বৃষ্টিভেজা গড়পঞ্চকোটে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রত্না ভট্টাচার্য্য
    শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

    সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

    মন খারাপ করা বিকেল মানেই মেঘ করেছে, দূরে কোথাও দু–এক পশলা বৃষ্টি  হচ্ছে। বর্ষা কারও কাছে বিষণ্ণতার সুর, কারও কাছে মন উদাসী হাতছানি। রবি ঠাকুর থেকে অক্ষয় বড়াল, অতুলপ্রসাদ থেকে হালের কবীর সুমন কেউই এড়াতে পারেননি আষাঢ়–শ্রাবণের অনিবার্য অভিঘাত। এ সবই হল মনোরাজ্যের কথা। ব্যবহারিক অবস্থাটি অবশ্য তেমন রোমান্টিক নয়। বৃষ্টি মানে ঘরবন্দি দিন, বৃষ্টি মানে বানভাসির আশঙ্কা। এমন মেঘ–ছায়া দিনে হঠাৎ যদি বেজে ওঠে টেলিফোন আর ও প্রান্ত থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর শোনায়–– কাল সকাল ছটা পনেরোয় ব্ল্যাক ডায়মন্ড, হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে যাস।––– তখন সে শুধু বার্তা থাকে না আর, হয়ে যায় রবিশঙ্করের মেঘ রাগে তার সপ্তকের ঝোড়ো তান।

    কোথায় যাব, কি দেখব, কতদিন থাকব এইসব শুনতে শুনতে প্রায় চার ঘণ্টা পার করে  বরাকর স্টেশনে নামলাম আমরা চার বন্ধু। চার বন্ধুর মধ্যে কেকা সরকারি কর্মচারী, স্মার্টনেসে আদব কায়দায় সে বেশ কেতাদুরস্ত। এ বর্ষা ভ্রমণের ছক তারই মস্তিষ্কপ্রসূত। তার কাছ থেকে জানা গেল এবারের গন্তব্য শাল পিয়াল মহুয়া পলাশে ঘেরা পুরুলিয়ার গড়পঞ্চকোট।

    বরাকর থেকে অটো নেওয়া হল, দূরত্ব ২০ থেকে ২১ কিলোমিটার। কখনও বৃষ্টিস্নাত সবুজ ধানক্ষেতের বুক চিরে, কখনও ঘন জঙ্গল, ভরাট খাল–বিল ও লাল মাটির রাস্তা পেরিয়ে পঞ্চকোটের পথে এগিয়ে যাওয়া। শ্রাবণের মেঘ বৃষ্টির সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে পৌঁছে গেলাম গড় পঞ্চকোট বন বাংলোর সামনে। সবুজ পাহাড়ি ঢালে কেয়ারি করা বাগানের মধ্যে রঙিন কটেজগুলি মনের মধ্যে খুশির তুফান বইয়ে দিল। আমাদের জন্য যে ঘরদুটি বরাদ্দ হল তাদের নামও প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। দামোদর ও বরাকর একমাত্র এই দুটি ঘরের বারান্দা থেকেই দেখা যায় পাঞ্চেত জলাধারকে। মুগ্ধতার প্রথম পর্বের শুরু এখান থেকেই।

     

    দ্বিতীয় পর্বে চোখ গেল সবুজে সবুজ পাঞ্চেত পাহাড়ের দিকে। ঠিক যেন নাগ বাসুকির ফণা। আকাশের ঘন কালো মেঘ পাহাড়ের উপর ঝুলে রয়েছে, যেন একটু আঘাত পেলেই ঝর ঝর করে ঝরে পড়বে। দূরে ক্রমশ ধোঁয়াটে হয়ে আসছে জলাধার। শুরু হল প্রবল বর্ষণ। সামনে জলাধার অদৃশ্য, পাহাড়ের আউটলাইন সাদা। বড় বড় গাছগুলো এমন লুটোপুটি খেতে শুরু করল যেন কেউ তাদের উপর নির্মম ভাবে চাবুক চালাচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘের কামান গর্জে উঠে অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। এমন বিকট আওয়াজ যে সুপার স্টিরিওফোনিক সাউন্ডও তার কাছে হার মেনে যায়। সমতলের মানুষ আমরা, এরকম পাহাড়ি বৃষ্টির মুখোমুখি তেমন ভাবে কোনওদিন হইনি। ডাইনিং হল থেকে দিয়ে গেল গরম গরম চা। চা পান করতে করতে সমস্ত সত্তা দিয়ে উপভোগ করতে লাগলাম বর্ষামঙ্গল।

    স্নান সেরে মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য গেলাম ডাইনিং হলে। হলের চারপাশের দেওয়াল কাঁচের, মাথাটি গোলাকার ছাতার মতো। বেশ সাজানো গোছানো রুচিসম্মত। রাত্রিবেলায় যখন চারিদিকে নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে হলে ঝাড়বাতিগুলো জ্বলে ওঠে তখন দূর থেকে মনে হয় অন্ধকারের সমুদ্রে লাইট হাউস। কাচের মধ্যে দিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে খিচুড়ি, অমলেট, আলুর দম ও আচার সহযোগে দারুণ খাওয়া সারলাম। বহুদিন মনে থাকবে।

    কাবেরী ও পামলির শোওয়ার বায়নাকে পাত্তা না দিয়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ইতিহাসের খোঁজে। পথে শুরু হয়ে গেল আবারও অঝোর ধারায় বৃষ্টি। ভিজে চুবড়ি  হয়ে যেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম সেটি হল পাঞ্চেত পাহাড়ের উল্টো দিক। সামনে আদিগন্ত প্রসারিত উপত্যকা। বাংলো থেকেই আমাদের সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল একজন গাইডকে। তার কাছ থেকে পঞ্চকোটের যেটুকু ইতিহাস উঠে এল তার সারমর্ম হল — সে আজ ছাব্বিশ শত বছরের আগের ঘটনা। জঙ্গলাকীর্ণ পুরুলিয়া ছিল বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত আর্য জাতিগোষ্ঠীর বাসভূমি। প্রথম আর্যজাতির প্রতিনিধি হিসেবে ২৪ তম তীর্থঙ্কর মহাবীর এখানে পা রেখেছিলেন। পরবর্তী কালে আর্যজাতির প্রতিনিধি হিসাবে এলেন পঞ্চকোট রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা দামোদর শেখর।

    রাজারা এসেছিলেন মাউন্ট আবু থেকে। এরা ছিলেন প্রখর (পরমার) বংশীয়। রাজাদের নামের ও পদবির সঙ্গে শেখর শব্দটা থাকে অলংকার হয়ে। পঞ্চকোটই পুরাণের শেখর পর্বত। এই রাজবংশ রাজপুতানা থেকে রাঢ় বঙ্গে আসার আগে উজ্জয়িনীতে রাজত্ব করেছেন। এই রাজ পরিবারের ইতিহাস ৮০ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৯৭২ এই দীর্ঘ ১৯০০ বছরের ইতিহাস। পৃথিবীর ইতিহাস খুঁজলে এত দীর্ঘকালব্যাপী রাজ্যশাসন আর কোথাও পাওয়া যাবে না। এই রাজবংশের অবদান পুরুলিয়ার জীবনে অনেকখানি। ৯৬২ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৭৭০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ আটশ বছর রাজপরিবারটি ছিল পাঁচেট পাহাড়ের  পাদদেশে।

    এত বৃষ্টির মধ্যে ছবি তেমনভাবে তোলা যাচ্ছিল না। আমরা সবাই ইতিহাসে বেশ মনোনিবেশ করে ফেলেছিলাম। হঠাৎ পামলি তালভঙ্গ করে বলে উঠল, দাঁড়ান দাঁড়ান, পাঁচেট পাহাড়টি আবার কোথায়? ওর প্রশ্নে হকচকিয়ে না গিয়ে গাইডদাদা জানালেন, পাহাড়টিতে পাঁচটি চূড়া বা পাঁচটি ঢাল। একে বলা হয় কূট, তা থেকেই কোট। ব্রিটিশদের উচ্চারণে পঞ্চকোট হয়েছে পানচেট তা থেকেই পাঞ্চেত। পাঞ্চেতই আবার পাঁচেট।

    গাইডদাদা আবার ফিরে গেলেন তার গল্পে। এই রাজবংশের এক রাজা কল্যাণশেখর বল্লাল সেনের কন্যা সাধনাকে বিবাহ করার ফলে যৌতুকস্বরূপ পান সেন বংশের কুলদেবী শ্যামারূপা দেবীর হাতের তলোয়ার, কালিঘুড়ি নামের ঘোটকী। এই দেবীই কল্যাণেশ্বরী নামক স্থানে অবস্থান করছেন। কল্যাণশেখরই কল্যাণেশ্বরী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। আকবরের রাজত্বকালে পঞ্চকোটের রাজা ছিলেন গরুড় নারায়ণ। তার সময়ে পঞ্চকোট এলাকার দেবমন্দির ও দেবমূর্তিগুলি কালাপাহাড় ধ্বংস করেছিল। ১৬০০ খ্রীষ্টাব্দে গড়পঞ্চকোটের দখল নেন বিষ্ণুপুরের মহারাণা হাম্বীর মল্লদেব। ১৮৫৫-৫৬ খ্রীষ্টাব্দে এই বংশের শেষ রাণা নীলমণি সিংহদেবকে সাঁওতাল বিদ্রোহে মদত দেবার অভিযোগে ইংরেজরা বন্দি করে ও নৃশংসভাবে হত্যা করে। ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে সিংদেব এস্টেটের ম্যানেজারের পদ অলংকৃত করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। “পঞ্চকোট গিরি”, “পঞ্চকোট রাজশ্রী” এবং “পঞ্চকোট গিরি বিদায়” নামে তিনটি কবিতাও তিনি এই সময়েই রচনা করেছিলেন।

    গল্প শুনতে শুনতে এতটা বুঁদ হয়ে গিয়েছিলাম যে দিনের আলো কমে আসছে সেটা খেয়ালই ছিল না। অতীতের স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ আর মন্দির। এই গড় থেকেই এখানকার নাম গড় পঞ্চকোট। ডানহাতে রয়েছে ভাঙা জরাজীর্ণ দেউল, বিগ্রহহীন। প্রায় ২ বর্গ মাইল জুড়ে রয়েছে মন্দিরক্ষেত্র। শত ঝড়–জল বাধা বিঘ্ন উপেক্ষা করে এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে যে সব মন্দির তার মধ্যে অন্যতম হল পোড়া ইটের তৈরি পঞ্চরত্ন মন্দির। ওপরতলায় ওঠার জন্য রয়েছে সিঁড়ি। অতীতে হয়ত পাঁচটি চূড়াতেই ওঠা যেত। গাইডের কথা অনুযায়ী এটি ছিল রাসমন্দির। আমরা চারজনেই অন্ধকারের মধ্যেও চুইয়ে আসা মরা গোধূলির আলোয় নির্বাক নিষ্পন্দ হয়ে মন্দিরটির দিকে তাকিয়ে রইলাম।

    পঞ্চরত্নটির একটু দূরে ঘন জঙ্গলের মধ্যে রয়েছে বিশাল একটি গম্বুজ আর তার পাশেই পরিখা। যেতে প্রথমে একটু ভয় ভয় করলেও আস্তে আস্তে গেলাম। মনে হল এক একটি ওয়াচ টাওয়ার, বাঁদিকের সিঁড়ি অক্ষত থাকলেও বর্ষাকাল সাপখোপের ভয়ে আর এগোনোর ঝুঁকি নিলাম না। এইসব মন্দির চত্বরে দাঁড়িয়ে রাজবাড়ির ভাঙা প্রাচীর, পাহাড়ের মাথায় আরও কিছু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পেলাম। গ্রামবাসীদের সাহায্যে হয়তো পৌঁছনো যেত কিন্তু বাদুড়, পেঁচার ডানায় ভর করে নেমে এল জমাট অন্ধকার। একে বৃষ্টি তায় অন্ধকার, মনে হল যেন নাগরিক কোলাহল থেকে কয়েকশত আলোকবর্ষ দূরে দাঁড়িয়ে আমরা কয়েকজন বিহ্বল, মোহাবিষ্ট। দূর থেকে ভেসে আসে বাঁশীর সুর। তন্ময়তা কেটে যায়, এবার ফিরতে হবে। পড়ে রইল নির্জনতা, আদিমতা, স্থবির দেউল, অবহেলিত ইতিহাস। আমরা ফিরে চলি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ।

    গড়পঞ্চকোটে থাকার ঠিকানা হল—গড়পঞ্চকোট প্রকৃতি ভ্রমণকেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন নিগম, online booking- www.wbfdc.com   এবং গড়পঞ্চকোট ইকো ট্যুরিজম, ওয়েবসাইট- www.garhpanchkotecotourism.com

    কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেড়িয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

    পায়ে পায়ে বাংলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More