মনকাড়া মংপু

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রত্না ভট্টাচার্য্য
    শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

    সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

    এ পথে আমি যে গেছি বার বার
    ভুলি নি তো একদিনও

    আক্ষরিক এবং বাস্তবিক ভাবেই কবি একবার দুবার নয় পর পর চারবার যে পথে পাড়ি দিয়েছেন সে পথ হল মংপুর পথ। মংপুর এমনই অমোঘ আকর্ষণ। এরকম একটি জায়গায় যাবার ইচ্ছা মনের গোপন কুঠুরিতে সযত্নে লালন করা ছিল অনেকদিন, এবার সুযোগ আসাতে একদম চোখ কান বুজে আত্মসমর্পণ করে ফেললাম মংপুর কোলে।

    আমাদের গাড়ি চলেছে রম্ভি হয়ে। রম্ভিবাজার থেকে মংপু পাহাড়টি স্পষ্ট দেখা যায়। মংপুর উচ্চতা প্রায় কার্সিয়াং এর কাছাকাছি। দুপাশের নিসর্গ বর্ণনার জন্য বরং ফিরে যাই মৈত্রেয়ী দেবীর লেখায়। তাঁর থেকে ধার করে বলি— ”ঘন বনের ভিতর দিয়ে এঁকে বেঁকে সরু পাহাড়ী পথ দিয়ে গাড়ি নামতে লাগল। ম্লান রোদ্দুর অসংখ্য আলোছায়ার ছবি আঁকছে গাছের তলায় তলায়। ঘন পরিচ্ছন্ন পথ দিয়ে মেঘ কুয়াশার রাজ্য ছাড়িয়ে মংপুতে যখন নামলুম রোদ চারিদিকের ধোয়া সবুজের উপর ঝিলমিল করছে, শেষ বেলার রোদের সুন্দর শান্ত হাসি।” মৈত্রেয়ী দেবীর চোখে এই হল মংপুর চিত্র।
    মংপুতে পা দিয়ে কবির অনুভূতি মৈত্রেয়ী দেবীকে— ”কি সুন্দর এই সামনের ঢালু পাহাড়টি, আকাশের কোল থেকে সবুজ বন্যা নেমে এসেছে। আমি মাটির কাছাকাছিই থাকতে চাই।”

    মৈত্রেয়ী দেবীর সময়কার মংপুর সঙ্গে আজকের মংপুর যে বিরাট পরিবর্তন হয়েছে তা বোধহয় নয়। কারণ মংপু আজও বড্ড নিরিবিলি। পাহাড় এখানে খোলামেলা, মেঘ, কুয়াশা, রোদ্দুর পালাক্রমে খেলা করে চলেছে পরস্পরের সঙ্গে।

    মংপুর বড় আকর্ষণ একদিকে সিঙ্কোনা বাগান অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ। কবিগুরুর স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি এখন রবীন্দ্রভবন। এই বাড়িটিতেই একদা মৈত্রেয়ী দেবী বাস করতেন। তাঁর স্বামী ডঃ মনোমোহন সেন ছিলেন কুইনোলজিস্ট অর্থাৎ কুইনাইন বিশেষজ্ঞ, পরবর্তীকালে তিনি কুইনাইন ফ্যাক্টরির ডাইরেক্টর হন। মংপুর সঙ্গে সিঙ্কোনা চাষ নিবিড়ভাবে যুক্ত। অনেকের ধারণা চা গাছের পাতার মতো বোধহয় সিঙ্কোনার পাতা দিয়ে কুইনাইন তৈরি হয়। আসলে কুইনাইন তৈরি হয় সিঙ্কোনা গাছের ছাল দিয়ে। এই কুইনাইনের ফ্যাক্টরিটি রবীন্দ্রভবনের বিপরীত দিকে অবস্থিত।


    আমরা বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছি রবীন্দ্রভবন বা বলা ভালো রবীন্দ্র সংগ্রহশালার সামনে। কাঁচের দরজা জানালা দেওয়া দুধ সাদা বাড়ি। সংগ্রহশালার প্রবেশপথের বাঁদিকে রয়েছে কবির মর্মর মূর্তি। বাংলোটির চারিদিকে সবুজ গাছপালা, রঙিন ফুলে সজ্জিত। সুন্দর পাহাড়ে ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশটি এক লহমায় মনকে বিহ্বল করে তোলে। সবুজঘাসের লন পেরিয়ে লম্বা টানা বারান্দা। বারান্দাতেই একটি আরাম কেদারায় সাদা চাদরের উপর কবিগুরুর ছবি। সামনে ফুলের অর্ঘ্য, জ্বলছে সুগন্ধী ধূপ। এই স্থানটিতে কবি প্রতিদিন ভোরবেলা সমাহিত চিত্তে ধ্যানে বসতেন। ওই স্থানের দেওয়ালে একটি তিনফুট লম্বা ও আড়াই ফুট চওড়া তাম্রফলক প্রোথিত করা আছে। এই ফলকটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শ্রীযুক্ত মনোমোহন সেন, কবির এই গৃহে আগমনের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য।

    বাড়িটিকে ধুয়ে মুছে যত্ন করে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কবির স্মৃতিগুলিকে পর্যটকদের কাছে যিনি প্রদর্শন করেন তিনি হলেন নেপালি কেয়ারটেকার শিশির রাউত। ওনার ঠাকুরদা একদা ছিলেন কবির পাল্কিবাহকদের একজন। ওনাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণ চলছে। শিশির রাউতের সঙ্গে পরিচয় না হলে বুঝতে পারতাম না কবির প্রতি এই মানুষটির ভক্তি বা অনুরাগ কতটা!

    শ্রী রাউত পর্যটকদের নিয়ে বিভিন্ন ঘরে রাখা কবির ব্যবহৃত জিনিষগুলি দেখাচ্ছেন এবং বর্ণনা করে চলেছেন। কখনও চোখ বুজে রবীন্দ্র কবিতা আউড়ে যাচ্ছেন, কখনও বা গেয়ে উঠছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের কয়েক লাইন। একটি পেপার ওয়েট আমাদের হাতে দিয়ে নিখুঁত ভাবে গেয়ে উঠলেন একটুকু ছোঁয়া লাগে, দু–চার কলি গাওয়ার পর বললেন কবির স্পর্শ রয়েছে ওতে। তিনি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমাদের দেখালেন বাঁদিকের ছোট ঘরটি। কাঁচ দিয়ে ঘেরা ঘরে রয়েছে লেখার টেবিল- চেয়ার, এখানে বসে লেখালিখি, ছবি আঁকা, পড়াশুনা করতেন। তন্ময় হয়ে বসে চেয়ে থাকতেন দূরে মৌনীস্তব্ধ পাহাড়ের দিকে।

    কবির ব্যবহৃত খাট যেটি আধশোয়া বা শোয়া দুই অবস্থাতেই ব্যবহার করা যেত। রয়েছে বায়োকেমিক্সের বাক্স, রং তুলি। অতীতের সংবাদপত্র, পাণ্ডুলিপি, অসংখ্য চিত্র, চিঠিপত্র ইত্যাদি। অদ্ভুত কবির স্নানের জায়গাটি। সুন্দরভাবে গরমজল ঠান্ডা জল আসার বা বেরুনোর ব্যবস্থা আছে। আধুনিক চিন্তা ভাবনায় তৈরি বাথটব।


    কবির বড় প্রিয় ছিল এই মংপু। তিনি ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ এর মধ্যে চারবার ছুটি কাটাতে এসেছেন মংপুতে। ১৯৪০ এর এপ্রিলে চতুর্থবার মংপুতে আসেন ও ২৫শে বৈশাখের জন্মোৎসব পাহাড়ি প্রতিবেশীদের সাহায্যে এই বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। জন্মদিন নামক তিনটি কবিতা সেইদিন রচনা করেছিলেন। শেষ কবিতাটিতে আছে –

    অপরাহ্ণে এসেছিল জন্মবাসরের আমন্ত্রণে
    পাহাড়িয়া যত।
    একে একে দিল মোরে পুষ্পের মঞ্জরী
    নমস্কার সহ।

    প্রায় তিনশত মজদুর সে উৎসবে যোগ দিয়েছিল। কবি যে কেবল মংপুর প্রকৃতিতে মজে ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন মানুষের কবি তাই তিনি মানুষকে খুঁজেছিলেন। তিনি বলতেন, যাদের মধ্যে এসেছি, যাদের ওই দূরের রাস্তায় ঘোড়ার পিঠে বোঝা চাপিয়ে যাতায়াত করতে দেখছি তারা কেমন, তাদের কাছ থেকে দেখতে চাই। অতএব তাঁর জন্মদিনে এইসব মানুষগুলো যে আসবে তাতে আর আশ্চর্যের কি!

    আজ যে মংপু তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে সেটি বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথের লেখবার টেবিলের উপর যে স্মারক খাতাখানি রয়েছে তার পাতা ওল্টালেই। খাতাখানি চিনা, জাপানি, জার্মানি ও ফরাসি নানা ভাষার লেখায় পূর্ণ হয়ে আছে।

    তবুও একটা বড় প্রশ্ন থেকে যায়। যতটা পাদপ্রদীপের আলোয় মংপুর আসার কথা ছিল ততটা কি আসতে পেরেছে? সে এখনও প্রচারের আলোর বাইরেই থেকে গেছে। মংপুকে ছেড়ে যেতে যেতে ভাবি অরণ্য নিসর্গ পাহাড়ি ঢালে ছোট ছোট বাড়ি, মেঘ কুয়াশা, রং বেরঙের ফুল, নিটোল নির্জনতা সব নিয়ে মংপু কিন্তু যে কোনও জনপ্রিয় পাহাড়ি অঞ্চলকে টক্কর দিতে পারে অথচ পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার কোনও প্রচেষ্টাই এখনও পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি। তাই অন্যান্য পাহাড়ি শহরের তুলনায় মংপু কিছুটা ব্রাত্যই থেকে গেছে।

    মংপুতে কেউ থাকতে চাইলে থাকতে পারেন সিঙ্কোনা প্লানটেশন বাংলোতে। যোগাযোগের নম্বর – ০৩৫৫২ ২৬৬২২৫। এছাড়া যোগীঘাট, সিটং, ঘালেটার বা কালিম্পং প্রভৃতি জায়গায় থেকে মংপু ঘুরে দেখে নেওয়া যায়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More