সোমবার, ডিসেম্বর ৯
TheWall
TheWall

গড়চুমুক, ফুলেশ্বর, বেলাড়ী

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।  খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

আনন্দময়ী কালীর মন্দির ছাড়াও উলুবেড়িয়ায় ভ্রমণার্থীদের যার টানে বার বার ছুটে যেতে হবে তা হল গড়চুমুক। উলুবেড়িয়া স্টেশন থেকে গড়চুমুকের দূরত্ব কম বেশি ১৮ কিলোমিটার। এটি একটি অনবদ্য পিকনিক স্পট। জল ও জঙ্গলে ঘেরা প্রায় ৬৭ বিঘা আয়তন বিশিষ্ট হাওড়া জেলার এই গড়চুমুক জায়গাটি যেন প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে গড়ে ওঠা এক নন্দনকানন। একাধিক পদ্ধতিতে গড়চুমুকে পৌঁছনো যায়। সড়ক পথে কলকাতা থেকে গাদিয়াড়ার পথে বাস বা গাড়িতে গড়চুমুক অথবা হাওড়া-মাতাপাড়া (এল) বাসে সরাসরি উলুঘাটা, ৫৮ নম্বর গেট স্টপে নামা অথবা উলুবেড়িয়ার কোর্ট বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে করে উলুঘাটা, উলুবেড়িয়া বাস স্টপ থেকে ৭০বি বাসে করেও গড়চুমুক পৌছনো যায়।

গড়চুমুকের আসল নাম গড়চুম্বক গ্রাম। দামোদরের জলধারাকে এখানে ৫৮টি স্লুইস গেট দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। কিন্তু পর্যটকদের মধ্যে এই গেটের এত জনপ্রিয়তা যে গ্রামের স্থানীয় নাম বদলে তা হয়ে গিয়েছে ৫৮ গেট। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনবিভাগ ও হাওড়া জেলা পরিষদের উদ্যোগে নদীতীরবর্তী ১৩৭ একর এলাকা জুড়ে একটি বনভূমির সৃষ্টি করা হয়েছে যেটি উলুঘাটা সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও মৃগদাব নামে পরিচিত। হরিণ ছাড়াও খরগোশ, ময়ূর, সজারু, ফিশিং ক্যাট প্রভৃতি দেখতে পাওয়া যায়। চারিদিকে সবুজের সমারোহ, লাল রাস্তা কিংবা কল্লোলিনী নদী এখানকার পরিবেশকে স্বর্গীয় করে তুলেছে।

সংরক্ষিত বনাঞ্চলে স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় পিকনিক করা যায়। তাৎক্ষণিক অনুমতিই পাওয়া যায়। প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ৩ টাকা, বাসের জন্য ১৩০ টাকা, মোটর সাইকেল ১৫ টাকা ও প্রাইভেট কার ৭০ টাকা। সকাল ৭ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। গাড়িতে গেলে কাঁচাবাজার ও রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে যেতে হবে, ট্রেনে বা বাসে গেলে স্থানীয় ডেকরেটারের দোকান থেকে জিনিসপত্র ভাড়া করতে হবে। ইদানীং শীতকালে, বিশেষ করে ছুটির দিনে ভাল ভিড় হয়।

এরকম স্বর্গীয় পরিবেশে থাকার ইচ্ছে হলে অবশ্যই থাকা যাবে। বনাঞ্চলের মধ্যে জেলা পরিষদ পরিচালিত পুরনো বাংলো ও নদীর ধারে নতুন বাংলো ‘বনবিতান’ রয়েছে থাকার জন্য। বুকিংয়ের ফোন নম্বর– ০৩৩ ২৬৩৮-৪৬৩৩/২৬৩৮৪৬৩৪। সোম থেকে শুক্রবার অফিস টাইমে বেলা তিনটে পর্যন্ত ঘর বুক করা হয়।

উলুবেড়িয়া থেকে কাছে ফুলেশ্বর ঘুরে আসা যায়।

কে যেন বলেছিলেন নামে কীই বা আসে যায়? কিন্তু এমন অনেক নাম আছে যার আকর্ষণ অমোঘ, এড়ানো যায় না কিছুতেই। ফুলেশ্বর তেমনই একটি নাম। ফুলেশ্বরে কী আছে জানা না থাকলেও নামটাই বারে বারে হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে। ফুলেশ্বর স্টেশন থেকে ৭-৮ মিনিটের পথ হেঁটে গেলেই গঙ্গার ধারে এক সুন্দর বাংলো। এই বাংলোর চারপাশে গড়ে উঠেছে পিকনিক স্পট। ইউক্যালিপটাস, মেহগনি গাছের ছায়ায় ঘেরা বাংলোটিতে এক অদ্ভুত শান্তি বিরাজ করছে। শীতে মরশুমি ফুলে সেজে উঠে বাংলোটি ঝলমল করতে থাকে। পিকনিক করার জন্য ফুলেশ্বর একেবারে আদর্শ। স্টেশনের কাছেই বড়সড় বাজার, টাটকা শাকসবজি। বাসনপত্রও ভাড়া পাওয়া যায়।

ফুলেশ্বর আসাও খুব সহজ। হাওড়া-খড়গপুর লাইনের কিছু ট্রেন বাদ দিয়ে সব ট্রেনই ফুলেশ্বর ছুঁয়ে যায়। গঙ্গাতীরের উদার অঙ্গনে শহুরে গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে চাইলে বাংলোতে থাকাও যায়। বাংলোয় বসে কখনও বা দেখা যায় বিশাল জাহাজ– কোনও দূর দেশে পাড়ি দিয়েছে। তবে বাংলোর অগ্রিম বুকিং দরকার। বুকিং করতে হবে এই ঠিকানায়– সেচ ও জলপথ বিভাগ, হাওড়া ডিভিশন, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, খাদ্য ভবন, কলকাতা। গঙ্গার তীরে পিকনিক করতে গেলে কোনও বুকিং করার প্রয়োজন নেই এবং কোনও ফি-ও লাগে না। ফুলেশ্বরে পিকনিক করতে গিয়ে রাজবংশী পাড়ায় কালীমন্দির ও সাতমহল এলাকায় মদনমোহন শিবের মন্দির পায়ে পায়ে ঘুরে নেওয়া যায় যা রথ দেখা ও কলা বেচার মতো উপরি প্রাপ্তি হয়ে যাবে।

উলুবেড়িয়া শহর থেকে কাছে শ্যামপুর থানায় এক প্রত্যন্ত গ্রাম বেলাড়ী। বেলাড়ী এক অবহেলিত, অন্ধকারছন্ন গ্রাম হলেও পর্যটনের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে এখানে। কারণ, গ্রামীণ পরিবেশে হুগলি নদীর তীরে বেলুড় মঠের শৈলীতে এক বিশাল সুদৃশ্য মন্দির নির্মিত হয়েছে এখানে যেটি পশ্চিমবঙ্গের ভক্তবৃন্দের কাছে এক অসাধারণ শিল্প নিদর্শন হিসাবে পরিচিত। মন্দিরটি শ্বেতপাথরের তৈরি। মন্দির সংলগ্ন প্রার্থনাগৃহ। নদীর দিকে মুখ করে থাকা মন্দিরে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের মূর্তিটি চমৎকার। সমগ্র মন্দির আঙিনা অসংখ্য মরশুমি ফুল, বিরল প্রজাতির গাছ দিয়ে সুসজ্জিত। মন্দির থেকে স্রোতস্বিনী গঙ্গার নীরবে বয়ে যাওয়ার দৃশ্য, মনকে অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে তোলে। মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, এরকম স্থানে এই অপূর্ব কর্মকাণ্ড কে বা কারা ঘটালেন?

ত্রিশের দশকে ইংরেজ বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া এক শিক্ষিত যুবক একটি ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে এক আশ্রম তৈরি করেন। ওই শিক্ষিত যুবকটি হলেন প্রফুল্ল মহারাজ যাঁর উদ্দেশ্য ছিল এ গ্রামে শিক্ষার আলো নিয়ে আসা। এখানে প্রথম শুরু হল অবৈতনিক বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয় আর স্বাদেশিকতার নিদর্শনস্বরূপ চরকা ও তাঁত। তাঁকে সাহায্য করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন বিশ্বম্ভর মহারাজ, গোকুল মহারাজ, গোষ্ঠ মহারাজ প্রমুখেরা। কিন্তু বছর চারেক পর অবোধ গ্রামবাসীদের কাছে উপেক্ষিত হয়ে স্বভাবতই হতাশাগ্রস্ত প্রফুল্ল মহারাজ বেলাড়ী ছেড়ে গয়ায় চলে যান। তখন আশ্রমের অঙ্গ রূপে নির্মিত হল একটি ছোট মন্দির। ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে এলেন বিভিন্ন গ্রামের সহৃদয় মানুষজন। তাদের সহযোগিতায় আশ্রমটি ধীরে ধীরে বিশাল মহীরুহের আকার ধারণ করে। এই বিশাল মহীরুহকে গড়ে তোলার পিছনে যাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছিল তিনি হলেন বিশ্বম্ভর মহারাজ, পরে স্বামীজির শিষ্য স্বামী সদাশিবানন্দের নিকট সন্ন্যাস গ্রহণ করে তিনি স্বামী বিদ্যানন্দ নামে পরিচিত হন। স্বামী বিদ্যানন্দ মহারাজ শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে উপনীত এক জীবন্ত কিংবদন্তী যাঁকে এককথায় বেলাড়ী আশ্রমের রূপকার বলা যায়।

মন্দিরে প্রতিদিন ভোর ৪-৩০ মিনিট থেকে এবং সন্ধ্যায় ৬-৩০ মিনিট থেকে ছাত্র ও মহারাজরা প্রার্থনাসভায় যোগ দিয়ে ধ্যান ও আরতির মাধ্যমে শ্রীরামকৃষ্ণকে স্মরণ করেন। প্রতিটি তিথি মেনে মন্দিরে চলে দেবারতি, দীক্ষাদান, পুস্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, দরিদ্র নারায়ণ সেবা ইত্যাদি। শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা, এবং স্বামীজির জন্মতিথি মহাসমারোহের সঙ্গে পালিত হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথিতে আশ্রমে সব থেকে বড় উৎসব পালিত হয়। ১৫-২০ হাজার ভক্ত দুপুরে প্রসাদ গ্রহণ করেন। আশ্রম প্রাঙ্গণ ফুল, লতাপাতায় সজ্জিত হয়ে ওঠে। আশ্রমকে কেন্দ্র করে বেলাড়ী গ্রামও যেন জেগে ওঠে।

আশ্রমের আধ্যাত্মিক দিক ছাড়া এর অন্য দিকটি সম্পূর্ণই বিবেকানন্দের কর্মযোগ আশ্রিত। সমাজের অবহেলিত, দুঃস্থ বালক-বালিকাদের দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়। এছাড়াও, বেলাড়ী শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমের অধীনে রয়েছে দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি বেসিক স্কুল ও আশ্রমিক ছাত্রাবাসে প্রায় ৭০ জনের মতো আবাসিক শিক্ষার্থী। বৃহস্পতিবারে দাতব্য চিকিৎসালয়ের ওষুধপত্র বিলি হয়। বহু দূর দূরান্ত থেকে রোগীরা আসে চিকিৎসার আশায়। এককথায় আশ্রমটি হল জ্ঞান ও কর্মযোগের এক সার্থক মিলনভূমি।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, এরকম একটি মনোরম পরিবেশে পৌঁছনোটা তত মনোরম নয়। উলুবেড়িয়া থেকে মাতাপাড়া বাস পথে অথবা হাওড়া থেকে গাদিয়াড়াগামী বাসে গড়চুমুকের অনেক আগেই এই স্থান। এবড়োখেবড়ো, গর্তে ভরা, ধুলোয় মোড়া মাটির রাস্তা, চারিদিকে বুনো ঝোপজঙ্গল, উঁচিয়ে থাকা বড় বড় কাঁটাগুল্ম পেরিয়ে এই মন্দিরে পৌঁছতে হয়। রাস্তাঘাট একটু সুগম হলে হাওড়া জেলার পর্যটনে বেলাড়ী গ্রাম শীর্ষে উঠে আসবে আশা করা যায়।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেড়িয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা 

Comments are closed.