মহারাষ্ট্রের কামসেট শোনায় বৃন্দগান…

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    মধুছন্দা মিত্র ঘোষ

    বিজনবেলায় ফিকে রোদ্দুরে ঘন হয়ে রয়েছে ধূসর আকাশ। যাই যাই করছে শ্রাবণের দিন। বাতাসে খানিক বৃষ্টি ছুঁতেই, ভালোবাসার সবুজ গল্প শুনব বলে ছাতা আর বর্ষাতি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি পশ্চিমঘাট পাহাড় ও চিকন নীল এক হ্রদের উদ্দেশ্যে। মুম্বাইয়ে বসবাস করার দৌলতে, মহারাষ্ট্রের কামসেট ও পাভানা হ্রদ এক্কেবারে নাগালেই। পশ্চিমঘাটের প্রখর লাবণ্যঘেরা ছবির মতো এক ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ কামসেট, যেখানে গিয়ে শেষ শ্রাবণের ছোঁয়া গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছি। সমুদ্রতল থেকে কামসেটের উচ্চতা ২২০০ ফুট।

    এই যে বর্ষাতি গায়ে চাপিয়ে বৃষ্টির দৌরাত্ম্য সামলে মোবাইলে ছবি তুলছি– মোবাইল স্ক্রিনে টুপটাপ ঝরে পড়ছে বৃষ্টিদানা সে তেমন কিছু নয়। কখনও বৃষ্টিছাট ঘিরে ফেলছে, কখনও জলজ কুয়াশায় ঝাপসা চারপাশ। ভিজে মেঘ গায়ের ওপর লেপটে এসেছে। প্রকৃতির বৃষ্টিস্নাত রূপকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করবো বলেই তো শেষ শ্রাবণে আসা পশ্চিমঘাটের অফুরান সবুজের বিস্তারে, পাহাড় চিরে আলপনা আঁকা মধুর পথে, ঝরনার জালবোনা পাহাড়ি মুলুকে। সবুজেরই যে কত রকমফের!

    পাহাড়ের সবুজ ও সোঁদা ঘ্রাণ, থম ধরা ভেজা পরিবেশ, আলোছায়ার অদ্ভুত লুকোচুরি। মেঘেদের কানে কানে অনবরত ফিসফিস বৃষ্টির গল্প। প্রকৃতিকে চিনে নেওয়ার অভিজ্ঞতাই আলাদা এমন পাহাড়ি প্রেক্ষাপটে। কামসেট অঞ্চলটি মহারাষ্ট্রের পুণে জেলার মাওয়াল তহসিলের অন্তর্গত এক নিটোল পাহাড়ি জনপদ। আজও যেখানে রয়ে গেছে দেশজ কৃষ্টি ও নিজস্বতাকে আগলে রাখার অটুট প্রয়াস। স্থানীয় পুরুষদের পরনে মরাঠি সাযুজ্যসহ সাদা সার্ট, সাদা প্যান্ট বা ধুতি এবং অতি আবশ্যিক মাথায় সাদা টুপি। এই পোশাকই মরাঠি ও বিদর্ভ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সনাতন ভূষণ, এখানকার মহিলাদেরও দেখলাম এই একবিংশ শতাব্দীতেও মরাঠা শৈলীতে কাছা দিয়ে ঝলমলে রঙিন শাড়ি ও দুই হাতে সবুজ কাচের চুড়ি পরতে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, মরাঠা সমাজে এয়ো স্ত্রীদের সধবা চিহ্ন হল কাচের সবুজ চুড়ি।

    বর্ষা আঁকা এক রবিবারে নভি মুম্বাই থেকে সিওন–পানভেল এক্সপ্রেসওয়ে ধরে এগিয়ে জাতীয় সড়ক ৪৮ উজিয়ে কুশগাঁও রোড শেষে কামসেট ঢুকে পড়েছি। যাত্রাপথে হাইওয়ের ধারে ‘অ্যাপেটাইট’ নামের এক ধাবা’র নাম দেখেই বিস্তর খিদে পেয়ে গেল। গাড়ি থেকে নেমে কান্দা পোহা, পাও ভাজি আর ফিল্টার কফি খেলাম। মুম্বাই থেকে কামসেটের দূরত্ব ৮০.৭ কিলোমিটার। প্রাতরাশের সময়টুকু বাদ দিয়ে সময় লাগল প্রায় ঘণ্টা দেড়েকের মতো। পথের ধারে চোখে পড়েছে ভুট্টা ও আখের খেত। কামসেট অঞ্চলে এই দুটিরই ফলন বেশি। এখানকার অন্যতম প্রধান জীবিকাই হল কৃষিকাজ। প্রায় প্রতিটি গৃহস্থের উঠোনেই গোরু–মোষ–ছাগল–মুরগি’র গৃহপালিত ব্যবস্থা। গ্রামীণ পাকা সড়ক তুমুল বৃষ্টিতে সকাল সাড়ে দশটাতেও আলো–আঁধারি। রাস্তায় প্রতিটি গাড়িই চলছে ফগ লাইট জ্বালিয়ে।

    কামসেট অবশ্য শুধুমাত্র নৈসর্গিক সৌন্দর্যেই খ্যাত নয়, এই অঞ্চলের একটি ভিন্ন পরিচিতিও আছে। কামসেটকে বলা হয় প্যারাগ্লাইডিং–এর স্বর্গ। এখানে রয়েছে অজস্র নামী দামি প্যারাগ্লাইডিং ফ্লাইং ক্লাব এবং প্রশিক্ষণ শিবির। এছাড়াও রয়েছে রক ক্লাইম্বিং, নাভানা হ্রদের জলে বিবিধ ওয়াটার স্পোর্টস শেখানোরও নানা ব্যবস্থা আছে। স্থানীয় পর্যটকদের কাছে কামসেট ‘প্যারাগ্লাইডিং প্যারাডাইস’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। প্যারাগ্লাইডিঙের মরশুম হল অক্টোবর থেকে মে মাস। এই সময় কামসেট গেলে দেখা যায় আকাশজোড়া রকমারি উড়ানদৃশ্য।

    নীচে উপত্যকা জুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে বৃষ্টিমেদুর মেঘের দল। পাহাড়ের গা বেয়ে গাড়ি নামতে শুরু করে। একদিকে সবুজ গালিচা মোড়া পাহাড়, অন্যদিকে সহজ সরল মরাঠা যাপনচিত্র। কামসেট মুম্বইকর ও পুণেকরদের কাছে দারুণ সুন্দর এক ‘উইকএন্ড গেটওয়ে’। নাগরিক জীবনের রোজনামচা থেকে কিছুটা সময়ের জন্য মুক্তির অবসর।

    কামসেট থেকে ৯১ কিলোমিটার দূরত্বে কোন্তেশ্বর শিবমন্দির। পূণ্যার্থীপ্রবণ মানুষদের অবশ্য দ্রষ্টব্যস্থান। জামবাভলি গ্রামে উন্মুক্ত চাতালের ওপর পাথরনির্মিত মন্দির। একতলা মন্দিরটি বিশেষ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। মন্দির চত্বরের কাছেই একটি ঝরনাধারা, একটি পুষ্করিণী ও খাটেশ্বর মহারাজের সমাধিক্ষেত্র আছে। ড্রাইভার জানালেন গাড়ি যাওয়ার পাকা সড়ক থাকলেও বর্ষায় কিছু জায়গায় রাস্তার বেহাল অবস্থা হয়। ফলে কোণ্ডেশ্বর যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বাতিল করলাম যাত্রা। কাছেই ভাণ্ডার ডোংগার একটি পাহাড়টিলা মন্দির। মহারাষ্ট্রের প্রাচীন ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব সন্ত তুকারামের স্মরণে এটি উৎসর্গ করা হয়েছে।

    কামসেট অঞ্চলের কাছে–দূরে ঐতিহাসিক দুর্গগুলির অতীত ভূমিকা ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তেমনই কয়েকটি দুর্গ হল, লোহাগড় দুর্গ, তিকোনা দুর্গ, টং দুর্গ, করাইগড় দুর্গ, ভিমাপুর দুর্গ ইত্যাদি। কামসেটের কাছে ভাইরি গুহায় নাকি যত্রতত্র রান্নার পুরাতন বাসনসামগ্রী অঢেল পড়ে আছে। স্থানীয় মানুষদের বিশ্বাস, কেউ যদি গুহার ভেতরে ঢুকে বাসনপত্র চুরি করার মতলব করে তাহলে পাহাড় থেকে গড়িয়ে নীচে গভীর খাদে পড়ে তার মৃত্যু অনিবার্য।

    বৃষ্টি কিছুটা ধরে এসেছে যদিও আকাশের মুখ ভার। সেদিন ছিল স্বাধীনতা দিবস আর তার আগের দিন জন্মাষ্টমী। রেশ রয়ে গেছে তার, কামসেটের রাস্তায় দলে দলে যুবাপুরুষ গেরুয়া রঙের টি–সার্ট, ক্লাবের নাম লেখা দলীয় ফেস্টুন, ব্যানার, নিশান নিয়ে হাজির। বেশ কয়েকটি স্থানে মরাঠার অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘দহি–হান্ডি’ উৎসব শুরু হয়েছে। স্থানীয় ক্লাব ও ঝাঁকে ঝাঁকে লরি–টেম্পো–মোটরবাইক চেপে হালফিলের ‘নন্দলালা’রা আসছে। সবাই জড়ো হচ্ছে নিজেদের ক্রীড়া কুশলতা প্রদর্শনের জন্য। কামসেট বেড়াতে এসে শুধুই প্রকৃতিদর্শন নয়, ক্যামেরায় টুকে রাখি জনপ্রিয় মরাঠা ঐতিহ্যের দহিহান্ডির দৃশ্য।

    এবার পথটি অনেকটাই সমতল।জাতীয় সড়ক ৭৯ পারাপার করে এবারের গন্তব্য কামসেট পাহাড়তলি থেকে মাত্র ১৩ কিমি দূরে পাভানা হ্রদ। হ্রদ–পাহাড়–উপত্যকার মনোরম ক্যানভাস পেন্টিং। প্রায় ৫৮ কিমি অঞ্চল জুড়ে ব্যাপ্ত হাভানা হ্রদ আদপে একটি কৃত্রিম জলাধার। পশ্চিমঘাট থেকে উৎপন্ন পাভানা ও ইরাবতী নদী দুইটির উকসান বাঁধের ব্যাকওয়াটার সৃষ্ট হ্রদ এটি। পাভানার ওপর বাঁধ নির্মাণকালে সৃষ্ট হয়েছে টলটলে স্বচ্ছ জলের হ্রদটি। চারদিকে পশ্চিমঘাটের ঢেউ খেলানো আঁকিবুকি। সবুজের মনোহর ঘেরাটোপ। বাঁধটির নির্মাণকুশলতায় আছে বাস্তুকারদের আধুনিক কারগরি।

    বেয়াদব মেঘেদের হাতছানি সম্বল করে বর্ষাদিনে এখানে বেড়াতে আসাটাই দারুণ ব্যাপার। বিশাল এই হ্রদ জুড়ে আজ ছুটির দিনে হৈ হৈ আমেজ। কত হরেক আয়োজন। ওয়াটার স্কুটার, স্পিডবোট, জয় রাইড, স্কুবা ডাইভিং, আরও নানা ওয়াটার স্পোর্টসের ব্যবস্থা। হ্রদের পাড় লাগোয়া পথে ঘোড়ার পিঠে চেপে পায়চারি করার বিনোদনী আয়োজন। মহারাষ্ট্রের প্রতিটি হ্রদ বা সাগরসৈকতে যেমন থাকে আর কী।

    নিবিড় নিসর্গের আস্বাদের লোভে পাভানা হ্রদে সময় কাটাই অনেকক্ষণ। শীতকালীন অধিবেশনে এই হ্রদ থাকে পরিযায়ী পাখিদের দখলে। সেই সময়ে খুব কাছ থেকেই দেখতে পাওয়া যায় পার্পল সোয়াম্পহেন, কমন মুরহেন, ব্ল্যাক ড্রঙ্গো, লেজার হুইসলিং, গ্রে হর্ন, লেজার ফ্লেমিংগো, ফিজ্যান্টটেল জাকানা সহ নানা প্রজাতির পাখি। পরিযায়ী পাখি দেখতে আসার সেরা সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এই সময়েই পক্ষীবিলাসীদের ভিড় জমে এই তল্লাটে।

    পশ্চিম মুলুকের বিলম্বিত সন্ধ্যা নামে হ্রদের পাড়ে। জলের থেকে উঠে আসা খানিক মায়া আর ভালোবাসা ছুঁয়ে যায় সর্বাঙ্গ। গাড়ির চাকা ঘোরে মুম্বাইয়ের দিকে। বাইরে তখন আবার শুরু হয়েছে অঝোর বৃষ্টি।

    চেনা ট্যুরিস্ট স্পটের বাইরে কম জানা ভ্রমণের খোঁজে ক্লিক করুন নীচের লাইনে

    অচেনা ভ্রমণ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More