রবিবার, জানুয়ারি ১৯
TheWall
TheWall

দোলাডাঙ্গা

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।  খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

কাঁসাই আর কুমারী নদীর জল নিয়েই তৈরি হয়েছে মুকুটমণিপুরের বিখ্যাত জলাধার। বাঁকুড়া জেলার মুকুটমণিপুর একটি প্রসিদ্ধ পর্যটনক্ষেত্র। তাকে ঘিরে হোটেল, রিসর্ট সহ বহু থাকার ব্যবস্থা। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এখানে ভিড় জমান। এই এলাকার অপর এক তীরে পুরুলিয়া জেলার মানবাজার থানার অন্তর্গত দোলাডাঙ্গা। অবর্ণনীয় সৌন্দর্য নিয়ে দোলাডাঙ্গা তার নিজস্বতায় অনন্য।

দোলাডাঙ্গার পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে একান্ত নির্জনে হারিয়ে যাওয়া যায়। দূরে পাহাড়ের শ্রেণি, অফুরন্ত জলরাশি, বনানীর সারি।

মুগ্ধ করে দেওয়া এই প্রাকৃতিক দৃশ্যপট অনবদ্য করে তুলেছে দোলাডাঙ্গাকে। হাওয়ায় ওঠা জলের ছোট ছোট ঢেউ দেখে লাদাখের সো মোরিরি লেকের কথা মনে হবে। কোলাহল মুক্ত, গাড়ি-ঘোড়াহীন এক অনাবিষ্কৃত জগত। কাছেই আছে বনপুকুরিয়া মৃগদাব। ইচ্ছে করলে নৌকাবিহার করা যায়। ভাসতে ভাসতে মুকুটমণিপুরেও চলে যাওয়া যেতে পারে।

এই এলাকাকে ঘিরে বনদপ্তর দোলাডাঙ্গা বনভোজন প্রাঙ্গণ তৈরি করেছিল এবং সেটি ১১/২/৯৯ তারিখে বিলাসীবালা সহিস উদ্বোধন করেছিলেন। তার জন্য কিছু বনভোজনের শেড, টিউবওয়েল, বিশ্রামালয় তৈরি হয়েছিল। বনভোজনের সময়কাল বা শীত চলে যাওয়ার পর তেমন ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়াতে সেগুলির হতশ্রী অবস্থা। দোলাডাঙ্গাকে ঘিরে স্থানীয় প্রশাসন বা পর্যটন দপ্তর যদি পরিকল্পনামাফিক কাজ করে তাহলে দোলাডাঙ্গা খুব দ্রুত পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করে নেবে।


মানবাজার থেকে ট্রেকারে অথবা রিজার্ভ গাড়িতে দোলাডাঙ্গায় যাওয়া যেতে পারে। দোলাডাঙ্গার কাছেই বনপুকুরিয়া মৃগদাব। এটিও বেশ সুন্দর। হরিণদের বিচরণ ক্ষেত্র ঘুরে দেখতে মন্দ লাগবে না। দোলাডাঙ্গার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে উপরি পাওয়া হবে হরিণদের সাক্ষাৎ। কিছুদিন হল দোলাডাঙ্গায় থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। নির্জনে দু–একটা দিন কাটাতে দোলাডাঙ্গা অনন্য।

দোলাডাঙ্গা থেকে মানবাজার হয়ে কাছেই বুধপুর। বুধপুর পুরুলিয়ার একটি বিখ্যাত শৈবক্ষেত্র। এখানে শিবের নাম বুধেশ্বর। পুরুলিয়ার শিবের গাজনে সর্বত্র পঞ্চশিবের নামে ধ্বনি ওঠে– ”বুধপুরের বুধেশ্বর, আনাড়ার বাণেশ্বর, ক্রোশজুড়ির সিদ্ধেশ্বর, চিড়কার গৌরীনাথ ও কেতনকিরির মানকেশ্বরের জয়।” বুধপুরের বুধেশ্বরকে পুরুলিয়ার প্রধান শিব হিসাবে মানেন বহু মানুষজন।

বুধপুর একটি প্রাচীন বৃহৎ তীর্থক্ষেত্র। কাঁসাই নদীর তীরে এই তীর্থক্ষেত্রটি অতীতে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। বুধপুরে বর্তমানে শিবমন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ২৫ ফুট। একটি বর্গক্ষেত্রাকার ভিত্তিভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। দৈর্ঘে ও প্রস্থে প্রায় ১৬ ফুট এবং ভেতরের মাপ প্রায় ১৩ ফুটের মতো। সামনের দরজার চারটি খিলানে নকশা জাতীয় চিত্র রয়েছে। দু’পাশের দেওয়ালে দুটি ফাঁকা কুলুঙ্গি। একসময় হয়তো কোনও দেবদেবীর মূর্তি ছিল। ওপরে গণেশের মূর্তি, তারও ওপরে শঙ্খবাদনরত একটি পুরুষ মূর্তি। মনে হয় মন্দিরের মাথাটি গম্বুজাকৃতি ছিল, ভেঙে গিয়ে বর্তমানে সমতল আকৃতির। মন্দিরের ভিতরে একটি বৃহৎ শিবলিঙ্গের পূজা হয়। অন্য শিবলিঙ্গের মতো এটি নয়। একটি বৃহৎ প্রস্তর স্তম্ভ এখানে দাঁড় করানো আছে। মাথার অংশটি ভেঙে গোল হয়ে গেছে। সামনেই বসানো আছে একটি ত্রিশূল।


বুধপুরে সারা বছরই উৎসব। এখানকার গাজন মেলা খুব প্রাচীন, চৈত্রসংক্রান্তিতে গাজন মেলায় জমজমাট হয়ে ওঠে বুধপুর। শিবরাত্রিতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ জড়ো হন বাবার মাথায় জল ঢালার জন্য। শ্রাবণ মাসের সোমবারে লাইন পড়ে যায়। এছাড়া ফাল্গুনে মাকড়ি সপ্তমীতে একটি বিশাল মেলা বসে।

এই শিবমন্দিরকে ঘিরে অনেক বিতর্ক দানা বেঁধেছে। শিবমন্দিরটি ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে কোনও এক ভগ্ন দেউলের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। দেউলের পাথর বুধপুরের শিবমন্দিরটি তৈরির কাজে লাগানো হয়েছে। গ্রামের মানুষেরা নিজেদের প্রয়োজনে বাড়ি তৈরির কাজে এমনকি গ্রামের প্রাথমিক স্কুল তৈরির কাজেও এগুলি ব্যবহার করেছেন। মন্দির এলাকার চারপাশে জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে দেউলের নানা ভাঙা অংশ। পাথরের বড় কয়েকটি স্তম্ভ, কারুকার্যখচিত পাথরের হস্তীমুখ, আমলক, পাথরের কলসসহ নানা অংশ পড়ে রয়েছে অবহেলায়। জে ডি বেগলার ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে এখানে এসেছিলেন এবং সেই সময় মাঝের দেউলটি (বর্তমান শিবমন্দির) এবং আরও চার কোণে চারটি দেউলের ধ্বংসস্তূপ দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি এগুলি দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতাব্দীর বলে অভিহিত করেন।


কিন্তু মজার কথা হল বুধপুরে বর্তমানে কোনও জৈন মূর্তি দেখতে পাওয়া যায় না। মানভূমে তামার কারবারে যুক্ত জৈন ব্যবসায়ীরা অনেক দেউল তৈরি করেছিলেন। তাম্র আকরিক শেষ হয়ে গেলে তাঁরা ব্যবসা বন্ধ করে অন্যত্র চলে যেতে থাকেন। সেই সময় বা পরে হিন্দুরা এই দেউলগুলি দখল করে নেয়। তার পর থেকে হিন্দুরাই এগুলি দেখাশোনা করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে উলঙ্গ জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

বর্তমান বুধপুরে রয়েছে মূল শিবমন্দির ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেক বীরস্তম্ভ। মন্দিরের প্রবেশপথে আছে বড় দুটি গণেশ মূর্তি। মূর্তিগুলি সিঁদুর লেপার জন্য অনেকটাই ঢাকা। বুধপুরে এই অঞ্চলটি গাছপালায় ছাওয়া। ইতস্তত ভাঙা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কিছুটা উঁচু জমির উপর শিবমন্দিরের পরিবেশটি খুব সুন্দর।


বুধপুরে আসার জন্য পুরুলিয়া থেকে সরাসরি বাস যোগাযোগ রয়েছে। দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। মানবাজার থেকে আসার জন্য রয়েছে রুটের বাস, ট্রেকার। দূরত্ব ৬ কিলোমিটার। এছাড়া ভাড়ার গাড়ি পুরুলিয়া ও মানবাজার দুই জায়গাতেই পাওয়া যায়।

বুধপুরের শিবমন্দির যাওয়ার মূল রাস্তার উলটো দিকের রাস্তা ধরে দেড় কিলোমিটার গেলেই কাঁসাই নদীর তীরে ট্যুসামা মন্দিরক্ষেত্র। কাঁসাই নদী এখানে একটু বাঁক নিয়েছে। সামনেই পাহাড়, নদীর মাঝে ছড়িয়ে থাকা বোল্ডার, দিগন্তবিস্তৃত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে জায়গাটি বেশ মনোমুগ্ধকর। এখানে প্রথমেই নজর কেড়ে নেবে প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার এক পাথরের মন্দির। বিশেষজ্ঞদের অনুমান এটি একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে নির্মিত। এটি একটি রেখ দেউল। দেউলের চূড়াতে এখনও বিরাজ করছে বিশাল আমলক। রোদে, জলে আমলকের কারুকার্য নষ্ট হয়ে গেছে। বর্গক্ষেত্রাকৃতির ভূমির উপরে দেউলের সন্মুখের দরজাটি চৌকো আকৃতির, দরজার কয়েকটি পাথর খসে গেছে। মন্দিরটি দক্ষিণ দিকে অনেকটা হেলে গেছে। দেউলটি কখনও ছড়বার দেউল, কখনও বা তেলকুপির দেউলের কথা মনে পড়িয়ে দেয়।


নদীর ধারে তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট উচ্চতার প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি প্রস্তর স্তম্ভ মাটিতে পোঁতা আছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ স্তম্ভে শিবলিঙ্গের খোদাই করা ছবি অথবা কোনও দেবদেবীর রুদ্র মূর্তি খোদিত আছে। এগুলিকে কেউ বলে বীরস্তম্ভ অর্থাৎ কোনও বীর যুদ্ধে মারা গেলে তাঁর স্মৃতিতে এগুলি পোঁতা হয়েছে আবার কারুর মতে এগুলি সতীস্তম্ভ অর্থাৎ কোনও নারী তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর চিতায় সহমৃতা হওয়ায় তাঁর স্মৃতিতে পোঁতা হয়েছে।

জে ডি বেগলার যখন এখানে এসেছিলেন তখন তিনি ট্যুসামা গ্রামের পূর্ব দিকে দুটি এবং উত্তর-পশ্চিম দিকে একটি বিশাল অলংকৃত মন্দির দেখেছিলেন। বর্তমানে সবই অবলুপ্ত। তবু আজও কাঁসাইয়ের তীরে এসে দাঁড়ালে মনে হবে আগে এই মন্দিরক্ষেত্রে বহু তীর্থযাত্রী আসত, তারা নদীতে স্নান করত, হয়তো নদীতে বাঁধানো ঘাট ছিল, তার পর তারা পূজা করত। তাদের কলকোলাহলে মুখরিত থাকত এই মন্দিরক্ষেত্রটি।


দোলাডাঙ্গায় রাত্রিবাসের ঠিকানা

দোলাডাঙ্গা মাড কটেজ, চলভাষ:  ৭৯৮০৫১৪৪৭৭
দোলাডাঙ্গা ব্যাকপাকারস ক্যাম্প, চলভাষ: ৯০৫১১৬০৮৭০।

Share.

Comments are closed.