বাংলার তামিল গ্রাম গদিবেড়ো

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রত্না ভট্টাচার্য্য
    শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

    সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। এবার থেকে সেই দায়িত্ব আমাদের। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই শুরু হল নতুন এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

    আক্ষরিক অর্থেই পাহাড়ের গায়ে গ্রাম। যে গ্রামটিকে সস্নেহে কোলে তুলে নিয়েছে বেড়ো পাহাড়, তার নাম গদিবেড়ো। ছোট বড় কুটির, অট্টালিকা, দিঘি-জলাশয় নিয়ে এক সম্পন্ন গ্রাম। গ্রামপত্তনের কাহিনীটি বড় চমৎকার। সেই চমৎকার কাহিনী জানতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় দুশো বছর। পুরুলিয়ায় পঞ্চকোটের রাজা তখন গরুড় নারায়ণ সিংহ, তিনি দক্ষিণ ভারতের তিরুপতিতে তীর্থ করতে গিয়েছিলেন। সেখানে গোপাল আচার্য’র সাধন ভজনে মুগ্ধ হয়ে রাজা তাকে কুলগুরু পদে বরণ করে নেন। তাঁকে ১০৪ টি নিষ্কর মৌজা দান করেন। আচার্যদেব ১০৪ টি মৌজার মধ্যে জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড় ঘেরা এই স্থানটি সাধন ভজনের উপযুক্ত বলে নির্বাচন করেন। সুদূর মাদ্রাজ থেকে তাঁর অন্যান্য শিষ্য সম্প্রদায়কে এখানে এনে বসতি করান। প্রায় শতাধিক আচার্য পরিবার এই গ্রামে আছেন। বাড়ির মধ্যে পরিবারের সকলেই তামিল ভাষায় কথা বলেন এবং তামিলনাড়ুর সঙ্গে এখনও বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে। যদিও এখানে বহু সম্প্রদায়ের মানুষ যেমন কুমোর, গুজরাতের সরাফ, মাহালী, বাউরি, মুদকরা কৈবর্ত, শবর, মাঝি, বেনে এমনকী মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও বর্তমানে বাস করেন। দ্রাবিড় সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙ্গালি সংস্কৃতি মিশে  যাওয়ার ফলস্বরূপ করম পরব থেকে টুসু পরব, পোংগল থেকে দুর্গাপূজা একই সঙ্গে পালিত হয়।

    রঘুনাথপুর শহর থেকে বেড়ো পাহাড়ের দূরত্ব মাত্র ১৪ কিলোমিটার। জয়চণ্ডী পাহাড়ের ধার ঘেঁষে যাওয়া বাঁকুড়া-পুরুলিয়া বাসরাস্তার এক জায়গায় বেড়ো বাসস্টপ আছে। রঘুনাথপুর থেকে অটোতেও সহজে যাওয়া যায়। আসানসোল-আদ্রা শাখা রেলপথের একটি স্টেশন বেড়ো। এই পাহাড়ের আয়তন বা উচ্চতা বেশি নয়। উচ্চতা এক হাজার ফুটের কাছাকাছি। ডুংরি শ্রেণীর এই বেড়ো পাহাড়ের শীর্ষদেশ থেকে দেখা যায় দূরে রেলস্টেশন, রেললাইন, জয়চণ্ডী পাহাড়, চারিদিকে ছোট বড় সবুজ পাহাড়, টিলা সব মিলিয়ে অপরূপ এক নৈসর্গিক ছবি।

    বেড়ো পাহাড়ের চাহিদা পর্বতারোহণ সংস্থাগুলির কাছে প্রবল। দক্ষিণবঙ্গ বিশেষ করে কলকাতা, দুর্গাপুর, অণ্ডাল, আসানসোল, চিত্তরঞ্জন প্রভৃতি জায়গার পর্বতারোহণ সংস্থাগুলি বেড়োতে শৈলারোহণ শিবিরের আয়োজন করে থাকে। কারণ এখানে শৈলারোহণের প্রয়োজনীয় বোল্ডার, চিমনি এবং লং স্লিং রাপলিং করার ভাল ফেস আছে। প্রিলিমিনারি, বেসিক এবং অ্যাডভান্স ট্রেনিং, ক্যাম্পিং ও নেচার স্টাডি করার আদর্শ জায়গা। মূল বেড়ো পাহাড়ের পাশেই খেলাইচণ্ডী পাহাড়। এখানেই মূলত শৈলারোহণ ক্যাম্প বা ট্রেনিংগুলো হয়। আর কেশবজিউ মন্দিরের পাশে যে বেড়ো পাহাড় তাতে ট্রেক করে ওঠা যায়। ট্রেক করার পথটি বেশ রোমাঞ্চকর। বড় বড় বোল্ডারের ফাঁক ফোকর দিয়ে বা ওপর দিয়ে লাফিয়ে পাহাড় শীর্ষে পৌঁছে যাওয়া যায়। শীর্ষদেশ থেকে দেখা যায় পুবে রাঙামাটিয়া, বাঁশগ্রাম, পশ্চিমে লাডুবাড়ি ও পাঁচপাহাড়ি, দক্ষিণে জেকাড়া ও খরবেলা গ্রাম এবং উত্তরে অস্পষ্ট পঞ্চকোট পাহাড়। শীর্ষদেশ থেকে নামার পথে যে গ্রামটি পড়ে সেটি বীর রাঘব আচার্যর জন্মস্থান। এই গ্রামই পঞ্চকোট রাজাদের গুরুদের অধিষ্ঠান ক্ষেত্র।

    বেড়ো গ্রামকে নিয়ে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে যেমন – খেলাইচণ্ডী, কেশবচাঁদ ও বেড়োর বাঁধ নিয়ে বেড়ো গ্রামের নিজস্ব ভূগোল তৈরি। প্রথমে আসা যাক কেশবচাঁদের মন্দির প্রসঙ্গে। আটচালার পূর্বমুখী মন্দিরটি জেলার মধ্যে সর্ববৃহৎ টেরাকোটার মন্দির। তিনটি মন্দির নিয়ে এই মন্দিরক্ষেত্রের অবস্থান। একেবারে দক্ষিণে জোড়বাংলো মন্দিরটি বর্তমানে পরিত্যক্ত। মধ্যস্থলের মন্দিরটি গোপীনাথের। দুটি মন্দিরই বর্তমানে ধ্বংসোন্মুখ। মন্দিরগুলির সব বিগ্রহই কেশবচাঁদের মন্দিরে রক্ষিত আছে। কেশবচাঁদ মন্দিরের সামনে নাটমঞ্চ ও একটি ছোট রাসমঞ্চ। খুবই অনুশোচনার বিষয় যে মন্দিরক্ষেত্রটি সযত্নে রক্ষিত হলেও এরকম একটি সুন্দর জোড়বাংলো মন্দির অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

    বেনেপাড়ায় শিবমন্দির সন্মুখস্থ রাস্তার পূর্ব পাশে একটি চার ফুট উচ্চতার বীরস্তম্ভ আছে। যিনি এলাকায় পূজিত হন বাঘরাই ঠাকুর নামে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের দ্বারা। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ বেড়োর বাঁধ। বিশাল স্বচ্ছ টলটলে জলের দিঘি। পদ্ম, পানিফল, শালুকে ভরা এই জলাশয় শীতকালে বহু পরিযায়ী পাখির আশ্রয়স্থল।

    বেড়ো স্টেশন থেকে ২০ মিনিটের হাঁটাপথে গ্রামের শেষ প্রান্তে খেলাইচণ্ডী মন্দিরে পৌঁছনো যায়। কী ভাবে এখানে চণ্ডীদেবীর পূজা শুরু হল তা নিয়ে অনেক কিংবদন্তী গড়ে উঠেছে। কেউ বলেন বর্গী আক্রমণ এবং বিভিন্ন ধর্মের বিপুল প্রভাব, প্রচার এবং অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে অনার্যরা বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ভয়াল শক্তিরূপে চণ্ডীদেবীর উপাসনা শুরু করেন। আবার মতান্তরে, এই অঞ্চলে আর্যবসতি স্থাপনের পরে অনেকে বৈদিক ধর্ম গ্রহণ করেন। এ সময়, অর্থাৎ আনুমানিক দ্বাদশ শতাব্দীতে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম দ্রুত প্রসার লাভ করে এবং চণ্ডী, শিব, বিষ্ণু ইত্যাদি দেবদেবীর পূজা প্রচলিত হয়।

    অন্যদিকে চতুর্দশ শতকে পঞ্চকোটরাজ কর্তৃক আনীত গুরু যখন এই স্থানে বসবাস শুরু করেন তখন থেকেই এই চণ্ডী দেবীকে কেন্দ্র করে এখানে মেলা শুরু হয়। প্রতি বৎসর পয়লা মাঘ থেকে তিনদিন ব্যাপী বিরাট মেলা বসে চিরমৌন চণ্ডী পাহাড়ের কোলে। কাছাকাছি রেলস্টেশন ও বাসে যাতায়াতের সুবিধা থাকায় মেলায় লোক সমাগম হয় প্রচুর। তিনদিনের মেলা হলেও মেলা থেকে যায় সপ্তাহখানেক। দেবীর মন্দিরের পাশেই পুকুর। সেই পুকুরে ডুব দিয়ে মাটি তুলে পাড়ে ফেলতে হয়। এই প্রথাকে বলে মাটি ফেলা। অনেকে এই মানত করে থাকেন। কেউ কেউ দণ্ডি কাটেন আবার অনেকে পায়রা ওড়ানোর মানসিক করে থাকেন। পাহাড়ের গা ঘেঁষে ভলান্টিয়ার এবং সেন্ট জন আম্বুলেন্সের তাঁবু।

    এছাড়া বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন অষ্টপ্রহর শতনাম সংকীর্তন হয় এই মন্দির ঘিরে। পাশেই গোবিন্দ আশ্রমে প্রতি মঙ্গল ও রবিবার বিশেষ পূজা হয়।

    খেলাইচণ্ডী পাহাড়ের উত্তর থেকে পশ্চিম বরাবর একটি গুহাপথ আছে। জনশ্রুতি গুহাটির দৈর্ঘ্য নাকি ২০০ ফুট। ওই গুহাকে কেন্দ্র করেই প্রয়াত সুকরাম বাবার আশ্রম। খুবই দুঃখের বিষয় ১৩৬২ সনে দুষ্কৃতীদের কুঠারাঘাতে এই স্থানেই তাঁর মৃত্যু হয়। এই মন্দিরের পাশে শীতকালে প্রচুর লোক আসে পিকনিক করতে। তাছাড়াও পক্ষীপ্রেমী, প্রকৃতিবিদ, ইতিহাসবিদ, ভূ-তাত্ত্বিক সকলেরই গবেষণাস্থল এই বেড়ো। এরকম উন্মুক্ত প্রকৃতির কোলে থাকতে চাইলে নিজস্ব তাঁবু থাকা দরকার অথবা রঘুনাথপুরে থেকে দিনে দিনে গদিবেড়ো ঘুরে নেওয়াই সুবিধাজনক হবে।

    রঘুনাথপুরে থাকার ঠিকানা

    পঞ্চবটি লজ- দূরভাষঃ ০৩২৫১-২৫৫৩৮৫ , চলভাষঃ ৯৪৭৫১৮৩৪৬৬ ।

    মানভূম লজ- দূরভাষঃ ০৩২৫১-২৫৬০৯৫ , চলভাষঃ ৯৯৩২৪১৫৬৪৮ ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More