মিরিকের হৃদয়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। এবার থেকে সেই দায়িত্ব আমাদের। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই শুরু হল নতুন এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি গরমে প্রাণবায়ু খাঁচা ছাড়া হবার উপক্রম। মন, মেজাজ সবই তিরিক্ষি হয়ে উঠেছে। অথচ হাতের কাছে মাত্র ১৬ ঘন্টার ব্যবধানে রয়ে গেছে একদম প্রাণ জুড়ানোর ঠিকানা সেটা আমাদের খেয়ালেই থাকে না। সে ঠিকানা হল সিংগালিলা পাহাড়ের কোলে ছবির দেশ মিরিক। অতএব আর দেরি নয়। উঠে পড়া তিস্তা-তোর্ষার কোলে। সে তার পাঙ্কচুয়ালিটি বোঝাতে রাত ২.৪০ মিনিটে আমাদের নিউ জলপাইগুড়ি ষ্টেশনে নামিয়ে দিয়ে কু ঝিক ঝিক করতে করতে মিলিয়ে গেল অন্ধকারের মধ্যে। প্লাটফর্মে পড়ে রইল সদ্য নামা বেশ কিছু প্যাসেঞ্জার সহ বিপুল লটবহর। বিশাল বিশাল ব্যাগ, সে ব্যাগের মধ্যে ছোট খাট হাতিও ঢুকে যেতে পারে। ভোরের আলোর অপেক্ষায় বসে বসে ভাবছি, ব্যাগের মধ্যে থাকা কত শহুরে জঞ্জাল নিষ্কলুষ পাহাড়ি শান্ত জনপদগুলোকে কলুষিত করতে চলেছে।

ধীরে ধীরে আঁধার কেটে গেলে একটি গাড়িতে চেপে পাড়ি দিলাম ৫২ কিলোমিটার দূরের মিরিকের উদ্দেশ্যে। আমাদের জন্য যে একটা চমকে দেওয়া সকাল অপেক্ষা করছিল তা বুঝতেই পারিনি। দুধিয়ার পর মিরিকের আঁকাবাঁকা পথটি যেন ছবির এ্যালবাম। একের পর এক পাতা উল্টে যাচ্ছে, আর দৃশ্য পটের পরিবর্তন হয়ে চলেছে। সুশৃঙ্খল সৈনিকের মতো দাঁড়িয়ে আছে পাইন, ফার, দেবদারুর মত বৃক্ষরাজি। তারা অনাদিকাল থেকে দাঁড়িয়ে আছে এ পথে আগত আগন্তুকদের গার্ড অফ অনার দেবে বলে। দু’পাশের পাহাড়ে উদ্বাহু প্রাচীন পাইনের সারি বার বার ভুল করিয়ে দিচ্ছিল যে না এটা শিলং বা উটি নয়, আমি আমার প্রিয় রাজ্যেই বিচরণ করছি।

এরপর শুরু হল দু’পাশে পাহাড়ের ঢালে চা বাগানের প্রাচুর্য। চোখে কেবল সবুজ স্নিগ্ধতা। স্নিগ্ধতার রেশ ধাক্কা খেল একেবারে ঘিঞ্জি মিরিক বাজারে। মিরিক বাজারের লাগোয়া বিখ্যাত থরবু চা বাগান। এই এলাকাতেই মিরিকের অধিকাংশ হোটেল ও লজ। পাহাড় ঘেরা মিরিকের সুন্দর প্রাকৃতিক লেকটি এখান থেকে আরও এক কিলোমিটার দূরে।

পাইনের সারি, এলাচ, ফুলঝাড়ুকে সঙ্গী করে দুই ঘন্টার যাত্রা শেষে পৌঁছে গেলাম আকর্ষণীয় শৈলনিবাস মিরিকে। যত শৈলনিবাস উত্তরবঙ্গে আছে তার মধ্যে মিরিকের উচ্চতা সবচেয়ে কম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মিরিকের উচ্চতা মাত্র ১৭৬৭ মিটার।

সিংগালিলা পাহাড়ের গায়ে অরণ্য আর লেকে ঘেরা ছোট উপত্যকাভূমি মিরিক যার দুইপাশে নেপাল ও দার্জিলিং। গাড়ি থেকে নেমে মনে হল যেন কোনও স্থির ছবির দেশে এসে পড়েছি। পাহাড়ের মধ্যে পাখির বাসার মত ছোট অথচ রমণীয় এক স্থান। ছবি দেখা স্থগিত রেখে পা চলে গেল চা আর মোমোর দোকানে। গরমাগরম সুস্বাদু মোমো দিয়ে সকালের উপবাসভঙ্গ বেশ ভালোই হল। যেমন মোমো সুস্বাদু তেমন মিষ্টি দোকানি দিদি। তার আন্তরিক ব্যবহার মিরিককে এক লহমায় আরও কাছে এনে দিল। খাওয়া শেষ করে নীচের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম মিরিকের মূল আকর্ষণের দিকে।

পাহাড়ি এই জনপদটির মূল আকর্ষণই হল পাঁচ একর সমভূমিতে ১.২৫ কিলোমিটার ব্যাপ্ত বিশাল এক টলটলে জলের হ্রদ। অনিন্দ্যসুন্দর এই লেকটির নাম ভারী মিষ্টি, সুমেন্দু এর নাম। এই লেকের অবস্থান সিংগালিলা পাহাড়ের কোলে। হ্রদের গভীরতা ২৮ থেকে ৩০ ফুট অবধি। লেকের চারপাশে পাইন বনের সারি, রঙ-বেরঙের নানাবিধ বুনো ফুলের সম্ভার। দূরে পূর্ব হিমালয়ের বরফাচ্ছাদিত তুষারশৃঙ্গের প্রতিচ্ছবি লেকের জলে প্রতিফলিত হয়ে এক অনন্য রূপের সৃষ্টি করে। না, এবার সে রূপের সাক্ষী হতে পারা গেল না কারণ আকাশ মেঘলা, দলা দলা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। হ্রদের উপর নীল সাদা রঙের রেনবো ব্রিজ। এই ব্রিজের উপর থেকে মিরিকের পুরো লেকটা দারুণ লাগে। ওপারে ফাইবার দিয়ে লেখা I LOVE MIRIK লেখাটি দেখতে ভালো লাগলেও মনে হচ্ছিল ঠিক যেন পরিবেশের সঙ্গে গেল না। ওটা যদি বাহারি লতাপাতা দিয়ে লেখা হত তাহলে বোধহয় মানানসই হত।

ব্রিজ পেরিয়ে লেকের পাশ দিয়ে মাটির রাস্তা মাড়িয়ে ঘন গাছপালার আলো আঁধারির মধ্যে দিয়ে পৌঁছে গেলাম সিংহবাহিনী দেবীর মন্দিরে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে মন্দির। মূল মন্দির ছেড়ে একটু ওপরে আরও নানা দেবদেবীর মন্দির, গুম্ফা আছে। আরণ্যক পরিবেশে মন্দিরটি এক কথায় চমৎকার। মন্দিরে পুজো দিয়ে পবিত্র মনে নেমে এলাম।

ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে হ্রদটির অপূর্ব শোভা ও অন্যান্য টুরিস্টদের সেলফি তোলার উন্মাদনা লক্ষ্য করছিলাম। প্রকৃতির প্রাঙ্গণে এরকম টলটলে জলের হ্রদ মিরিকের হৃদয় বলতে যা বোঝায় তাই। এই হ্রদ ঘিরেই জনজীবন। হ্রদে সারাবছর জল থাকে। ছটফটে মাছ যেমন খেলে বেড়াচ্ছে তেমন পানকৌড়ির টুপ করে ডুব দিয়ে মাছ শিকারের দৃশ্যও বিরল নয়। মাছের খাবার কিনে পর্যটকরা জলে ছুঁড়ে দিচ্ছে। হ্রদের জলে রঙিন নৌকা, প্যাডেল বোট, স্পিড বোট সব দাপিয়ে বেড়ায় পর্যটকদের নিয়ে। তাদের হুল্লোর আর আনন্দে এই অঞ্চল গমগম করে। মিরিক ডে সেন্টার থেকে প্যাডেল বোট ও দাঁড় টানা বোটের বুকিং হয়। এই সরকারি সেন্টারে শৌচালয় ও বিশ্রাম নেওয়ার ঘর আছে।

লেকের পাশে আছে লাগোয়া ময়দান। এই ময়দান থেকে ঘোড়ায় চড়ার স্বাদ নেওয়া যায়। এক পাশে রয়েছে ফ্লোটিং বাজার আর একপাশে তৈরি হচ্ছে বেশ বড়সড় একটি বিনোদন পার্ক। রয়েছে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, অর্কিড নার্সারি। চারিদিকে হোটেল ও রকমারি শৌখিন দ্রব্যের দোকান নিয়ে মিরিক জমজমাট। দোকান বাজার বাদ দিলে মিরিক এক কথায় অতুলনীয়। যত্রতত্র গোলাপের ঝাড়, সাদা ও কমলা রঙের ধুতুরা ফুল মিরিকের বৈশিষ্ট্য। মিরিক এখন আর সাইড সিইং–এর স্থান নয় সে নিজেই এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ।

আজন্ম দেখে আসা ধানক্ষেত, কুঁড়েঘর, মন্দির-মসজিদ-মাজারের বাংলায় এমন জায়গা আছে ভেবে অবাক লাগছিল। নিজের রাজ্যে এরকম অপার্থিব মায়াময় একটা জায়গা রয়ে গেছে না দেখলে বিশ্বাস করা হত না।

এবারে গাড়ি চেপে একেবারে শহরের মধ্যে পাহাড়ের মাথায়। এখানে অবস্থান করছে রিমপোচে মনাস্ট্রি। এটি একটি সুপ্রাচীন মনাস্ট্রি। পাশেই লামাদের বিদ্যালয়। ঘুরতে ঘুরতে চলে যাওয়া যায় রামিতেধারা যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত খুব ভালো দেখা যায়। এখানে দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকালে ঢেউ খেলানো উপত্যকাটি ভারী সুন্দর লাগে। আবার এখান থেকে তুষারাবৃত পর্বত চূড়াগুলোও স্পষ্ট দেখা যায়। মিরিকের মত রোম্যান্টিক জায়গায় থাকতে চাইলে অনায়াসে থাকা যায় কারণ থাকার জায়গার অভাব নেই। মিরিকে লেকের পাশে থাকার ঠিকানা হল

দি পার্ক হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট , দূরভাষ- ৯১ ৩৫৪ ২২৪৩৩১৯ , চলভাষ- ৯৮০০৭০৭০৩৯ ।

এছাড়া বহু হোটেল ও হোম স্টে আছে মিরিকে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More