শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

নদীর মাথায় বাংলো হাতিবাড়ি

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। এবার থেকে সেই দায়িত্ব আমাদের। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই শুরু হল নতুন এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

১৪২৬ বঙ্গাব্দের আনন্দ পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক নলিনী বেরার ‘সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা’ পড়তে পড়তে শুশুকের মত হঠাৎ ভুস করে একটি নাম মাথায় জেগে উঠল হাতিবাড়ি। নামটি বড্ড বেশি রোমান্টিক, মনে হয় এক ছুটে চলে যাই। কলকাতার এত কাছে একাধারে নদী ও জঙ্গলের এরকম মেলবন্ধন যেখানে না এলে বোঝানো কঠিন হাতিবাড়িতে ঠিক কী আছে। পশ্চিমবঙ্গ-ওড়িশা-ঝাড়খণ্ড তিন রাজ্যের সীমান্ত এলাকায় এর অবস্থান। একটা সময় হাতিদের করিডর থাকলেও এখন আর তা নেই। ঝাড়গ্রাম থেকে বাসে অথবা গাড়িতে ৬২ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাওয়া যাবে হাতিবাড়ি। প্রসিদ্ধ জনপদ গোপীবল্লভপুর থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে এক অসাধারণ বনঠিকানা এই হাতিবাড়ি।

বনতোরণ পেরোলেই ঘন শালের বন। বনের ভিতর বাংলো। বেশ নীচে সুবর্ণরেখা। বলা যায় নদীর মাথায় বাংলো। বাংলোর চারপাশে রঙিন ফুলের বাগান। ইটের কেয়ারি করা  মোরামের লন। চৌহদ্দির শেষ প্রান্তে শালগাছের নীচে সিমেন্টের একাধিক বেঞ্চ ও টেবিল। চারদিক নিঝুম ও নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে পাখির ডাক। হাতিবাড়ির জঙ্গলে কিন্তু কোনও বড় জন্তু জানোয়ারই নেই। নাম হাতিবাড়ি হলেও হাতি নেই ঠিকই কিন্তু জঙ্গলে খটাশ, বেজি, খরগোশ, সাপ, গোসাপের যাতায়াত আছে। বাংলোর চওড়া বারান্দায় বসে কাঞ্চন, শাল, বহেড়া, চন্দন, ক্রোটন, করমের শোভা অনায়াসেই উপভোগ করা যায়।

আপাতদৃষ্টিতে নিঝুম, নিস্তব্ধ মনে হলেও বনজঙ্গলের একটা ভাষা আছে। চুপ করে বসে থাকলে তা উপলদ্ধি করা যায়। তার নিজস্ব ভাষা দিনে, রাতে, ঋতুতে ঋতুতে বদলায়। আছে পাতা ঝরার শব্দ, শনশন বাতাস বয়ে যাবার শব্দ, বাতাসে পাতা কাঁপার শব্দ। বৃষ্টি পড়লে টাপুর টুপুর, ঝড় উঠলে মাতালের মত দুলতে থাকে গাছপালারা, এ ওর সঙ্গে মাথা ঠোকাঠুকি করে। রাতের আঁধার খান খান হয়ে যায় পেঁচা ও তক্ষকের তীক্ষ্ণ চিৎকারে। আর রাত যদি পূর্ণিমার হয় তাহলে তো কথাই নেই। চাঁদের আলো সৃষ্টি করে এক স্বপ্নিল পরিবেশ। বাংলোয় বসে স্বর্গীয় আনন্দ উপভোগ করা এক উপরি পাওনা বলে মনে হয়।

বাংলোর পাশ দিয়ে একটা রাস্তা নেমে গেছে সুবর্ণরেখার ধারে। ঘাটশিলা থেকে বয়ে এসে সুবর্ণরেখা হাতিবাড়িতেই সমতলে নেমেছে। সুবর্ণরেখা দিনে, দুপুরে, রাতে এক একসময় এক এক রূপ ধারণ করে। এখানে সে ধীর, গম্ভীর, শান্ত, বেশ চওড়া ও গভীর। একসময় এ নদীর বালির সঙ্গে নাকি বয়ে আসত সোনা। সেই সোনার খোঁজে স্থানীয় মানুষজন নদীর পাড় চষে বেড়াত। এখন সোনা না খুঁজলেও মাঝি মাল্লারা খুঁজে চলেছে জলের রূপালি ফসল– আড়, বাউস, চন্দনা, ইলিশ, চিংড়ি ইত্যাদি। ভাসমান ছোট ছোট নৌকা সুবর্ণরেখার বুকে যেন ফ্রেমে আঁটা সজীব চিত্র। বিশাল বিশাল পাথর নদীর বুকে উঁচিয়ে আছে। এরকম নদী দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে তার বুকে কিন্তু সেটা করা  একদমই উচিৎ হবে না কারণ জলে রয়েছে ছোট বড় নানা মাপের ঘূর্ণি। আপাতদৃষ্টিতে বোঝা না গেলেও ঘূর্ণিতে পড়লে পাকে পাকে জড়িয়ে টেনে নিয়ে যাবে জলের অতলে। অতএব নদীতে নেমে স্নান না করে দূর থেকে নদীর শোভা উপভোগ করাই নিরাপদ। নদীপাড়ে বসেই আলসেমি করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাবে।

বনবাংলো থেকে সামান্য দূরে সাতমা গ্রাম। এখানে আছে ছৌ নাচের দল। এরা মুখোশ ব্যবহার করে না, মুখে রং মেখে নাচে। নাচের তালে তালে বাজে ধামসা, মাদল, কেঁদরি। বনবাংলো থেকে এক দেড় কিলোমিটার নদীর পাড় ধরে হাঁটলে সুবর্ণরেখা হেঁটে পার হওয়া যাবে। নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে পাওয়া যাবে ৪১ ঘরের গ্রাম হাতিবাড়িকে। বাংলোয় বসে এই গ্রামের অস্তিত্ব বোঝাই যায় না। এখানে রয়েছে একটি সাধারণ শিব মন্দির।

যাওয়া যেতে পারে গোপীবল্লভ জিউর মন্দির। গোপীর মূর্তিটি উচ্চতায় তিন ফুট। কালো কষ্টিপাথরের এরকম অনিন্দ্যসুন্দর মূর্তি সারা ভারতবর্ষে বিরল বলা যায়। এই মন্দির বা মূর্তির খ্যাতি প্রবলভাবে বিরাজমান সমগ্র বৈষ্ণব সমাজের কাছে। যদি গরমকালে যাওয়া যায় তাহলে কালো মূর্তির গলায় মোটা স্বর্ণচাঁপার মালা বাকরুদ্ধ হয়ে বিস্ফারিত নেত্রে দেখতে হয়। মন্দিরময় স্বর্ণচাঁপার সুবাস। শ্রীপাট গোপীবল্লভপুর গুপ্ত বৃন্দাবন নামে খ্যাত। কথিত আছে যে, এখানে শ্রীল গোবিন্দ স্বয়ং বিরাজ করেন। বাস্তবিকই মন্দিরে প্রবেশ করে রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি দর্শন করলে মনে এক অদ্ভুত আনন্দের সঞ্চার হয়। মনে হয় সত্যি এখানে ভগবান বিচরণ করেন। মন্দিরের পৃথক কক্ষে গৌর, নিতাই, জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা বিগ্রহ আছে। একটি পাঁচ চূড়াযুক্ত নহবতখানা ও একটি আটকোণা রাসমঞ্চ এখানকার উল্লেখযোগ্য দ্রষ্টব্য। গোপীর বাজারে প্রসিদ্ধ মিষ্টি মাগধের (মিঠাই) স্বাদ নিতে যেন ভুল না হয়।

হাতিবাড়ি বনবাংলো থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে রয়েছে ঝিল্লি বাঁধ। বাংলোয় বসে একঘেয়ে লাগলে একটু উঠে কাঁচা রাস্তা ধরে খানিকটা এগিয়ে গেলেই পাওয়া যাবে ঝিল্লিকে। নামটি যেমন মিষ্টি, প্রকৃতিও তার ভারী মিষ্টি। বেশ বড় জলাধার। খুবই গভীর। বর্ষার জল এখানে বাঁধ দিয়ে ধরে রাখা হয়। সারাবছর এই জল চাষের কাজে ব্যবহৃত হয়। জলের উপর ভেসে বেড়াচ্ছে বালিহাঁস। জলাধারে বড় বড় মাছও আছে। কিন্তু জাল ফেলা যায় না। জলের নীচে বড় বড় গাছের গুঁড়ি আছে। বাঁধের অপর পাড়ে চাষের খেত। বিস্তীর্ণ চরাচর সবুজে সবুজ। কিছু দূরে ফুলডি গ্রাম। একটু দূরে রয়েছে কয়েকটি চালাঘর। চালাঘরগুলি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের। ওখানে শাল, কেন্দু প্রভৃতি গাছের চারা তৈরি হয়।    হাতিবাড়ি থেকে ঝিল্লির রাস্তা কাঁচা হলেও গাড়ি যেতে কোনও অসুবিধা নেই। যাত্রাপথ মনোরম। গ্রাম, জঙ্গল ছিঁড়ে জায়গাটি এককথায় অনবদ্য। ভিড়, কোলাহল, সর্বোপরি সবরকম দূষণমুক্ত একটি এলাকা।

অতএব এবার টহল হোক নদী- জঙ্গল- নির্জনতার হাতিবাড়িতে। হাতিবাড়ির বনবাংলোতে চারটি দ্বিশয্যার ঘর আছে।

বনবাংলো বুকিং এর দূরভাষ নম্বর – ৮৯৭২৮৪০৫৩৯।  

Comments are closed.