রবিবার, নভেম্বর ১৭

হিমালয়ের অন্দরে নদীর বুকে মোজাউলে দু’রাত

মৃন্ময় দে

হিমালয়ের কোলে সিকিমের কিছু প্রায় অজানা স্পট ও হোমষ্টে সম্বন্ধে কিছু মনমাতানো অভিজ্ঞতার কথা। আজ শেষ পর্ব।

 তিরিতিরি বয়ে চলা অথচ খুব বেশি প্রশস্ত নয় এরকম এক পাহাড়ি নদীর ধারে– না, নিছক ধারেই বা বলি কেন, আক্ষরিক অর্থেই প্রায় নদীর বুকে যদি থাকতে চান তাহলে ঘুরে আসুন সিকিমের প্রচলিত টুরিস্ট স্পট হৃষিখোলার পাশেই ‘মোজাউলে’–তে। যদি রুমস্টের প্রতিটা কোণা থেকে নদীর দেখা পেতে চান, যদি ঘরের যে কোনও অবস্থান থেকে নদীর কলতান শুনতে চান, যদি দিনের ২৪ ঘণ্টার যে কোনও সময়ে নদীর সঙ্গে একা বা সপরিবারে গল্প করতে চান, এমনকী যদি কোনও চাঁদনি রাতে মাঝ রাত বা ভোর রাত অবধিও নদীর পাড়ে বনফায়ার করতে চান আর সেই নদীর জলে পড়ে থাকা পাথরের উপরে বসে সেই বনফায়ারে করা ঝলসানো খাবারে কামড় দিতে চান তাহলেও অবশ্যই ঘুরে আসুন মোজাউলে।

হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে এখানেও আপনি পারখার মতো কোনওভাবেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাবেন না তবে তার অভাব আপনি অনুভবও করতে পারবেন না।

আসলে কাঠের এই ছোট ছোট কিন্তু বেশ সাজানো গোছানো কটেজগুলো তৈরিই হয়েছে নদীর পাড় বরাবর নূন্যতম যেটুকু জায়গা না রাখলেই নয় শুধু সেটুকু বাদ দিয়ে। আর তাই গাড়ি যাওয়ার রাস্তা যেখানে এসে শেষ হবে অর্থাৎ যেখান থেকে আপনাকে নেমে হাঁটতে শুরু করতে হবে সেখানে নেমে প্রথমে আপনাকে বেবাক বোকা বনে যেতে হবে কারণ গতিশীলা ‘হৃষিখোলা’ নদী ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়বে না। এমনকী সেখান থেকে বাঁক ঘুরে কটেজ চত্বরের দিকে এগোতে গিয়েও ধাঁধাঁ লাগবে কারণ সেদিকেও শুধুই হৃষিখোলা। আর শেষপর্যন্ত যখন পৌঁছাবেন ঐ কটেজ চত্বরে তখন নিজেকে আবিষ্কার করবেন তিন দিকে নদী আর একদিকে পাহাড়ে আবৃত প্রায় দ্বীপের মতো একফালি জমিতে।

কিন্তু এটা ভেবে নেওয়ারও কোনো কারণ নেই যে এখানে থাকলে শুধুমাত্র নদী সর্বস্ব হয়েই কাটিয়ে দিতে হবে। বরং আপনার যদি ‘হাইক’ করার ‘বদভ্যাস’ থাকে তো শেষ বিকেলে প্রায় ৬০ ডিগ্রি খাড়া সরু পাকদণ্ডী এবং ছাইয়ের মতো গুঁড়ো পাথুরে পথ বেয়ে চলে যেতে পারেন সানসেট পয়েন্টে যেখানে যাওয়ার পথে গায়ে জড়িয়ে যাবে দুটো পাশাপাশি গাছের মধ্যে বানানো বড় বড় মাকড়সার জাল। দেখতে পাবেন অজস্র পাখির বাসায় ফেরার ছটফটানি – শুনতে পাবেন ওদের কলকাকলি যা হয়তোবা বাড়ি ফেরার পরে ওদের সারাদিনের অভিজ্ঞতা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া ওদের নিজস্ব ভাষায়।

দেখতে পাবেন গাছের কোটরে আপনার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা লক্ষ্মী পেঁচার এক জোড়া চোখ। এরপরে সন্ধ্যায় কটেজে ফিরে ঐ কটেজ চত্বরের ভেতরের কাঠের টানা বেঞ্চগুলোতে হাতেগরম চা বা কফির কাপ এবং গরম গরম পাকোড়া নিয়ে আপনার পরিশ্রান্ত শরীরটাকে এলিয়ে দেদার আড্ডায় মজে যান। অবশ্যই তার আগে রাত বা মাঝরাতের বনভোজনের প্রস্তুতি হিসাবে নিজেই তদারকি করে রাখুন এবং ইচ্ছে হলে নিজের মতো রেসিপিতে ম্যারিনেট করিয়ে রাখুন আপনার কাঙ্ক্ষিত আইটেমগুলো। আর আপনি যদি ‘সৌভাগ্যবান’ হন তাহলে বলবো অন্তত কিছুক্ষণের জন্য যেন লোডশেডিং হয়।

চারিদিকে ছড়ানো ছেটানো বড় বড় গাছের ছায়াতে তৈরি হওয়া আলো আঁধারির মায়াবী পরিবেশে নদীর উচ্ছ্বাস মাখানো কলতান একসঙ্গে মিলে যে অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করবে, যে তারপর আপনার প্রাত্যহিক নাগরিক জীবনের মধ্যে ফিরে এসে  যদি কখনও লোডশেডিঙের মুখোমুখি হন তখন শুধু মোজাউলের রাতের কথা ভেবে আপনার যন্ত্রণার উপশম হবে। বারেবারে মনে হবে, দাও ফিরে সে লোডশেডিং, সেই অসাধারণ মুহূর্ত।

 

এরপরে নদীর ধারের নুড়ি পাথরের উপরে কাঠ সাজিয়ে সেই আগে থেকে ম্যারিনেট করার ব্যবস্থা করিয়ে রাখা নিজের পছন্দের আইটেমসগুলো নিজের হাতেই রোষ্ট করতে করতে খোলা আকাশের নীচে গানবাজনা করা – আড্ডা মারা। ভাবুন তো একবার যে আপনাদের এই নিশি যাপনের প্রত্যক্ষদর্শী হয়তো হয়ে থাকবে নদীর গা বরাবর উঠে যাওয়া ঐ পাহাড়ের ঢালের জঙ্গলে ঘাপটি মেরে বসে থাকা কোনও রাতচরা পাখি, মায় কিছু জন্তজানোয়ারও। এরপরে রোষ্ট কমপ্লিট হয়ে গেলে আপনার মনোমতো সব্জি সহ ঝলসানো মুরগি বানিয়ে আর প্রাপ্তবয়স্ক হতে চাইলে অনবদ্য সিকিমিজ পিচ ওয়াইন (রাইনো) ও রেড ওয়াইনে ছোট ছোট চুমুক দিতে দিতে বসে পড়ুন একেবারে নদীর উপরে পড়ে থাকা পাথরে। মাঝ রাতের চাঁদ হয়তো তখন ঢলে পড়েছে পূব আকাশে।

অবশ্য এতেই কিন্তু আপনার মেনুকার্ড কমপ্লিট হয়ে যাচ্ছে না কারণ পরের দিনের জন্য থাকছে কাকডাকা ভোরে বেড়িয়ে পড়ে পাহাড়ের খাঁজ ধরে নেমে আসা এক নাম না জানা ঝর্নার উৎসমুখে ট্রেকিং–এর হাতছানি। পাহাড়ি রাস্তা ধরে চলার পথে আমরা যে অজস্র ঝর্না দেখি ও তা পেরিয়ে যাওয়ার সময় নিজের মনে ভাবতে থাকি যে ‘এই ঝর্নার উৎস কোথায়?’, সেইরকমই একটা ঝর্নার উৎসে পৌঁছানোর পথ ধরুন।

 

এখানে একথাটুকু অত্যন্ত শ্লাঘার সঙ্গে বলার যে সেই রাস্তায় টুরিস্ট হিসাবে আমরাই প্রথম পা রেখেছিলাম ওই পথে, অন্তত আমাদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় গাইড হিসাবে চলা রিসোর্টের মালিক ‘শেখর’ ভাইয়ের বক্তব্য সেরকমই। যাইহোক, যেহেতু ওই রাস্তায় প্রায় কারুরই পা পড়ে না তাই আমাদের মতো আপনিও নিজেই অজস্র ঝোপঝাড় ধারালো কাঠের লাঠি দিয়ে কাটতে কাটতে আর রাস্তার পাশে গজিয়ে থাকা ঝোপগুলো খামচে খামচে ধরে ধরে এগোতে থাকুন। এগিয়ে চলুন একেবারে পিছল পথ ধরে যার প্রায় পুরোটাই গোড়ালি ভেজানো রাস্তা।

আপনার সঙ্গে সঙ্গে চলেছে ওই তিরিতিরি বয়ে চলা ঝর্না। এবং এইভাবে চলতে চলতেই পৌঁছে যান বড্ড মন ভালো করা এক তন্বী ঝর্নার উৎসমুখে যা প্রায় তিনতলা সমান উচ্চতা থেকে পড়ছে। চারপাশের এক অপার শান্তির নীরবতার মাঝে ঝর্নার জলের একটানা বয়ে চলার শব্দ বহুক্ষণ ধরে বিহ্বল অবস্থায় শোনার মধ্যে দিয়ে আপনার মোজাউলে ভ্রমণ পূর্ণতা পাক …।

 কিভাবে যাবেন : এন.জে.পি. থেকে মোজাউলে সরাসরি গাড়ি ভাড়া করে পৌঁছাতে পারেন। সেক্ষেত্রে গাড়িভাড়া পড়বে ৩৫০০ – ৪০০০ টাকা এবং সময় লাগবে ঘণ্টা চারেক। সিকিমের সিল্ক রুটে আসা যাওয়ার পথেও এখানে একরাত বা দু’রাত কাটিয়ে যেতে পারেন।

 কখন যাবেন: বছরের যে কোনও সময়।

কোথায় থাকবেন : আমরা ছিলাম ‘শেখর ছেত্রি’র ‘মোজাউলে রিভার রিসর্ট’এ, ফোন নম্বর: ৭৯০৮০৭৬৭১৩। ভাড়া ফুড ও লজিং সহ প্রতিদিন জনপ্রতি ১০০০ টাকা।

পরিশেষে আরও একটি দরকারি তথ্য: এই তিনটে স্পটে যাওয়া আসার জন্য আপনার সঙ্গে সবসময়ের জন্য গাড়ি রাখার কোন প্রয়োজন নেই। আপনি এনজেপি থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথম যে স্পটে যাবেন ও শেষ যে স্পট থেকে এনজেপিতে ফিরবেন এবং প্রত্যেকটা স্পট থেকে পরের স্পটে যাওয়ার জন্য সব জায়গাতেই পৃথক পৃথক ভাবে (ঘোরার ভাষায় যাকে বলে ‘কাটা রুট’) গাড়ি পাবেন। মজার কথা হল প্রতিটা ক্ষেত্রেই গাড়িভাড়া পড়বে ৩৫০০ – ৪০০০ টাকা এবং সময় লাগবে মোটের উপর ঘণ্টা চারেক। আমরা ট্যুরটা নামথাং থেকে শুরু করে মাঝে পারখা হয়ে শেষে মোজাউলে দিয়ে শেষ করেছিলাম।

এই সিরিজের অন্য লেখা পড়ার জন্য নীচের লাইনে ক্লিক করুন

অচেনা ভ্রমণ

Comments are closed.