রানিবাঁধের জঙ্গলে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রত্না ভট্টাচার্য্য
    শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

    সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।  খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুস করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

    বাঁকুড়া শহর ছাড়িয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি স্বল্পপরিচিত পর্যটন কেন্দ্র, তারই একটি রানিবাঁধ। বাঁকুড়া থেকে রানিবাঁধের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। বিহার মালভূমির প্রান্তদেশে পুরুলিয়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সংলগ্ন পাহাড়ি বনাঞ্চল নিয়ে রানিবাঁধ এক ছোট্ট জনপদ। মালভূমির সীমান্তবর্তী অঞ্চল হলেও ছোট-বড় একডজন পাহাড় রয়েছে। একসময় এই এলাকা ছিল ঘন শাল-জঙ্গলে ঢাকা, বাঘ, হাতি, হরিণের বাসভূমি। মাঝে মাঝে ছিল সাঁওতাল, ওরাঁও, মুণ্ডাদের ছোট ছোট গ্রাম, কিন্তু কাঠ চোরাচালানকারীদের রসদ যোগাতে যোগাতে জঙ্গল এখন অনেকটাই ফাঁকা। গ্রামগুলিও কলেবরে বেড়েছে। জঙ্গলের বেশখানিকটা অংশ পরিষ্কার করে তৈরি হয়েছে চাষের জমি। ইদানীং সরকারি সংরক্ষণের ফলে হারিয়ে যাওয়া জঙ্গলের কিছুটা হলেও ফিরেছে। প্রকৃতির মনোরম শোভা রানিবাঁধকে করে তুলেছে অপরূপা, দিয়েছে রানির মুকুট। কেউ বলেন, রানিবাঁধ হল বাংলার নেতারহাট, অন্য মতে, পাঁচমারি।

    জ্যোৎস্নারাতে রানিবাঁধের পরিবেশ হয়ে ওঠে মোহময়ী। শহরের জাঁতায় পেষা জীবন থেকে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের ঘ্রাণ নেওয়ার জন্য রানিবাঁধে আসাটা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে এখানকার স্থানীয় বাঁদনা পরব, ভাদু, টুসু, নববর্ষ, শিকার উৎসব দেখার মত। স্থানীয় মানুষজনের পরবে মেতে ওঠার দৃশ্য দেখতে পাওয়া ভ্রমণের উপরি পাওনা। শনি ও বুধবারের হাটও দ্রষ্টব্য।

    রানিবাঁধে রয়েছে বিরসা বাজার, কেন্দ্রস্থলে রয়েছে সংগ্রামী বিরসা মুণ্ডার মর্মরমূর্তি। রানিবাঁধকে কেন্দ্র করে অনেকগুলি পর্যটন স্থান, যেমন ঝিলিমিলি, সুতান, ছেন্দাপাথর, মুকুটমণিপুর, তালবেড়িয়া ড্যাম ঘুরে নেওয়া যেতে পারে। থাকতে চাইলে কোনও অসুবিধে নেই। থাকার জন্য রয়েছে পঞ্চায়েত সমিতি পরিচালিত বলাকা পর্যটক আবাস, মৃণাল দত্তের লজ, ভারত সেবাশ্রম সংঘেও থাকা যায় অনুমতিসাপেক্ষে। তবে কেউ যদি শাল, সেগুনের বনজ ঘ্রাণে বুঁদ হয়ে থাকতে চান, তা হলে তাকে থাকতে হবে রানিবাঁধ ফরেস্ট রেস্ট হাউসে। বুকিং দেন বাঁকুড়ার ডিএফও। বাঁকুড়া থেকে ঝিলিমিলিগামী বাসে অথবা গাড়ি ভাড়া করে এখানে আসা যায়।

    তালগোড়া আশ্রম-– বাঁকুড়ায় পাহাড়, নদ-নদী, দেব-দেউল যেমন অজস্র আছে, তেমন আশ্রমের সংখ্যাও কম নয়। এদের মধ্যে বেশ প্রাচীন আশ্রম হল তালগোড়া আশ্রম। রানিবাঁধ-ঝিলিমিলি সড়কপথে তালগোড়া গ্রামের কুমোরপাড়া মোড় থেকে সোজা পূর্বদিকে অবস্থিত তালগোড়া বৈষ্ণব আশ্রম।

    স্থানীয় মানুষজনের কাছ থেকে জানা যায় যে, দক্ষায়নী গোঁসাই মা এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ঠিক কতদিন আগে গভীর অরণ্যসংকুল এলাকায় সুদূর খড়দহ আশ্রম থেকে কোন কারণে তিনি এখানে এসেছিলেন, তা অজানা। তালগোড়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দাদের কাছ থেকে যেটুকু তথ্য উঠে আসে তা হল–- গোঁসাই মা প্রথমে ভক্ত-শিষ্য পরম্পরায়, আদিবাসী তপশিলিদের মধ্যে বৈষ্ণবধর্ম প্রচার করার উদ্দেশ্যে ঝিলিমিলির কাছে ভুড়রুডাঙ্গায় আশ্রম স্থাপন করেন। পচাপানি, বাঁশপাহাড়ি, পাঞ্চুড়, বাঁশকোপা, আমডাঙ্গা, রানিবাঁধ, রাউতোড়া ইত্যাদি গ্রামের বহু মানুষ গোঁসাই মায়ের বৈষ্ণবীয় প্রভাবে আকৃষ্ট হয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন প্রায় একশো বছর আগে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও চোরের উপদ্রব এড়াতে পরবর্তীকালে মণ্ডলদের দানকৃত জমিতে বর্তমান বৈষ্ণব আশ্রমটি গড়ে তোলেন তিনি। আশ্রম প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে খড়, পাতা ও জঙ্গলের কাঠ দিয়ে গোঁসাই মা আশ্রমে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে সেখানে গিরিধারী, রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ ও শালগ্রাম শিলা স্থাপন করেন। রাজাকাটা গ্রামের পূর্ণানন্দ (বর্তমান নাম প্রেমানন্দ মহারাজ) ছেলেবেলায় এই আশ্রমে চলে আসেন। পরে গোঁসাই মায়ের মন্ত্রশিষ্য হয়েছিলেন। তিনিই প্রথম সন্ন্যাসী আশ্রমিক সন্ন্যাসী। আশ্রমে তিনিই দোল, ঝুলন, রাস ও রথযাত্রা উৎসবের সূচনা করেন।

    ১৩৪৪ বঙ্গাব্দে গোঁসাই মায়ের দেহত্যাগের পর প্রেমানন্দ মহারাজ আশ্রমের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। গোঁসাই মায়ের সমাধিমন্দির নির্মাণ করেন। প্রেমানন্দজিও আর নেই। বর্তমানে শ্যাম মহান্তি নামক জনৈক শিষ্য আশ্রমটি পরিচালনা করে চলেছেন।

    ঘুরতে গিয়ে গাছপালায় ঘেরা সাড়ে ছয় বিঘের আশ্রম পর্যটকদের নিশ্চয়ই হতাশ করবে, কিন্তু একটু সহমর্মিতার দৃষ্টি দিয়ে যদি জীর্ণ আশ্রমের ইতিহাস উপলদ্ধি করা যায়, তা হলে বোধহয় হতাশা কেটে যাবে। মানুষজন যত যাবে তত আশ্রমটি প্রাণ পাবে, নয়তো তার মৃত্যু উপস্থিত। বর্তমানে আশ্রমটি চলে আশ্রমের দু’জন সন্ন্যাসীর মাধুকরীর মাধ্যমে।

    সুতান

    আজন্মলালিত, স্বাচ্ছন্দ্যপালিত কংক্রিটের নিশ্চিন্ত সুখী আশ্রয়, চব্বিশ ঘণ্টা বিদ্যুতের পরম প্রশ্রয়, জীবাশ্ম জ্বালানির দুরন্ত গতি, আহার-বিহার-ব্যসনের আধুনিক আয়োজন মজুত থাকা সত্ত্বেও জীবন যে কেন উচাটন হয় সব কিছু ছেড়ে জঙ্গল, পাহাড় কিংবা সমুদ্রে পাড়ি জমাতে? তা কি কেবল একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে, না কি ধুলোয় জ্যাম ফুসফুসকে খানিকটা বিশুদ্ধ অক্সিজেনের যোগান দিতে? যদি সত্যি ফুসফুসকে চাঙ্গা করতে হয়, তা হলে যেতে হবে রানিবাঁধ থেকে সুতানের জঙ্গলে। মাইলের পর মাইল শালের জঙ্গল নিঝুম, নিস্তব্ধ পড়ে রয়েছে। বাঁকুড়া থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে সুতান। মূলসড়ক ছেড়ে বাঁদিকে প্রায় ৬ কিলোমিটার বনপথ। পাহাড়ের হাতেগড়া জঙ্গল বুনতে নাকি অনেক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। বন কমিটির হাতে ১২৫৮ হেক্টর বনভূমির ভার। আশপাশে রয়েছে রায়গড়া, মহাদেব সিনান, বড়পচা, খাতাম, সুতান, মিঠা আম–- এই সব গ্রামের গ্রামবাসীরা জঙ্গলকে পরিচর্যা করে চলেছেন নিয়মিত। এখানকার গভীর জঙ্গলের সঙ্গে রয়েছে বাফার এরিয়া হরামগোড়া, ছেন্দাপাথর, চুড়কু, লেদাপাকুড়। সুতরাং এই জঙ্গলের বিস্তার তো কম নয়ই, বরং বন্যপ্রাণীও বিবিধ-– ভালুক, হায়না, হাতি, হরিণ, বন্যশূকর, ময়ূর ইত্যাদি। শাল, পিয়াশাল, ভ্যালাই, সিধা, পড়াশি, কেঁদ, মহুয়া, পিয়ালদের নিয়ে অরণ্যও বেশ জমজমাট সংসার পেতেছে। বাঁকে বাঁকে রহস্যময়তা নিয়ে জঙ্গলের পথ রীতিমত আকর্ষণীয়।

    এ রকমই এক বাঁকের মুখে চারিদিকে পাহাড় আর ঘন সবুজ শালের প্রাচীরের মাঝে একাকী এক বাংলো। যেন একটি সবুজ বাটির তলদেশে বাংলোর অবস্থান। বাংলোর সামনে হাঁটুসমান সবুজ মলমলে ঘাস। বাংলোর বারান্দা ঘেঁষে বয়ে চলেছে ছোট ঘোলাজলের নদী। তার চলায় পাথরের ছন্দ। নদীর জলে দু’টি বোট বাঁধা। বারান্দার শেষেই সিঁড়ি নেমে গেছে জলে। ত্রিশ ফুট গভীর সবুজ জলের নিচে জলজ উদ্ভিদের আধিক্য। পাশেই রয়েছে ৪০ ফুট উচ্চতার এক টাওয়ার, যেখানে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ বাঁকুড়ার জঙ্গলমহল, মেদিনীপুর ও পুরুলিয়ার অংশবিশেষ চোখে ধরা পড়ে। বিশেষ করে, রানিবাঁধের জঙ্গলে সূর্যাস্তের দৃশ্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার মত।

    শীত, গ্রীষ্ম, শরৎ, বর্ষা যে কোনও মরসুমে সুতান মনোরম। রয়েছে ১২ বিছানার ডর্মিটরি অথবা দুই শয্যার ঘর। ইচ্ছা করলে পাহাড়ে তাঁবু-ঘরেও থাকা যায়। প্রায় ২ কিলোমিটারের মধ্যে শান্ত গ্রাম সুতান। চল্লিশ-পঞ্চাশ ঘর সাঁওতাল, ভূমিজ, ওঁরাও, মুণ্ডা নিয়ে সুতানের ঘর-গেরস্থলি। প্রকৃতির সব রং, সৌন্দর্য, মায়াময়তা নিয়ে গড়ে উঠেছে সুতান।

    সুতান অপেক্ষায় পর্যটকদের। নানাবিধ উপকরণ তার ঝুলিতে। যারা ট্রেকিং চান, তারা খাতাম, ভেদিয়াশোল, বুড়িশাল পাহাড়ে স্থানীয় গাইড নিয়ে অনায়াসে ট্রেকিং করতে পারেন। যারা নিস্তব্ধতা পছন্দ করেন, তাদের জন্য অবশ্যই সুতান। যারা বন্যপ্রাণীর সাক্ষাৎপ্রার্থী তাদেরও নিরাশ হবার কথা নয়, কারণ, এই জঙ্গল হল দলমার হাতির পালের যাতায়াতের করিডর। আর যারা মৎস্যশিকার করতে চান, তারাও স্বাগত, কারণ, পাহাড়ি নদীতে সাঁতরে বেড়াচ্ছে অসংখ্য রুপোলি ফসল।

    রানিবাঁধ থেকে জিপ বা ট্রেকারে এখানে আসা যায়। ঝিলিমিলির বাসে সুতান মোড়ে নেমে ৬ কিলোমিটার হেঁটে বাংলোয় পৌঁছনো যায়। রানিবাঁধ ও সুতানে রাত্রিবাসের জন্য বনবাংলো বুকিং করতে হবে-– ডিএফও, বাঁকুড়া সাউথ ডিভিশন, বাঁকুড়া। দূরভাষ: ০৩২৪২ ২৫০৩০৭।

    কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেড়িয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

    পায়ে পায়ে বাংলা 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More