শুক্রবার, ডিসেম্বর ৬
TheWall
TheWall

নির্জন সৈকত বাঁকিপুট

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

জুনপুট থেকে বাঁকিপুটের দূরত্ব মাত্র ৫ কিলোমিটার। নিজস্ব গাড়ি, মোটর-সাইকেল, সাইকেলই হল যাবার একমাত্র উপায়। যদি কিছুই না থাকে তাহলে পদযুগলের ওপর ভরসা করে পাড়ি দিতে হবে। ভাগ্য ভালো থাকলে রিকশা মিলে যেতে পারে। কাঁথি রেলস্টেশন থেকে ভাড়া করা গাড়িতে সহজে বাঁকিপুট যাওয়া যায়।

হরিপুর সাগর সৈকতের বিপরীত পাশে বাঁকিপুট বা গোপালপুর সৈকত। ওড়িশার গোপালপুর অন সি-র যতটা প্রচার, ঠিক ততটাই আড়ালে বাংলার এই গোপালপুর। অথচ বাঁকিপুটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়নাভিরাম। লাল মোরাম বিছানো পথের দু’পাশে সারিবদ্ধ ঝাউ, ইউক্যালিপটাসের অভ্যর্থনায় আপ্লুত হয়ে এগিয়ে যাওয়া সমুদ্রের দিকে। সমুদ্র এখানে একটু বাঁক নিয়েছে, ফলে ক্ষয়ের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবছর বর্ষাকালে সমুদ্রবাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়।

এই সমুদ্রবাঁধের ওপরেই গড়ে উঠেছে থাকার একমাত্র জায়গা ঝিনুক লজ। ঝিনুক নামটি সার্থক। সমুদ্রতটে বালি আর ঝিনুক ছাড়া তো আর কিছু থাকার কথা নয়। যারা ভীষণভাবে নির্জনতা পছন্দ করেন তাদের জন্য ঝিনুক একেবারে আদর্শ। পর্যটক নামমাত্র যায়। অথচ এত কাছে সমুদ্র যে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, পাখির কলকাকলি, অপার নির্জনতা নিয়েই বাঁকিপুট বা গোপালপুর।

নির্জন সৈকতে ঘুরে বেড়িয়ে কাছেই ঘুরে আসা যায় দরিয়াপুর। দরিয়াপুর নামটি শুনলেই মনে হয় দরিয়ায় নাও ভাসানোর কথা। নাও না ভাসালেও দরিয়াপুর কিন্তু সাহিত্যের দরিয়ায় এক অবিস্মরণীয় জায়গা করে নিয়েছে। এই সেই বিখ্যাত দরিয়াপুর গ্রাম– কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের পটভূমি। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র যখন এখানে এসেছিলেন তখন এই অঞ্চল ছিল গভীর জঙ্গলাকীর্ণ। দৌলতপুরে সেচ বিভাগের বাংলো ছাড়া কিছু ছিল না। সে বাংলোটির বর্তমানে ভগ্নদশা। কপালকুণ্ডলা কালীর দুটি মন্দির, রাস্তার ধারে নতুন মন্দিরটি অবস্থিত। খোলা প্রাঙ্গণের এক ধারে বঙ্কিম মঞ্চ আর একধারে গ্রন্থাগার এবং কক্ষের মধ্যে বঙ্কিমের আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত রয়েছে। এই মূর্তির সন্নিকটে প্রতিবছর বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুদিন অর্থাৎ ২৬শে চৈত্র বঙ্কিমমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে।

একটু এগোলেই উঁচুমতো ফাঁকা জায়গায় সদাশিবের বড় মন্দির। ভাঙা একটি মূর্তি বাইরে দাঁড় করানো রয়েছে। মন্দিরটি বেশ প্রাচীন, সম্প্রতি সংস্কার করা হয়েছে। সামনে রয়েছে বিশাল ঝুরির বটবৃক্ষ। এই মন্দিরটিকে পেছনে ফেলে গ্রামের রাস্তা ধরে এগোলে আর একটি মন্দির দেখা যাবে। ভাঙাচোরা, আগাছার জঙ্গলে পরিপূর্ণ মন্দিরের আগের চেহারা দেখলে ভয় পাওয়ারই কথা ছিল কিন্তু মন্দিরটি সংস্কার হয়ে আমূল পালটে গিয়েছে। বোঝার উপায় নেই মন্দিরটি আগে কেমন ছিল। তবে এটাই যে বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলায় উল্লিখিত মন্দির তা কিন্তু সন্দেহের কুয়াশায় ঢাকা, কারণ লিখিত কোনও প্রমাণ নেই।


এখান থেকে খানিকটা এগোলে পথের বাঁ পাশ আলো করে দাঁড়িয়ে থাকা দরিয়াপুর দীপঘর বা লাইট হাউস নজরে আসবে। লাইট হাউসটি দরিয়াপুরের গর্ব। প্রাচীর ঘেরা এলাকার মধ্যে অফিস, বাগান, কর্মীদের আবাসন আর তার মধ্যে উঠে গেছে সাদা-কালো বলয়ের উত্তুঙ্গ দীপঘর। দীপঘরের উচ্চতা ৭৫ ফুট, প্রায় সাততলা সমান। ভেতরে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দেখা যায় অপূর্ব দৃশ্য। সামনে গঙ্গায় এত বিপুল জলরাশি যে একূল ওকূল দেখা যায় না। নদী এখানে প্রায় ২০ কিলোমিটার মতো চওড়া। বাঁয়ে রসুলপুর নদীর শীর্ণ ধারা। কখনও কখনও কলকাতা বন্দরে প্রবেশাভিমুখী জাহাজের দেখা মিললেও মিলতে পারে।

দীপঘরের যন্ত্রপাতি সম্পর্কে যে পরিচিতি দেওয়া আছে তা হল–


লাইট হাউসের যন্ত্রপাতি ছিল দ্বারকাতে এবং তখন এটি জ্বালানো হত তেলের সাহায্যে। পরে ১৯৬৪ সালে ওই যন্ত্রপাতি নিয়ে আসা হয় কলকাতা লাইট হাউসে এবং সংস্কার করে ১৯৬৮ সালে দরিয়াপুরে স্থানান্তরিত করা হয়। তখন থেকে এটি তেলের পরিবর্তে পেট্রোলিয়ম ভেপার বার্নারে জ্বালানো শুরু হয়। উনিশ মাইল দূরের সমুদ্র থেকে জাহাজের নাবিকরা এর আলো দেখতে পান। তাদের বিপদ-আপদের প্রধান ভরসাই এই আলোকস্তম্ভ। ছোট-বড় সকল ভ্রমণার্থীরই উচিত এই দীপঘর ঘুরে দেখা। ওপরের উচ্চতা থেকে নীচের প্রকৃতি যেন ক্যানভাসে আঁকা ল্যান্ডস্কেপ। এই লাইট হাউস ঘুরে দেখার সময় বিকেল ৩টে থেকে ৫টা। প্রবেশমূল্য বয়স্কদের মাত্র ১০ টাকা আর শিশুদের মাত্র ৩ টাকা, স্টিল ক্যামেরা ২০ টাকা আর ভিডিওর জন্য ২৫ টাকা করে লাগে।

এখান থেকে পায়ে পায়ে দেখে নেওয়া যায় দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল ফিশিং হারবার। কাঁথি শহর থেকে দরিয়াপুরের দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার। অটো, জিপ, ভাড়া করা গাড়ি করে স্বছন্দে এখানে আসা যায়। অথবা রুটের ট্রেকারেও কাঁথি থেকে এখানে আসা যেতে পারে।


দরিয়াপুর থেকে নদী পেরিয়ে গেলেই হিজলি। হিজলি শব্দের মধ্যেই একটি মাদকতা আছে। ভূগোল, ইতিহাস, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অটুট বন্ধনে গ্রথিত হিজলি। হিজলিকে জানতে গেলে একটু ইতিহাস, একটু ভূগোল না জানলে পরিক্রমা কেবল নীরস পরিক্রমায় পর্যবসিত হবে।

রসুলপুর নদী গঙ্গার শেষ উপনদী। এই সেই বঙ্কিমচন্দ্রের বিখ্যাত উপন্যাস ‘কপালকুণ্ডলা’-র রসুলপুর নদী। রসুলপুর নদী যেখানে গঙ্গায় মিশেছে সেই সংযোগস্থলের উত্তর তীরে হিজলি এবং দক্ষিণ তীরে দরিয়াপুর।

চতুর্দশ শতাব্দী ছিল তাম্রলিপ্ত বন্দরের অন্তিমকাল। তারপর নদী দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে ১৫১৪ খ্রিস্টাব্দে ওড়িশার পিপলি বন্দর থেকে হিজলিতে কিছু পর্তুগিজ বণিক আসে। হিজলি অঞ্চল তখন ঘন জঙ্গলে ঢাকা, বসবাসের কোনও সুযোগ-সুবিধাই নেই। খুব দ্রুত তাম্রলিপ্ত বন্দরের বিকল্প হিসাবে ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দে হিজলি বন্দরের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া এবং ইউরোপে। চাল, কার্পাস ও পাটের কাপড় যা রেশমি বস্ত্রের মতো, তার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে এই বন্দর। নাগাপট্টম, সুমাত্রা, মালাক্কা ও অন্যান্য স্থান থেকে জাহাজ আসত। তারা প্রচুর চাল, কার্পাস ও রেশমবস্ত্র ছাড়াও মাখন, লঙ্কা, চিনি ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে যেত। পর্তুগিজ ছাড়া ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজ বণিকরাও বাণিজ্য করতে আসত এখানে। আস্তে আস্তে হিজলি প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ বাণিজ্যকেন্দ্র ও শ্রেষ্ঠ বন্দরের খ্যাতি অর্জন করে।


১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দে হিজলির যুদ্ধ ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মাত্র দুই শত সৈন্য নিয়ে জব চার্নক চাতুরি করে মোগল সেনাধ্যক্ষ আবদুস সামাদের ১২ হাজার সৈন্যের বাহিনীকে পরাজিত করলেন। ভারতের মাটিতে, হিজলিতে ইংরেজ আধিপত্যের গোড়াপত্তন হল ১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুন। হিজলি তখন বিশাল দুর্গ সমন্বিত রাজধানী শহর। আপাতত অতীতের গৌরবের সাক্ষী কিছু নেই, বর্তমানে মাথা তুলে আছে শুধু মসনদ-ই-আলা।

এই মসজিদটি মুসলিম স্থাপত্যরীতির এক অতি প্রাচীন নিদর্শন। ঐতিহাসিকদের মতে, এই মসজিদের নির্মাণ শুরু হয় শাহজাহানের শাসনকালে আর শেষ হয় ১৬৪৯ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু এই মসজিদ নির্মাণ করল কে?

সে ইতিহাস জানতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে সেই সুদূর অতীতে। এই অঞ্চলে হিজলি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন মোগল সুবেদারের অধীনস্থ ক্ষমতাশালী জমিদার মনসুর ভুঁইঞার ছোটছেলে রহমত ভুঁইঞা। রহমত বড়ভাই জামালের ষড়যন্ত্রের হাত থেকে বাঁচতে এখানে পালিয়ে আসেন এবং হিন্দু কর্মচারীদের নিয়ে রাজ্যপাট চালাতে থাকেন। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র দাউদ খাঁ অল্প দিন রাজত্ব করে মারা যান। তাঁর পুত্র তাজ খাঁ স্বীয় প্রতিভাবলে হিজলি রাজ্যকে সুশাসিত করেন। হিন্দু ও মুসলমানদের নিকট তিনি জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তিনি উপাধি নেন মসনদ-ই-আলা। অর্থ– যাঁর আসন উচ্চ।


রাজকর্মচারীদের ষড়যন্ত্রে তাঁর প্রিয় ভাই সিকন্দরের মৃত্যু ঘটলে তার মনে বৈরাগ্য জন্মায় এবং বর্তমান পটাশপুরের অমর্ষি নামক স্থানের ফকির হজরত মখদুম-শেখ-উল-মশারেখ-শাহ-আবদুল-হক উদ্দীন চিশতির কাছে সন্ন্যাসধর্মে দীক্ষা নেন এবং ঈশ্বরের চিন্তায় বাকি জীবন কাটান। তাঁর ঈশ্বর ভজনার গুণে তিনি সকলের কাছে হয়ে ওঠেন ঈশ্বরের অবতার। তাঁর সাধনক্ষেত্র হিজলিতে গড়ে তোলেন বিরাট মসজিদ।

মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। পূর্ব দিকে তিনটি দরজা। তিনটি সুগোল প্রকাণ্ড গম্বুজ ও মিনার দ্বারা ছাদটি নির্মিত। অতীতে সুউচ্চ মিনারগুলি সাগর থেকে মোহনায় প্রবেশকালে বা বঙ্গোপসাগরে যাত্রাকালে বণিক, নাবিকদের পথ দেখানোয় সাহায্য করত।

মসজিদের মাঝের দরজার খিলানের একটু ওপরে দেওয়ালের গায়ে আরবি অক্ষরের প্রস্তরলিপি রয়েছে। মসজিদের সামনে তাজ খাঁয়ের সমাধি মঞ্চ বা মাজার। লোকে বলে বাবাসাহেবের মাজার। চলতি কথায় মসনদ-ই-আলার স্থানীয় নাম ‘বাবাসাহেবের কোর্টগড়া’।

মাজারের সামনে রয়েছে একটি বড় কুয়ো। কথিত আছে, তাজ খাঁ সুদূর মক্কা থেকে পবিত্র জল এনে এর মধ্যে রেখেছিলেন। মসজিদের পাশে একটি প্রাচীন গুলঞ্চ গাছের পাশে রয়েছে তাজ খাঁয়ের ছোটভাই সিকন্দরের লোহার লাঠি। এটিকে ‘আশাবাড়ি’ বলে ডাকা হয়। জনশ্রুতি, কোনও কামনা নিয়ে এক বারের চেষ্টায় এই আশাবাড়িকে মাটি থেকে ওঠাতে পারলেই তার মনস্কামনা পূর্ণ হবে। বছর দশেক হল মসজিদটি সংস্কার হয়ে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।


খেজুরি থানার হিজলিতে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কাছে মসনদ-ই-আলা সমান শ্রদ্ধাভাজন। এ অঞ্চলের লোকেরা মানত করে, ইচ্ছাপূরণ হলে পূজা দেয়, শিরনি চড়ায়। শিরনি তৈরি হয় চালের গুঁড়ো, ময়দা এবং চিনি দিয়ে।

প্রতিবছর চৈত্র মাসের প্রথম শনিবার সারারাত ধরে মেলা বসে সন্ধে থেকে। পার্শ্ববর্তী জেলাগুলি থেকে হাজার হাজার মুসলমান জলপথে ও স্থলপথে আসেন এখানে। কেবল মুসলমানরাই নন, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লক্ষাধিক মানুষের ঢল নামে মেলায়। পশ্চিমবঙ্গে এরকম সম্প্রীতির মেলা কমই আছে।

ঝাউয়ের জঙ্গল, রসুলপুরের বিস্তীর্ণ মোহনা, পিছনের বালিয়াড়ি মসনদ-ই-আলাকে এক সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে অদূর ভবিষ্যতে।

বাঁকিপুটে রাত্রিবাসের ঠিকানা
ঝিনুক লজ, বাঁকিপুট, চলভাষ – ৯৮৩১১৬৭৫৩৭।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেড়িয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা 

Comments are closed.