বুধবার, নভেম্বর ১৩

মেঘে মাখা নামথাং

  • 84
  •  
  •  
    84
    Shares

মৃন্ময় দে

হিমালয়ের কোলে সিকিমের কিছু প্রায় অজানা স্পট ও হোমষ্টে সম্বন্ধে কিছু মনমাতানো অভিজ্ঞতার কথা।
অজানা মানে এমন নয় যে আপনিই সেখানে ‘প্রথম কলম্বাস’। অজানা মানে ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে এই জায়গাগুলি এখনও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কম মানুষ যান ফলে কম ভিড়। প্রকৃতির নিজস্ব সংগীত এখনও এই জায়গাগুলিতে শ্রাব্য। যারা প্রকৃতির সান্নিধ্যে, হিমালয়ের রহস্যঘন সৌন্দর্যের মধ্যে দিনকয়েকের অবসর যাপন করতে চান এ লেখা তাদের জন্য। এখানকার হোমস্টেগুলিতে সবরকম বেসিক ফেসিলিটিস পাবেন যদি ঘরে ঘরে টিভি থাকাটাকে আপনি বেসিক ফেসিলিটি বলে  মনে না করেন। অপরূপ প্রকৃতির সঙ্গে পাবেন অসাধারণ কিছু মানুষের সান্নিধ্য যা আদ্যন্ত নষ্ট সময়ে আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেবে মহাঋষির সেই আপ্তবাক্য, মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।
আসুন, এবার আমরা পৌঁছে যাই আমাদের কাঙ্ক্ষিত প্রথম গন্তব্যে।

দক্ষিণ সিকিমে হিমালয়ের বুকে এক ছোট্ট জনপদ ‘নামথাং’। একা বা পরিবারকে নিয়ে কয়েকটা দিন যদি একান্তে প্রকৃতির মাঝে কাটাতে চান তাহলে নামথাং আপনার জন্য এক আদর্শ জায়গা। এখানে একবার পৌঁছে গেলে সারাদিনই হিমালয় ও প্রকৃতিকে নীরবে নিভৃতে আশ্লেষ করার, হিমালয়ের নানা বৈচিত্রময় রূপকে অনুভব করার সুযোগ আপনার হাতের মুঠোয়। হয়তো সাতসকালে বা পড়ন্ত বিকেলে আপনি পরিষ্কার আলোতে গরম চায়ের কাপ নিয়ে আড্ডা মারছেন, হঠাৎ কোনও আগাম নোটিস না দিয়ে একরাশ কুয়াশা আপনাকে নরম স্পর্শ দিয়ে – আপনার চারপাশ অন্ধকার করে দিয়ে চলে গেলো। বা মাঝরাতে আপনার ‘প্রকৃতি প্রেমিক মন’ যদি আপনাকে একা বারান্দাতে এনে দাঁড় করায় তাহলে শুনতে পাবেন একদিকে নাম না জানা ঝোরার অবিশ্রান্ত বয়ে চলার আওয়াজ আর তার সঙ্গে পাহাড়ি পোকাদের সাংগীতিক যুগলবন্দি। তার প্রতিটা ‘সম’এ যেনো এক  রাতচরা পাখির ডাক।  সেই তান-সরগমের নিয়মিত ও সমঝদার শ্রোতা একমাত্র পাহাড়ি সারমেয়কুল যাদের মাঝেমধ্যে ডেকে ওঠাও যেন সেই রাতসংগীতের অপরিহার্য অনুসঙ্গ।

এনজেপি থেকে দুরত্ব মাত্র ঘণ্টা চারেকের তাই পৌঁছনর ঝক্কিও বিশেষ নেই। সবথেকে বড় কথা যাঁদের হোমস্টেতে আপনি উঠবেন সেই জিওন লেপচা ভাই ও প্রমীলা বৌদি’র সারল্যমাখা ও আন্তরিক হাসি আপনার প্রথম আলাপের আড়ষ্টতা মুহূর্তের মধ্যে কাটিয়ে দেবে। মনে হবে যেন নিজেরই পরিচিত কোনও মানুষের বাড়ি আপনি এসে পৌঁছালেন। অবশ্য এই আতিথেয়তা ও আন্তরিকতার মিষ্টি স্বাদ আপনি বাকি সবকটা হোমস্টেতেই পাবেন।

যে সময়েই পৌঁছান না কেন আপনি চাইলে ধোঁয়া ওঠা গরম চা আপনার জন্য মজুত থাকবেই। এর পরে গরম জলে স্নান সেরে একরাশ খিদে নিয়ে খাবার টেবিলে আপনি বসে যখন প্রথম গ্রাসটা মুখে তুলবেন এবং সেই যে খাবারের সুস্বাদ নিয়ে বাহ্ বলে উঠবেন তারপর থেকে যতদিন আপনি এই হোমস্টে–তে থাকবেন একই অভিব্যক্তি আপনার সঙ্গী হয়ে থাকবে প্রতিটি খাবার সময়।

হ্যাঁ, প্রমীলা বৌদির রান্নার হাত এতটাই সুস্বাদু যে পরবর্তী সময়ে, এমনকী যে রান্নার সাথে আমি ও আমার পরিবার বিশেষ অভ্যস্ত ছিলাম না সেই পর্ক বা শুকরের নানা পদও আমরা প্রত্যেকে আক্ষরিক অর্থেই চেটেপুটে খেয়েছি আর শেষ হয়ে যাবার পরেও উঁকিঝুঁকি দিয়ে খোঁজ করেছি যে আরও দু-এক টুকরো বাকি আছে কিনা। সবথেকে বড় কথা এই নানান নতুন দেখা সব্জি দিয়ে নানাপদের রান্না যা আমরা খেয়েছি তার বেশ কিছু এঁনাদের নিজস্ব ফলন তাই সেসবের স্বাদও দারুণ তাজা ও সুস্বাদু।

এই হোমস্টেতে আর এক ভীষণ মজার ব্যাপার কারাওকে। আপনি পেশাদার গায়ক হোন বা ‘বাথরুম সিঙ্গার হোন আপনার গায়ক বা গায়িকা সত্তাটুকু ঝালিয়ে নিতে পারবেন যা আমরাও দিব্যি নিয়েছিলাম। তবে সেসব তো আপনি চাইলে ভর সন্ধ্যাতেও ঝালিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু তার আগে দুপুরের খাওয়া সেরে অলস বিকেলে হোমস্টের সামনে একফালি লনে বসে হাতে গরম চায়ের কাপ নিয়ে হিমালয়ের কোলে এক পাহাড়ি গ্রাম ও তার সন্তানদের প্রবাহমান সরল সাধারণ জীবনের স্বাদ চেটেপুটে নিয়ে নিন। মাথায় কাঠের বিশাল বোঝা নিয়ে ঐ পাহাড়ি চড়াই উৎরাই রাস্তা ধরে বাড়ি ফিরতে ফিরতেও আপনার হাত নাড়ার প্রত্যুত্তরে অনাবিল হাসিমাখা মুখে পাল্টা হাত নাড়া বা বিকেলে ছোট্ট একটা পাহাড়ি পাথুরে জমিতে কতগুলো পাহাড়ি কিশোরের প্রাণবন্ত ফুটবল খেলা তো আর ‘চেকলিস্ট মেলানো প্যাকেজ ট্যুর’এ দেখার ও তা অন্তর থেকে অনুভব করার সুযোগ বারবার পাওয়া না, তাই না?

ও হ্যাঁ, আরও একটা কথা তো বলাই হয়নি। বরাতজোড়ে আবহাওয়া যদি পরিষ্কার থাকে এবং মেঘমুক্ত আকাশ পেয়ে যান তাহলে ঐ লন থেকেই আপনি বহুশ্রুত এবং হয়তো একাধিকবার দৃষ্ট হয়েও চিরনুতন থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ সৌন্দর্যও উপভোগ করতে পারবেন।

এর সঙ্গে আছে প্রথাগত ছকের বাইরে গিয়ে নানান মন ভালো করা সাইট সিইং যেমন ‘তারেভির’। যেতে পারেন ‘নাগি লেক’ ট্রেকিং–এ, যেখানে আদতে এক ফোঁটা জল না থাকলেও ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়াই এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। গায়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলা মেঘের সারির মধ্যে দিয়ে এক হাত দুরের রাস্তাও প্রায় দেখতে পাওয়া যায় না। এমনই এক আধাভৌতিক বা পুরো ভৌতিক পরিবেশের মধ্যে দিয়ে আসা যাওয়া মিলিয়ে প্রায় দু ঘণ্টার ট্রেকিং করে আসা যায়। আরও একটু যদি ‘অ্যাডভেঞ্চারাস’ হতে চান তো শেষ বিকেলে ট্রেকিং শুরু করে প্রায় সন্ধ্যায় মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে ট্রেকিং শেষ করে সবশেষে নীচের মনাস্ট্রিতে গরম চা সহযোগে নানা গল্প করে কাটাতে পারেন কিছু সময়। ফেরার সময় মনাস্ট্রিতে মোমের প্রদীপ জ্বালিয়ে আসার পথে সেই যে একরাশ ভালো লাগা আপনার মনকে গ্রাস করবে চেষ্টা করেও সেখান থেকে আপনি বেড়িয়ে আসতে পারবেন না এ আমি হলপ করে বলতে পারি।

কিভাবে যাবেন: NJP থেকে গাড়ীতে ৩৫০০-৪০০০ টাকা ও সময় লাগবে ঘণ্টা চারেক। এছাড়াও গ্যাংটক থেকেও যাওয়া যায়, দুরত্ব পড়বে মোটামুটি ৫৫-৬০ কিলোমিটার।

কোথায় থাকবেন: এখানে থাকার জন্য নানা রেঞ্জের হোমস্টে ও হোটেল আছে। আমরা ছিলাম ‘জিওন লেপচা’র হোমস্টেতে, ফোন নম্বর: ৯৭৭৫৪১৯২০৫। ভাড়া থাকা–খাওয়া সহ প্রতিদিন জনপ্রতি ৮০০ টাকা।

কখন যাবেন: সারা বছরই যাওয়া যায় তবে ডিসেম্বরের শেষের দিকে ‘নাগি পোখরি ট্যুরিজম’ ও ‘অরগ্যানিক ফেস্টিভাল’ বিশেষ আকর্ষণীয়।

চিত্র: লেখক

Comments are closed.