রবিবার, জানুয়ারি ১৯
TheWall
TheWall

শ্রীবর্ধন সৈকতে লোনা হাওয়ার কানাকানি

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

মধুছন্দা মিত্র ঘোষ

ফাঁকা রাস্তায় স্পিড তুলে গাড়ির কাচ নামিয়ে দিয়েছি। লোনা বাতাসেরা পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতো জানলার অন্দরে হুড়মুড়িয়ে এসে পড়ল। সাগরপাড়ের চেনা চেনা দৃশ্য যেমন হয় আর কী। এই সাগরতটের কথা শুনেছিলাম মুম্বাইয়েরই এক বান্ধবীর কাছে। তখনই মনে মনে ছক কষেছি, আগামী দুটো দিন ছুটি পেলেই পাড়ি জমিয়ে দেবো এই সাগরকিনারে। মুম্বাই মহানগরের জুহু বা মেরিন ড্রাইভ সৈকতের ধার সারাবছর গড়িয়াহাট মোড়ের মতোই জনসমাগম থাকে। একটুখানি নির্জনতায়, অনাবিল সৈকতে গা ভাসাতে কিংবা নিদারুণ ফুর্তিতে বালিয়াড়ির রোদ–উঠোনে গা ভিজিয়ে মিঠে আমেজে ক্ষণিকে হারিয়ে যেতেই তো রায়গড় জেলার শ্রীবর্ধনে আসা।

আরবসাগরের কিনারায় মন চুরি করা কত যে সৈকত রয়েছে। সমুদ্রের সঙ্গে আড্ডার ফাঁকতালে খানিক ছোঁয়াছুঁয়ি খেলায় মেতে উঠতেই বা মানা করেছে কে? শ্রীবর্ধন সাগরপাড়ের এক নিজস্ব অহংপ্রস্তাব আছে। কোঙ্কন উপকূলের চেনা দৃশ্য ভেঙে আবারও টুকরো টুকরো চেনা দৃশ্য। সৈকত জুড়ে দিনভর হরেক ধরনের বিনোদনী জলযান। এই রাইড সেই রাইড, স্কুবা ডাইভিং সহ বিস্তর প্রমোদ ব্যবস্থা। আস্ত একটা সকাল এবং বিকেল যেন উবু হয়ে বসে সাগরতটে।

 

পরবর্তী দৃশ্য আটকে বিছিয়ে আছে সাগরসৈকত। সফেদ বালিয়াড়িতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি মুঠোভর্তি সময় নিয়ে। নোনাহাওয়ার কানাকানিতে মজে যাই। শ্রীবর্ধন সাগরসৈকতের সফর ফেরতাই বৃত্তান্তে আমি তখন কেবলই নির্বাক পর্যটক শুধু।

যেন প্রকৃতির হাতে গড়া এক মায়াসৈকত। এখানে আসার আগেই বান্ধবী ফোনে বাতলে দিয়েছিল যে আমরা যে এতো এখান–ওখান ঘুরে বেড়াই, আমাদের উচিত একবার উইকএন্ড ছুটিতে শ্রীবর্ধন যাওয়া। গুগল হাতড়ে একটু খুঁজতেই পাওয়া গেছিল, কোঙ্কন উপকূলের কোল ঘেঁষে মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার এই সাগরকিনারটি। একদিকে বিস্তীর্ণ সমুদ্র– বহুদূর পর্যন্ত চলে গেছে সূর্যস্নাত সফেদ বালুতট, অন্যদিকে নারকেল, সুপুরি, আম গাছের ভিড় নিয়ে এই ঐতিহাসিক তালুক।

সকালবেলা বালির বুকে ফেরা ঢেউদের নজরবন্দি করে রাখছি। উইকএণ্ড কাটাতে ও সাগর ভ্রমণের নেশায় কাছে–দূরের অনেকেই চলে আসেন এখানে। হরিহরেশ্বর শ্রীক্ষেত্র এখান থেকে মাত্র ১৮ কিমি দূরে। শ্রীবর্ধন ও হরিহরেশ্বরকে ‘টুইন সিটি’ও বলা হয়ে থাকে। আসলে পর্যটকপ্রিয় হরিহরেশ্বর–দিবেগড়–শ্রীবর্ধন–কোনডিভালি সৈকতগুলি মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলাকে অপরূপ সৈকতসমূহের বিশিষ্টতা দিয়েছে। আবার এদের মধ্যে কোনডিভালি আদপে একটি মৎস্যবন্দর। ছোট্ট ছুটিতে এই সৈকতগুলির আওতায় কাটিয়ে দেওয়া যায় আলো–ছায়া ঘেরা ক্ষণিক অবসর। মায়াবী ভিজে থাকা সৈকতপথ– যেখানে ভ্রমণের সবটুকু নির্যাস ধরা থাকে।

 

আবছায়া নিরিবিলিতে কোঙ্কন উপকূলের ক্যানভাসে আঁকা কয়েকটি সৈকতকে বুড়ি ছোঁয়া ছুঁয়ে পেরিয়ে যাই শ্রীবর্ধন সৈকত অভিমুখে। ক্রমশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে শ্রীবর্ধন আর তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বহু রিসর্ট। সমুদ্রসৈকত যাওয়া–আসার রাস্তা ধরে অসংখ্য সি–সাইড রেস্তোরাঁ ও হোটেল। এখানকার নারকেল ও সুপারির খ্যাতির জন্য সবুজে ছাওয়া প্রাচীন এই জনপদকে বলা হয় ‘শ্রীবর্ধন রোঠা’।

সময় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ছে অবিরত। সৈকতে ঢোকার মুখেই সাইনবোর্ডে মরাঠি ভাষায় লেখা ”শ্রীবর্ধন নগরপালিকা পর্যটককাচে স্বাগত করত আহে”। এবং সমগ্র সৈকত এলাকাটাই যে সিসিটিভি’র নেক নজরের আওতায় রয়েছে, সেই সতর্কতা জারির কথাও জানিয়ে রাখছে শ্রীবর্ধন নগরপালিকা।

বিচ রোড যেখানে শেষ হয়ে সৈকতের বালিয়াড়ি পথ শুরু হচ্ছে, সেখানে বাঁদিকে একটি স্মারকবেদি। সেটি শ্রী শ্রী নানাসাহেব ধর্মাধিকারীর নামে সমর্পিত। সৈকতের সীমানা বরাবর বোল্ডার বিছানো। বোল্ডারের পেছনে সিমেন্ট বাঁধানো বসার জায়গা। পেছনেই সার দিয়ে রয়েছে ক্যাসুরিনা গাছের সযত্ন প্রলেপ। হালকা ঢেউখেলানো রুপোলি বালুতট পেরিয়ে যেতেই পায়ে এসে আছড়ে পড়বে সমুদ্রের কোলাহল। প্রশ্রয় পেতেই চটুলঢেউ এসে মস্করা শুরু করে দেয়। সকালবেলাতেই সৈকতে ঢেউ খেলায় মত্ত তামাম পর্যটক। এই সাগরসৈকতের এটাও বৈশিষ্ট্য। নানা স্তরে এখানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মজে থাকা যায় জলের রকমারি লুকোচুরি খেলায়। এদিকে ঢেউগুলোর হাতছানিও উপেক্ষা করা দায়।

ইতিহাসে শ্রীবর্ধন রয়েছে প্রবলভাবেই। খুবই প্রাচীন এক ঐতিহ্যমণ্ডিত অঞ্চল ছিল শ্রীবর্ধন। ১৬টি মজবুত দুর্গ দ্বারা সুরক্ষিত ছিল অতীতের বাণিজ্যশহর বলে খ্যাত শ্রীবর্ধন। মহাভারত জানাচ্ছে, মধ্যমপাণ্ডব অর্জুন তীর্থযাত্রাকালে এই স্থানে এসেছিলেন। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে প্রথমে মহারাষ্ট্রের আহমেদনগরের অধীনে ও পরে বীজপুরের অধীনে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী বন্দর ছিল শ্রীবর্ধন। বহুকাল আগের এক ইওরোপিয়ান ভ্রামণিক স্যার জিফরদন–এর লেখাতেও উল্লেখ পাওয়া যায় এই অঞ্চলের। আবার ১৫৩৮ সালে ডম্ জোয়া দে ক্যাস্ট্রো নামে এক বিদেশি ভারত পর্যটকের লেখায় উঠে এসেছে শ্রীবর্ধন বন্দরের বর্ণনা। তিনি লিখে গেছেন, ‘এটি ছিল অল্প জলের জেটি। তবে জোয়ারের সময় প্রশস্ত এই এলাকাটাই হয়ে যেত বৃহৎ একটি উপদ্বীপ।’

অতীতে পেশোয়াদের রাজ্যপাট ছিল শ্রীবর্ধন। পেশোয়া সম্প্রদায়ের আদি পদবি ছিল ভট্ট। শ্রীবর্ধন অঞ্চলটির পুরোধা ছিলেন ‘দেশমুখ’ উপাধিপ্রাপ্ত ভট্ বংশীয়রাই। ১৭১৩–১৭২০, প্রথম পেশোয়া বালাজি বিশ্বনাথ ভট্ ছিলেন এই ছোট্ট এলাকার প্রধান শ্রীমন্ত দেশমুখ। নিজের স্বকীয়তা এবং কঠোর পরিশ্রমে বালাজি বিশ্বনাথ পুণের সুবেদার নির্বাচিত হন। সেইসময় শিবাজি পুত্র শাহুজি তাঁকে প্রথম মারাঠা পেশোয়া রূপে মনোনীত করেন। পুণে ছিল তৎকালীন ‘হিন্দুভি স্বরাজ’ পেশোয়া সাম্রাজ্যের রাজধানী। প্রথম পেশোয়া বালাজি বিশ্বনাথের জীবনাবসান হয়। পরবর্তী সময়ে তৃতীয় পেশোয়া ছিলেন বালাজি বাজিরাও। তিনি শ্রীবর্ধন অঞ্চলে ১৭৫০ সালে এক বৃহৎ অট্টালিকা নির্মাণ করেন। ১৯৮৮ সালে নির্মিত বালাজি বিশ্বনাথের একটি মূর্তিও আছে এখানে। ইতিহাস খুঁড়ে এত কথা বলার কারণ শ্রীবর্ধন আজও আবদ্ধ অতীতের গৌরবে।

শ্রীবর্ধন তালুকে রয়েছে বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির। কোথাও আবছায়া তবু এক নির্জন মন্দিরের লাল টেরেকোটা রঙ। এই লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরটি পেশোয়া জমানায় মূল মন্দিরস্থল। আরও কিছু মন্দির রয়েছে এখানে যেমন, কুসুমদেবী মন্দির, সোমজাই মন্দির, জীবতেশ্বর মন্দির ও ভৈরবনাথ মন্দির।

রূপোলী বালির চিকচিকে এই সৈকতে কাটানো যায় দিব্যি এক নিরিবিলি দুপুর। যেন এখানেই স্বপ্নবহুল আত্মহারা এক মুগ্ধ চরাচর। বিকেল হতেই সমুদ্রের ধারের ভিড়টা গাঢ় হতে থাকে আবার। উৎসাহ তখন সূর্যাস্ত সময় রেশ থাকাকালীন আরও খানিক মৌজমস্তি। তখনও থামতে চায় না সমুদ্র–স্নানের হইচই। আর সেই ফাঁকে কখন যেন আকাশের ওই গোলপানা সূর্যটাও সাগরজলে টুপ্ করে নেমে পড়ে। গোধূলি ছটায় শ্রীবর্ধনের চেনা রুপোলি সৈকত তখন কুসুমরাঙা। গোধূলির শ্রীবর্ধন এক্কেবারে অন্য মেজাজে। সূর্য পাটে যাওয়ার পরও শ্রীবর্ধন সৈকতকে মাতিয়ে রাখে ক্রমশ আরও কাছে এগোতে থাকা সমুদ্র।

থাকার জায়গা রয়েছে অনেক। প্রতিটি হোটেল রিসর্টের থাকা–খাওয়ার মান ভালো। কোনও কোনও হোটেলে প্যাকেজ প্রথায় থাকা–খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। ট্রি হাউসে থাকার অভিজ্ঞতা পেতে হলে ‘শুভান বিচ হাউস’–এ থাকতে পারেন। ট্রি হাউসে থাকার অভিজ্ঞতা সারা জীবনের সঞ্চয় হয়ে থাকবে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। এছাড়া অন্যান্য রিসর্ট ও হোটেলের মধ্যে রয়েছে হোটেল সী–উইন্ড, তেন্ডুলকর বিচ রিসর্ট, কোকোহাট বিচ রিসর্ট, রেইনবো কটেজ, বিলাস হোমস্টে সহ অন্যান্য।

আপাতদৃষ্টিতে দুনিয়ার সব সমুদ্রসৈকতই প্রায় একইরকম মনে হলেও কোঙ্কন উপকূলের প্রতিটি সমুদ্রতটেরই কিছু নিজস্বতা আছে। শ্রীবর্ধন সৈকত বেড়াতে যাওয়ার সেরা সময় যদিও জানুয়ারি থেকে মার্চ যদিই প্রখর গ্রীষ্ম ও তুমুল বর্ষার কটা দিন বাদ দিয়ে সারাবছরই এখানে আসা যায়।

Share.

Comments are closed.