Latest News

শাসনে-স্নেহে কী ভাবে স্বনির্ভর আর আত্মবিশ্বাসী করে তুলবেন সন্তানকে?

দ্য ওয়াল ব্যুরো: আপনি কি খুব রাগী অভিভাবক? নাকি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ব্যতিব্যস্ত। বাড়িতে চোখ রাঙিয়ে কড়া শাসনে রাখেন সন্তানকে? কথায় বলে বাবা, মা হওয়া নাকি সহজ কাজ নয়।আদর্শ অভিভাবক হতে গেলে কী কী করণীয়, আর কী কী নয় তার জ্ঞান দেওয়াটা খুব একটা সহজ কাজ নয়। কারণ শিশু থেকে কিশোর— মুড বদলের সঙ্গে আপনার ধৈর্যেরও পরীক্ষা হয় ষোলোআনা। সেই পরীক্ষায় সঠিক ভাবে উতরোতে পারলেই কেল্লাফতে। সন্তানের মনও পাবেন আর তার গতিবিধিও থাকবে এক্কেবারে হাতের মুঠোয়। নচেৎ ওই আদরে বাঁদর তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে।

সন্তানকে স্বনির্ভর, আত্মবিশ্বাসী করতে কেমন হবে অভিভাবকত্ব এ নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক কম হয়নি। গবেষকরা বলছেন, শৈশব থেকে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার পথে অভিভাবকদের তিনটি ধাপ মনে রাখতে হবে। প্রথম ধাপ, সেই শিশুর আশপাশের জগৎ। পরের ধাপে তার যোগ্য সংমিশ্রণ ও তার পরের ধাপে তাদের পরিণত হয়ে ওঠা।

যে মানুষটির সঙ্গে বাচ্চাটি বেড়ে ওঠার সময়ে সবচেয়ে বেশি সময় কাটাচ্ছে সেই তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধন। তার সঙ্গেই মনের বাঁধনও তৈরি হয় শিশুটির। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই মানুষটি তার মা বা বাবা। কিন্তু যার ক্ষেত্রে বাবা-মা দুজনেই চাকরিরত, তার ক্ষেত্রে বাইরের লোকের কাছেই বেশিটা সময় কাটাতে হয় শিশুটিকে। তবে তার ফাঁকেও সময় বার করে নিয়ে আপনার সন্তানকে সঙ্গ দিন। বাচ্চার পাকাপাকিভাবে অবসাদগ্রস্ত বা খিটখিটে মেজাজের হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। কখনও কখনও একটা স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা কাজ করতে থাকে তার মনের ভিতর।

এ তো গেল সঙ্গ দেওয়ার প্রশ্ন, এ বার আসা যাক আসল কথায়। কৈশোর অবস্থা বা বয়ঃসন্ধির সময় মা, বাবার সাহচর্য বেশি দরকার হয় বাচ্চাদের। এই সময় শারীরিক বদল যেমন আসে, তেমনি মনের বদলও হতে থাকে পাল্লা দিয়ে, তার উপর স্কুল-কলেজের চাপ, পারিপার্শিক নানা ঘটনা মনে প্রভাব ফেলে।

দেখে নিন একজন অভিভাবকের কী কী করণীয়?

সন্তানকে সময় দিতে পারেন না, অমনযোগী হয়ে উঠছে, কী করবেন

বাবা-মা দু’জনেই কর্মরত হওয়ায় বছর দেড়েক থেকেই প্লে স্কুলে যেতে শুরু করে অনেক খুদে। তখনও মুখে বুলি ফোটেনি। টলোমলো পায়েই হাজির হয় স্কুলের চৌকাঠে। নিজের ইচ্ছে-অনিচ্ছে, প্রয়োজন বোঝানোর ক্ষমতাও তখন তার তৈরি হয়নি। তাই অপছন্দে কেঁদে ওঠাই একমাত্র পথ তার। এ সময়ে শিশুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। ভাবতে থাকে যে, বাবা-মাকে আর দেখতে পাবে না। তখম ছোট্ট সোনাকে বোঝান, অফিস থেকে আপনারা যেমন নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে আসেন, স্কুল থেকেও সে বাড়ি ফিরে আসবে।

সন্তান কিছুটা বড় না হওয়া পর্যন্ত পড়তে বসলে তার সামনে থাকুন। এমন একটা সময় তার পড়ার জন্য বরাদ্দ করুন, যাতে অফিস সামলে সেই সময়টা আপনিও বাড়িতে থাকেন। পরীক্ষায় খারাপ ফল করলে বকাঝকা একদম নয়। বরং দেখুন ওর ভুলে যাওয়ার কারণ, কোথায় ঘাটতি সে সব বোঝা অনেক সহজ হবে। সন্তান যা পড়ছে, সেটা আপনাকে পাল্টা বোঝাতে বলুন। এটা করতে সক্ষম হলে বুঝবেন, পড়া বুঝতে বা মনে রাখতে তার আর সমস্যা হবে না।​

শিশুর ক্ষেত্রে ছবি ও ব্লকের সাহায্য  নিন। পড়ার বিষয়টা ছবি এঁকে, প্রয়োজনে আলাদা আলাদা রং ব্যবহার করে বোঝান। পড়াশোনার ক্ষেত্রে ভিজ্যুয়াল কোনও দৃশ্যও খুব কাজে আসে। তাই ইতিহাস বা নাটক বোঝাতে বসলে সেই ঘটনার উপর নির্মাণ কোনও নাটক বা সিনেমার দৃশ্যও দেখাতে পারেন। এতে মনে থাকবে বেশি। পড়া বুঝে লিখে ফেলতে বলুন এক বার। লিখে ফেললে সহজেই মনে রাখতে পারবে তা।

শিশু একাগ্র না হলে তাকে একটানা পড়াবেন না। সন্তানের ওতেই মনঃসংযোগের ঘাটতি দেখা যায়। বরং পড়ার মাঝে মাঝে ওর পছন্দের কিছু করতে দিন। এতে আনন্দ পাবে, মন ভাল রেখে পড়লে মনে রাখতেও পারবে সহজে।

স্বনির্ভরতা

স্কুলে যাওয়ার পরে কিছু জিনিস বাচ্চাকে নিজেকেই করতে হবে। বছর আড়াইয়ের শিশুটিকে নিজের ব্যাগ গোছানোর দায়িত্ব দিতে পারেন। নিজে থেকে জামা-কাপড়, জুতো পরার কাজও শেখানোর চেষ্টা করুন। সে স্বনির্ভর তো হবেই, বাড়বে দায়িত্ববোধও। পরবর্তীকালে বাচ্চাকে একা একা রাস্তায় চলাফেরা করা শেখান। সবসময় কোমর বেঁধে পিছু পিছু ছুটবেন না। এতে সন্তান আপনার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। ১৮ থেকে ২১ বছর বয়সী ছেলেমেয়েকে চোখে চোখে রাখলেও সেটা তাদের বুঝতে দেবেন না। তাদের কথা মন দিয়ে শুনুন, বোঝার চেষ্টা করুন। এই বয়সে মনের দিক থেকে বড় পরিবর্তন আসে, সেটা সঠিক উপায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই সন্তানের ভবিষ্যত সুন্দর হয়ে উঠবে।

সন্তান প্রতিপালনের আদবকায়দা এক-এক দেশে এক-এক রকম। সুইডেনে বাচ্চাদের এক বছর বয়স থেকেই ‘ডে কেয়ার’- এ দেওয়ার চল আছে। জাপানে চার থেকে সাত বছর হলেই তাকে একা রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়। আবার এমনটা আমেরিকায় ঘটলে বাবা-মাকে দায়িত্বহীন বলা হতে পারে। ভারতবর্ষে বিভিন্ন জাতি ও রাজ্যের মানুষের সন্তান মানুষের কায়দা বিভিন্ন। অভিভাবকত্ব নিয়ে নানান পরীক্ষা চলেছে। আগে যৌথ পরিবারে প্রভাবশালী ব্যক্তির কথাকেই প্রাধান্য দেওয়া হতো। পরে যৌথ পরিবার ভেঙে পরিবার অনেক ছোট হলো। সেখানে অভিভাবকের সঙ্গে সন্তানের বোঝাপড়া অনেক বেশি। সিঙ্গল পেরেন্টহুডের ক্ষেত্রেও তাই। অভিভাবকত্বের বিবর্তনের সঙ্গে সন্তান প্রতিপালনের ধরনেও অনেক বদল এসেছে।

সন্তানের শৈশবকে শুধু বইয়ের পাতায় বন্ধ করবেন না। আদর যেমন করবেন শাসনও সে রকম করুন। সন্তানকে পড়ানো ও শাসনের পাশাপাশি কিছুটা সময় ওদের সঙ্গে নিছক আনন্দে হইহই করে কাটান। স্বামী-স্ত্রীর অশান্তি বা মতের অমিলের আঁচ যেন সন্তানকে নিরাপত্তাগীনতায় না ভোগায়। সামাজিক রীতি-নীতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ সন্তানকে শেখান। তবেই আপনি একেবারে ‘পারফেক্ট পেরেন্ট’ হয়ে উঠবেন।

You might also like