শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

মনের মাঝে পারখা

মৃন্ময় দে

হিমালয়ের কোলে সিকিমের কিছু প্রায় অজানা স্পট ও হোমষ্টে সম্বন্ধে কিছু মনমাতানো অভিজ্ঞতার কথা। আজ দ্বিতীয় পর্ব।

এই যে নানা হোটেলের বিজ্ঞাপনে আকছার বিজ্ঞাপনের ক্যাচলাইন দেখা যায় ‘home away from home’, বাক্যটার আক্ষরিক প্রয়োগ ‘নামথাং এ জিওন লেপচাভাইয়ের হোমষ্টেতে যেমন ও যতটা পেয়েছি ততটাই পেয়েছি পূর্ব সিকিমের ‘পারখা’য় এসে ‘কমল গুরুং’ ভাইয়ের কাছেও। তবে সে কথায় পরে আসছি। সবার আগে বলি এখানকার অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক অবস্থানের কথা। এমনিতেই পারখার এই হোমষ্টেতে আসার আগে সদ্য তৈরি হওয়া ‘পাকিয়ং’ এয়ারপোর্ট দেখতে যাওয়ার পথে শান্ত সমাহিত হিমালয়ের অনবদ্য রূপ দেখতে দেখতে আমাদের মনটা এক অপরূপ স্নিগ্ধতায় ভরে ছিল।

ওই দিনটা ছিল ওখানকার হিন্দুদের সবথেকে বড় উৎসব ‘ভাই টিকা’ বা ‘দশেরা’ যা আমাদের কাছে বিজয়া দশমীর দিন। আর তাই গ্রামের পথে সব ধরনের মানুষের কপালে বড় করে ধেবড়ে যাওয়া লাল টিপ ও নানা রংয়ের পোষাক পড়া হাস্যময় ও আনন্দমুখর অভিব্যক্তি ও ফেরার পথে পাকিয়ং বাজারে ওঁদের কেনাবেচার দৃ্শ্য একটা ভীষণ মন ভালো করা আবেশ তৈরি করেছিল। ঘোরটা কেটে গেল যখন আমাদের গাড়ি একটা জঙ্গলে ঘেরা জায়গায় এনে থামিয়ে  ড্রাইভার ভাই বললেন ‘আ গিয়া সাব’।

 

আমরা তো তখন ভেবেই পাচ্ছি না ‘আ গিয়া মানে?’ এই জঙ্গলে ঘেরা রাস্তার মাঝখানে আবার থাকার জায়গা কোথায় হতে পারে? সেকথা ভাবতে ভাবতে গাড়ি থেকে নেমে ইতিউতি তাকাতে গিয়ে চোখে পড়লো ভীষণ মিষ্টি হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছোটোখাটো একজন মানুষের দিকে। আমি এর আগে ফোনে অত্যন্ত উষ্ণতার সঙ্গে কথা হওয়া হোমষ্টের মালিক ‘কমল গুরুং’–এর কথা জিজ্ঞেস করায় উঁনি উত্তর দিলেন ‘ম্যায় হু কমল’। সেই যে একসঙ্গে বিস্মিত হওয়ার আর ভালো লাগার রেশ শুরু হলো তা পরের দু’দিন বারবার ফিরে ফিরে এসেছে।

মানুষটা যথেষ্ট বিত্তশালী অথচ আক্ষরিক অর্থেই শুধু যে তিনি মাটির মানুষ তাই নয়, ভীষণ মিষ্টি মানুষও। প্রতিটা সময়ে আমাদের সুবিধা অসুবিধার খবর রাখা, দরকারে তার ব্যাবস্থা করা, আমাদের আহ্বানে একসঙ্গে বসে নানা মজার গল্প করা, নিজে সঙ্গে থেকে প্রায় ৬ ঘন্টার একটা দুর্দান্ত ট্রেকিংয়ে– এমনকি দরকারে হাত ধরে কঠিন রাস্তাগুলো পার করে দেওয়া ও স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে লোকাল এনার্জি ড্রিঙ্ক সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে আমাদের গ্রুপ ফটো ‘ওঁনার পছন্দমতো’ ১০০% নিখুঁত করার জন্য নিজে স্থানীয়স্তরে একজন অত্যন্ত সন্মানীয় মানুষ হওয়া সত্ত্বেও মাটিতে শুয়ে পড়ে আমাদের ছবি তোলা … না, এই মানুষটাকে নিয়ে যতই বলি তাও যেন কিছুই বলা হয় না। মানুষটা ও তাঁর পরিবার এতটাই অতিথিবৎসল যে আমাদের কৌতূহলী উৎসাহ দেখে বিন্দুমাত্র কিছু না বলা সত্ত্বেও নিজেদের বাড়িতে কষ্ট করে বানানো ‘বাঁশের আচার’ এর ভাগও অকপটে দিয়ে দিলেন। ওঁনার আরও একটা বড্ড মন ভালো করা প্রথা যা আমরা জিওন লেপচা ভাই ও বৌদির কাছ থেকেও পেয়েছিলাম তা হলো ‘বিদায় নেওয়ার সময় প্রত্যেককে উত্তরীয় যাকে স্থানীয় ভাষায় খাদা বলে সেটা পরিয়ে সসন্মানে বিদায় জানানো।

এ তো গেলো ‘কমল গুরুং’ নামক মানুষটার কথা। এবারে আসি ওঁনার হোমষ্টের সম্বন্ধে। সেও এক বিস্ময়। গাড়ি থেকে নেমে প্রধান রাস্তা থেকে নীচের একটা গ্রামের রাস্তা দিয়ে আরএকটু নামতেই ওঁনার হোমষ্টে চোখে পড়লো। প্রথম দর্শনেই মনে হল যেন একটা ছবির বাড়ি কেউ অর্ডার দিয়ে বানিয়ে জঙ্গলের মধ্যে বসিয়ে দিয়েছে। বাড়ির সামনে গিয়ে সেই ভালোলাগাটা রীতিমতো উন্মাদনায় পরিণত হল আমাদের থাকার ঘর দুটোর সামনের ছোট্ট টানা বারান্দাটা দেখে। অথচ এরকম একটা ‘হার্ডকোর প্রাকৃতিক’ অবস্থানেও ঘরের ‘বেসিক ফেসিলিটিজ’ কিন্তু ১০০% ‘আপ টু ডেট’। টিপটপ পরিষ্কার ঘর ও বেডশিট, চাদর, তোয়ালে, সঙ্গে গিজার, মায় কোনওরকম প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ওডোমসও।

যাইহোক ঘরে ঢুকে কোনওরকমে মালপত্তরগুলো ফেলে রেখেই মন উচাটন করে উঠল সামনের একফালি বারান্দাটার জন্য। ঐ বারান্দা থেকেই সামনের জঙ্গলটা শুরু হয়েছে, এমনকি গাছের পাতাগুলো একটু হাত বাড়ালেই ধরা যাচ্ছে আর তার সঙ্গে দেখতে না পাওয়া একটা পাহাড়ি ঝোরার অবিরাম বয়ে চলার শব্দ কানে আসছে। যেন স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যবর্তী এক মায়াময় পরিবেশে প্রবেশ করেছি। ডান পাশ ফিরতেই  সামনের খোলা দৃষ্টিপথে চোখে পড়ল অনেকটা দুরের একটা পাহাড়ি ঢালে পাহাড়ি জনপদ, ইতস্তত ছড়ানো বাড়ি।

ভালোলাগার এই অনুভূতিতে ছেদ পড়লো প্রায় বিকেলে লাঞ্চ করার আহ্বানে আর তখনই আবিষ্কার করলাম হিমালয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে খিদে ভুলে যাওয়ার কথা। যাইহোক এরপরে সাজানো গোছানো ডাইনিং টেবিলে ততোধিক সুন্দর করে সাজানো বাসনপত্রগুলো দেখে যে খিদেটা আরও চনমনে হয়ে উঠেছিল যা পুরোপুরি মিটিয়ে নিলাম নানা পদের খাবার খেয়ে। এরপর যা স্বাভাবিক, সেই ভাতঘুম আসতে গিয়েও এলো না। কারণ একমুহূর্তের জন্যও হিমালয়কে চোখ ছাড়া করতে পারছিলাম না। আর তাই নরম কম্বলের তলায় পা ঢুকিয়ে ঘরের কাঁচের জানলা দিয়ে দুরের পাহাড়ের বুকের সন্ধ্যা নামার প্রস্তুতিপর্ব থেকে সন্ধ্যা নামা অর্থাৎ আলো ঝলমল করে ওঠা জনপদগুলো দেখতে দেখতে হিমালয়ের আর এক সৌন্দর্যে ডুবে গেলাম।

এইভাবেই বেশ লাগছিলো সময় কাটাতে। চরম ব্যস্ততার শহুরে জীবনে অভ্যস্ত মন তো এই মুগ্ধতায় মাখানো অলস সময়ের খোঁজেই বারে বারে ফিরে ফিরে আসে হিমালয়ের কোলে। কিন্তু কমল গুরুং ভাই তো আর সেজন্য তাঁর কর্তব্য ভুলে থাকবেন না আর তাই যথারীতি তিনি তাঁর লোককে নিয়ে গরম কফি আর পকোড়া নিয়ে হাজির যথাসময়ে। তারপর সেসব নিয়ে চলল নানা মজার আড্ডা।

 

সবথেকে মজা লাগলো ওঁনাদের এখানকার রীতিনীতি ও অভিজ্ঞতার গল্প শুনে যেমন বিয়ের ক্ষেত্রে আমাদের শহরে যা যা নিয়ম এখানকার ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থাৎ এখানে মেয়ে ও মেয়েপক্ষরাই বিয়ে ও তাকে ঘিরে নানা সামাজিক রীতিনীতির ব্যাপারে প্রথম ও শেষ কথা বলে। এভাবে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত কখন নেমেছে তা টেরই পাইনি। যখন পেলাম তখন আমরা তড়িঘড়ি ডিনার সেরে ফেললাম আর তারপরে সারাদিনের ক্লান্ত শরীরগুলো বিছানায় আশ্রয় নিতে দেরি করলো না।

সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পরেও যথারীতি একা আমি বসে থাকলাম বারান্দায় আর শুনতে থাকলাম জঙ্গলের সেই মন আবেশ করা সঙ্গীতের মহফিল যা শুনেছিলাম নামথাং–এ। সে যে কী আবেশ করা এক অনির্বচনীয় ভালো লাগা! কাঞ্চনজঙ্ঘা না হয় এখানে এসে নাই বা দেখতে পেলাম কিন্তু সেটাই কি হিমালয়কে ভালোবাসার একমাত্র শর্ত হতে পারে?

পরের দিন তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট সেরে সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়লাম ‘হাইকিং’এ। সেও এক যাকে বলে ‘নার্ভ স্টিমুলেটিং’ অভিজ্ঞতা। এতদিন আড় চোখে দেখা ও মনে মনে ভাবা ‘ঐসব রাস্তা আমাদের জন্য নয়’ সুলভ পাহাড়ি মানুষদের ব্যবহার করা পাকদণ্ডী পথ ধরেই আমরা এক পাহাড় থেকে থেকে আর এক পাহাড়ে চড়াই ভেঙে উঠতে লাগলাম। পথে যে কত চেনা ও অধিকাংশ অচেনা মন ভালো করা  ফুল ও ফলের রূপ ও পাখির কলতান প্রত্যক্ষ করলাম তার কোনও ইয়ত্তা নেই। সঙ্গে অভিজ্ঞতা হল একটা পাহাড় থেকে আর একটা পাহাড়ের মাঝে ছোটো ছোটো গ্রামের মানুষদের নিজস্ব গ্রাম্যজীবনের স্বরূপ দেখার।

এইভাবেই চলতে চলতে কখন যে আমরা আমাদের হোমস্টে থেকে অনেক উঁচুতে উঠে এসেছি তা বুঝতেই পারিনি। পারলাম যখন আমাদের ট্রেকিং গাইড ‘কমলভাই’ নীচে থাকা ওঁনার হোমস্টেটা দেখালেন। কাছাকাছি এলাকার মধ্যে ঐ পয়েন্টটাই যেহেতু সবথেকে উঁচুতে ছিলো তাই আমরাও আমাদের ‘লেভেল’ অনুযায়ী ঐ পয়েন্টটাকেই ‘সামিট পয়েন্ট’ ধরে নিয়ে আমাদের “মোহনবাগানের পতাকা” পুঁতে দিলাম। এ প্রসঙ্গে উল্লেক্ষ্ যে পুরো টিমের সবাই যেহেতু মোহনবাগানী ছিলাম তাই এই বিষয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ ছিলো না।

এরপরে ‘কমলভাই’এর সৌজন্যে একজন স্থানীয় মানুষের বাড়িতে বসে চা-বিস্কুট খেয়ে চাঙ্গা হলাম। সঙ্গে আবার ওঁনাদের বাড়িতেই ভুট্টা পচিয়ে স্থানীয় মদ বানানোর প্রক্রিয়া দেখারও অভিজ্ঞতা হল। এইভাবেই ভালো লাগার বহুরঙা রঙে রঞ্জিত হয়ে ও নতুন নতুন অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে আমরা হোমস্টেতে ফিরে এলাম। তবে ঐ যে বললাম ‘হিমালয়ের বুকে একবার নিঃশর্তভাবে আশ্রয় নিতে পারলে ভালো লাগার অনুভূতির ছেদ পড়ে না। যেমন ঐ সন্ধ্যাতেই আমরা হোমস্টের মধ্যেই একফালি জমিতে কমলভাইয়ের তত্ত্বাবধানে খোলা আকাশের নীচে বসে জমিয়ে ‘বনফায়ার’ করলাম ঝলসানো চিকেন আর অনবদ্য ‘সিকিমিজ রাইনো ও রেড ওয়াইন’ দিয়ে।

তবে এইসব সিকিমিজ ওয়াইন যদি নাও সঙ্গে থাকতো তবু ‘মনমাতাল করা’র রসদের অভাব ছিলো না কারণ আমাদের সঙ্গে ছিল দূরের উলটোদিকের পাহাড়ের আলোর মালার মতো সেজে থাকা জনপদ আর জঙ্গল ও প্রকৃতির নিরবিচ্ছিন্ন কলতান। এইভাবেই আমাদের মন ‘ফুরাইয়ো না এ নিশি’ বলতে চাইলেও রাত নামলো পারখার আকাশে আর আমিও বেশি রাতে আবারও কালকের ঐ ‘প্রকৃতি ও জঙ্গলের তান সরগম ও তাঁদের যুগলবন্দি’ শুনতে থাকলাম …

কিভাবে যাবেন : ফ্লাইটে যেতে চাইলে Pakyong Airport থেকে মাত্র দশ কিমি দুরে ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম পারখা বা NJP থেকে গাড়িতে গেলে লাগবে ৩৫০০-৪০০০ টাকা ও সময় লাগবে ঘণ্টা চারেক।
কোথায় থাকবেন : আমরা ছিলাম ‘কমলগুরুং’এর ‘পারখা হোমস্টে’তে, ফোন নম্বর: ৯৮৩২৩২০৫৮৯। খরচ থাকা–খাওয়া সহ প্রতিদিন জনপ্রতি ১০০০ টাকা।
কখন যাবেন: বছরের যে কোনও সময়।

এই সিরিজের অন্য পর্ব পড়ার জন্য নীচের লাইনে ক্লিক করুন

অচেনা ভ্রমণ

Comments are closed.