শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

সিংহশিশুর গ্রাম বীরসিংহ

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

আপামর বাঙালির কাছে অন্যতম তীর্থ হল বীরসিংহ অন্তত সেটাই হওয়া উচিত। অন্যান্য অনেক তীর্থে বাঙালি ভ্রমণ করলেও এই তীর্থে মানুষ আসেন খুব কম। চলতি আশ্বিন মাসে বিদ্যাসাগরের জন্মমাস, তাই এই নিবেদন। যদি এই ভ্রমণকথা কিছু মানুষকে উৎসাহিত করে করুণাসাগরের জন্মস্থানে ঘুরে আসার জন্য তাহলে এই প্রচেষ্টা কিছুটা হলেও সার্থক বলে বিবেচিত হবে।।

উনিশ শতকের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মভুমি বীরসিংহ গ্রামটির নামের সঙ্গে স্কুলের পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে পরিচিত অধিকাংশ বঙ্গসন্তান। মেদিনীপুর শহর থেকে অথবা চন্দ্রকোণা রোড থেকে সহজেই আসা যায় এখানে। ক্ষীরপাই-ঘাটাল সড়কে বীরসিংহ মোড় থেকে বীরসিংহ গ্রাম ৫ কিলোমিটার পথ। এটি ঘাটাল থানার অন্তর্গত। মূল সড়কে নিয়মিত বাস চলে। মোড় থেকে ট্রেকার বা রিকশায় খুব সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায়। আগের মতো পথ আর এখন নেই, প্রশস্ত পিচ রাস্তা চলে গেছে গ্রাম অবধি। জন্মস্থানে বিদ্যাসাগরের প্রাচীন বসতবাটির কোনও চিহ্ন আজ আর নেই। তাঁর সেই মাটির বাস্তুভিটেয় গড়ে উঠেছে বিদ্যাসাগর স্মৃতিমন্দির। বিদ্যাসাগর স্মৃতি সংরক্ষণ সমিতির দ্বারা বিদ্যাসাগর স্মৃতিমন্দিরের উদ্বোধন হয় ১৭ মার্চ, ১৯৪০। উদ্বোধক ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়।

১২২৭ বঙ্গাব্দের ১২ই আশ্বিন বিদ্যাসাগরের জন্ম হয়। বিদ্যাসাগরের পিতৃপুরুষের আদি বাসস্থান ছিল হুগলি জেলার বনমালীপুর। তাঁর পিতামহী দুর্গামণি দেবী স্বামী রামজয় তর্কভূষণের তীর্থ ভ্রমণকালে আপন পিতৃগৃহে বীরসিংহ গ্রামে পুত্র ঠাকুরদাস ও অন্যান্য সন্তান-সহ বাস করতে শুরু করেন। ঠাকুরদাস ও ভগবতী দেবীর প্রথম সন্তান হলেন বিদ্যাসাগর। উল্লেখ্য, বিদ্যাসাগর যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন বীরসিংহ গ্রাম হুগলি জেলার ক্ষীরপাই মহকুমার অন্তর্গত ছিল। পরে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে চন্দ্রকোণা ও ঘাটাল থানা মেদিনীপুর জেলায় অন্তর্ভুক্ত হলে বীরসিংহ মেদিনীপুর জেলায় চলে আসে।

স্মৃতিমন্দিরের সঙ্গেই রয়েছে গ্রন্থাগার ও সংগ্রহশালা। সংগ্রহশালায় বিদ্যাসাগরের জীবনী ছোট ছোট পুতুলের দ্বারা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিদ্যাসাগরের ব্যবহৃত বাক্স, তোরঙ্গ, ছড়ি ইত্যাদি ছাড়াও রয়েছে তাঁর ব্যবহৃত বইপত্র। যেখানে তিনি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন সেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। স্মৃতি মন্দিরের সামনে ছোট উদ্যান তৈরি হয়েছে, রয়েছে বিদ্যাসাগরের সুন্দর মূর্তি।

এখানে ঘুরে দেখে নেওয়া যায় বিদ্যাসাগরের স্মৃতিবিজড়িত শচী বামনার পুকুরপাড়, শৈশবের খেলাধুলার স্থান, মায়ের নামে ভগবতী বিদ্যালয়, ছাত্রাবাস ও দাতব্য চিকিৎসালয়। এটি বর্তমানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়েছে। এছাড়া পাঠশালা বা প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালিকা বিদ্যালয়, বিদ্যাসাগর মেমোরিয়াল হল, গ্রামীণ পাঠাগার, ঠাকুরদাস মঞ্চ, সুবৃহৎ দিঘি ও পিরের স্থান রয়েছে। প্রতি বছর বিদ্যাসাগর মেলায় দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এই পুণ্যভূমে আসেন। কয়েক দিন ধরে নানান অনুষ্ঠান ও মেলা হয়।

ছবি: সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

এছাড়া উৎসাহীদের ঘুরে দেখার জন্য রয়েছে ঘোষপাড়ায় শীতলানন্দ শিবের মন্দির। ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মিত। উনিশ শতকের শেষ দিকে নির্মিত প্রায় ২৩ ফুট উচ্চতার ধর্মরাজের মন্দিরও রয়েছে। মন্দিরে এখনও কিছু পঙ্খের অলংকরণ দেখতে পাওয়া যায়। এটি গ্রামের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত। বীরসিংহ গ্রাম ক্ষীরপাই থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

চন্দ্রকোণা-ঘাটাল রাস্তায় বীরসিংহের মোড় থেকে ঘাটালের দিকে একটু এগোলে রাধানগর মৌজায় নবগ্রাম গ্রামে গোপাল ও সিংহবাহিনীর প্রায় ৩৩ ফুট উঁচু একটি পঞ্চরত্ন মন্দির আছে। ১৭০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরটি ভগ্নপ্রায়। হয়তো আর বেশিদিন স্থায়িত্ব নেই, কিন্তু এই মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির লঙ্কাযুদ্ধ, শিকারযাত্রা প্রভৃতি যে অপরূপ ফলকগুলি আছে তার উৎকর্ষতার নিরিখে একে জেলার সর্বশ্রেষ্ঠ মন্দির বলা যেতে পারে। মূল পিচ রাস্তা থেকে কাঁচা রাস্তা ধরে কিছুটা গেলেই মন্দিরটির দেখা পাওয়া যাবে।

বীরসিংহ থেকে ঘাটাল যাওয়ার পথে, ঘাটাল শহর থেকে ৩ কিলোমিটার আগে ক্ষীরপাই-ঘাটাল সড়কের ওপর পড়ে বরদার বিশালাক্ষী মন্দির। কথিত আছে, বিখ্যাত ভূস্বামী শোভা সিংহ এই দেবীর প্রতিষ্ঠাতা। এই দেবীই ছিলেন শোভা সিংহের কুলদেবী। বিশালক্ষী দেবী খুব জাগ্রত বলে বিশ্বাস। এই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও অন্য জেলা থেকেও মানুষ আসেন দেবীর মাহাত্ম্যের কারণে।

বিরাট দেবী মূর্তি চতুর্ভুজা। ওপরের ডান হাতে ঢাল ও বাম হাতে খড়্গ। নীচের দু’হাতে বরাভয় মুদ্রা। বাম পা মহাকালের বক্ষে স্থাপিত আর ডান পা এক তান্ত্রিক ভৈরবের মাথায় ন্যস্ত। বিশালাক্ষীর কণ্ঠে নরমুণ্ডমালা রয়েছে। দেবী ত্রিনয়না। মূর্তির দু’পাশে নাগদণ্ড দৃশ্যমান। দশভুজা দুর্গার ন্যায় বিশালাক্ষী দেবীর মেড় আছে। তাতে ওপরের ডান দিকে গণেশ, বামে কার্তিক, নীচে জয়া-বিজয়া, জগদ্ধাত্রী ও মনসামূর্তি আছে। সব মূর্তিই মাটির তৈরি। কয়েক বছর রাখার পর বিসর্জন দিয়ে আবার নতুন মূর্তি তৈরি হয়। শোভা সিংহের আমল থেকে এইভাবে তৈরি হয়ে আসছে। তন্ত্রোক্তমতে দেবীর নিত্যপূজা হয়। সারা বছরের মধ্যে শারদোৎসবের সময় অষ্টমী ও নবমীতে বিশেষ পূজা ও পৌষ মাসে সংক্রান্তির দিন বাৎসরিক পূজা উপলক্ষ্যে প্রচুর মানুষের সমাগম হয় ও মেলা বসে। বর্তমানে দেবীর সুদৃশ্য মন্দির, নাটমন্দির, নহবতখানা, ভোগমণ্ডপ তৈরি হয়েছে।

ছবি: সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

এই অঞ্চলটি এত প্রাচীন যে জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে এই অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়। সতেরো শতকে চেতুয়া-বরদার রাজা শোভা সিংহ এই অঞ্চলের রাজা ছিলেন ও গড় বানিয়েছিলেন যা একটি ঐতিহাসিক দুর্গে পরিণত হয়েছিল। গড়টি তিনটি অংশে যুক্ত ছিল– ভিতর গড়, দ্বিতীয় গড় ও তৃতীয় গড়। ভিতর গড়ে রাজার প্রাসাদ ছিল। গড়ের চারপাশে বহু দিঘি ছিল। বর্তমানে সবই ধংসস্তূপ। আশপাশে ছড়িয়ে থাকা ইট ও পাথরের খণ্ড আর কিছু দিঘি জানান দেয় অতীত ইতিহাসের কথা।

এই অঞ্চলকে ঘিরে ঘুরে নেওয়া যায় মন্দিরময় ক্ষীরপাই, ইতিহাসের চন্দ্রকোণা, নাড়াজোলের জমিদারবাড়ি এমনই আর কত জায়গা।

বীরসিংহে থাকার জায়গা নেই, চন্দ্রকোণা রোড অথবা মেদিনীপুর শহরে রাত্রিবাস করে বীরসিংহ ঘুরে নেওয়া যায়।

মেদিনীপুরে থাকার ঠিকানা হল—রানি শিরোমণি পর্যটক আবাস, ডাকবাংলো রোড,মেদিনীপুর, দূরভাষ-০৩২২২-২৬৬৫৮৮, চলভাষ- ৯৭৩২৫১০০৭৪।

চন্দ্রকোণা রোডে থাকার ঠিকানা হল—গীতাঞ্জলি লজ অ্যান্ড হোটেল, সাতবাঁকুড়া, চন্দ্রকোণা রোড, দূরভাষ- ০৩২২৭- ২৮২৩২২।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেড়িয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা   

পড়ুন ‘দ্য ওয়াল’ পুজো ম্যাগাজিন ২০১৯ এ প্রকাশিত সাক্ষাৎকার।

পুরস্কারের জন্য আমি সিনেমা বানাব না: প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য

 

Comments are closed.