রবিবার, নভেম্বর ১৭

ছোটরানি কার্সিয়াং

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। এবার থেকে সেই দায়িত্ব আমাদের। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই শুরু হল নতুন এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না,

সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।

নানা রঙের দিনগুলি ফেলে এসেছি ঠিকই কিন্তু আজও অমলিন রয়ে গেছে স্মৃতির মণিকোঠায়। এবারে আমাদের ঘোরা কার্সিয়াংকে কেন্দ্র করে। দার্জিলিং, কালিম্পং, গ্যাংটক যখন পর্যটকের ভিড়ে হাঁসফাঁস অবস্থা তখন এক কোণে কার্সিয়াং মুখ লুকিয়ে বসে আছে। আর আড়ালে থাকার জন্যই সে স্বতন্ত্র, অনন্য এবং আমাদের মতো মানুষজন যাদের ভিড় একেবারেই না পসন্দ তাদের কাছে এত প্রিয়।

বর্তমানে রোহিণী হয়ে অসাধারণ একটি টোল রোড চালু হয়ে যাওয়ার ফলে কার্সিয়াং এখন সারা দেশের সবচেয়ে সুগম হিল স্টেশনগুলির একটি। সমতলের শিলিগুড়ি থেকে খুব অল্প সময়ে পাহাড়ের শীতল কোলে পৌঁছে যাওয়া যায়। দার্জিলিং থেকে মাত্র ৩২ কিলোমিটার দূরে ৪৮৬৪ ফুট উচ্চতায় কার্সিয়াং–এর অবস্থান। সারা বছর এখানে স্নিগ্ধ ও স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার সান্নিধ্য পাওয়া যায়। দার্জিলিং যদি বড়রানি হয় তাহলে কার্সিয়াং ছোটরানি।

 

কার্সিয়াং টুরিস্ট লজে আমাদের বুকিং ছিল আগে থেকেই। এখানে লাগেজ রেখে একটি গাড়ি ভাড়া করে কার্সিয়াং ঘুরতে বেরুলাম। বেশিরভাগ পর্যটকের ধারণা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও চা বাগান ছাড়া কার্সিয়াং–এ দেখার কিছু নেই। কথাটা সঠিক নয়। মাথায় রাখতে হবে কার্সিয়াং এমনই একটি জায়গা যেটি একাধিক মহাপুরুষদের পদধূলিধন্য।

 

নিষ্কলুষ পাহাড়ি পরিবেশে কবিগুরু সাহিত্য রচনার প্রেরণা পান। ১৮৮৫ সালে মার্ক টোয়েনও এখানে কয়েকটি দিন কাটিয়ে গেছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অতুলপ্রসাদ সেন কার্সিয়াং–এর সৌন্দর্যে অভিভূত হয়েছিলেন। ভগিনী নিবেদিতা পাহাড়ি নির্জনতাকে সঙ্গী করে বাড়ি বানিয়ে কিছুদিন ছিলেন। গিদ্দা পাহাড় বা গিরধরপুরে তো ভবানীপুরের বসু পরিবারের বাড়িই ছিল।

 

আমাদের গাড়ির চালক আদিত্য বেশ স্মার্ট লেখাপড়া জানা ছেলে। অনেককিছু খবর রাখে। নেপালি হলেও ঝরঝরে বাংলা বলে কারণ ও কিছুদিন কলকাতায় ছিল। ওর কাছেই জানলাম লেপচা ভাষায় কার্সিয়াং শব্দের অর্থ অন্যায় আর নেপালি ভাষায় খারসাং শব্দের অর্থ  ভোরের ধ্রুবতারা। খারসাং অপভ্রংশে কার্সিয়াং। পাহাড়ি জনপদ কার্সিয়াং–এর জনগোষ্ঠী হল  মূলত নেপালি ও লেপচা। কার্সিয়াং অতীতে ছিল সিকিমের অংশ। সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে এই অঞ্চল চলে যায় নেপালের অধীনে। কয়েক দশক পরে ব্রিটিশরা কার্সিয়াং দখল করে। ১৮৩৫ থেকে কার্সিয়াং হয়ে ওঠে ব্রিটিশদের গ্রীষ্মাবাস।

 

হিলকার্ট রোড ধরে দুই কিলোমিটার দূরে গৃধ্র পাহাড়। লোকের মুখে হয়েছে গিদ্দা পাহাড়। কথা বলতে বলতে গিদ্দা পাহাড়ে পৌঁছে যাই। এক জায়গায় একটি দুধ সাদা রঙের বাড়ি দেখিয়ে বলে এটাই নেতাজির দাদার বাড়ি। আমরা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বাম দিকে দেখি সুভাষচন্দ্রের হাফ বাস্ট মূর্তি। আর একটু উঠেই দেখতে পাই নেতাজির দাদার হাতে পোঁতা ক্যামেলিয়া ফুলের গাছটিকে। বাড়িটি আসলে নেতাজির দাদা শরৎচন্দ্র বসুর। ১৯২৬ সালে নেতাজি এখানে সাত মাস গৃহবন্দি ছিলেন। বর্তমানে বাড়িটি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস মিউজিয়ামে পরিণত হয়েছে। পরপর ঘরগুলোয় নেতাজির জীবনের দুষ্প্রাপ্য চিঠি, ছবি কাঁচের শো–কেসে বন্দি। বয়স্ক কেয়ারটেকার এসে আলো জ্বালাতেই ইতিহাস জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে ধরা দিল। পুরনো সেইসব আসবাবপত্র, আইএনএ’র স্ট্যাম্প, পোশাক, জুতো সবকিছু রয়েছে এখানে। সব কিছুতে যত্নের ছাপ।

একমনে নিবিড়ভাবে সব দেখছিলাম হঠাৎ চেঁচামেচিতে সম্বিত ফিরল, তাকিয়ে দেখি রাজস্থান থেকে আগত একদল বৃদ্ধ–বৃদ্ধা, মাথায় তাদের বিশাল পাগড়ি। তারাও আগ্রহ নিয়ে সব দেখছে। ভালো লাগল কার্সিয়াং–এর ড্রাইভারদের যারা পর্যটকদের এখানে নিয়ে আসছে। যত পর্যটক আসবে তত জায়গাটা সজীব সচল থাকবে নাহলে তো সব কালের গহ্বরে হারিয়ে যাবে।

ফিরে যাওয়ার পথে হঠাৎ আঁচলে টান, পিছনে তাকিয়ে দেখি ক্যামেলিয়ার ডালে কিভাবে আঁচলটা আটকে গেছে। হতে পারে কাকতালীয় কিন্তু প্রথমেই চেয়েছিলাম ওকে স্পর্শ করতে, আদর করতে কিন্তু নিষেধাজ্ঞার বোর্ড দেখে আর সাহসে কুলোয় নি। এবার আর বাধা  নেই। আঁচল ছাড়ানোর অছিলায় গাছটার সাথে ইতিহাসকে স্পর্শ করলাম। শ্রদ্ধায় মাথা নোয়ালাম তাঁর উদ্দেশ্যে যিনি এক বুক স্বপ্ন দেখেছিলেন, দেখিয়েছিলেন তাঁর দেশকে নিয়ে, প্রিয় মাতৃভূমিকে নিয়ে। যারা দার্জিলিং বেড়াতে যান, তাদের প্রত্যেকের উচিৎ এই পবিত্র তীর্থভূমি ঘুরে যাওয়া।

এবার আদিত্য যেখানে নিয়ে গেল সেটি হল একটি পার্ক, বড় অদ্ভুত তার নাম। ‘ঈগলস ক্র্যাগ’। পার্কে ঢুকলেই যেটি সবার আগে চোখ টানে তা হল একটি স্তম্ভের মাথায় বিশাল একটি কুকরি গাঁথা। পাশে এক কোণে ওয়াচ টাওয়ার। টাওয়ার থেকে কার্সিয়াংকে ছবির  মতো লাগছিল। দক্ষিণ–পূর্ব দিকে নীচে তিস্তা বয়ে চলেছে, দূর থেকে সরু ফিতের মতো মনে হচ্ছিল। ফুলে ফুলে ভরা পার্কটি সুন্দর।

কার্সিয়াং–এর অনেক কিছুতেই বিদেশি ছোঁয়া রয়েছে। আসলে ব্রিটিশদের স্বাস্থ্যাবাসের কারণে এখানকার পরিবেশে একটু বিদেশি আভিজাত্য আছে। এখানকার অন্যতম গৌরব ট্রয় ট্রেন। ১৮৮০ সালে দার্জিলিং হিমালয়ান রেল কার্সিয়াং পর্যন্ত চালু করলে কার্সিয়াং জনপ্রিয় হয়ে  ওঠে। কার্সিয়াং থেকে ট্রয় ট্রেনে দার্জিলিং ঘুরে আসার মজাই আলাদা। ৫২৫৮৭ কার্সিয়াং- দার্জিলিং প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি কার্সিয়াং থেকে ভোর ৬.৩০ মিনিটে ছেড়ে আড়াই ঘণ্টা বাদে দার্জিলিং পৌঁছায় সকাল ৯.০৫ মিনিটে। ফিরতি ৫২৫৮৮ দার্জিলিং- কার্সিয়াং প্যাসেঞ্জার  ট্রেনটি দার্জিলিং থেকে বিকেল ৪.০০ মিনিটে ছেড়ে কার্সিয়াং পৌঁছায় ৬.৩০ মিনিটে।

অনেকক্ষণ থেকে একটু চা পানের জন্য উসখুস করছিলাম। পরপর চা বাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছি অথচ চায়ের দোকান দেখতে পাচ্ছি না। আদিত্য বুঝতে পেরে বলে, ”দাঁড়ান একেবারে খোদ চা বাগানের মধ্যে নিয়ে গিয়ে চা খাওয়াব।” এবারে সে নিয়ে গিয়ে ফেলল বহুশ্রুত বিখ্যাত মকাইবাড়ি টি এস্টেটে। শতাব্দী প্রাচীন এই ফ্যাক্টরিতে ঘুরে দেখতে প্রবেশ মূল্য ৩০ টাকা। প্রবেশ মূল্যের সঙ্গে পাওয়া টুপি পরে ঘুরে দেখলাম শতাব্দী প্রাচীন বিদেশি যন্ত্রের সাহায্যে চা তৈরির বিভিন্ন ধাপ। একজন গাইড সব বুঝিয়ে দেখিয়ে দিলেন।

ফ্যাক্টরি দেখে এসে অফিসে ঢুকে প্রণয় ভুজেল যিনি দায়িত্বে ছিলেন তার সঙ্গে কথায় কথায় জানতে পারলাম এখানকার চা জৈব পদ্ধতিতে চাষ হয়। মার্চ থেকে নভেম্বরের মধ্যে তিনবার চা পাতা তোলা হয়। যেগুলি ফার্স্ট ফ্লাশ, সেকেন্ড ফ্লাশ ও অটাম ফ্লাশ নামে পরিচিত। এবার চা কেনার জন্য দাম জানতে চক্ষু চড়কগাছ, ১০০ গ্রাম প্যাকেটের দাম ১৫০০ টাকা, ১৩০০০ টাকা ইত্যাদি। চা কেনা আর হল না। প্রণয় জানালেন এই দামের চা স্বাদ নিতে চাইলে ৩০ টাকা ও ৫০ টাকা মূল্যে পাওয়া যাবে। এক লাখ তিরিশ হাজার টাকা দামের স্বাদই নিলাম ৫০ টাকা মূল্যে। মন্দ লাগলো না, তবে এত হালকা লিকার যে নেশা কাটলো না।

 

কাছেই মকাইবাড়ি চা বাগান। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সবুজ বাগিচা যেন সবুজ সমুদ্র। এ এক অপরূপ সৌন্দর্য। মকাইবাড়িতে কতকগুলি হোম স্টে আছে যেখানে থাকা যায়। একদিন বাদে এসে নির্জন কোলাহলহীন এখানে দু’দিন কাটাবো। ফাঁকা আছে দেখে বুক করে ফেললাম।

কার্সিয়াং এ থাকার ঠিকানা

কার্সিয়াং টুরিস্ট লজ, চলভাষ- ৯৭৩৩০০৮৭৭৯

মকাইবাড়িতে থাকার ঠিকানা

মকাইবাড়ি টি এস্টেট, নয়ন লামা, চলভাষ- ৯৮৩২৪৪৭৭৭৪, ৭৮৬৪৯০৭৮০৫

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেড়িয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

 

Comments are closed.