জৈনতীর্থ পাকবিড়রা

১৩

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

পুরুলিয়া নাম মনে আসলেই রুখাশুখা ভাবটাই মনে আসে। কিন্তু এই মাটিতেই আছে অপার সৌন্দর্য, সুরের মায়াজাল, চিত্রশিল্পীর তুলির টান, পাথরের তৈরি দেব দেউল সহ হাজারো মন ভোলানো পশরা। সৌন্দর্যের টান ছাড়াও পুরুলিয়ায় ঘুরে আনন্দ পাওয়া যায় দেব দেউল ও ভাস্কর্য দেখে। পাকবিড়রা এমনই এক মায়াময় স্থান।

পাকবিড়রা একটি ছোট গ্রাম। গ্রামটি জৈন সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধ্বংসাবশেষ বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাকবিড়রা শব্দটির অর্থ নিয়ে নানান মতভেদ আছে। স্থানীয় ভাষায় শব্দটির অর্থ ‘দেবতার বিচরণভূমি।‘ অন্য দিকে রাঢ় গবেষক কীর্তনন্দ অবধূত মনে করেন ‘পক্কভীরম’ শব্দ থেকে পাকবিড়রা শব্দের উৎপত্তি। ‘পাক’ শব্দের অর্থ পাখি এবং বিড়রা শব্দের অর্থ বাসভূমি। অর্থাৎ পাখিদের বাসস্থান। লোকচক্ষুর অন্তরালে কলকাকলি মুখরিত অরণ্যকে বেছে নিয়েছিলেন জৈনরা তাদের পীঠস্থান তৈরি করার জন্য।

আক্ষরিক অর্থে কেবল নয়, বাস্তবিকই এই এলাকাটি দেখলে মনে হয় দেবতাদের বিচরণ করার আদর্শস্থল কারণ, পুরুলিয়ায় যতগুলি জৈন পীঠস্থান রয়েছে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ জৈন তীর্থকেন্দ্র হল পাকবিড়রা।

পুরুলিয়া শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে পাকবিড়রা পুঞ্চা থানার অন্তর্গত। ইতিহাস গবেষক সুভাষ রায়ের মতে নবম শতাব্দী থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত যে জৈন তীর্থকেন্দ্রগুলি গড়ে উঠেছিল তাদের দুটি মূলকেন্দ্র ছিল। একটি বন্দরনগরী তেলকুপি ও অন্যটি পাকবিড়রা।

জে ডি বেগলার তাঁর বর্ণনায় পাকবিড়রায় ২১টি মন্দিরের ধ্বংসস্তূপের কথা উল্লেখ করেছেন যার মধ্যে ১৯টি দেউল ছিল পাথর দ্বারা নির্মিত। বর্তমানে সেই মন্দিরগুলির একটিও দেখতে পাওয়া যায় না। যে তিনটি মন্দির দেখতে পাওয়া যায় সেগুলিতে খুব একটা নিপুণতার ছাপ নেই। তবে পুরুলিয়াতে পাকবিড়রা ব্যতীত এত মূর্তির সমাবেশ আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। বহু মূর্তি নষ্ট হয়ে গেছে, চুরি হয়ে গেছে।

পাকবিড়রায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও সর্ববৃহৎ মূর্তিটি সাড়ে সাত ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট। এটি কোনও তীর্থংকরের দিগম্বর মূর্তি। এলাকায় এটি ভীরম নামে পরিচিত। কালো পাথর দ্বারা খোদাই করা মূর্তিটি এত নিখুঁত ও অসাধারণ যে চোখ ফেরানো যায় না। এ রকম বড় মূর্তি পুরুলিয়ায় আর কোথাও চোখে পড়ে না। এ রকম অনিন্দ্যসুন্দর মূর্তি খোলা আকাশের তলায় রোদে পুড়ে, জলে ভিজে কতদিন টিকে থাকবে বলা মুশকিল। গ্রামবাসীরা মূর্তিটিকে শিবরূপে ফুল, বেলপাতা দিয়ে নিত্য পূজার্চনা করেন। এটির আশু সংরক্ষণ হওয়া প্রয়োজন।

পাকবিড়রায় আরও অজস্র মূর্তি, কলস, অর্ঘমন্দির এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কিছু মূর্তিকে একটি ঘরে পরপর সাজিয়ে রাখা হয়েছে। যে সব মূর্তি রয়েছে তা হল– দেবী অম্বিকার মূর্তি দুটি (একটি ছোট ও একটি বড়), দুটি পার্শ্বনাথ, তিনটি আদিনাথ, ঋষভনাথ, শিশু কোলে নারী-পুরুষের মূর্তি, চন্দ্রপ্রভা ইত্যাদি। চারটি চৈত্যও পরপর সাজানো। যদিও প্রথম চৈত্যটির ওপরের অংশ ভাঙা।

পাকবিড়রার পুরনো দেউলগুলির আকৃতি, গঠনপ্রণালী কেমন ছিল তা ওই চৈত্যগুলি দেখে অনুমান করা যায়। বড় অম্বিকার মূর্তিটি মহাবীরের শাসন দেবী। মূর্তিটির দু’পাশে চামরধারী রমণী মূর্তি ছিল, বর্তমানে একটি নষ্ট হয়ে গেছে। মূর্তিটি মুগ্ধ করার মতো।

পশ্চিম প্রান্তে ইটের ধ্বংসস্তূপ রয়েছে। অনুমান, হয়তো ওই সব স্থানেই ইটের দেউলগুলি ছিল। বর্তমান তিনটি দেউলের মধ্যে প্রথম দেউলটির ভেতরে রয়েছে শান্তিনাথের মূর্তি। এই দেউলের ভেতরে একটি পাথরের ওপর খোদিত লিপি রয়েছে। এছাড়া, এটির প্রবেশপথের ডান দিকে রয়েছে একটি তীর্থঙ্কর পট। পটটি লম্বায় প্রায় ৪ ফুট এবং চওড়ায় ২ ফুট। পটটিতে রয়েছে ১৬টি সারি এবং প্রতি সারিতেই চব্বিশজন তীর্থংকরের মূর্তি খোদিত।

পুরুলিয়া থেকে হুড়া, লালপুর, বাগদা হয়ে মানবাজারের রাস্তায় ধাধকি বাস স্টপে নেমে রিকশা অথবা প্রাইভেট গাড়িতে করে পাকবিড়রার প্রত্নস্থলে পৌঁছনো যায়। ধাধকি থেকে বাঁ দিকে একটি কাঁচা রাস্তা চলে গিয়েছে, সেই রাস্তায় প্রায় ৫ কিলোমিটার গিয়েই ডান দিকে পড়ে গ্রামটি। ডান দিকেই রয়েছে মানভূমের ভাষা আন্দোলনের অসম্পূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ। পুঞ্চা থানার পাশের মোরাম রাস্তা ধরেও এখানে যাওয়া যায়।

মানভূমের ইতিহাসে পাকবিড়রা কেবল জৈন পীঠস্থানই নয়, ঐতিহাসিক স্থানও বটে। মানভূমের বঙ্গভুক্তি আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে লোকসেবক সংঘের মানভূম মাতা লাবণ্যপ্রভা দেবী, অরুণচন্দ্র ঘোষ, সুশীল মাহাতো, ভজহরি মাহাতো সহ বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী পাকবিড়রা থেকে হেঁটে কলকাতায় যান এবং কারাবরণ করেন। যার ফল আজকের পুরুলিয়ার বঙ্গভুক্তি। পাকবিড়রা গ্রামে আজও দু-একজন বৃদ্ধ মানুষ আছেন যাঁরা এই আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন।

বর্তমানে ধ্বংসস্তূপের কাছেই তৈরি হয়েছে দিগম্বর জৈন সম্প্রদায়ের বিরাট ট্রাস্ট। এখানে একটি মন্দির ও থাকার জন্য ধর্মশালাও রয়েছে। এই জৈন ট্রাস্টটি পাকবিড়রার মূর্তিগুলির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন কিন্তু গ্রামের মানুষ রাজি হননি। তাঁরা মনে করেন এগুলি হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি।

পাকবিড়রা থেকে কাছেই ঘুরে আসা যায় বাগদা রামকৃষ্ণ আশ্রমে। শ্রীশ্রীসারদা মায়ের সাক্ষাত শিষ্য স্বামী কৃষ্ণানন্দ ও স্বামী তপানন্দের সাধনস্থল ও কর্মভূমি এই বাগদা গ্রাম। বাগদার আশ্রমে সারদা মায়ের চুল একটি কৌটায় রক্ষিত আছে। বাগদায় রামকৃষ্ণ আশ্রমটি ছোট হলেও পরিবেশটি ভারি সুন্দর। আশ্রমের পিছনে টাড় জমির দিগন্ত বিস্তৃত জায়গার দিকে তাকালে মনটা উদাস হয়ে যায়।

পুরুলিয়া শহরে রাত্রিবাস করে পাকবিড়রা ঘুরে নেওয়া যায়।
পুরুলিয়ায় থাকার ঠিকানা হল – হোটেল আকাশ, বি টি সরকার রোড, পুরুলিয়া,
দূরভাষ: ০৩২৫২-২২৪৫৩৫, চলভাষ: ৯৭৩৫১৪৪১৫৫

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেড়িয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা  

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More