ভালোপাহাড়ের অন্দরে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রত্না ভট্টাচার্য্য
    শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

    সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। এবার থেকে সেই দায়িত্ব আমাদের। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই শুরু হল নতুন এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

    বিশ্বকবির সুন্দর বাণী লিপিবদ্ধ রয়েছে যে দেওয়াল জুড়ে সেখানে একটু থমকাতেই হবে  বাণীটি আত্মস্থ করার জন্য— ”আমি একলা সমস্ত ভারতবর্ষের দায়িত্ব নিতে পারব না। আমি  কেবল জয় করব একটি বা দুটি ছোট গ্রাম। এই কখানা গ্রামকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করতে   হবে— সকলে শিক্ষা পাবে, গ্রাম জুড়ে আনন্দের হাওয়া বইবে, গান বাজনা কীর্তন পাঠ চলবে। আগের দিনে যেমন ছিল, তোমরা কেবল এই কখানা গ্রামকে এইভাবে তৈরি করে দাও। আমি বলব এই কখানা আমার ভারতবর্ষ।” কবির স্বপ্ন যে এইভাবে বাস্তবায়িত করা যায় তা ভালোপাহাড় না গেলে বোঝা যেত না।

    অনেকগুলি প্রশ্ন মাথায় হুড়মুড়িয়ে এসে যায়। ভালোপাহাড় কি বা কোথায়? কে বা কারা এর কারিগর?

    প্রথম প্রশ্নের উত্তর এইভাবে দেওয়া যায় ভালোপাহাড় কোনও পাহাড় নয়। পুরুলিয়ার দুয়ারসিনি রেঞ্জের ডাঙ্গরজুড়ি গ্রামে ভালোপাহাড় একটি সোসাইটি। এই সোসাইটি সম্বন্ধে জানতে হলে একটু পিছনে হাঁটতে হবে। জামসেদপুরের কৌরব পত্রিকার পাঁচজন সদস্য মিলে নিজেদের জমানো টাকায় ডাঙ্গরজুড়ি গ্রামে কিছুটা জমি কেনেন। উদ্দেশ্য রুক্ষ ঊষর ভূমিকে শ্যামলিমায় ভরে দেওয়া, আর গড়ে তোলা এক দূষণমুক্ত পরিবেশ। ১৯৯৬ এর ১  সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হল ভালোপাহাড় নামে এক সোসাইটি। এই সোসাইটির কর্ণধার বহু গুণান্বিত নিবেদিত প্রাণ কমল চক্রবর্তী। তাঁর প্রথম পরিচয় তিনি একজন আদ্যন্ত কবি। তাঁর বীজমন্ত্র হল জয় বৃক্ষনাথ। এই মন্ত্র বুকে আর দু’চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে শনিবার করে জামসেদপুর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার স্কুটার চালিয়ে আসতেন ডাঙ্গরজুড়িতে গাছ লাগাতে, দু’পকেট ভর্তি বীজ নিয়ে। শুধু বীজ হলেই তো হল না, দরকার জলের। সেই জলের জোগান হল পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একরত্তি আমলী নদী থেকে।

    কখনও দু’হাতে আঁজলা ভরে, কখনও বা পাত্র ভরে। গাছ লাগানো হল প্রায় লাখখানেক। তা আজ বংশবিস্তার করে প্রায় দু’লাখের কাছাকাছি। মনুষ্যসৃষ্ট সেই অরণ্যে কি নেই! হিমঝুরি, মেনঝুরি, সোনাঝুরি, রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া, লতাপলাশ, শাল, সেগুন, শিমুল, তাল, গামার, বহেড়া, তেঁতুল, কাঁঠাল, আমলকী, আমড়া সহ কত গাছ। সোনালি বাঁশ গাছের সৌন্দর্য অপরূপ। তাদের ডালে ডালে হলুদ বেনেবৌ, দোয়েল, খঞ্জনা, দুধরাজ, টুনটুনি, বুলবুলি,  কাঠঠোকরা, মাছরাঙা, বাঁশপাতি, চড়ুইয়ের দল, হাঁড়িচাচা ইত্যাদি। বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্য ২০ বিঘার পুকুর কাটা হয়েছে। বেশ কিছু গরু, হাঁস, মুরগি প্রতিপালন হচ্ছে।

    এরকম একটি দুর্দান্ত জায়গায় থাকার লোভ সম্বরণ করা খুব কঠিন। হ্যাঁ, তারও ব্যবস্থা আছে। পুরো আধুনিক স্বাচ্ছন্দ্যে ভরপুর অতিথি নিবাস। ভালোপাহাড়ের অন্দরে প্রবেশপথের বাঁদিকে অফিসঘর সঙ্গে কিছু সদস্যের থাকার জায়গা। কম্পাউন্ডের ভেতরে ঢুকলে সাদর অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে আসবে ক্রেংকার ধ্বনি সহ গ্রীবা উঁচিয়ে বড়বড় রাজহাঁসের দল। রাজহাঁসের এরূপ রাজকীয় অভ্যর্থনায় প্রাণ বিগলিত হতে বাধ্য। পরম যত্ন ও মমতায় গড়ে তোলা বেশ বড়সড় বাগান— গাঁদা, শিউলি, বেল, অপরাজিতা, টগর, হংসরাজ, চাঁপা, মুসম্বি, পাতিলেবু ও বাতাবিলেবুতে ভরা। মাঝখানে খড়ের ছাউনি দেওয়া গোলঘর। উদরপূর্তি ও আড্ডা দেওয়ার আদর্শ জায়গা। বাঁদিকে হেঁশেল ঘর, কাঠের স্তূপই বলে দেয় কাঠের জ্বালানিই রান্নার মাধ্যম।

    আরও কিছুটা এগিয়ে বাঁহাতে ঘর অতিথিদের জন্য। একতলা ও দোতলা মিলিয়ে। পেছনেই রয়েছে দোতলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ খেলার মাঠ। আর রয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। আশপাশের গ্রাম যেমন ধাদকা, কুলবেড়ার আদিবাসীদের অসুখে একমাত্র ভরসা এই কেন্দ্র।

    আদিবাসী গ্রামগুলির প্রায় ২০০টি বাচ্চাকে জয়তীদি, প্রদীপদা গড়ে পিটে জবরদস্ত বানাচ্ছেন। ওরা অ-এ অজগর না বলে বলছে অ-এ অমলতাস, আ-এ আমলকী। টিফিনে দেওয়া হয় কোনওদিন মুড়ি, কোনওদিন খিচুড়ি, কোনওদিন পাঁউরুটি। খাওয়া হয়ে গেলে থালা ধোওয়া জল গাছের গোড়ায়। বাচ্চাদের বলতে হয় না, ওরা জানে জলে সিঞ্চিত হবে নতুন অঙ্কুর।  কেবল টিফিন বললে ভুল বলা হবে। বইখাতা, স্কুল ইউনিফর্ম থেকে শুরু করে বাচ্চাদের নিয়ে আসা, দিয়ে আসার মস্ত দায়িত্ব সোসাইটির। স্টেট ব্যাঙ্কের ভালোবাসায় একটি বাস পাওয়া গেছে। হলুদ বাসের গায়ে লেখা ‘ভালোপাহাড়’। এখনও পর্যন্ত স্কুলের সেভাবে কোনও  অনুমোদন নেই, অন্য কোনও পর্ষদস্বীকৃত স্কুল থেকে পরীক্ষায় বসতে হয়।

    অতিথি সেবার জন্য রয়েছে ক্ষেতে চাষ করা লাল চালের মিষ্টি ভাত, সারবিহীন সবজির তরকারি, খাঁটি দুধ, ঘরে পাতা দই, কালোনুনিয়া চালের পায়েস, কুসুম পাতায় মোড়া তালের বড়া, কারিপাতা দিয়ে আলুর তরকারি— এককথায় অপূর্ব। রান্নার স্বাদ বেড়ে যায় এদের আন্তরিক অমলিন ব্যবহারে। সন্ধেবেলায় আমতেল, কুঁচো পেঁয়াজ সহযোগে মুড়িমাখা সঙ্গে ঘরে ভাজা গরম গরম তেলেভাজা সত্যি ভোলা যায় না।

    হলুদ মেরুন ইউনিফর্মে বাচ্চাগুলো যেন এক একটি অলংকার। ক্লাসে গেলে দেখা যায় কী অপরিসীম আগ্রহ কোনও কিছু শেখার বিষয়ে। এত উপস্থিতবুদ্ধি সহ ছাত্রছাত্রীদের দেখে তাক লেগে যায়। মুগ্ধ করে ওদের ডিসিপ্লিন। আর তাই সামগ্রিক বিচারে এই স্কুলের মিলেছে পশ্চিমবঙ্গের শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিরোপা ”দি টেলিগ্রাফ স্কুল অ্যাওয়ার্ড”।

    ভালোপাহাড় থেকে এক কিলোমিটার দূরে কুচিয়া গ্রাম, হাঁটতে হাঁটতে চলে যাওয়া যায়। ২০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে টটকো ড্যাম, স্থানীয়দের কাছে ভালু ড্যাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, সূর্যাস্তের দৃশ্য অপরূপ। ড্যামের জলে পানকৌড়ি ও হাঁসের দলের হালকা ভেসে চলা মনকে উদাস করে তোলে। ফেরার পথে চিলা, মোনাং গ্রাম হয়ে বান্দোয়ানে ঘুরে বেড়ানো। বান্দোয়ান মোটামুটি গঞ্জ, সপ্তাহে একদিন হাট বসে। ঘুরতে গিয়ে হাটবার পড়ে গেলে উপরি পাওনা বলেই মনে হবে। এ হাটের রূপ, মেজাজ একদম আলাদা অন্যান্য হাটের থেকে। এখনও কৃত্রিমতার ছোঁয়া লাগেনি।

    বসন্তে এখানেও শুরু হয়েছে দোল উৎসব বা পলাশ মেলা। এই সময় শালে আসে কচি পাতা। এখানকার ক্যানভাস তখন গ্লোয়িং গ্রিন। ইচ্ছে করলে একবার এই উৎসবে যোগদান করাই যায়। লোকসংস্কৃতিকে বাঁচানোর জন্য তৈরি হচ্ছে লোকশিল্প মিউজিয়াম। স্থানীয় তুঁত থেকে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু আচার।

    ভালোপাহাড় নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাহাড়ের ছবি। না পাহাড় এখানে শুধুই প্রতিবেশী। দূরে আবছা পাহাড়ের সারি। এখানে অনেক ‘ভালো’ জমে উঠে পাহাড়ের আকার নিয়েছে।

    এখানে পৌঁছতে সবচেয়ে ভালো হাওড়া থেকে ভোরের ইস্পাত এক্সপ্রেসে চেপে গালুডি স্টেশনে নামা। স্টেশন থেকে ভালোপাহাড় ১৮ কিলোমিটার। স্টেশন থেকে একটু এগিয়ে এলেই অটো  সার্ভিস আছে। থাকার জন্য একবার ফোন করলেই হল। আগাম বলা থাকলে স্টেশনে গাড়ি আপনাকে নিতে চলে আসবে। এই ১৮ কিলোমিটার রাস্তাটিও ভারী সুন্দর। পথে পড়বে সাতগুরুং নদী— সাত পাক খেয়ে নদীটি বয়ে চলেছে। দু’পাশে পাহাড় অরণ্যের মাঝে এখানকার আদিবাসীদের জীবনরেখা হল বহতা এই নদীটি। এই নদীই ঝাড়খণ্ড ও  পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা করেছে। এরপর দুয়ারসিনি পেরিয়ে রাস্তা গেছে বান্দোয়ানের দিকে। এরপর কুচিয়া গ্রাম পেরিয়ে ভালোবাসার ভালোলাগার ভালোপাহাড়।

     

    বুকিং এর জন্য দূরভাষ— ৯৪৭৪৪৬২২৩৮

    ঠিকানা– ভালোপাহাড়, গ্রাম ডাঙ্গরজুড়ি, পোঃ-কুচিয়া,

    জেলা- পুরুলিয়া, পশ্চিমবঙ্গ, পিনকোড-৭২৩১২৯

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More