শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

চুপকথার সাংসের

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। এবার থেকে সেই দায়িত্ব আমাদের। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই শুরু হল নতুন এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

কাবেয়া। কাবেয়া মতলব? প্রশ্নটা শুনে কে.কে. হোমস্টের মালকিন সুশ্রী, স্মার্ট তরুণী একটু হকচকিয়ে যেতে গিয়েও সামলে নিয়ে থেমে বলল— কাব্যিয়, গোদা বাংলায় যেটা দাঁড়ায় কাব্য। আরিব্বাস! এবার হকচকিয়ে যাওয়ার পালা আমাদের। এমন অসামান্য নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মাঝে এক তরুণীর নাম কাব্য! কে.কে. হোমস্টে’র নামের দুটি ‘কে’র অর্থ কাব্য আর কাদম্বরী, মালিকের দুই কন্যা। দুটি লাল টুকটুকে পরি, না ঠিক পরি নয়, তারা অনাঘ্রাত প্রকৃতির কোলে যেন ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা। সাংসেরের হোম পরিপূর্ণ দুই কন্যা ও তাদের বাবা মা সরিফ ও জয়কলাকে নিয়ে।

কালিম্পং থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে সাংসেরের অবস্থান। দিয়লো ও দূরপিনডারা পাহাড়ের মাঝখানে ছবির চেয়েও সুন্দর এই গ্রাম। বাঁদিকে মেল্লি, রংপো, সিংটাম হয়ে গ্যাংটক আর ডানদিকে মহানন্দা অভয়ারণ্য, সেবক, কালিঝোরা হয়ে তিস্তা বাজার ছাড়িয়ে একটু এগিয়ে ঝোলনা ব্রিজ। ব্রিজ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে কালিম্পং। কালিম্পং থেকে শুরু হল চড়াই। গাড়ি উঠতে লাগল লাট্টুর গায়ে লেত্তির মত পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে। ২৪ কিলোমিটার পথ পুরোটাই চড়াই পথ। ৪০০০ ফুট উঁচুতে সাংসেরের অবস্থান। ছাল–বাকল উঠে রাস্তার হৃৎপিণ্ড বেরিয়ে এসেছে। লক্ষ কোটি ঝিঁ ঝিঁ পোকাদের (লোরেন) খঞ্জনি বাজানো আর সঙ্গে কেবল টাটা গোল্ডের আওয়াজ। ঘন ঘন হেয়ার পিন বেন্ড রাস্তা এক পাহাড় ছেড়ে আর এক পাহাড়ের কোলে লাফিয়ে পড়ছে। পাহাড়ি পথ কখনও উঁচু গাছের মাথা ছুঁয়েছে আবার কখনও চলেছে আকাশে মাথা ঠেকানো গাছের পায়ের কাছ দিয়ে। অনেক নীচ দিয়ে রূপোলি পাতের মত ঝকঝক করছে তিস্তা।

ক্রমাগত প্রবেশ করে চলেছি এক শব্দহীন নিঝুম জগতে। রাস্তার দুধারে বুনো ফার্ন, লিলি, আমলকি, বহেরা, রুদ্রাক্ষ, এখানে সেখানে আদা এলাচের ঝোপ। পাহাড় জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ চলাতেই রোমাঞ্চ আর আনন্দ। হঠাৎ সহযাত্রীদের চিৎকারে তাকিয়ে দেখি দৌড়ে ঝোপের আড়ালে ময়ূরের চলে যাওয়া। উঠছি তো উঠছিই, দলা দলা মেঘ ভেসে  বেড়াচ্ছে। ঠান্ডা মিষ্টি আবেশে চোখ বুজে আসতে চাইলেও চোখ খোলা রাখি যাতে কোনও দৃশ্য দেখা থেকে বাদ না পড়ে যায়।

গাড়ি থামতেই হঠাৎ বিশালদেহী এক লোমশ কুকুর ছুটে আসে। ভিতরে ভিতরে কুঁকড়ে গেলেও মুখে চোখে স্মার্ট থাকার চেষ্টা করি। ড্রাইভার ছিরিংজি অভয় দেন। তাঁরই মুখে শুনি কে.কে. হোমস্টের আর এক সদস্য ‘শিম্বাই’ আমাদের গাইড। ও নাকি টুরিস্টদের নিয়ে আশপাশ ঘুরিয়ে দেখায়।

শিম্বাইকে দেখে যে আড়ষ্টতা তৈরি হয়েছিল সেটা মুহূর্তে কাটিয়ে দিল হোমস্টের রঙিন ফুল আর অর্কিডের সৌন্দর্য। আমরা কি নন্দনকাননে পৌঁছে গেলাম?

পাহাড়ের কোলে আমাদের দু’দিনের আস্তানা কে.কে হোমস্টে নজরে পড়ার মতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সারা দিনের জার্নির পর মন যেন এমনই এক জায়গার আকাঙ্ক্ষা করছিল। ব্যাগপত্র পড়ে রইল গাড়িতেই, খড়ের ছাউনি দেওয়া গোল ঘরে বসে পড়লাম। চারিদিকে কেবল ছবি শুধু ছবি। এসে গেল গরম গরম পপকর্ন, পকোড়া সঙ্গে ধূমায়িত কফি। সামনে উন্মুক্ত উপত্যকা জুড়ে নেমে আসছে সন্ধ্যা। টুপ টুপ করে জ্বলে উঠছে সারা পাহাড় জুড়ে দীপাবলির আলো। আর আমরা কজন ডুবে যাচ্ছি ক্রমশঃ নির্জন অন্ধকারে। হাত দুটো শিরশির করছে ঠান্ডায় তবুও উঠতে ইচ্ছা করছে না। এক নিশ্চিন্ত আলস্য ঘিরে ধরছে ক্রমশঃ।

সরিফের ডাকে এক ঝটকায় মায়াময় জগত থেকে নেমে আসি বাস্তবের পৃথিবীতে। একটি প্রয়োজনীয় প্রশ্নের উত্তর জানতে চান গৃহকর্তা। রাতে কী খাব, ভাত না রুটি ?

সাময়িক ঘোর কেটে যাওয়ার জন্যই হয়তো, বেশ টের পাই পাহাড়ের গা দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে যথেষ্ট ঠান্ডা নেমে পড়েছে ইতিমধ্যেই। খড়ের ছাউনি ছেড়ে যে যার ঘরে ঢুকে পড়ি গরম পোষাকের খোঁজে। ডাইনিং রুমে রাতের খাবারের ডাক পড়ে রাত ৮.৩০ তে। ঢুকেই যারপরনাই বিহ্বল অবস্থা। সোনার বরণ ঝকঝকে কাঁসার থালা বাটি গেলাসে পরিবেশিত ধোঁয়া ওঠা খাবার। বলাই বাহুল্য যে, সে খাবারের স্বাদ আলাদা হবেই। সরিফ, জয়কলা প্রবীণ না হলেও হলেও ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের নাড়ির যোগ ছিন্ন হয়নি। তাদের কাছে এখনও অতিথি দেবতা। কী অকপট আন্তরিকতা!

খেতে খেতে শুরু হয় আড্ডা। জানতে ইচ্ছে না করলেও টুকরো টাকরা শব্দ ছিটকে আসে কানের ভেতর। হাতে গোনা গুটিকয় পরিবার নিয়ে সাংসেরের বিস্তার। মূলতঃ সিঙ্কোনা প্ল্যান্টেশনের দৌলতে এই গ্রামের বোলবোলাও। ফার ফ্রম দ্য ম্যাডিং ক্রাউড, দূষণমুক্ত গ্রামটি যেন ছিমছাম প্রকৃতির আলগা উঠোন। এক নজরেই ভালো লেগে যায়। বর্ষাকালে এলে সুগন্ধী আতপ চালের গন্ধ পাওয়া যাবে গ্রামটিতে। আসলে সিঙ্কোনা গাছ হল শেড ট্রির মত। বর্ষার দিনে সত্যিই গন্ধে ম ম করে। সিঙ্কোনা গাছের ছাল হল সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বস্তু। প্রথম একবছর চলে যায় শীড বেডে। তারপর ট্রান্সপ্ল্যান্টিং, সাত আট বছরেই ছাল তোলা হয়। চা গাছের মত সিঙ্কোনা গাছেরও জীবনীশক্তি বেশী দিনের নয়।

সাংসেরের আসল মজা ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে শিশির ভেজা পায়ে হালকা ট্রেক আর আবহাওয়া প্রসন্ন থাকলে চোখের সামনে হাজির সপারিষদ কাঞ্চনজঙ্ঘা। শান্ত-স্নিগ্ধ বার্চ, পাইন, সিঙ্কোনা বাগানের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে কখনও ক্লান্তি লাগে না। ডাইনিং রুমে শোনা এইসব সাত পাঁচ কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমের অতলে তলিয়ে যাই।

কখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে টের পাইনি, নরম লেপ–কম্বলের উষ্ণতায় আরামে আচ্ছন্ন হয়েছিলাম। হঠাৎ দরজায় ধাক্কা, জলদি খোলিয়ে – সরিফের গলা। কম্বলটা কোনওমতে জড়িয়ে দরজা খুলতেই একটা ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপট চোখে মুখে হামলে পড়ল। সেটাকে সামলে নিয়ে দেখি চারিদিকে নরম আলো। সমস্ত পৃথিবী কেমন চুপ হয়ে রয়েছে। তার মধ্যে সরিফের হাত অনুসরণ করে বিহ্বল হয়ে পড়ি। সেই কাঞ্চনজঙ্ঘা – প্রথম সূর্যের লালচে নরম আলোয়। ছোট থেকে দেখা ছবিটা এখন আমার সামনে। সেই বহু চেনা বার বার দেখা বরফের চাদরের ভাঁজ, গোলাপি আলোয় নিঃশব্দে আমাদের ঘরের কাঁচের জানালায়। সারাটা আকাশ জুড়ে বেজে চলেছে “প্রথম আলোর চরণধ্বনি”। চারিপাশে কেবল তাল ভঙ্গ করা বেরসিক মন্তব্য ওয়াও, ওয়াও। অজস্র ক্যামেরার শাটারের আওয়াজ আর নীলচে আলোর ঝলকানি। সুখের সময় দীর্ঘস্থায়ী হয় না– সে পুরনো প্রবাদ তো আছেই। সে প্রবাদ সত্যি হল এক্ষেত্রেও। মেঘেরা আস্তে আস্তে ঘিরে ধরল কাঞ্চনজঙ্ঘাকে। অল্প সময়ের জন্য হলেও সেই সুবিশাল সৌন্দর্যকে প্রত্যক্ষ করেই সূচনা হল স্বপ্ন ছোঁয়া একটি দিনের। পাশে তখনও সরিফ, ঘড়িতে ৫টা ১০ মিনিট।

অলসভাবে কেটে গেল আরও একটা দিন। পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ানো চিত্রার্পিত সাংসেরের পথে প্রান্তরে। কেজো জীবনকে ভুলতেই তো ছুটে আসা নির্ভেজাল প্রকৃতির কোলে। প্রকৃতি তার অপার ঐশ্বর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাংসেরে। সাংসেরের খুব কাছেই ইচ্ছেগাঁও ও রামদুরা নামে দুটি গ্রাম। কিন্তু সাংসেরকে ছেড়ে, সরিফ, জয়কলা, কাব্য, কাদম্বরী, সিম্বাইকে ছেড়ে কোথাও যেতে ইচ্ছে করল না। তাই এখানে আর একটা দিন থেকে যাওয়া।

যারা পাহাড়, সবুজ নির্জনতা ভালোবাসেন তাদের জন্য এক আদর্শ গন্তব্য সাংসের। সিল্ক রুটের পথে এক নির্জন পাহাড়ি গ্রাম। প্রকৃতির নিঃশব্দ রূপ পান করতে এখানে না এসে উপায় নেই। তাই কথা দিয়ে এলাম আবার আসব এই মায়াবী রাজ্যে।

সাংসেরে থাকার ঠিকানা

সরিফ রাই, কে. কে. হোমস্টে, সাংসের ফরেস্ট, কালিম্পং, ৭৩৪৩১৬ 

চলভাষ – ৮৯০৬১০৩৭০০, ৭৯০৮৫৯৬৭৫৬ (হোয়াটস অ্যাপ )

Comments are closed.