সাহারায় শিহরিত

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সুদেষ্ণা ঔরঙ্গাবাদকর

    এই বছরে মধ্য জুনের আধো রাত আধো ভোরে মস্কো থেকে রওনা দিলাম। গন্তব্য টিউনিসিয়া, ভূমধ্যসাগরের কিনারা ধরে বিস্তৃত আফ্রিকার মুকুটে মুক্তোর মতো দেশ|   এনফিদা এয়ারপোর্টে নেমে দিল্লি বা রাজস্থানের সঙ্গে বেশ একটা মিল পেলাম| সেখান থেকে প্রায় তিনঘণ্টার পথ মাহদিয়া শহর। সমুদ্রের ধারে ছোট্ট শহরতলি বলা চলে যেখানে মূলত বিলাসবহুল হোটেল আর কিছু স্থানীয় লোকেদের বসবাস| শহর ঘুরতে বেড়িয়ে দেখি ছোট ছোট দোকান আর তাতে ট্যুরিস্টদের আকর্ষণের জন্য রয়েছে হাতে বানানো সিরামিকের বাসন থেকে জাফরানের সম্ভার। সবই বিক্রি হচ্ছে। তারই মধ্যে চোখে পড়ল কলকাতার আদলে গোল হয়ে বসে হাতে ছোট্ট কাপে মধু আর পুদিনা দেওয়া টিউনিসিয় চা নিয়ে বিভিন্ন বয়েসের লোকেদের আড্ডা–হাসির আসর।

    বহু প্রাচীন সভ্যতার সাক্ষী টিউনিসিয়া। রোমানদের দিয়ে শুরু। শেষ বদলটি ঘটে ১৯৫৬ সালে যখন ফরাসিদের শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা ঘোষিত হয় এই দেশ| বহু জাতির আসা যাওয়ার ছাপ রয়ে গেছে টিউনিসয়দের চেহারায়। অলিভ গায়ের রঙের সঙ্গে সবুজ বা নীল চোখ… অসাধারণ সুন্দর এই জাতি|

    টিউনিসিয়া যাবো আর সাহারায় গিয়ে শিহরিত হব না এ তো হতেই পারে না! তাই ঠিক করলাম সাহারা দর্শনে যাওয়া যাক| যে ভদ্রমহিলা ট্যুরটি বিক্রি করলেন, তিনি শুধু মিষ্টি হেসে বললেন খুব রোমাঞ্চকর ট্যুর, সঙ্গে একটু বেশি করে জল নেবেন! সে যে কী রোমাঞ্চ তার পরিচয় পরে পেলাম!

    আমি আগেও দেখেছি, কোনও দুর্গম জায়গায় পৌঁছবার আগে প্রকৃতি ধীরে ধীরে নিজের রূপ বদলে একটা প্রস্তুতি করিয়ে দেয় নয়তো যে জায়গায় পৌঁছতে চলেছি তার ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যায় না| ভোর পাঁচটায় রওনা হতে হবে, ঘরের পর্দা সরিয়ে ব্যালকনিতে এসে দেখি আকাশ রাঙা করে ভূমধ্যসাগরের অতল জলরাশি থেকে সূর্য উঠছে! মনে একরাশ উত্তেজনা নিয়ে বাসে করে রওনা দিলাম বিশ্বের বৃহত্তম মরুভূমি সাহারার উদ্দেশ্যে …

    ধীরে ধীরে শহরের সবুজ ছাড়িয়ে রুক্ষতার দিকে যতই এগোচ্ছি বাসের গতিও ততই দ্রুত হচ্ছে। প্রায় দু’ঘন্টা চলার পর প্রথম বাস থামল এল-জেম রোমান অ্যামফিথিয়েটারে। ২৩৮ খৃষ্টাব্দে নির্মিত অ্যামফিথিয়েটারটি রোমের কলোসিয়ামের চেয়ে আয়তনে ছোট হলেও বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংরক্ষিত স্থাপত্য। এখানেই গ্ল্যাডিয়েটর ছবির শুটিং হয়েছিল!

    রোমান সাম্রাজ্যের চিহ্নকে ফেলে রেখে চললাম এগিয়ে। স্থানীয় গাইড ফুয়েদ বিভিন্ন সময়ের টিউনিসিও ইতিহাসের কাহিনী বলতে বলতে চললো। পথে দেখি বহু পরিত্যক্ত গুহা। মনে হল একসময়ে এই গুহাগুলিতে মানুষের বসতি ছিল।

    হ্যাঁ অনুমান ঠিকই, বাস থামল মাতমাতা গ্রামে বেরবের আদিবাসীদের গুহার সামনে! ধু ধু মরুভূমির গুহাতে এখন মুষ্টিমেয় বেরবের আদিবাসীদের বাস, অধিকাংশই গুহা ছেড়ে গ্রামে পাড়ি দিয়েছে, তেমনি ৩৬০ বছর ধরে একই গুহায় বংশপরম্পরায় বাস করছে এমন এক পরিবারের গুহায় হাজির হয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখলাম সেখানে সোলার ব্যাটারি আর স্যাটেলাইট টিভি পৌঁছে গেছে। মুগ্ধ করে দেওয়ার মতো আতিথেয়তা! ঘরে বানানো অলিভতেল, হাতে গড়া রুটি আর রোজম্যারিন মধু দিয়ে অতিথিসৎকার করল তারা|

    দুপাশে অ্যাটলাস পর্বতমালা। চারিদিকে শুধু রুক্ষতার মধ্যে কিছু বন্য রোজম্যারিন। সূর্য্ তখন মধ্যগগন ছাড়িয়ে নীচে নামছে। মরুভূমির মধ্যে অপূর্ব হোটেল, জিনিসপত্র রেখে বেরোলাম উটে সওয়ারি হয়ে সাহারার মধ্যে যাওয়ার জন্য।

    সার দিয়ে উটের পাল আর ঘোড়ার টাঙ্গা টুরিস্টদের জন্য অপেক্ষা করছে। উট বসে থেকে যখন দাঁড়ায় তখন আরোহীর বডিল্যাংগুয়েজ সারা বিশ্বে একমাত্র লালমোহন গাঙ্গুলিই দেখাতে পেরেছিলেন! তিনটি করে উট আর টাঙ্গা মরুভূমির বিভিন্ন দিকে  নিয়ে চললো। মাঝ মরুভূমিতে হাল্কা হলুদ রঙের বালির স্তূপ। সেখানেই ট্যুরিস্টদের নামামো হয় বিখ্যাত Silence of Sahara অথবা সাহারার অপরিসীম নৈঃশব্দ উপভোগ করার জন্য।

    চারিদিকে শুধু ধু ধু প্রান্তর আর নীল আকাশ… যত মরুভূমির গভীরে যাওয়া যায় ততই বালির রঙ সাদা, হাতে নিলে সাদা ময়দার মতো নরম আর মিহি লাগে! কোথাও অন্য কোনও রঙের অস্তিত্ব নেই, বাতাসের কোনও আওয়াজ নেই। সূর্য তখন ডোবার অপেক্ষায়। সমস্ত চরাচর যেন থমকে আছে…

    এমন সময়েই মানুষ জীবনের অনিত্যতা দেখতে পায়। মনে হয়, জীবন যেন বালু ঘড়ির মত, জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই উল্টে দেওয়া হয় …তারপর শুধুই মুহূর্তগুলো হারিয়ে ফেলা সাহারার বালির মতো। যাকে মুঠোয় ধরা যায়না, মুঠোর ফাঁক দিয়েই সময় বালির মতো ছেড়ে চলে যায়, চলে যায় আমাদের প্রিয়জনদের মতো। এভাবেই আমিও ঝরে যাব একদিন। জীবন যে কত নশ্বর তা উপলব্ধি করার জন্য একবার সাহারার বুকে দাঁড়াতেই হবে!

    আমি জানিনা ফেলুদা বা তার স্রষ্টা সাহারা ভ্রমণে এসেছিলেন কিনা কিন্তু শিহরন ছাড়া অন্য কোনও শব্দ সাহারা দেখে আসেনা!

    সাগরে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত সাহারা মরুভূমিতে দেখে হোটেলে ফিরলাম! রাতের ডিনার করে শুতে গেলাম। রাত দুটোয় উঠে তিনটের সময় পুলিশি নিরাপত্তা বেষ্টিত হয়ে নতুন দিনের সূর্যোদয় দেখতে Chott el Djerid বা গোলাপি লবণহ্রদে রওনা হলাম। তারপর মরুভূমির মাঝে ২০০ কিমি ভেতরে প্রাক্তন প্যারিস-ডাকার রুটে জিপ সাফারি। দেড়দিনে প্রায় ১৪০০ কিমি ভ্রমণ… সে গল্প না হয় আরেকদিন হবে!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More