দিয়ে বিচার করলেই একে ভয়ংকরই বলা যায়। এখনও পর্যন্ত কোভিডের দুটি ঢেউ আমাদের সামনে এসেছে। দ্বিতীয়টি তার মধ্যে খুবই মারাত্মক। রোগীর সংখ্যা যেমন অনেক বেশি, তেমন মুহূর্তের মধ্যে রোগীর শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও অনেক। সব মিলিয়ে খুবই চ্যালেঞ্জিং একটা সময় বলা যেতে পারে এই দেড়টা বছরকে।

আরও পড়ুন: পোস্ট-কোভিড হৃদরোগ বাড়ছে, তাই করোনা কমলেও কার্ডিওলজিস্টদের যুদ্ধ চলবেই: ডক্টর পি.সি. মণ্ডল

আমি অর্থোপেডিক ডক্টর হওয়ার কারণে হয়তো আমায় সরাসরি কোভিড রোগীর চিকিৎসা করতে হয়নি, কিন্তু আমাকেও এই রোগের মোকাবিলা করতে হয়েছে। কারণ অনেক কোভিড আক্রান্ত রোগীই হয়তো ফ্র্যাকচার নিয়ে আমাদের কাছে এসেছেন। অর্থাৎ সমস্যা দ্বিমুখী। কোভিডের কারণে বহু অস্ত্রোপচার, প্রতিস্থাপন আমরা পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি, তবে এই ফ্র্যাকচারের সমস্যা তো আর ফেলে রাখাও যায় না। চিকিৎসা চলেছে সাবধানতা অবলম্বন করেই। আর তা করতে গিয়ে বুঝেছি, লম্বা সময় ধরে পিপিই পরে একটা সিরিয়াস অস্ত্রোপচার করা খুব সহজ নয়। এই অভিজ্ঞতা আগে ছিল না।

এই কোভিড সংক্রমণ শরীরের বায়োকেমিস্ট্রিটাকে সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস করে দেয়। ফলে একটা অপারেশনের যে ঝুঁকি সাধারণত রোগীদের থাকে, তা কোভিডের বেলায় বেশ বেড়ে যায়। আমাদের বিবেচনা সবসময়ই ছিল অস্ত্রোপচার যদি এখনই না করতে হয়, পরে করা যায়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তো বিকল্প থাকে না, তাৎক্ষণিক অস্ত্রোপচার করতেই হয়। তখন আমাদের কারও থেকে যাতে রোগীর সংক্রমণ না হয় এবং রোগীর থেকেও যাতে আমাদের সংক্রমণ না হয়– এই দুটি দিকেই বিশেষ নজর রাখতে হয়।

দেখুন, কী বলছেন ডাক্তারবাবু।

দ্য ওয়াল: ১ জুলাই ডক্টর্স ডে, এই দিনটায় কোনও বিশেষ বার্তা দেবেন?

ডক্টর চ্যাটার্জী: আমি মনে করি, ডাক্তারিটা শুধুই একটা পেশা নয়। এটা একটা ধর্মও। এই ধর্ম আজীবন পালন করার শপথ নিয়েই এই পেশায় যোগদান করি আমরা। আমি তো বলব আমি ডাক্তার হিসেবে কাজ করি না, ডাক্তার হিসেবেই বেঁচে থাকি। এই বিশ্বাসটা থাকলে যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়া একটু সহজ হয়। আর সত্যি কথা বলতে, রোগীকে সুস্থ করে তোলার এই কাজ আমরা যদি না করি, তাহলে কে করবে। এ তো আমাদেরই কাজ। এই পেশায় যেমন অজস্র আনন্দের মুহূর্ত পেয়েছি, বহু মানুষের কৃতজ্ঞতা পেয়েছি, তেমনই বহুবার ভর্ৎসনারও শিকার হয়েছি।

সকলেই এখন টিভি-মিডিয়ার দৌলতে সব জানেন। কত তথ্য এসেছে, গেছে, কতরকম দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে কোভিড নিয়ে। তবে এই সংক্রমণ প্রথম যখন মাথাচাড়া দেয়, তখন যে প্রাথমিক আচরণবিধিগুলো আনা হয়েছিল, সেগুলোয় কোনও বদল আসেনি। সেগুলো আজ দেড় বছর পরেও একই রয়েছে, আগামীতেও হয়তো থাকবে। সেগুলি হল মাস্ক পরা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। প্রোটোকল যতই বদলাক, এই নিয়ম বদলায়নি। আমি সাধারণ মানুষকে এই নিয়ম পালন করার বার্তাই দেব।

দ্য ওয়াল: চিকিৎসকদের ভগবানের আসনে বসানো, কীভাবে দেখেন?

ডক্টর চ্যাটার্জী: রোগীকে সুস্থ করে তোলাটা চিকিৎসকদের কাছে তাঁদের কাজ ও পেশা হলেও, সুস্থ হয়ে ওঠাটা রোগীদের কাছে একটা আবেগের জায়গা। তাঁরা হয়তো এই আবেগের জায়গা থেকেই এমনটা বলেন। আবার সুস্থ হয়ে ওঠার বিষয়টা যখন রোগী বা রোগীপরিবারের ঠিক মনের মতো হয় না, তখন এর উল্টোটাও হয়। আমাদের অনেক খারাপ পরিস্থতির মুখে পড়তে হয়।

আমি বলি, আমরা ডাক্তার সম্প্রদায়, আমরা ভগবানও নই, শয়তানও নই। আমরা আপনাদের মতোই রক্তমাংসের মানুষ। আমরা হয়তো কিছুটা পরিশ্রম করেছি, শিখেছি, আত্মত্যাগ করেছি, তাই হয়তো পরিষেবা দিতে পারছি। আমরা আমাদের শিক্ষাকে পালন করে যতটা সম্ভব চিকিৎসা করার চেষ্টা করি। কিন্তু সেটা কখনওই ১০০ শতাংশ সফল হওয়া সম্ভব নয়। সবার ওপরে ঈশ্বর রয়েছেন, কলমের শেষ আঁচড় তিনিই কাটবেন।

You might also like