এই সেই চম্পকনগর!

চম্পাইনগর বা চম্পকনগর মনসামঙ্গলের নায়ক চাঁদ সদাগরের জন্মস্থান বলে পরিচিত। অতীতের চম্পাইনগর বর্তমানে কসবা। এটি একটি প্রাচীন গ্রাম।

৮৩

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুস করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

ছোটবেলা থেকে চাঁদ সদাগর, বেহুলা-লখিন্দরের গল্প শুনতে-শুনতে সে-সব নাম যে মনের অবচেতনে শিকড় গেড়ে বসে গেছে, তা বোঝা যায় সেগুলো পরবর্তীকালে সামনে এলে। বাস্তবে চাঁদ সদাগরের দেশ কোনওদিন দেখা হবে বা অতীতে আদৌ তার অস্তিত্ব ছিল কি না সে-সব নিয়ে কোনওদিন ভাবিনি। সবই লেখকের কল্পকাহিনি ধরে নিয়েছি। কিন্তু বাস্তবে সেই নগরে গিয়ে যখন পৌঁছলাম, তখন এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করলাম।

এই সেই চম্পকনগর! চম্পাইনগর বা চম্পকনগর মনসামঙ্গলের নায়ক চাঁদ সদাগরের জন্মস্থান বলে পরিচিত। অতীতের চম্পাইনগর বর্তমানে কসবা। এটি একটি প্রাচীন গ্রাম। বুদবুদ থেকে অ্যামুনেশন রোড ধরে দক্ষিণে ৮ কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই দামোদরের উত্তর তীরে এই গ্রামে পৌঁছনো যাবে। আবার পানাগড় থেকেও যাওয়া যায়।

মনসামঙ্গলের কাহিনি থেকে আমরা জানি, চাঁদ সদাগর ছিলেন পরম শৈব এবং তিনি তাঁর বসতভিটায় শিবমন্দির তৈরি করে শিবের আরাধনা করতেন। ডিভিসি ক্যানেলের দক্ষিণে একটি উঁচু ঢিবিতে রয়েছে একটি সুন্দর শিবমন্দির। বিশাল অশ্বত্থ গাছের পাশে অবস্থিত খোলামেলা মন্দিরটিতে রয়েছে গৌরীপট্টহীন এক বিশাল শিবলিঙ্গ, যেটি রামেশ্বর নামে পরিচিত। শিবলিঙ্গের উচ্চতা কম করে চার হাত। এর ছয় কোনা আকৃতি, মানুষ দু’হাতে বেড় দিয়ে ধরতে সক্ষম নয়। পুজো করার জন্য সিঁড়ি দিয়ে উঠে বসার ব্যবস্থা আছে। পূর্ব বর্ধমানের বর্ধমানেশ্বর শিবলিঙ্গটির যে বিশাল আয়তন, তার পরেই এই শিবলিঙ্গ। প্রচুর সংস্কার হয়েছে মন্দিরটির, নতুন সংযোজিত হয়েছে সুরম্য এক নাটমন্দির।

এই মন্দির সংলগ্ন আরও কয়েকটি মন্দির রয়েছে। ডানদিকে এক ঝোপের মধ্যে বাণেশ্বর শিবের অবস্থান। কথিত আছে, কালাপাহাড় বাণেশ্বরের মাথায় আঘাত করার ফলে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে, সেই রক্ত জমে সৃষ্টি হয় রক্তপুকুর। এখন পুকুরে থকথকে কাদা ছাড়া কিছু নেই। কিছু দূরে পাকা বেদিতে মা মনসার অধিষ্ঠান। নিত্যপূজা হয়।
একটু পূর্বে সরে গেলে দেখা যাবে একটি পরিত্যক্ত বিষ্ণুমন্দির। বর্তমানে মন্দিরের মধ্যে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি রয়েছে।
এই মন্দিরের উত্তর-পূর্বে রয়েছে একটি উঁচু ঢিবি, যেটিকে জনগণ অতীতের সাঁতালী পর্বত বলে মনে করে। সর্পদংশনের হাত থেকে সদ্যবিবাহিত লখিন্দরকে রক্ষা করার জন্য চাঁদ সদাগর লোহার বাসরঘর তৈরি করেছিলেন এই পর্বতেই। জায়গাটি গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ।
এই সব মন্দিরের দক্ষিণে চোখে পড়বে অবরুদ্ধ গতিহীন কোনও নদীর পরিত্যক্ত শুকনো খাতের চিহ্ন বা মরা খাল। অনেকের মতে, এটিই অতীতের গাঙুর নদী, যেখানে বেহুলা মৃত স্বামীকে নিয়ে ভেলা ভাসিয়েছিলেন।
এ ব্যাপারে নিম্নলিখিত তথ্য সংযোজন করলে খুব একটা অতিশয়োক্তি হবে না মনে হয়। কবি কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ রচিত ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে বর্ণিত জলপথটি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, ওই সময়ে দামোদরের শাখানদী হয়ে বাঁকা নদী পূর্বমুখে প্রবাহিত হবার পর মেমারি থানায় বাঁকা থেকে অন্য একটি শাখা গাঙ্গুর নামে মেমারি ও কালনা থানার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হত। বেহুলা যে স্রোতপথ ধরে কলার মান্দাসে ভেসে গিয়েছিলেন, তা ছিল নিঃসন্দেহে সুনাব্য নদীপথ। এটা প্রমাণ করে যে, নদীর বর্ণনা প্রসঙ্গে কবি খুব একটা কল্পনার আশ্রয় নেননি।

চম্পাইনগর যেহেতু মনসামঙ্গলের সঙ্গে জড়িত, তাই এখানকার অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা মনসা। গ্রামের প্রখ্যাত জমিদার ছিলেন নায়েক বংশধারী। জমিদারবাড়ি সংলগ্ন এক মন্দিরে নায়েকদের দ্বারা মনসাদেবী নিত্য পূজিত হন। শ্রাবণ সংক্রান্তিতে পালিত হয় বিশেষ উৎসব। এই উপলক্ষে দূরদূরান্ত থেকে ভক্তজনের সমাগম হয়। একটি মেলাও বসে। সেখানে এই গ্রামের কামার, কুমোর ও বেনে সম্প্রদায়ের লোকেরা এখনও মাটি খুঁড়ে উনুন তৈরি করতে পারেন না, এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আছে। এই কাজ তাদের অন্য সম্প্রদায়কে দিয়ে করাতে হয়।

এখানে বিভিন্ন দেবদেবীর পূজার চল থাকলেও শিবপূজার ধুমই বেশি। বহু ভক্ত প্রতিদিন এসে ভক্তিভরে পূজা করে থাকেন। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে বিশাল মেলা বসে। এই মেলা আগের থেকে অনেক বেশি জাঁকজমক নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। মেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের আসা-যাওয়ায় এলাকাটি সরগরম হয়ে ওঠে।

রণডিহা

এখান থেকে কাছেই বর্ধমান জেলার বুদবুদ থানার অন্তর্গত দামোদরের তীরে ছোট্ট এক গ্রাম রণডিহা। পানাগড় রেলগেট থেকে একটু এগিয়ে সেনাবাহিনীর বেসক্যাম্পকে বাঁদিকে রেখে সোজা রাস্তায় ছোট্ট একটি ক্যানেল পেরিয়ে রণডিহা গ্রাম। খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির কুঁড়েঘর। ধানের গোলা। রাস্তায় শুকোচ্ছে ধান। টুকরো-টুকরো দৃশ্য পার হতেই জঙ্গলের শেষে চোখ পড়বে দামোদরের দিগন্তবিস্তৃত সীমারেখা। একটি ছোট বাঁধ দিয়ে দামোদরের স্রোতকে বেঁধে রাখা হয়েছে। ইংরেজ আমলে সেচব্যবস্থা প্রথম চালু হয় এখানে।

ছোট ব্যারেজ

Anderson Weir. ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর বাংলার গভর্নর জন অ্যান্ডারসন এটির উদ্বোধন করেন। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে এর কাজ শুরু হয়েছিল। সেচ বিভাগের দেশি-বিদেশি বহু ইঞ্জিনিয়ার ও সচিবের তত্ত্বাবধানে এটি নির্মিত হয়। পাঁচটি লকগেট। দুপুরের রোদে চিকচিক করে নদীর জল। চারদিকে ধূসর বালুকারাশি। শীতে যখন জল কম থাকে তখন খেটেখাওয়া মানুষরা জলে পা ডুবিয়ে হেঁটে চলে যান নদীর ওপারে বাঁকুড়ার সোনামুখীতে।
নদীর ধারেই রয়েছে সেচ বিভাগের বাংলো। ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টের বিশাল চৌহদ্দির একদম শেষপ্রান্তে একতলা বাংলোটি। এই সরকারি বাংলোকে বলা যেতে পারে সাহেবকুঠি। ১৯১৯ সালে অ্যান্ডারসন সাহেব এটি তৈরি করেন। সামনের টানা বারান্দায় দাঁড়ালে অনেক দূরে, বাঁকে-বাঁকে হারিয়ে যাওয়া দামোদরকে দেখা যায়। এই বাংলোয় থাকার অনুমতির জন্য লিখতে হবে-– এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার, দামোদর হেড ওয়ার্কস ডিভিশন, দুর্গাপুর-২। এছাড়া থাকার জন্য রয়েছে আস্থা ম্যারেজ হল।

বাঁধ, পারিপার্শ্বিক গ্রাম ও দামোদরের দৃশ্য চমৎকার। শীতের রোদে দামোদরের চড়ায় দূরাগত পাখির মেলা। পিকনিকের জন্য রণডিহা যথেষ্ট জনপ্রিয়।
কিছু দূরে ভরতঢিবি থেকে প্রাচীন যুগের ঐতিহাসিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। ঘুরতে-ঘুরতে দেখে নেওয়া যেতে পারে।
আরও খানিকটা দূরে অর্থাৎ চাক তেঁতুল পেরিয়ে কসবা গাঁয়ে ঢোকার ঠিক আগে ডানদিকের মোরামের রাস্তা ধরে একটু গেলেই সুবিশাল প্রাচীন এক বটবৃক্ষের ছায়ায় শিবঠাকুরের মন্দির। ভেতরে ফুট-পাঁচেক উঁচু কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ নিত্য পূজিত হন। এই শিবই নাকি চাঁদ সদাগরের আরাধ্য দেবতা ছিলেন। কাছেই ছিল বণিকদের বাড়ি। বর্তমানে কিছুই নেই। একটা ঢিবির ওপর গড়া হয়েছে বেহুলা-লখিন্দরের মন্দির। ট্রেনে পানাগড়, সেখান থেকে বাসে বা রিকশায় রণডিহা। অন্য পথে বুদবুদ হয়ে কসবা-চম্পাইনগর হয়েও রণডিহা আসা যায়।

ভরতপুর

রণডিহা থেকে কাছেই দামোদর নদের উত্তরে অবস্থিত ভরতপুর একটি প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম। জি টি রোডে পানাগড় বাসস্টপে নেমে বা পানাগড় রেলস্টেশন থেকে দক্ষিণে শিলানপুর। বাসে যাওয়া যায়। সেখান থেকে পূর্ব দিকে দু’-একটি গ্রামের পরেই ভরতপুর। শিলানপুরের রাস্তা ছেড়ে লাল মোরাম ধরে পূর্বগামী হবার কিছু পরেই দক্ষিণে প্রলম্বিত মোহময় দামোদর। উত্তরে বাবলাবীথির শ্যামলিমায় ঘেরা বিরাট উঁচু ঢিবির ওপর বিংশ শতাব্দীর সাতের দশকে আবিষ্কৃত হওয়া বঙ্গের প্রথম বৌদ্ধস্তূপ দেখতে পাওয়া যাবে। শুনতে অবাক লাগলেও এটিই সত্য যে, এই গ্রামেই আবিষ্কৃত হয়েছে বঙ্গের প্রথম বৌদ্ধস্তূপ। পশ্চিমবঙ্গের প্রত্ন মানচিত্রে গ্রামটি একটি উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে রয়েছে। কারণ, এটি বঙ্গের এক প্রাচীন প্রত্নক্ষেত্র। খননকার্যে প্রাপ্ত ১২টি বুদ্ধমূর্তি ও বিভিন্ন নিদর্শনাদি প্রমাণ করে যে, এখানে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ বছর পূর্বে তাম্রাশ্মীয় সভ্যতার অধিবসতি গড়ে উঠেছিল। সে-দিক থেকে গ্রামটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।
জনশ্রুতি, অতীতে ভরত নামে কোনও এক রাজার রাজত্ব ছিল এখানে। তা থেকেই গ্রামের নাম ভরতপুর হয়েছে। Peterson-এর District Gazetteer-এ দেখা যায়, এখানে সদগোপ বংশীয় রাজারা রাজত্ব করতেন। হয়তো তাদেরই কোনও রাজার নাম ছিল ভরত আর তার নামেই গ্রামের নাম হয়ে থাকতে পারে।

গ্রামে বেশ কয়েকটি শিবমন্দির, বিষ্ণুমন্দির, দুর্গামন্দির আছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় মন্দির হল ধর্মরাজ মন্দির। এই গ্রামের গ্রামদেবতাই হলেন ধর্মরাজ। ধর্মরাজ সিংহাসনে উপবিষ্ট আর তাঁর সঙ্গেই অবস্থান করছেন গণেশ, নারায়ণ শিলাসমূহ। ধর্মরাজের নিত্যপূজা হয়। বৈশাখী পূর্ণিমায় মহা ধুমধামের সঙ্গে গাজন উৎসব পালিত হয়। গাজনকে কেন্দ্র করে কয়েকদিনের জন্য জমকালো একটি মেলা বসে। মেলাটি বহু দিনের।

রণডিহায় রাত্রিবাসের ঠিকানা হল-– আস্থা ম্যারেজ হল, রণডিহা, চলভাষ: ৯০০২৪৩৮৬৮২। এ ছাড়া পানাগড় বা দুর্গাপুরে থেকে জায়গাগুলি দেখে নেওয়া যায়।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More