সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬

গোকুলনগরের প্রাঙ্গণে

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

গ্রামবাংলার পথে প্রান্তরে এমন কিছু মন্দির ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যে শুধু একটা মন্দির দেখার জন্যই সেখানে যাওয়া যেতে পারে। তেমনই একটি মন্দির রয়েছে গোকুলনগরে। বেশ বড় এলাকা নিয়ে এই মন্দিরের অবস্থান। প্রচার বা আলোর বৃত্তের বাইরে পড়ে থাকা এই মন্দিরে গেলে মন ভরে যাবে।

গোকুল শব্দটি শুনলেই যে বহুপ্রচলিত প্রবাদবাক্যটির কথা মনে পড়ে যায় সেটি হল ‘তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’। আর তার সঙ্গে সঙ্গে মানসপটে ভেসে ওঠে এক চিত্রকল্প– প্রচণ্ড ঝড়জলের রাত, কংসের কারাগার থেকে সদ্যোজাত কৃষ্ণকে মাথায় করে বসুদেব যমুনা পার হয়ে রেখে আসছেন গোকুলে নন্দের গৃহে, মা যশোদার কোলে।

সে ইতিহাস তো বৃন্দাবনের। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে গোকুলনগরের অবস্থান কোথায় আর এ গোকুলনগরের সঙ্গে কৃষ্ণের সম্পর্কই বা কতটুকু? একটু ধৈর্য ধরে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাঁকুড়া জেলার জয়পুর থানার ৪৩নং গোকুলনগর মৌজায় ছিল একসময় মল্লভূমের মল্ল রাজাদের স্বপ্নের আদিমল্ল রাজধানী। এই রাজধানী প্রদ্যুম্নপুর গড়ের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বৃন্দাবনের আদলে তৈরি করা হয়েছিল। সমুদ্র বাঁধ থেকে আগত যমুনার জলধারা গোকুলনগর গ্রামের দক্ষিণ দিক বরাবর পূর্ব দিকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরত্বে পাশের গ্রাম কুচিয়াকোল থেকে আসা আর একটি জলধারার সঙ্গে মিলিত হয়েছে এবং সেই জলধারা আমোদর নাম নিয়ে বয়ে গেছে পুণ্যতীর্থ জয়রামবাটীর পাশ দিয়ে। বৃন্দাবনের প্রায় ১২ মাইল পূর্বে যমুনা তীরে যেহেতু গোকুলনগর, কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা মল্লরাজ তাই গুপ্তবৃন্দাবন বিষ্ণুপুরের প্রায় ১২ মাইল পূর্বে যমুনার তীরে স্থাপন করেন গোকুলের চাঁদ শ্রীকৃষ্ণের মন্দির এবং গোকুলনগর গ্রাম।

বাঁকুড়া জেলার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রথম সারির পুরাকীর্তির মধ্যে অন্যতম হল গোকুলচাঁদ মন্দির। এটি জেলার বৃহত্তম মন্দির তো বটেই এমনকী পশ্চিমবঙ্গেরও বৃহত্তম হতে পারে। মন্দিরটিকে ঘিরে আছে একটি আয়তকার দুর্গের মতো পাথরের প্রাচীর। পূর্ব দিকের প্রাচীরের মাঝখানে রয়েছে প্রধান প্রবেশতোরণ। তোরণদ্বার দিয়ে প্রবেশ করলে মাকড়া পাথরে তৈরি পূর্বমুখী মন্দিরটি নজরে আসবে। মন্দিরটি পঞ্চশিখরবিশিষ্ট। পাঁচশিখরের কেন্দ্রীয় শিখর বা চূড়াটি বড় এবং আটকোনা। কোণের দিকের শিখরগুলি চারকোনা, পাতলা ও আশ্চর্য লাবণ্যময়। চারদিকে তিন খিলানযুক্ত বারান্দা ছাড়াও গর্ভগৃহের চারদিকে প্রদক্ষিণপথটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। মন্দিরের দক্ষিণ দিকের দেওয়ালে রয়েছে দশাবতার ও পৌরাণিক মূর্তির খোদাই কারুকাজ। পুরাতত্ত্ব বিভাগের সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে– মন্দিরটি মল্লরাজ প্রথম রঘুনাথ সিংহের রাজত্বকালে তৈরি।

প্রাঙ্গণের দক্ষিণ দিক বরাবর সুবিশাল এক বেদির ওপর রয়েছে নাটমণ্ডপ। এটি আপাতত ভাঙাচোরা হলেও সুবিশাল যে স্থাপত্যের পরিচয় রয়ে গেছে তা অবাক চোখে তাকিয়ে দেখতে হয় কারণ, এই মঞ্চটি ব্যবহৃত হত কীর্তনমঞ্চ, সাধুনিবাস সংগ্রহশালা ও ভাগবত পাঠের মঞ্চ হিসাবে। কীর্তনমণ্ডপের মূল দেওয়ালের ভেতরে ঈশান (উত্তর–পূর্ব), নৈঋত (দক্ষিণ–পশ্চিম) ও বায়ুকোণে (উত্তর–পশ্চিম) একটি করে মোট তিনটি গুহার আকারে ছোট ঘর এবং অগ্নিকোণে (দক্ষিণ–পূর্ব) রয়েছে ছাদে ওঠবার সিঁড়ি। আকারে বিশাল এই মণ্ডপটির ভেতরে বহু প্রাচীন মূর্তি সংরক্ষিত ছিল, সেগুলি সবই অদৃশ্য হয়েছে, কিছু বিষ্ণুপুর যোগেশচন্দ্র পুরাকীর্তি ভবনে সংরক্ষিত রয়েছে।

এরকম একটি জমকালো মন্দির বিগ্রহহীন, পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে দেখলে অনুতাপ হয় অথচ এই মন্দিরেই একসময় প্রতিদিন ১ শলি সিদ্ধ চালের ভোগ রান্না হত (১ শলি অর্থাৎ ১৮ কিলোগ্রাম)। কাঁচা শালপাতায় পোড়ানো পোস্ত ও কাঁচা বিরি কলাইয়ের ডাল ছিল ভোগের আবশ্যিক উপকরণ। এই খরচ আসতো দেবোত্তর সম্পত্তি থেকে। মন্দিরের পশ্চিম দিকে ছিল পাথরে বাঁধানো একটা কুয়ো। ওই কুয়োর জলেই পুজোর কাজ ও ভোগ রান্না হত।

এই মন্দিরের কিছুটা উত্তরে একটি বাঁধানো পুকুরের পাড়ে প্রাচীন মন্দিরের ধংসস্তূপের ওপর অপূর্ব এক বরাহ অবতারের মূর্তি কিছুটা মাটিতে পোঁতা অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষেত্রপালজ্ঞানে পুজো করে থাকেন।

গোকুলচাঁদ মন্দিরের আধ কিলোমিটার উত্তরে রয়েছে গন্ধেশ্বর শিবের পাথরের সাধারণ দেউল মন্দির। পূর্বমুখী মন্দিরের ভেতরে রয়েছে বৃহদাকার যোনিপট্ট-সহ শিবলিঙ্গ। এরকম শিবলিঙ্গ সারা ভারতের মধ্যে অন্যতম এবং সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গে বৃহত্তম। গর্ভগৃহের মধ্যে এক অপূর্ব মহিষমর্দিনী মূর্তি রয়েছে যেটি আজও পূজিত হয় এবং ঐতিহাসিকদের ধারণা এটি পালযুগের মূর্তি। মন্দিরের চারপাশে পুরনো মন্দিরের ভিত্তিবেদি-সহ বহু ল্যাটারাইট পাথরের চাঙড় ও আমলক শিলা ছড়ানো রয়েছে। ভিত্তিবেদি এবং চূড়ার শিলাগুলি যেরকম ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তাতে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, অতীতে মন্দিরটি ছিল সাতটি রথের আকারের এবং উচ্চতা কমপক্ষে ৮০ ফুট। কোন সময়ে এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।

গোকুলনগর কেবলমাত্র মল্লসংস্কৃতি বা মল্ল রাজাদের ইতিহাস নয়, গোকুলনগর ও তৎসংলগ্ন সলদা গ্রামের দক্ষিণ-পূর্বাংশ জুড়ে গড়ে উঠেছিল এক প্রাচীন সংস্কৃতি। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই জায়গা পরিদর্শন করে বলেছিলেন, সলদা-গোকুলনগরের মাটির নীচে লুকিয়ে রয়েছে এক সম্ভাবনাময় প্রাচীন ঐতিহ্য যা ঠিকমতো আবিষ্কৃত হলে সিন্ধু সভ্যতার ঐতিহ্যকে ম্লান করে দিত। সলদাতে বর্তমানে গাছতলায় জড়ো করা রয়েছে বহু জৈন ও হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি ও ভাঙা মন্দিরের ধংসস্তূপ। বহু প্রত্নবস্তু, স্মারক ও চিহ্ন কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু এখনও যা আছে তা যদি আবিষ্কৃত হয় এবং গবেষণা হয় তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক নতুন ইতিহাসের সন্ধান পাবে যা হয়তো পরবর্তীকালে ইতিহাসে ঠাঁই করে নেবে।

জয়পুর থেকে সলদা গ্রাম হয়ে গোকুলনগরে অথবা বাঁকুড়া থেকে ট্রেনে গোকুলনগর স্টেশন হয়েও আসা যায়।
জয়পুর অথবা বিষ্ণুপুরে থেকে গোকুলনগর ঘুরে দেখে নেওয়া যায়।

জয়পুরে থাকার ঠিকানা হল—বনলতা হোটেল, জয়পুর জঙ্গলের পাশে, চলভাষ- ৯৭৩২১১১৭০৫, ৯৪৩৪২০২০২৭
বিষ্ণুপুরে থাকার ঠিকানা হল- বিষ্ণুপুর টুরিস্ট লজ, রাসমঞ্চের কাছে, দূরভাষ—০৩২৪৪-২৫২০১৩

Comments are closed.