সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬

নবজাগরণের রূপকারের দেশে

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

হুগলির খ্যাতি ইতিহাসপ্রসিদ্ধ জেলা হিসাবে। একদিকে বৌদ্ধ, জৈন, শৈব, বৈষ্ণব, শাক্তদের অবস্থান অন্যদিকে পর্তুগিজ, ডাচ, ব্রিটিশ, ফরাসি, দিনেমারদের কুঠি সব মিলিয়ে জেলায় একটা মিশ্র সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। প্রাচীনতম পর্তুগিজ গির্জা, ওলন্দাজদের প্রটেস্টান্ট গির্জা, ব্রিটিশদের সুবৃহৎ ব্যারাকভবন, প্রাচীনতম কলেজ, মুদ্রণালয়, প্রথম চটকল, মসজিদ মিনারের সমারোহ রয়েছে এই জেলাতে। হুগলি নদীর তীরে তীরে রয়েছে ইউরোপিয়ানদের তৈরি অসংখ্য স্থাপত্য কীর্তি। এতগুলি বিভিন্ন রঙের পালক জেলার মুকুটে থাকলেও পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে কিন্তু হুগলি তেমনভাবে স্বীকৃতি পায়নি। এটা খুবই পরিতাপের বিষয়। ভাবগম্ভীর  পর্বতশ্রেণি, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস বা রহস্যময় জঙ্গল না থাকলেও এখানে এমন কতকগুলি উজ্জ্বল জায়গা রয়েছে যেগুলি পর্যটনকেন্দ্র রূপে অনায়াসে জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারে। এরকমই জায়গা হল খানাকুলের রাধানগর, কৃষ্ণনগর ইত্যাদি।

আরামবাগ বা তারকেশ্বর থেকে বাসে করে পৌঁছনো যায় রাধানগর গ্রামে। এটি হুগলির এক অন্যতম গ্রাম যে গ্রামের এক সুসন্তানের জন্য আপামর বাঙালি গর্ব করতে পারে। তিনি আর কেউ নন বাংলাদেশ তথা ভারতের নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়। তিনি এই গ্রামে ১৭৭২ খ্রীষ্টাব্দে মতান্তরে ১৭৭৪ খ্রীষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বাংলায় রেনেসাঁ’র জনকের ২১৪তম জন্মদিনে তাঁর জন্মবেদির উপর নির্মিত হয়েছে এক সুদৃশ্য স্মারকস্তম্ভ। এই জন্মস্থানটিকে চিহ্নিত করার পুরো কৃতিত্ব রেভারেন্ড জেমস লঙ সাহেবের। তিনি এটি চিহ্নিত করেছিলেন ১৮৫৯ খ্রীষ্টাব্দে। স্থানীয় সর্বস্তরের জনসাধারণ, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর সহযোগিতায় এই স্মারকস্তম্ভটি গড়ে উঠেছে। এই স্তম্ভকে ঘিরে রয়েছে পুরোনো দেবালয়, রামমোহনের মর্মর মূর্তি ও ঘরের মধ্যে রয়েছে বংশতালিকা ও বিভিন্ন চিত্রাবলী। রামমোহনের জীবনের বহু  টুকরো টুকরো ঘটনা যেমন সতীদাহের ঘটনা, বেন্টিংকের সঙ্গে সাক্ষাৎকার, জাহাজে করে বিদেশ গমন ইত্যাদি বিভিন্ন ছবির মাধ্যমে প্রদর্শিত হয়েছে।

রাধানগর রামমোহন রায় স্মৃতিরক্ষা সমিতির একদম বিপরীত দিকে রয়েছে গ্রন্থাগার। এই গ্রন্থাগারের সামনে রয়েছে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে অবস্থিত রাজা রামমোহন রায়ের সমাধিস্মারকের পূর্ণ প্রতিরূপ। এটি নির্মিত হয়েছে ২০১৩ সালে। এই সমাধিস্মারকটি নির্মাণের সময় ব্রিস্টলের আর্নস ভেলের সমাধিক্ষেত্র থেকে মৃত্তিকা সংগ্রহ করে আনা হয়েছে।

কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজকে অন্ধকারের মধ্যে আলোর দিশা দেখিয়েছিলেন যিনি, সেই মানুষটির জন্মস্থান বা জন্মপল্লী কী নিদারুণ ঔদাসীন্যে ও অবহেলায় পড়ে রয়েছে তা রাধানগর না গেলে বোঝা যাবে না। একটা ছোট্ট ছুটিকে সম্বল করে যাওয়াই যায় এরকম এক তীর্থস্থানের পুণ্যধূলির স্পর্শ নিতে।

খানিকটা দূরে রয়েছে হুগলি জেলা পরিষদ পরিচালিত রাজা রামমোহন রায় প্রকৃতি পর্যটন কেন্দ্র। গাছগাছালিতে ভরা জায়গাটি বনভোজন করার পক্ষে আদর্শ।

রাধানগরের ঠিক উল্টোদিকে কৃষ্ণনগর গ্রাম। রাস্তার এপাশ আর ওপাশ। এখানে রয়েছে অভিরাম গোস্বামী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত গোপীনাথ মন্দির। মন্দিরে প্রবেশের আগে অভিরাম গোস্বামীর পরিচয় একটু জানা দরকার।

অভিরাম ছিলেন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের সাক্ষাত শিষ্য, যিনি দ্বাদশ গোপালের প্রথম গোপাল  হিসাবে পরিচিত। চৈতন্যদেব অভিরামকে নাম প্রচারের জন্য গৌড়ে চলে আসতে আদেশ করেন। মহাপ্রভুর কাছ থেকে ফিরে এসে তিনি বৈষ্ণব ধর্মের ব্যাপক প্রচার করতে শুরু করেন। অভিরাম তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে খানাকুলের কৃষ্ণনগরে একটি চালাঘরে উপাস্য দেবতা গোপীনাথজীকে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দে নবরত্ন মন্দিরটি নির্মিত হয়। এই মন্দিরের কিছুটা অংশ ভেঙ্গে যাওয়ায় বর্তমানে পরিত্যক্ত। পাশেই গড়ে উঠেছে ৭০ ফুট উঁচু মন্দির যেখানে কালো কষ্টি পাথরের নয়নাভিরাম গোপীনাথ প্রতিষ্ঠিত। পাশাপাশি চেতুয়া, মন্দ্রারণ, খানাকুল প্রভৃতি গ্রামের ধীবর গোষ্ঠী মিলে এই রেখ দেউলটি নির্মাণ করে দেন।

মন্দিরে মধ্যে বলরাম, মদনমোহন, গোপাল ও অভিরাম গোস্বামীর মূর্তি নিয়মিত পূজিত হয়। মন্দিরে নিয়মিত ভোগরাগ ও উৎসব ইত্যাদির ব্যবস্থা আছে। মন্দিরের সামনে রয়েছে বিরাট প্রশস্ত নাটমন্দির। অদূরেই রয়েছে গোপীনাথের প্রশস্ত রাসমঞ্চ। রাসের সময় একাদশী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত মেলা বসে। মন্দিরের তোরণদ্বারের বাঁদিকে রয়ে গেছে অভিরাম গোস্বামী কর্তৃক প্রোথিত আনুমানিক ৫০০ বছরের সিদ্ধ বকুল গাছ। সে আজও শীতল ছায়া দান করে চলেছে। মন্দিরে ভোগ খাবার ইচ্ছা থাকলে কর্তৃপক্ষকে আগে জানাতে হবে।

পাশেই রয়েছে রাধাকান্তের মন্দির। রাধাকান্তজি ছিলেন খানাকুলের বিখ্যাত সর্বাধিকারী বংশের কুলদেবতা। এই মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু করেন রামনারায়ণ মুন্সী। তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মথুরামোহন এই মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ করেন ১৮৪০ খ্রীষ্টাব্দে। মন্দিরটি অনেকটা এলাকা জুড়ে। আয়তনে যেমন বড়, শিল্পসুষমায় তেমনি অনন্যসাধারণ। বর্গাকার মন্দিরের গর্ভগৃহের উপর চারচালা শৈলীর একচূড়া মন্দির। পোড়ামাটির অলংকরণে মন্দিরটি সজ্জিত। বহু পৌরাণিক দৃশ্য, লতা পাতা ফুল ও পাখির অলংকরণে মন্দিরটি অপরূপ। মন্দির মধ্যে সিংহাসনে রাধাকান্ত বিগ্রহ। বিগ্রহটি অনিন্দ্যসুন্দর।

মন্দিরের পাশে রয়েছে পুকুর, সিড়িঁ দিয়ে নেমে যেতে হয়। রক্তকরবী, কাঠচাঁপা, বড়োসড়ো তুলসীমঞ্চ সব কিছু নিয়ে মন্দিরটি এক কথায় মনোহরণকারী।

কৃষ্ণনগর থেকে চার কিলোমিটার দূরে খানাকুল হাটতলা হয়ে যাওয়া যায় ঘণ্টেশ্বর মন্দিরে। প্রায় ৬০ ফুট উঁচু মন্দিরে বিগ্রহের অবস্থান। অতীতের খ্যাত রত্নাকর নদীর তীরে মন্দিরটি অবস্থিত। কিংবদন্তি যে পঞ্চদশ শতকের কোনও এক সময়ে একদিন অভিরাম গোস্বামীর কৌপিন নদী স্রোতে ভেসে যাওয়ায় তিনি ক্ষুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দেন এবং তাঁরই অভিশাপে তীব্র বেগবতী নদী তার বেগ হারায় এবং কানা রত্নাকরে পরিণত হয়। আজও এই কানা নদী ঘণ্টেশ্বর জীউ সহ আরও কয়েকটি মন্দিরকে বলয়াকারে ঘিরে রেখেছে। মন্দিরের পরিবেশটি বেশ চমৎকার। মন্দিরের বিশাল আঙিনা জুড়ে বিরাজ করছেন দেবী দুর্গা, বিশালাক্ষী, পঞ্চমুন্ডির আসনে মা আনন্দময়ী শ্মশান কালী, দেবী অন্নপূর্ণা, মা ষষ্ঠী, ধর্মরাজ ক্ষুদিরায়, রাধাকৃষ্ণের যুগল বিগ্রহ ও মুসলমানদের আরাধ্য নীরসাহেব। এতগুলি মন্দিরের সমাবেশে স্থানটিকে অনেকে বলেন গুপ্তকাশী। ঘণ্টেশ্বরকে গুপ্তকাশীর অধিপতি বলে। তিনি পূজিত হন – গুপ্ত কাশীধামপতি ভজ ঘণ্টেশ্বরম মন্ত্রে।

আরামবাগ বা তারকেশ্বর থেকে বাসে এখানে আসা যায়। নিজেদের বা রিজার্ভ গাড়ি হলে তো কথাই নেই। খানাকুলে থাকার কোনও জায়গা নেই, তারকেশ্বরে রাত্রিবাস করে জায়গাটি ঘুরে দেখে নেওয়া যায়।

তারকেশ্বরে থাকার ঠিকানা হল- তারকেশ্বর টুরিস্ট লজ, মন্দিরপাড়া, তারকেশ্বর
দূরভাষ- ০৩২১২-২৭৯৩৩২, চলভাষ- ৯৭৩২৫০৯৯২৭

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেড়িয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা 

Comments are closed.