রোম্যান্টিক রিমিল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রত্না ভট্টাচার্য্য
    শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

    সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। এবার থেকে সেই দায়িত্ব আমাদের। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই শুরু হল নতুন এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

    বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার প্রান্তসীমায় ঝিলিমিলি। নামেই তার মাধুর্য নয়, চরিত্রেও সে বেশ মিষ্টি। বাঁকুড়া থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে ঝিলিমিলি এক ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ। কৃষ্ণচূড়া, বট, আমলকী, কুসুম, শাল, সেগুনে ছাওয়া ঝিলিমিলির বনাঞ্চল। এই বনাঞ্চলের বনপথ যেন কুমারী কন্যার সিঁথি। পাখির কলতানে এ বনভূমি যেন সর্বদা মুখর। ঝিলিমিলি যেন এক টুকরো কবিতা। যদিও কবিতার ছন্দ ও তাল কেটে যায় যখন দলমার হাতিরা দলবেঁধে এখানে হাওয়াবদল করতে আসে। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্পূর্ণ নৈসর্গিক ও স্বর্গীয়। প্রাকৃতিক দৃশ্যের সঙ্গে ছন্দ মেলায় সাঁওতালি মাদল ও নাচ। বনজঙ্গল ঘুরে দেখতে চাইলে ফরেস্ট বাবুর সঙ্গে একটু কথা বলে নেওয়া উচিত হবে কারণ এই বনে হরিণ, ভালুক, শুয়োর, হনুমানদের অবাধ বিচরণ।

    ঝিলিমিলির কাছে পড়াডির মোড় থেকে তিনটি জেলার যোগসুত্র রয়েছে। একটি রাস্তা গেছে পশ্চিম মেদিনীপুরের বাঁশপাহাড়ী হয়ে বেলপাহাড়ীর দিকে, অপর রাস্তাটি পুরুলিয়া জেলার বান্দোয়ানের দিকে, একটি শহর বাঁকুড়ার দিকে আর একটি ছেন্দাপাথর হয়ে ফুলকুসমার দিকে।

    ঝিলিমিলির বিউটি স্পট হল রিমিল পর্যটক আবাস। বাঁকুড়া থেকে বাসে ঝিলিমিলি। ঝিলিমিলি বাসস্টপ থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথে রিমিল। বিশাল বিশাল গাছে ভরা অরণ্যের মধ্যে এই পর্যটক নিবাস। নামটা এত বেশি রোম্যান্টিক যে প্রকৃতি আর রিমিলের মেলবন্ধন যেন ঠাসবুনোট এক কাব্যগ্রন্থ।  একটু উঁচু টিলায় অবস্থিত দোতলা রিমিল, দুটো করে চারটি ঘর, সংলগ্ন বাথরুম। লজ ও দুটি কটেজ ‘অভ্যর্থনা’ ও ‘অটবী’ ছাড়া বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে নানা গাছের বাগান। শাল, পিয়াল, মহুয়া, পলাশ ছাড়া আম, জাম, কাঁঠাল, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া প্রভৃতি। সামনে ফুলেরও বাগান রয়েছে।

    রিমিলের আকর্ষণ অমোঘ। প্রকৃতির এই ক্যাম্পাস জুড়ে সবুজের এক অনবদ্য সিম্ফনি। ঘন সবুজ, ফিকে সবুজ, ভেজা সবুজ, কালচে সবুজ, টিয়া সবুজ – এসবই রিমিলের স্বপ্ন সবুজ রঙ। কয়েক পা গেলেই বিশাল জলাশয় কল্যাণসায়র। তার বুকে আলো হয়ে ফুটে আছে অসংখ্য পদ্ম। জেলেদের মাছধরা দেখতে দেখতে সময় কখন যে পিছলে যাবে তা বোঝাই যাবে না।

    এরকম সুন্দর এক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠা রানিবাঁধ পঞ্চায়েত সমিতির সহযোগিতায় সম্ভব হয়েছে। ২০০২ সালের ৩০ মার্চ এই বাংলোটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন মন্ত্রী সূর্যকান্ত মিশ্র। হতাশাগ্রস্ত জীবনই হোক বা প্রবল কাজের চাপই হোক, সবসময়ই সব ধরনের পর্যটককে মানসিক প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিতে রিমিল প্রস্তুত। রিমিলের দেখাশোনার দায়িত্বে আছে লাজুক লুলু। পর্যটকদের জন্য সদা তৎপর।

    রিমিলের আশপাশের ভূষণ হল সবুজ গাছপালায় ঘেরা জঙ্গল, পাহাড়, ছোট নদী আর ছোট–বড় ড্যাম। রিমিল থেকে কাছেই ঘুরে আসা যায় এরকমই এক ড্যাম তালবেড়িয়ায়। রাউতাড়া গ্রামের পাশে তৈরি হয়েছে এই জলাধার, যেন পাহাড়ের বাটিতে ধরা এক দীর্ঘ জলাশয়। অরণ্য পরিবেষ্টিত বিস্তীর্ণ এলাকার জল এবং ঝরনার জল জমা হয়ে এই জলাশয় সৃষ্টি হয়েছে। এখানে বাঁধ দিয়ে খালের সাহায্যে গ্রামে জল সরবরাহ করা হচ্ছে। এ কর্মকাণ্ডের নির্মাতা ক্ষুদ্র সেচ বিভাগ।

    পিকনিক স্পট হিসাবে জায়গাটি দুর্দান্ত। ড্যামটি তার সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে পর্যটকের  আশায় একাকী নির্জনে পড়ে রয়েছে। দোকান বা হোটেল কিছুই নেই। স্বপ্নের মতো স্থানটি  শব্দহীন। এখানে পৌঁছাতে গেলে পেরোতে হবে কয়েক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা। রাস্তা কাঁচা হলেও ড্যামের সৌন্দর্য এককথায় অপার্থিব। পিকনিক ছাড়া বেড়ানোর পক্ষেও জায়গাটি অনবদ্য। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ, ক্যামেরাতে ছবি বন্দি আর বাঁধের জলে নৌকাবিহার করে অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া যায় একটা দিন। কিন্তু থাকতে মন চাইলেই মুশকিল। হয় রানিবাঁধ বা রিমিলে ফিরে যেতে হবে অথবা তাঁবু সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। এখান থেকে সুতান গ্রামেও যাওয়া যায়। আনন্দের খবর যে, পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দফতর এই জায়গাটিকে পর্যটনস্থলে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটনস্থল হবে।

    রিমিল থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ছেঁদাপাথর গ্রাম। অরণ্য, পাহাড়, জলাশয় নিয়ে ছেন্দাপাথর কথ্য ভাষায় ছেঁদাপাথর। এক অপরূপ লাবণ্যময়ী গ্রাম। পাগল করা সৌন্দর্য গ্রামের। কেবলমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই এই গ্রামের অলংকার নয়, এই গ্রাম গর্ব করতে পারে এর ইতিহাসের জন্য। সে ইতিহাস ইদানীং চর্চার অভাবে খানিকটা বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেলেও পুরোপুরি গরিমা হারায়নি কারণ এই গ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপ্লবী ক্ষুদিরামের স্মৃতি।

    উল্টে দেখা যাক অতীতের পাতা। ক্ষুদিরামের গোপন অস্ত্রভাণ্ডার ছিল এখানকার দুর্গম পাহাড়ে। বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, নরেন গোস্বামী, বিভূতি সরকার প্রমুখ বিপ্লবীরা এখানে গভীর জঙ্গলে আগ্নেয়াস্ত্র লুকিয়ে রাখার জন্য সুড়ঙ্গ কেটে মাটির গভীরে আস্তানা তৈরি করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। বোমা তৈরির জন্য জায়গাটি ছিল নির্জন ও নিরাপদ। বিপ্লবীদের প্রশিক্ষণস্থলও ছিল এটি।

    এখানে রয়েছে গাছপালায় ঘেরা শহীদ ক্ষুদিরাম উদ্যান। সেখানে রয়েছে ক্ষুদিরামের আবক্ষ মর্মরমূর্তি আর রয়েছে সেই গাছ, যে গাছের তলায় বসে ক্ষুদিরামের সঙ্গীসাথীরা বিশ্রাম নিতেন। উদ্যানের ভিতরে সাধুরাম চাঁদ মুর্মু আদিবাসী সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের একটি বড় মঞ্চ রয়েছে। রানিবাঁধ পঞ্চায়েত সমিতি ও বারিকুল গ্রাম পঞ্চায়েত এই উদ্যানটি পরিচালনা করে থাকেন।

    বাঁকুড়ার এই অঞ্চল জল, জঙ্গল, টিলা, লাল মাটির অঙ্গরাগে ভূষিত। পূর্ণিমার রাতে জায়গাটি হয়ে ওঠে মোহময়ী। এরকম জায়গায় থাকতে হলে থাকতে হবে শহীদ ক্ষুদিরাম স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে। কর্তৃপক্ষের অনুমতিও লাগবে। হালকা বিছানা নিয়ে যেতে হবে সেক্ষেত্রে। এখানে পর্যটক আবাস নির্মাণ করা হয়েছিল কিন্তু বর্তমানে তা বন্ধ আছে। যাদের ট্রেকিংয়ে উৎসাহ তারা ছেঁদাপাথর থেকে মুকুটমণিপুর বা রানিবাঁধ ট্রেক করে যেতে পারেন, এটি খুবই আকর্ষণীয় পথ।

    ছেঁদাপাথর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে আর এক আকর্ষণীয় স্থান হল জাঁতাডুমুর। ভৈরববাঁকি নদীটি বছরের অন্য সময় শান্ত থাকলেও বর্ষায় ফুলে ফেঁপে উঠে আঁকাবাঁকা গতিপথের দু’ধারের গ্রামগুলিকে গ্রাস করতে চায়। তাই তার গতিকে নিয়ন্ত্রণ আনতে দেওয়া হয়েছে বাঁধ এবং তৈরি হয়েছে জাঁতাডুমুর ড্যাম। জলাশয় ঘিরে রয়েছে বড় বড় গাছ। গাছগুলি মুখরিত থাকে পাখপাখালির কুজনে। ড্যামের শান্ত জলে প্রতিফলিত হয় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য। অনাবিল আনন্দে মন ভরে ওঠে। রিমিল থেকে জায়গাটি ঘুরে দেখে নেওয়া যায়।

    রিমিলে থাকার ঠিকানা

    রিমিল পর্যটক নিবাস, দূরভাষ- ০৩২৪৩-২৪০৩০০ ।।  চলভাষ- ৯৪৩৪২০২৪৮৫

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More