মায়াপুরের ইসকন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

ইসকন বা ‘ISCON’ অর্থাৎ ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনসাসনেস বা আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের মূল মহাকেন্দ্র মায়াপুর। ১৯১৮ সালে ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের চৈতন্য মঠ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মায়াপুরে নতুন ভাবে ভক্তির প্লাবন শুরু হয়। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ তাঁর দীক্ষাগুরুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইসকনের মহাকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা করেন মায়াপুরে। বর্তমানে ইসকনের জন্য মায়াপুর একটি আন্তর্জাতিক তীর্থক্ষেত্র ও পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইসকনের মধ্যেই অনেক দর্শনীয় জিনিস রয়েছে সেগুলি সময় নিয়ে দেখলে ভালো লাগবে। এখানে বিনামুল্যে গাইড পাওয়া যায় এবং বিভিন্ন জায়গায় তীর্থযাত্রী সহায়তা কেন্দ্র থেকে সাহায্যও পাওয়া যায়। মূল তোরণদ্বারের ডান দিকে তীর্থযাত্রী সহায়তা কেন্দ্র রয়েছে।

প্রভুপাদের ভজন কুটির: মূল তোরণদ্বার দিয়ে প্রবেশ করে বাঁ দিকে রয়েছে ভজন কুটির। এইখানে প্রথম ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কয়েকজন বিদেশি ভক্তকে নিয়ে আশ্রম শুরু করেছিলেন। এখানে দিন-রাত অখণ্ড হরিনাম সংকীর্তন চলছে এবং গৌর-নিতাই পূজিত হচ্ছেন।

প্রভুপাদের পুস্পসমাধিমন্দির: তোরণদ্বারের ডান দিকের রাস্তা দিয়ে একটু গেলেই বিরাট সুদৃশ্য পুস্পসমাধিমন্দির। নির্দিষ্ট স্থানে জুতো রেখে এই মন্দিরে প্রবেশ করা যায়। সমাধির সামনে রয়েছে উঁচু ফোয়ারা-সহ পুষ্করিণী। সমাধিমন্দিরে নানান পৌরাণিক চিত্র, কারুকার্য খচিত রয়েছে। সমাধিমন্দিরের ভিতরে প্রভুপাদের অষ্টধাতুর বিরাট সুন্দর মূর্তি রয়েছে। চারপাশে গুরু পরম্পরার মূর্তি রয়েছে। মন্দির ভোর ৪টে থেকে দুপুর ১টা ও বিকেল ৩.৩০ মিনিট থেকে রাত ৮.৪৫ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে। নীচে প্রেক্ষাগৃহে ভক্তিকথাচিত্র দেখানো হয়। ওপরে প্রভুপাদের জীবনী সম্বন্ধে মিউজিয়াম রয়েছে। দর্শনীর বিনিময়ে দেখতে পাওয়া যায়। সকাল ৯.৩০টা থেকে দুপুর ১টা ও বিকেল ৩.৩০ মিনিট থেকে ৮.৪৫ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে। ওপর থেকে মায়াপুরের দৃশ্য দেখতে বেশ লাগে।

চন্দ্রোদয় মন্দির: ইসকনের প্রধান মন্দির এই চন্দ্রোদয় মন্দির। এখানে প্রধান দেবতা শ্রীশ্রীরাধামাধব। রাধামাধবের দুই দিকে ললিতা, বিশাখা, চম্পকলতা, চিত্রা, তুঙ্গবিদ্যা, ইন্দুলেখা, রঙ্গদেবী ও সুদেবী নামক সখীরা রাধামাধবের সেবায় রয়েছেন। প্রতিদিন নতুন নতুন সাজে অষ্টসখীপরিবৃত হয়ে রাধামাধব পূজিত হন। প্রতিদিন বহু দর্শনার্থীর আনন্দে মন্দির আনন্দময় থাকে। ১৯৮৬ সালে চন্দ্রোদয় মন্দিরে ভগবান নৃসিংহদেবের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এর পাশেই ২০০৪ সালে পঞ্চমহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য, নিত্যানন্দ, গদাধর পণ্ডিত, অদ্বৈতাচার্য ও শ্রীবাস ঠাকুরের মূর্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছে। রাধামাধবের মন্দির ভোর ৪.১৫ মিনিট থেকে ৫.১৫ মিনিট ও সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮.৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে। নামসংকীর্তনের মধ্য দিয়ে বহু দর্শনার্থীর নৃত্য ও কীর্তনের আনন্দে মন্দিরটি প্রতিদিন ভরপুর থাকে।

ভোর ৪.১৫ মিনিটে মঙ্গলারতি, সকাল ৭টায় দর্শনারতি ও সন্ধ্যা ৬টায় গৌর আরতি অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। রোজ সকাল ৮টায় শ্রীমদ্‌ভাগবতপাঠ ও সন্ধ্যা ৭.৩০ টায় গীতাপাঠ হয়। কোনও আধ্যাত্মিক প্রশ্ন থাকলে এই সময় তার উত্তর জানানোর ব্যবস্থা করা হয়। রাধামাধব মন্দিরে পুজো দিতে চাইলে মন্দিরের বাঁ দিকে ভক্তদের জন্যে নির্দিষ্ট ডেস্ক থেকে নৈবেদ্য গ্রহণ করতে হবে এবং পুজোর প্রসাদ দেওয়া হবে। মন্দিরের মধ্যে থেকে ফুল, ফল, নৈবেদ্য সংগ্রহ করেও পুজো দেওয়া যাবে। মন্দিরের ডান দিকে লাড্ডু, খাজা ইত্যাদি শুকনো মহাপ্রসাদ পাওয়া যায়।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী প্রদর্শনী: সুন্দর মডেলের মধ্য দিয়ে চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবন ও শিক্ষা সন্মন্ধে প্রদর্শনী রয়েছে। ভোর ৫.৩০টা থেকে ৬.৩০, সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা ও বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা অবধি খোলা থাকে।

গোশালা: বেশ বড় এলাকা নিয়ে তৈরি হয়েছে গোশালা। এখানে বিভিন্ন জাতের গাভী রয়েছে। এখান থেকে দুধ ভগবান ও ভক্তদের সেবায় যায়। গোমূত্র থেকে মহৌষধ ও গোবর থেকে মাজন ও সার তৈরির ব্যবস্থা আছে।

বৃহৎ মৃদঙ্গ ভবন: এই ভবনে রয়েছে ‘দি ভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাস্ট’ প্রকাশনী কার্যালয়। এখানে ভক্তরা গীতা, ভাগবত, চৈতন্যচরিতামৃত, ক্যালেন্ডার ছাপানোর কাজে নিযুক্ত। প্রকাশিত হয় ‘ভাগবৎ দর্শন’ ও ‘হরে কৃষ্ণ সংকীর্তন সমাচার’ নামে দুটি জনপ্রিয় পত্রিকা। পত্রিকা পাওয়ার জন্য যোগাযোগ : শ্রীভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাস্ট, শ্রীমায়াপুর, নদীয়া, পিন কোড : ৭৪১৩১৩।

হরেকৃষ্ণ নামহট্ট: বৃহৎ মৃদঙ্গ ভবনের উত্তর দিকে এই ভবনে কৃষ্ণভক্তি অনুশীলনের শিক্ষা দেওয়া হয়। ‘গৃহে কৃষ্ণভক্তি অনুশীলন’ শিক্ষার প্রচার এখান থেকে হয়।

সংকীর্তন ভবন: ভক্তরা বাসে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রভুপাদের গ্রন্থসম্ভার নিয়ে প্রচার করেন।

গুরুকুল: বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক, খেলাধুলা, ছবি আঁকা প্রভৃতি প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা দেওয়া হয়। এছাড়া, বাংলা ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল আছে।

প্রসাদ বৃত্তান্ত: শ্রীশ্রীরাধামাধবের রাজভোগ খেতে চাইলে মূল মন্দিরে সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে পূজারি বিভাগে যোগাযোগ করলে দুপুর ১টায় মহাপ্রসাদ পাওয়া যাবে। রাধামাধব মন্দিরের সামনে প্রতিদিন সকাল ১০টায় এবং বিকেল ৫টায় সকলের জন্য বিনামুল্যে খিচুড়ি প্রসাদ দেওয়া হয়। দোল পূর্ণিমা, জন্মাষ্টমী, নন্দোৎসব, গোবর্ধন পূজা ইত্যাদি বিশেষ উৎসবে সারাদিন ধরে বিনামুল্যে মহাপ্রসাদ দেওয়া হয়। মূল গেটের সামনে থেকে স্বল্পমূল্যে কুপন সংগ্রহ করলে সুলভ ভোজনালয়ে অন্নপ্রসাদ পাওয়া যায় দুপুরবেলায়। আর গদাভবনে অন্নপ্রসাদের জন্য তিন রকমের মূল্য নির্ধারণে অন্নপ্রসাদ পাওয়া যায় দুপুর ১টায় ও রাত্রি ৮.৩০ টায়। এর জন্যে সকাল বেলা থেকে প্রসাদ দেওয়ার দেড় ঘণ্টা আগে পর্যন্ত গদাভবনের রিশেপসন থেকে কুপন পাওয়া যায়।

যাত্রীদের জন্য গোবিন্দ ভোজনা প্রসাদ নামে একটি রেস্তোরাঁ আছে। এটি সকাল ৭.৩০টা থেকে দুপুর ২টা এবং ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। গদাভবনের নীচে মিষ্টির দোকানের মিষ্টির স্বাদও অতি সুন্দর, এদের স্পেশাল ভেজরোলটি বেশ সুস্বাদু। ইসকন চত্বরে এই সমস্ত খাবার পিঁয়াজ-রসুন মুক্ত নিরামিষ খাবার।

ধর্মশালা ও অতিথিভবন: মায়াপুরে থাকার জন্য যেমন স্বল্পমূল্যে গৌরাঙ্গ কুটির, নিত্যানন্দ কুটির, হরেকৃষ্ণ ধর্মশালা, গৌর-নিতাই ধর্মশালা রয়েছে, তেমনই ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যের বিভিন্ন অতিথিশালা রয়েছে। যেমন শঙ্খভবন, গদাভবন, চক্রভবন, বংশীভবন, প্রভৃতি। এগুলি সন্মন্ধে বিস্তারিত জানার জন্য যোগাযোগের দূরভাষ : ০৩৪৭২-২৪৫৪৯৪।

চলভাষ : ৯৬০৯৩৩১৪৩৬। অনলাইন বুকিংয়ের জন্য দেখুন– www.mayapurguesthouse.com.

খেয়াল রাখবেন: ইসকন  চত্বরে কোনও রকম মাদকদ্রব্যের ব্যবহার, ধূমপান, আমিষ খাবার, খাওয়া, উচ্চস্বরে কথা বলা বা কিছু বাজানো নিষিদ্ধ। মন্দিরে লুঙ্গি বা ম্যাক্সি পরে দর্শনে নিষেধ আছে। ফটো তোলার জন্য অনুমতি লাগবে। জুতো নির্দিষ্ট স্থানে রাখা উচিত। কোনও বিদেশি বাচ্চা দেখে তাকে ছুঁয়ে আদর করা উচিত হবে না। গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য বিনামূল্যে নিরাপদ ব্যবস্থা আছে।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেড়িয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা 

পড়ুন ‘দ্য ওয়াল’ পুজো ম্যাগাজিন ২০১৯–এ প্রকাশিত গল্প

প্রতিফলন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More