অরণ্যময় কাঁকড়াঝোড়

৬৬

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

শরতের নীল আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ মনকে উদাস করে দিচ্ছে, এই সময় ইঁট কাঠ ছেড়ে যদি প্রকৃতির কাছে নিজেকে নিয়ে যাওয়া যায় তাহলে বাকি কাজটা প্রকৃতিই করে দেয়। শহরেও এমন আকাশ দেখা যায় কিন্তু জঙ্গলের মাঝে সবুজের আঙিনায় মাথার উপর নীল আকাশ দেখার মজা একদম অন্যরকম। সর্বোপরি জঙ্গলের ঘ্রাণ, নির্জনতা বড় আপনভোলা করে দেয়। তাই তো ছুটে যাওয়া এত পথ পেরিয়ে প্রকৃতির কোলে। জঙ্গল কমে আসছে, পশ্চিম মেদিনীপুরের দিকে এখনও আছে কিছুটা। তাই কাঁধে ঝোলা ফেলে কাঁকড়াঝোড়ের উদ্দেশ্যে যাওয়া।

ঝাড়খণ্ড ও বাংলার সীমান্তে অবস্থিত কাঁকড়াঝোড়। কাঁকড়া অর্থ পাহাড় আর ঝোড় অর্থ জঙ্গল। বাস্তবিক নামের সঙ্গে জায়গার এমন অপূর্ব মেলবন্ধন লক্ষ্য করার মতো। পাহাড় আর জঙ্গলের ঘেরাটোপে এক স্বপ্নসুন্দর পর্যটন কেন্দ্র কাঁকড়াঝোড়। বাঁশপাহাড়ি থেকে ছোট্ট ছোট্ট ছবির মতো সুন্দর গ্রাম চাকাডোবা, কাশমোর, কাশীডাঙা, ছুরিমারা, ময়ূরঝরনা হয়ে পথ গিয়েছে কাঁকড়াঝোড়ে। অদূরেই রয়েছে দলমা পাহাড় আর সবুজ বনানী। পাহাড়ের শরীর আর এলাকা জুড়ে রয়েছে গভীর জঙ্গল। কাঁকড়াঝোড়ের জঙ্গল তিন জেলা ও এক রাজ্যের সীমানা জুড়ে অর্থাৎ মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ওদিকে ঝাড়খণ্ডের দলমা। কুসুম, শাল, পিয়াশাল, সেগুন, মহুয়া আকাশমণিতে ছাওয়া ভৈরব পাহাড়ের গা ঘেঁষে ৯০০০ হেক্টরের গহন বনে চরে বেড়ায় ভালুক, বুনো শুয়োর, হায়না, সম্বর। রাতের বেলা নেমে আসে কেন্দু ও মহুয়ার লোভে। আবার হাতির পালও কখনও সখনও দলমা থেকে নেমে এসে পথ অবরোধ করে দাঁড়ায়। এরা আসে পার্বত্য নদীতে জল খেতে। সামান্য ঘোরাফেরা করে আবার ফিরে যায় দলমায়। ভাগ্য ভালো থাকলে পথে সাক্ষাৎ হয়ে যেতে পারে দলমার দামালদের সঙ্গে।

কাঁকড়াঝোড়ে কাজু, কফি ও কমলালেবুর চাষ হচ্ছে। শীতকাল মনোরম হলেও প্রখর গ্রীষ্ম এড়িয়ে যে কোনও সময় এখানে আসা যায়, তবে চাঁদনি রাতে কুহকী পরিবেশ বুকের মধ্যে সারেঙ্গির ছড় টানতে থাকে। ভৈরব পাহাড়ের গা ঘেঁষে কাঁকড়াঝোড়ের পাশ দিয়ে বয়ে যায় পাহাড়ি নদী খরা। পাহাড়ি নদীর পাড় ধরে হাঁটলে দেখতে পাওয়া যায় কম-বেশি ২৮টি গ্রামে শতাধিক পরিবারে হাজারের মতো মুণ্ডা, সাঁওতাল ভূমিজ উপজাতির বাস। সামান্য চাষবাস হলেও এদের নির্ভর করতে হয় কেন্দুপাতার উপর। কেন্দুপাতা থেকে বিড়ি তৈরি হয়। জঙ্গলের বনৌষধি লতাগুল্মের মধ্যে রয়েছে অনন্তমূল, শতমূল, কালমেঘ ইত্যাদি। এছাড়া সাবাই ঘাসের বন থেকে তারা দড়ি তৈরি করে, সে দড়ি বিকোয় কাঁকড়াঝোড়ের সপ্তাহান্তিক হাটে। গ্রামের পথে প্রায়শই চোখে পড়ে সাবাই ঘাস থেকে দড়ি তৈরিতে ব্যস্ত মহিলারা।

শহুরে চিঁড়েচ্যাপ্টা একঘেয়ে বিষণ্ণ দিনযাপনের মধ্যে দক্ষিণের খোলা জানলার হাওয়ার আস্বাদ নিতে চাইলে পর্যটকদের একবার আসতে হবে কাঁকড়াঝোড়ে, যার পশ্চিমে সীমানা টেনেছে ঘর্ঘরা নালা তথা ভৈরবী নদী। এপারে বাংলা ওপারে ঝাড়খণ্ড। ভৈরবীর হাঁটুজল ভেঙে আরণ্যক পথে বোল্ডারের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে মাকুলি নদী, গিয়ে পড়েছে সুবর্ণরেখায়। চড়াই পথে মাকুলি ঝরনাটিও অনবদ্য।

ঝাড়গ্রাম থেকে কাঁকড়াঝোড়ের দূরত্ব ৭৯ কিলোমিটার আর বেলপাহাড়ি থেকে ১৮ কিলোমিটার। বেলপাহাড়ি থেকে একটু এগিয়ে বাঁ দিকে ওদলচুয়ার রাস্তা হয়ে কাঁকড়াঝোড় যাওয়া যায়। এখন এ পথে ওদলচুয়া হয়ে বাসও যাচ্ছে। মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম থেকেও বাস যোগাযোগ রয়েছে। এখান থেকে ঘাটশিলা হয়েও ঘোরা যায়। জঙ্গলে কিছুটা পথ হেঁটে কাশীদা, তারপর সেখান থেকে বাসে ঘাটশিলা যাওয়া যায়। ট্রেকিংয়ের ইচ্ছে থাকলে কাঁকড়াঝোড়কে কেন্দ্র করে ছোট ছোট ট্রেক অনায়াসে করা যায়। আগে যেমন অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা ভুলাবেদায় নেমে ১০ কিলোমিটার মতো পথ ট্রেক করে জঙ্গলের পথ ধরে কাঁকড়াঝোড়ে পৌঁছতেন। এখনও সে রোমাঞ্চ ইচ্ছে করলেই নেওয়া যায়।

থাকার জন্য রয়েছে বনবিভাগের বনবাংলো, পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন নিগমের প্রকৃতি ভ্রমণ কেন্দ্র। যদিও সাময়িকভাবে এগুলির বুকিং বন্ধ আছে। আর আছে আদি অকৃত্রিম মাটির দোতলা বাড়ি রোম্যান্টিক মাহাতো লজ। এখানে থাকতে হলে টর্চ, জল পরিশোধক, মশা তাড়াবার ধূপ বা ক্রিম সঙ্গে থাকা অত্যন্ত জরুরি। কাঁকড়াঝোড় থেকে ঘুরে আসা যায় কেটকি ঝর্ণা, বেশ মজা লাগবে।

কাঁকড়াঝোড় থেকে গাড়ির পথে কদমডিহা, বুরিঝোড়, শুষনিজীবি হয়ে সিঙ্গাডোবা গ্রাম। এখান থেকে মোরাম পথে ২ কিলোমিটার গেলেই এক অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে কেটকি ঝরনা। পাহাড়ি ঝোরার জল আটকে এক বিস্তীর্ণ জলাশয়। ফাঁকা নির্জনে সিঙ্গাডোবা ও বুরিঝোড় গ্রামের সীমান্ত বাঁধে বন্দি চেরারাং পাহাড়ের কেটকি ঝরনা। চেরারাং পাহাড় পেরোলেই ঝাড়খণ্ড রাজ্য। এখানেই আপন খেয়ালে শুঁড় দুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় বুনো হাতির দল। মনের আনন্দে উড়ে বেড়ায় টিয়া, নীলকণ্ঠ-সহ কত ঝাঁক ঝাঁক পাখি। আশপাশের গ্রামে এখনও খাবারের খোঁজে হানা দেয় হায়না।

ঝরনার কিছুটা আগে পর্যন্ত গাড়ি যায়। এরপর একটু হেঁটে কেটকি ঝরনার কাছে পৌঁছনো যায়। হাঁটতে হাঁটতে মিলবে বাবুই ঘাসের অভ্যর্থনা। বেলপাহাড়ি থেকে ওদলচুয়া ১১ কিলোমিটার। এই পথে গজডুংরি, চুটিয়াডুংরি ঠাকুরান পাহাড়ে ঘেরা রাস্তায় সৌন্দর্যে মনে হবে এ তো আর এক ভূস্বর্গ! ওদলচুয়া থেকে ৩ কিলোমিটার পথ গিয়ে সিঙ্গাডোবা গ্রাম, সেখান থেকে ২ কিলোমিটার গেলেই কেটকি ঝরনা। অ্যাডভেঞ্চার করতে যারা ভালবাসেন তারা কেটকি ঝরনা থেকে ৭ কিলোমিটার জঙ্গলের পথ ধরে কাঁকড়াঝোড় অবধি ট্রেক করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই একজন দক্ষ গাইডের দরকার হবে। সিঙ্গাডোবা অবধি ট্রেকার পাওয়া যাবে, বাকি ২ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হবে। রিজার্ভ গাড়িতে ঝরনা পর্যন্ত সরাসরি যাওয়া যাবে।

কাঁকড়াঝোড়ে থাকার ঠিকানা হল—মাহাতো লজ, (মাটির দোতলা বাড়ি ), যোগাযোগ মধুসূদন মাহাতো, চলভাষ- ৮৯৬৯৫৯০৬৬২, চন্দ্র মাহাতো, চলভাষ- ৮২৯৪০৭৫৪২৫।

এছাড়া ঝাড়গ্রামে রাত্রিবাস করে জায়গাটি ঘুরে দেখে নেওয়া যায়।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেড়িয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা  

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More