দেবদেউলের বেগুনিয়া

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রত্না ভট্টাচার্য্য
    শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

    সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

    বর্ধমান জেলার পশ্চিম প্রান্তে বরাকর থানার একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী গ্রাম বেগুনিয়া। এটি বরাকর সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তসীমায় অবস্থিত। পাশ দিয়ে বরাকর নদী সীমানা ঘোষণা করতে করতে বয়ে চলেছে। ওপাশেই ঝাড়খণ্ড রাজ্য। বরাকর স্টেশন থেকে দেড় কিলোমিটার পথ এগিয়ে গেলে বেগুনিয়া বাজারের ডানদিকে পড়বে ৪টি সুউচ্চ শিখর দেউল। বেলেপাথরে নির্মিত মন্দিরগুলি প্রায় ৬০ ফুট উঁচু। মন্দিরগুলিকে বলা যেতে পারে বেগুনিয়ার গর্ব। উন্নত ভাস্কর্যশৈলীর চিহ্ন বহনকারী এইসব মন্দির বাংলার প্রাচীনতম। মন্দিরগুলির শিখরদেশ বেগুনের মতো তাই স্থানীয় মানুষেরা বেগুনিয়া মন্দির বলে থাকেন। ওড়িশি স্থাপত্যের ছাপ রয়েছে মন্দিরগুলিতে। চারটি মন্দিরের মধ্যে তিনটির প্রত্যেকটিতে একসঙ্গে তিনটি করে লিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত আছে। বিশাল এলাকাটি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা।

    প্রথম মন্দিরের ভেতরের দেওয়ালে বিশাল গণেশের মূর্তি সিঁদুরলিপ্ত অবস্থায় রয়েছে। দ্বিতীয়টি কালীর, তৃতীয়টি দুর্গার, চতুর্থটি আদি শিবের। ইনি অনাদি শিবলিঙ্গ। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে বরাকরের উল্লেখ আছে। ১৪৬২ খ্রিষ্টাব্দে রাজা হরিশচন্দ্র তাঁর প্রিয়তমা ভার্যা হরিপ্রিয়ার উদ্দেশে শিবমন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই রাজা শৈব ছিলেন। প্রতিষ্ঠা ফলকে রয়েছে–

    হরিশ্চন্দ্রস্য ভুরিপ্রিয়ো ভুশক্রস্য
    হরিপ্রিয়া প্রিয়তমা উচ্চৈঃ ফল প্রাপ্তয়ে।

    পরে ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে নন্দ নামক একজন ব্রাহ্মণ মন্দিরটির সংস্কার করেন। আদি শিব অর্থাৎ সিদ্ধেশর শিবের মন্দিরটি অন্য মন্দিরগুলির চেয়ে উচ্চতায় খাটো হলেও অন্য মন্দিরগুলির তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ। মন্দির বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুবনেশ্বরের পরশুরামেশ্বর মন্দিরের সঙ্গে এই মন্দিরের যথেষ্ট মিল রয়েছে। বিশাল আমলক শিলা মন্দিরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রবেশপথের দু’পাশে ২টি নন্দী বৃষমূর্তি রয়েছে, তার মধ্যে একটি ভাঙা। মন্দিরের ভেতরে  অমসৃণ পাথরের শিবলিঙ্গটি কোনও গৌরীপট্ট বা যোনিপট্টের ওপর স্থাপিত নয়।

    শোনা যায়, সিদ্ধেশর শিবের পূজার্চনা ও মন্দিরের খরচ বাবদ কালীপুরের রাজা দেবোত্তর জমি দান করেছিলেন। শিবরাত্রি উপলক্ষে এখানে বহু মানুষের সমাগম ঘটে। দিশেরগড় থেকে জল এনে বিগ্রহের মাথায় ঢালা হয়। প্রতিদিন  নিষ্ঠাভরে সিদ্ধেশরের পূজা হয় এবং ভোগ নিবেদন হয় তাঁর উদ্দেশে। কোনও আগন্তুক গিয়ে উপস্থিত হলেও তিনি ভোগ থেকে বঞ্চিত হন না। শিব মন্দিরের পাশেই  ব্রাহ্মণীতলায় ১লা বৈশাখ বলিদান-সহ পূজা হয়। ভোগ বিতরণ করা হয়। এখানে শিব চতুর্দশীর মেলা বসে এবং ওই মেলায় প্রায় ১০-১২ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসেন। এই মেলা এখানে এক বিশেষ  স্থান অধিকার করে আছে। মন্দির চারটি ১৯৫৮ সাল থেকে ভারত সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত।

    এই শিব মন্দিরের দক্ষিণ সীমান্তে আছে বাবা সীতারাম দাসের বিরাট আশ্রম। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার জয়পুর নিবাসী সাধক সীতারামবাবা বাংলার ১৩৩১ সালে একটি দালান মন্দির নির্মাণ করে নিতাই-গৌর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। আশ্রমটি স্থানীয়দের কাছে শ্রীগৌরাঙ্গ মন্দিরবাড়ি নামে পরিচিত। এখানে পৃথক পৃথক মন্দিরে দেবী অন্নপূর্ণা, রাধাকৃষ্ণ, জগন্নাথ, বলরাম সুভদ্রা, গৌর-নিতাই, দুর্গা, হনুমানের মূর্তি রয়েছে। এগুলি নিত্য পূজিত হন। সীতারামবাবার সমাজের ওপর একটি সমাধিমন্দির নির্মিত হয়েছে। শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মতিথিতে নবরাত্র কীর্তন ও উৎসব পালিত হয়। এছাড়া রাস ও রথযাত্রা উৎসবও মহাসমারোহে পালিত হয়। মন্দির চত্বরের দক্ষিণ ভাগে একটি ছোট ঘরকে মাসির বাড়ি বলে চিহ্নিত করা আছে।

    এখানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় বস্তুর মধ্যে রয়েছে একটি ঘরের মধ্যে কয়েকটি দেব বিগ্রহ। বরাকরের নদী খাত থেকে উদ্ধার হওয়া কষ্টিপাথরের নির্মিত ১২-১৩টি অসাধারণ মূর্তি সীতারামবাবা একটি ঘরের মধ্যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। বিগ্রহগুলি হল যক্ষ বাহনে কুবের, শশক বাহনে চন্দ্রদেব, মহিষ বাহনে যমরাজ, গরুড় বাহনে বিষ্ণু ইত্যাদি। মূর্তিগুলিকে ভাস্কর্য শিল্পের প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলা যায়।

    এখান থেকে কাছেই দিশেরগড় ঘুরে নেওয়া যায়। গড় শব্দটি মনের মধ্যে কৌতূহল সঞ্চার করে। এ গড় পরিখা না দুর্গ! কোনওটাই নয়। ব্রিটিশ আমলে ডিহি শেরগড় অপভ্রংশ বা উচ্চারণ বিভ্রাটে দিশেরগড়ে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্ধমানের প্রান্তসীমায় প্রায় ঝাড়খণ্ডের গা ছুঁয়ে দিশেরগড় যেন অনাবিষ্কৃত এক সৌন্দর্যের খনি। প্রতিবছর সরস্বতী পুজার এক দিন পরে মাঘ মাসের মাকরি সপ্তমীতে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে বিশাল মেলা। বর্ধমান, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ এই মেলায় যোগ দেন। বীরভূমের জয়দেব মেলা শেষ হবার পরই সেখানকার যাত্রা, বাউল, কীর্তন চলে আসে দিশেরগড়ে। এই মেলারও মূল আকর্ষণ বাউল গান। প্রকৃতপক্ষে এটি আদিবাসী, বনবাসী ও শহরবাসীর এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র বলা যেতে পারে। আসানসোল, কুলটি বা বরাকর থেকে দিশেরগড় যাওয়া যায়। দিশেরগড় কালো হিরের সদর অঞ্চল হলেও এখানকার মূল দ্রষ্টব্য হল মা ছিন্নমস্তার মন্দির। মন্দিরের সামনে অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশে এক মহাশ্মশান অবস্থিত। সামনে বরাকর, দামোদর ও খুদিয়া নদী এসে মিশেছে। শুধু তিনটি নদীই নয়, স্থানটি যথাক্রমে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া বর্ধমান জেলার মিলনক্ষেত্র।

    দামোদরের ওপরেই দেবীমন্দির অবস্থিত। ভীষণা দেবীমূর্তিটি বর্ধমানের রামনগর গ্রামে পড়েছিল। সাঁকতোড়িয়ার মানিকলাল আচার্য এই মূর্তিটি স্থাপন ও পূজা করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বাঁকুড়ার শুশুনিয়া থেকে এক শিল্পীকে নিয়ে এসে তিনি মূর্তিটির সংস্কারসাধন করান। তারপর এক শুভদিনে দেবীর প্রতিষ্ঠা হয়। ভীষণাকৃতি পাষাণ বিগ্রহ ছিন্নমস্তা নিজের হাতেই নিজের ছিন্নমস্তক ধারণ করে তাঁর স্বীয় কণ্ঠ নির্গত রক্তধারা পান করছেন। মূর্তির দু’পাশে দুই সহচরীও ওই রক্ত পান করে চলেছেন। দেবীমূর্তির সঙ্গেই শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদার প্রতিকৃতি সংস্থাপিত। দশমহাবিদ্যার ষষ্ঠ রূপ ছিন্নমস্তা। দেবী নিত্যপূজিতা।

    দেবীর মন্দিরটি ছাড়াও এখানে রয়েছে বিশ্বনাথ, বৈদ্যনাথ, গ্রহরাজ রাধাকৃষ্ণ ও গণেশের পৃথক পৃথক মন্দির। সব মিলিয়ে এক বিরাট মন্দিরক্ষেত্র। নতুন করে মন্দির সংস্কারের কাজ চলছে। শেষ হলে আশা করা যায় আগামী দিনে এটি একটি সুন্দর পর্যটনক্ষেত্রে পরিণত হবে।

    মন্দিরের পিছন দিকে সিঁড়ির গ্যালারিতে বসে সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া দামোদরকে উপভোগ করা যায় মনের আনন্দে। সামনেই রয়েছে নদীর ওপর ব্রিজ, ওপারে পুরুলিয়া জেলা। বিস্তীর্ণ বালুবেলা রোদ পোহাচ্ছে। নদীর দু’পারেই প্রাগৈতিহাসিক ম্যামথের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে পাথরের চাঁই। নদীর ওপারে আগোছালো জঙ্গল, জঙ্গলের পেছনে মেঘ আড়াল করে দাঁড়িয়ে পাঞ্চেত পাহাড়। অদূরে নদীর ওপর সেতু মনের মধ্যে মায়াজাল সৃষ্টি করে। এখানে এলে মধ্যযুগের এক আশ্চর্য সৌন্দর্যের স্বাদ পাওয়া যায়।

    জগন্নাথ মন্দির– ছিন্নমস্তা মন্দিরের প্রবেশ তোরণটি বেশ বড়। তোরণের উলটো দিকে মূল রাস্তায় শ্রীশ্রীজগন্নাথ মহাপ্রভুর মন্দির অবস্থিত। সুন্দর দারুমূর্তি। সুউচ্চ রথ রয়েছে। এখানকার রথযাত্রা বিখ্যাত। সামনেই রয়েছে হরিসভা।

    মাজার– মন্দিরের একটু আগে ডানদিকে রয়েছে পির শেরশাহ’র অবস্থানভূমি। এছাড়া আরও বহু সাধকের মাজার রয়েছে। চৈত্র মাসে উরস উৎসব উপলক্ষে এক বিরাট মেলা বসে। প্রতিবছর ৫ চৈত্র থেকে মেলা শুরু হয়, চলে ১৫ দিন। পিরকে স্মরণ করে হাজার হাজার হিন্দু-মুসলমান এখানে মিলিত হন। গত ৫০ বছর ধরে এই মেলা চলে আসছে শান্তিপূর্ণভাবে যা হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।  

    আসানসোল বা মাইথনে রাত্রিবাস করে জায়গাগুলি দেখে নেওয়া যায়।

    আসানসোলে রাত্রিবাসের ঠিকানা—হোটেল আসানসোল ইন, বার্নপুর রোড, রবীন্দ্রনগর। দূরভাষ—০৩৪১ ২২৫২৫৫২। মাইথনে রাত্রিবাসের ঠিকানা – মাইথন টুরিস্ট লজ, চলভাষ – ০৯৭৩২১০০৯৪০।কলকাতা অফিসের দূরভাষ – ০৩৩ ২২৮৪৫৯১৭।

    কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেড়িয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

    পায়ে পায়ে বাংলা 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More