অরণ্য সুন্দরী ভালকি মাচান

৮৬

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

“শাস্ত্র” নামক কবিতায় কবি বলছেন –
পঞ্চাশ ঊর্ধ্বে বনে যাব
এমন কথা শাস্ত্রে বলে
আমি বলি বাণপ্রস্থ
যৌবনেতেই ভাল চলে।

মন যখন তরুণ তখন পথে নামতে দ্বিধা কিসের? তাই ছিঁটে ফোঁটা বৃষ্টিকে সঙ্গী করে বনেই সাপ্তাহান্তিক বানপ্রস্থ কাটাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। জায়গাটা একদম নাগালের মধ্যে, পূর্ব বর্ধমানের ভালকি মাচান। নামটি শুনেই মন যেন আনচান করে ওঠে ওখানে যাবার জন্য। অতএব আর দেরি কেন, শুভস্য শীঘ্রম বলে ট্রেনে উঠে পড়লাম। বর্ধমান হয়ে মানকর স্টেশনে যখন পৌঁছলাম তখন বেলা এগারোটা। স্টেশনে যেটি চোখ টানল সেটি হল স্টেশন সংলগ্ন রাস্তার ধারে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের কংক্রিটের মূর্তি। স্টেশন থেকে একটি অটো রিজার্ভ করে উঠে বসলাম।

মানকর স্টেশনবাজার হয়ে হাটতলা মোড়ে এসে অটো ডানদিকে ঘুরে গেল। জামতাড়া গ্রামের পর সুয়াতা মোড় থেকে বাঁদিকের রাস্তা ধরল। অটো চালকের কাছ থেকে জানা গেল এটা ভালকি যাবার আড়াআড়ি এবং শর্টকার্ট পথ। সুয়াতা গ্রামের ভিতর দিয়ে আবার অভিরামপুর–রামনগর পাকা রাস্তায় উঠলাম। অনতিবিলম্বে আমরা ভালকি মাচানের দোতলা বাংলোতে পৌঁছে গেলাম। মোট সময় লাগল আধ ঘণ্টা।

জনপদ থেকে সামান্য দূরে জঙ্গলাকীর্ণ হরেকরকম উদ্ভিদ ও নাম না জানা বুনো ফুলে পরিপূর্ণ নির্জন স্থান প্রথম দর্শনেই মন ভরিয়ে দিল। বাংলোর নামটিও ভারি কাব্যিক – অরণ্যসুন্দরী।

ভাল লাগছে দেখে যে, বাংলো আর শালবনের মধ্যে কোনও প্রাচীর নেই, নেই কোনও কাঁটাতারের বেড়াও। জঙ্গলের মধ্যে বাড়ি। জামতলা পার হয়ে সোজা উঠে এলাম দোতলার ব্যালকনিতে। ঘন জঙ্গলে লজটি এক কথায় দারুণ। এই দ্বিতল লজে রয়েছে ডরমিটরি, ডবল বেডের সাধারণ ঘর ও এসি রুম।

বর্ধমান বন বিভাগের গুসকরা বনাঞ্চলের ১৪৫০ হেক্টর জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে ভালকি বনক্ষেত্র। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বন বিভাগের যৌথ বন পরিচালন ব্যবস্থায় ভালকি বন সংরক্ষণ কমিটি ভালকি বনক্ষেত্র তৈরি করেছে।

আউসগ্রাম ২ নং পঞ্চায়েত সমিতির আন্তরিক উদ্যোগে ভালকি মাচান রূপের অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে এখন হয়েছে অরণ্যসুন্দরী ভালকি মাচান টুরিস্ট স্পট। কয়েক বছর আগেও এ জায়গাটি পর্যটকদের কাছে অচেনাই ছিল। বাংলোর আগে থেকে তৈরি করা জলখাবার খেয়ে আশপাশ ঘুরতে লাগলাম। পাশেই রয়েছে বড় জলাশয়। অতি যত্নে সংস্কার করে তার রূপ বদলে মনোরম সরোবরে পরিণত করা হয়েছে। দিঘিকে ঘিরে বিভিন্ন রকম গাছপালা দিয়ে তৈরি হয়েছে এক গোলাকার বাগান। মাঝে সুন্দর পথ চলে গেছে, তার চারপাশে রংবেরঙয়ের ফুলের সমাহার, সুন্দর কংক্রীটের ছাতার নীচে বসার জায়গা। দিঘিতে রয়েছে বোটিং ও মাছ ধরার ব্যবস্থা। টাইটানিক বা হর্ষবর্ধন নামক বোট দুটিতে চড়ে জলাশয়ে ঘুরে বেড়ানো যায়। ছোট ছোট শিশুদের পক্ষে তো দারুণ ব্যাপার। জলাশয়ে স্নান করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। জলাশয়ের দিকে চেয়ে পাখির কলতানে কখনও বা ঝিঁঝিঁর কনসার্টে নিস্তব্ধ জঙ্গলমহলে অনায়াসে কেটে যাবে ছুটির দিনগুলো অফুরান আনন্দে। এখানে প্রাতঃভ্রমণ ও বৈকালিক ভ্রমণ অতি মনোরম।

বাংলোর চারিদিকে বিস্তীর্ণ জঙ্গল। লজ ছাড়িয়ে দেবদারু, শাল, সেগুন, আমলকী, হরীতকীর ঘন জঙ্গল। জঙ্গল ঘন হলেও জীবজন্তু বিশেষ নেই। বাংলোর গেটের কাছে ভালুকের এক ধাতব মূর্তি। হঠাৎ ভালুকের মূর্তি কেন? উত্তর খুঁজতে গেলে পাওয়া যাবে একাধিক উত্তর। সত্যি কথা বলতে কি ভালকি মাচানের নামকরণ নিয়ে এত তথ্য যে একটি আস্ত বই হয়ে যাবে। তবুও যেগুলি উল্লেখযোগ্য সেগুলি হল – একসময় এ জঙ্গলে নাকি ভালুক ছিল। রাজা ভালুক শিকারের জন্য মাচান বানিয়েছিলেন বলেই এ গ্রামের এমন অদ্ভুত নাম। লজের পাশে সেই মাচান আজও দণ্ডায়মান।

আর একটি জনশ্রুতি হল, কোনও এক দম্পতি তার দুধের শিশুকে এই জঙ্গলে ফেলে রেখে চলে যান। তাকে উদ্ধার করে, আশ্রয় দিয়ে স্তন্যপান করিয়ে বড় করে তোলে এক মা ভালুক। পরে সে এক সদগোপ বাড়িতে বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রতি রাতে তাকে দেখতে আসত সেই মা ভালুক। শিশুটি মানুষের সংস্পর্শে এসে মানুষের ভাষা শিখলেও হাঁটত পা টেনে টেনে ভালুকের মত। তাই তাকে ডাকা হত ভল্লুপদ নামে। ভালুক মায়ের আশীর্বাদে সে একদিন রাজা হল। তার রাজ্যের নাম হল ভালকি।

জঙ্গলের কিনারায় রয়েছে মাচান তথা ইঁটের মিনার। চারদিকে চারটি ইঁটের তৈরি মিনার, তার মধ্যে একটি বেশ উঁচু। কেউ বলে মিনারগুলো শত্রুদের লক্ষ করার জন্য ব্যবহার হত। কেউ বলে ওগুলো বিমান চলাচলের দিক নির্দেশ করত। সুরকি দিয়ে গাঁথা ইটের প্রাচীনত্ব দেখে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বোঝা যায় কিন্তু কৌতূহল নিবারণের কোনও উপায় নেই। চারপাশে মাটির ঢিবি, আগাছা আর কাঁটাঝোপে ভরা। ভেতরে ঢোকার কোনও সুযোগ নেই। ৫টি স্তম্ভের মাঝখানে স্বল্প পরিসরে লোহার জালে ঢাকা একটি কুয়োর মত দেখা যায়। অনেকের মতে এটি নাকি সুড়ঙ্গ পথ। স্তম্ভের আশপাশে কোনও সিঁড়ি দেখতে পাওয়া যায় না। এই পথ নাকি বিপ্লবীরা ব্যবহার করতেন।

রূপকথায় ভরা ভালকি মাচান। রাজা ভল্লুপাদের প্রপৌত্র ছিলেন রাজা মহেন্দ্রনাথ। তিনি তাঁর মহিষী অমরাবতীকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য প্রাচীন গোপভূমে অমরাগড় নামে একটি দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই গড় বা দুর্গের কোনও চিহ্ন এখন নেই। অমরাগড়ে রয়েছে শিবাখ্যা দেবী ও দুগ্ধেশ্বর শিবের পুরনো মন্দির।

বাস্তবতার নিরিখে যেটা সত্যিকারের ইতিহাস সেটি হল উগ্রক্ষত্রিয় বর্ধমানের রাজারা বর্গী আক্রমণের ভয়ে তাদের রাজত্ব সীমানার চারিদিকে অনেকগুলি গড় তৈরি করেছিলেন যেগুলির মাথায় বসে পাহারা দেওয়া হত। ভালকির এই মাচানটিও সেরকমই একটি গড় ভিন্ন আর কিছু নয়। নিশ্চয়ই আশে পাশের শক্তিগড়, পানাগড় এইসব এলাকাতেও এরকম গড় থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। অবশ্য স্থানীয় মানুষজনের বিশ্বাস যে এই মাচানটি এখানকার রাজারাই ব্যবহার করতেন। নিরাপত্তার কারণে এই ওয়াচটাওয়ার থেকে দুর্গাপুরের বর্তমানে সিটি সেন্টার পর্যন্ত সুড়ঙ্গ পথ ছিল।

বিকালবেলা গেলাম কাছেই ভালকি গ্রামে। অভিরামপুরগামী পাকা রাস্তা ধরে মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর বাঁদিকের জঙ্গলে ঢুকে গেলাম। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পায়ে চলা একটিই পথ। পথে পড়ল লাক্ষা ও ধুনা চাষ কেন্দ্র। এক পাথরের ফলকে লেখা রয়েছে ২০১১ সালের ৯ ফ্রেবুয়ারি এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন কলকাতার মার্কিন কনস্যুলেট। এর কিছুটা পরে তিন মাথার মোড় থেকে ডান দিকে ঘুরে যেতেই গ্রামের বাড়ি নজরে এল। অরণ্যসুন্দরী থেকে গ্রামের দূরত্ব প্রায় ২ কিলোমিটার। বর্ধিষ্ণু বেশ বড় গ্রাম। আশ্চর্যের ব্যাপার যে এই গ্রামে রয়েছে অগুন্তি মন্দির। মন্দির যেমন রয়েছে তেমন রয়েছে দিঘি বা পুকুর। সন্ধ্যার অন্ধকার অনেকক্ষণই চরাচর ঢেকে দিয়েছে তাই ফিরে এলাম লজে।

ভীষণ ক্লান্তিতে শরীর বিছানা চাইছিল। নইলে স্থানীয় আদিবাসীদের লোকসঙ্গীত বা লোকনৃত্য দেখা যেত লজ কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায়। সব দেখে ফেললে আবার আসার ইচ্ছা হবে না। তাই সামান্য অতৃপ্তি নিয়ে পরদিন ফিরে চললাম ইট কাঠের ঠাস বুনোটের জঙ্গলে।

অরণ্যসুন্দরীতে থাকতে গেলে যোগাযোগ করতে হবে এই নম্বরে – দূরভাষ-০৩৪৫২-২০০৬৪। চলভাষ – ৯১৫৩৪২০১৩৩, ৯৪৩৪৫৩৭৫৪৫

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More