মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৫

মনভোলানো তুলিন

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

পুরুলিয়া জেলার পশ্চিম প্রান্তে বাংলা ঝাড়খণ্ডের সীমানায় এক অখ্যাত গ্রাম তুলিন। গ্রামটি একরত্তি। দূরে তিরতির করে বয়ে চলেছে সুবর্ণরেখা। ও পারে সিংভূম জেলার মুরি শহর। মুরিতে রয়েছে ইন্ডালের কারখানা। লোহারদাগা থেকে আকরিক এনে এখানে গুঁড়ো করা হয়। চালান হয়ে যায় অন্যত্র। চারিদিকে ছোট ছোট টিলা, মেঘের চাদর গায়ে ঢাকা দিয়ে রয়েছে, ইতস্তত জঙ্গল আর দিগন্তে তরঙ্গায়িত নীল পাহাড়শ্রেণি। সার বেঁধে ওপার থেকে শ্রমিকদের ছপছপ আওয়াজ তুলে সুবর্ণরেখা পার হয়ে যাওয়া অথবা ঝকঝকে এনামেলের হাঁড়ির পর হাঁড়ি সাজিয়ে সাঁওতাল রমণীদের কূপ থেকে জল বয়ে নিয়ে যাওয়ার ছন্দবদ্ধ দ্রুত পদচারণা, দু একটা পাখির ডাক, সুবর্ণরেখার অস্ফুট কলধ্বনি, শীতে পাতা ঝরার রিক্ততা, বসন্তে পলাশ, কুসুমের রক্তিমাভায় রঙিন প্রকৃতি– দুর্দান্ত সব সিল্যুয়েট নিয়েই তুলনাহীন তুলিন।

সুবর্ণরেখা নদীর উপর সড়ক সেতু। ১৯২৯ সালে কুমারডুবি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড সুবর্ণরেখার ওপর এই সড়ক সেতু তৈরি করে। পরিত্যক্ত সেতুটি মনের মধ্যে এক অলস মায়াজাল বুনে চলে। কিছুদিন হল সুবর্ণরেখার তীরে গড়ে উঠেছে সূর্যমন্দির, হনুমানের বিশ্বরূপ দর্শন, শিবমন্দির, দুর্গা, রাম, শনি ও কালীমন্দির।

নীরবে নিভৃতে সুন্দরকে উপভোগ করার মতো জায়গা তুলিনের মতো পুরুলিয়াতে কমই আছে। তুলিনে থাকার জায়গা হল পি ডব্লিউ ডি-র বাংলো। প্রায় দু’একর জমি নিয়ে বাংলো, টালির ছাউনি। রয়েছে শতবর্ষ প্রাচীন এক বাঁধানো বেদিতে অশ্বত্থ গাছ। কিছুক্ষণ পরপর গুম গুম আওয়াজ তুলে রেলগাড়ির সুবর্ণরেখার রেল ব্রিজ পার হয়ে যাওয়ার শব্দ। বাইরের পৃথিবী কাছে থেকেও মনে হয় অনেক দূরে। আর রয়েছে নতুন গড়ে ওঠা সন্ন্যাসী লজ।

খানিকটা দূরে ছোট্ট মায়াবী নীলাঞ্জন মাখানো ছবির মতো সুন্দর স্টেশন তুলিন। সেখানে অনায়াসে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। তুলিনে গোধূলি আলোয় সুবর্ণরেখা বড় মায়াময়, অপার্থিব। এ রকম চরম মগ্নতার মুহূর্তে মনে হয় জীবন বড় সুন্দর।

শহরের জ্যাম জটে জীবন যখন হাঁসফাঁস তখন উচিত হবে তুলি দিয়ে আঁকা জলরঙের ছবির মতো শান্ত তুলিনে মাত্র দুটো দিন প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটিয়ে আবার ফিরে যাওয়া থোর-বড়ি-খাড়ার জীবনে। তুলিনে পৌঁছনোর সোজা উপায় হল হাওড়া থেকে আদ্রা-চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার ধরে সকালে পুরুলিয়া স্টেশন। সেখান থেকে রিকশায় বাসস্ট্যান্ড। তার পর রাঁচির বাস ধরে সোজা তুলিন। এছাড়া পুরুলিয়া শহর থেকে দিনভর বাস ও ট্রেকারে সরাসরি তুলিন। এছাড়া রাঁচি-হাতিয়া এক্সপ্রেসে মুরি স্টেশনে নেমে রিকশায় তুলিন।

তুলিনকে ঘিরে অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়ানো যায়, তুলিন থেকে যে পাহাড়টাকে হাত বাড়ালে ছোঁয়া যায় সেটি হল বাংসা পাহাড়। ঝালদা থেকে বাংসা অটোয় দশ মিনিট। শহরের কোলাহল থেকে পালিয়ে গিয়ে নিশ্চিন্তে নির্জনতার স্বাদ নিতে চাইলে চলে যেতে হবে ছোট্ট পাহাড়ি অজ পাড়াগাঁ বাংসা পাহাড়ের কোলে। ঝালদার গর্ব বাংসা। বাংসা পাহাড়ের মাথা থেকে দৃষ্টি চলে যায় বহু দূরে। উন্মুক্ত প্রান্তর আর মাঝে মাঝে মরুদ্যানের মতো টিলা ও জলাশয় ঘিরে সবুজের বিন্যাস। বাংসা পাহাড়কে জড়িয়ে রেখেছে পলাশ, হরিতকী আর করঞ্জের দল। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রাঁচি রোড ও রেলপথ। ট্রেন চলে যাওয়ার ঝমঝম শব্দে মন উদাস হয়ে ওঠে। অদূরে সুবর্ণরেখার জলে সূর্যাস্তের শেষ রশ্মি পড়ে সুবর্ণরেখা সার্থকনামা হয়ে ওঠে। পাহাড়ের উলটো দিকে রাস্তার ওধারে একটি ছোট্ট জনপদ। পাহাড়ের নামেই নাম তার।

জনশ্রুতি যে, এই ছোট্ট অঞ্চলের নামকরণের পিছনে এক অলৌকিক ঘটনা রয়েছে। এই গ্রামে এক বৃদ্ধ থাকতেন, তার নাম ছিল বাংসাবাবা। ওই বৃদ্ধকে গ্রামের কোনও এক বাসিন্দা এঁটো থালায় খেতে দেন। এর পর থেকে বাংসাবাবার আর হদিশ পাওয়া যায় না। বাংসাবাবাকে ফিরে পাওয়ার জন্য গ্রামবাসীরা পুজো করতে শুরু করে। সেই থেকে বাংসা ঠাকুরের পুজোর প্রচলন হয় আর তাঁরই নামে নামকরণ হয় বাংসা গ্রাম আর বাংসা পাহাড়ের। পাহাড়ের অদূরে গাছতলায় রয়েছে কিছু দেবদেবীর মূর্তি। একটু এগিয়েই বাংসা ঠাকুর লেখা একটি ছোট মন্দির। সামনে রয়েছে ইঁদারা, টিউবওয়েল আর ছোট্ট দুটি পুকুর। বাংসার পিছন দিকের আকৃতি এমন যে দেখলে মনে হয় শিবলিঙ্গের মাথায় সাপ ফণা বিস্তার করে রয়েছে। এই পাহাড়ের পাথরের আকৃতি সুন্দর ধরনের। দূরে দূরে তিনটি গ্রাম– মেটাল, মারু ও আরহার।

জানুয়ারির মাঝামাঝি (১লা মাঘ) সারা গ্রাম মেতে ওঠে বাংসাবাবার পুজোয়। সকাল থেকে দলে দলে ভক্তরা খালি পায়ে ওঠেন বাংসা পাহাড়ে পুজো দিতে। রাস্তার ধারে দোকানিরা পশরা সাজিয়ে বসে পড়েন। সন্ধ্যায় জমে ওঠে মোরগ লড়াই আর রাতে মেতে ওঠেন গ্রামবাসীরা ঝুমুর নাচের ছন্দে।

সুন্দর শান্ত প্রকৃতি উপভোগই শুধু নয়, পাহাড়ে চড়ার অনুশীলনও এই পাহাড় এবং আশপাশের টিলাকে ঘিরে হয়। বাংসা গ্রাম শুধু পর্বতারোহীদের কাছেই নয়, যে কোনও পর্যটকদের কাছেই লোভনীয়। সকাল, সন্ধ্যা, রাত যে কোনও সময়ই বাংসা অনবদ্য। ভোরে সুপ্রভাত জানাবে ইন্ডিয়ান রবিন, ব্রাহ্মিনী, ময়না, বুলবুল, বাঁশপাতি, ঘুঘু, ছাতারে। সন্ধ্যা শিহরিত হয়ে উঠবে শিয়াল, হায়নার ডাকে আর রাত মোহময় হয়ে উঠবে ধোঁয়াশাহীন নীল আকাশে সলমা চুমকিসদৃশ তারাদের সান্নিধ্যে।

এখানে থাকতে চাইলে ঝালদায় বনদপ্তরের বিশ্রামগৃহে অথবা নিজস্ব ব্যবস্থায় তাঁবু। বনবিশ্রামগৃহের বুকিংয়ের ঠিকানা– উপ বন-আধিকারিক, পুরুলিয়া বিভাগ, জেলা ও ডাক– পুরুলিয়া। এছাড়াও, চায়ের দোকানের সরযুভাই সদা প্রস্তুত সাহায্যের জন্য। কাঁচা বাজার ঝালদা থেকে করে নেওয়াই বাঞ্ছনীয়।

তুলিন থেকে হুড্রু ফলস, জোনা ফলস, রাঁচী বা ছিন্নমস্তা মন্দিরও ঘুরে আসা যায়। তবে কোথাও না গিয়ে তুলিনে বসে সময় কাটানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

তুলিনে থাকার জন্য বাংলো বুকিংয়ের ঠিকানা– নির্বাহী বাস্তুকার, পি ডব্লু ডি পুরুলিয়া।
সন্ন্যাসী লজ, তুলিন স্টেশনের কাছে, চলভাষ—০৯৮৩২৯৪৯১৮০, ০৯৩৩৪০৬৩৪৩১।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেড়িয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা   

Comments are closed.