চোরচিতার চোরেশ্বর শিব

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

এখন ঘরের বাইরে বেরোতেও মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। শুয়ে, বসে, গার্হস্থ্যকর্ম সেরেও সময় যেন কাটছে না। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

গোপীবল্লভপুর থেকে বাসে কুঠিঘাট নেমে অটো ভাড়া করে রান্টুয়া হয়ে বাংলা-বিহার সীমান্তে চোরচিতা গ্রামে পৌঁছতে হয়। ঝাড়গ্রাম থেকে চোরচিতার দূরত্ব ৪৩ কিলোমিটার। রান্টুয়া বাসস্টপ থেকে ১০ কিলোমিটার সুবর্ণরেখা নদীর পার দিয়ে গেলেই এই গ্রামে পৌঁছনো যায়। রাস্তাটি ছবির মতো সুন্দর। এখানে রয়েছে বিখ্যাত ‘চোরেশ্বর’ শিবের মন্দির। শিবের এরকম নাম রীতিমতো অভিনব। এমন অদ্ভুত নাম কেন হল তার কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। মন্দিরের ভিতর মাথা তুলে আছে শিবলিঙ্গ।
শিখর দেউলটি এক উল্লেখযোগ্য পুরাকীর্তি। মন্দিরে কোনও প্রতিষ্ঠালিপি নেই, তবে এটি আঠারো শতকের নির্মিত বলেই বিশেষজ্ঞদের অনুমান। গ্রামের বাসিন্দা গৌরচন্দ্র মহাপাত্র এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। চৈত্রসংক্রান্তিতে গাজন উপলক্ষ্যে মেলা বসে।

 

চোরচিতা যোগাশ্রম

চোরেশ্বর শিবমন্দিরের অদূরে সুবর্ণরেখার তীরে চোরচিতা যোগাশ্রম। এই আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা তন্ত্রসাধক স্বামী গোবর্ধনগিরি মহারাজ। সর্পগন্ধা, নীল কাঞ্চন, নীল ধুতরা ও আরও নানাবিধ গাছগাছালিতে ভরা আশ্রমটি। মহারাজকে ঘিরে অনেক অলৌকিক ঘটনা মানুষের মুখে মুখে আজও শুনতে পাওয়া যায়। ১৩০৫ বঙ্গাব্দে নদীতে বান এসে ঘরবাড়ি সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সেই সময় মহারাজ আশ্রয় নিয়েছিলেন বটগাছের কোটরে। আশ্রমের পশ্চিমে রটন্তী কালীর মন্দিরের পাশে রয়ে গেছে সেই বটগাছ। প্রায় ২০০ ফুট জায়গা জুড়ে বটের ঝুরিগুলি এক একটি কাণ্ডে পরিণত হয়েছে। শীতের সময় আসে পরিযায়ী পাখির দল। কত রকমের কত রঙবেরঙের পাখি সব, কোথা থেকে আসে, কোথায় চলে যায়, কেউ জানেন না। আর একটি ঘটনা হল, মৃত ছেলের বুকে পা রাখতেই নাকি ছেলে ফিরে পেয়েছিল জীবন! এই সাধক ১৪০ বছর পর্যন্ত বেঁচেছিলেন! মহারাজকে নাকি সুবর্ণরেখার জলের ওপর দিয়ে হাঁটতেও দেখা গেছে বলে লোকের বিশ্বাস।
আশ্রমে মহারাজের সমাধিমন্দির রয়েছে। তার পাশে রয়েছে আর্টিজীয় কূপ, আগে সবসময় জল পড়ত, বর্তমানে তা খারাপ অবস্থায় পড়ে আছে। মহারাজের তিরোধান দিবস ৯ শ্রাবণে উৎসব পালিত হয়। এছাড়াও মাঘ মাসের অমাবস্যায় হয় রটন্তী কালী পূজা। প্রচুর ভক্তের সমাবেশ ঘটে এই পূজা উপলক্ষ্যে।
গোপীবল্লভপুর ঘুরতে গেলে চোরচিতা গ্রাম ও যোগাশ্রম অবশ্যই ঘুরে নেওয়া উচিত। গ্রামীণ পথের সৌন্দর্য কল্পনাতীত সুন্দর।

গোপীবল্লভপুর
শ্রীপাট

ঝাড়গ্রাম থেকে গোপীবল্লভপুরের দূরত্ব ৪২ কিলোমিটার। কুঠিঘাটগামী বাসে বা নিজস্ব গাড়ি ভাড়া করে এখানে আসা যায়। ৪২ কিলোমিটার দূর হলেও গোপীবল্লভপুর বেশ ব্যস্তসমস্ত গঞ্জ। এখানে রয়েছে গোপীবল্লভজীউয়ের মন্দির। এটি বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কাছে অন্যতম প্রধান তীর্থ। চৈতন্যেত্তর যুগের ত্রয়ী প্রধান বৈষ্ণবাচার্যের অন্যতম হলেন শ্রীশ্যামানন্দ প্রভু। ইনিই এখানে রাধাগোবিন্দ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। গোবিন্দের নামানুসারে জায়গার নাম হয় গোপীবল্লভপুর। রাধাগোবিন্দের পুবমুখী শিখর মন্দিরটি পুরাকীর্তির এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। মন্দিরের দেওয়ালে বিষ্ণু, বরাহ নৃসিংহ ও মনসার মূর্তি নিবদ্ধ দেখা যায়। এছাড়া কোনও প্রাচীন মন্দিরে ব্যবহৃত পাথরের একটি দরজা ও একটি অজ্ঞাতপরিচয় পাথরের মূর্তিও মন্দির প্রাঙ্গণে পড়ে আছে।

মন্দিরটি বেশ উঁচুতে। কতগুলি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। গোপীর মূর্তিটি উচ্চতায় ৩ ফুট। কালো কষ্টিপাথরের এরকম অনিন্দ্যসুন্দর মূর্তি সারা ভারতে বিরল বলা যায়। এই মন্দির বা মূর্তির খ্যাতি প্রবলভাবে বিরাজমান সমগ্র বৈষ্ণব সমাজের কাছে। যদি গরমকালে যাওয়া যায় তাহলে কালো মূর্তির গলায় মোটা স্বর্ণচাঁপার মালা বাকরুদ্ধ হয়ে বিস্ফারিত নেত্রে দেখতে হয়। মন্দিরময় স্বর্ণচাঁপার সুবাস। শ্রীপাট গোপীবল্লভপুর ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’ নামে খ্যাত। কথিত আছে যে, এখানে শ্রীল গোবিন্দ স্বয়ং বিহার করেন। বাস্তবিকই মন্দিরে প্রবেশ করে রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তি দর্শন করলে মনে এক অদ্ভুত আনন্দের সঞ্চার হয়। মনে হয় সত্যি এখানে ভগবান বিচরণ করেন। মন্দিরের পৃথক কক্ষে গৌর, নিতাই, জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার বিগ্রহ আছে। একটি পাঁচ চূড়াযুক্ত নহবতখানা ও একটি আট কোনা রাসমঞ্চ এখানকার উল্লেখযোগ্য দ্রষ্টব্য।
এখানকার শ্রেষ্ঠ উৎসব দণ্ডমহোৎসব। দোলযাত্রা ও রাসযাত্রা এখানকার উল্লেখযোগ্য উৎসব। গোপীবল্লভপুরের সঙ্গে শ্রীচৈতন্যের অন্যতম শিষ্য রসিকানন্দের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁদের সাধনায় গোপীবল্লভপুর একটি প্রসিদ্ধ বৈষ্ণবতীর্থে বা বলা যেতে পারে গৌড়ীয় মহাতীর্থে পরিণত হয়েছে।
গোপীবল্লভপুরের দণ্ডমহোৎসবের সূত্রপাত যেভাবে হয় তা যেমন চমকপ্রদ তেমনি কৌতূহলোদ্দীপক।
খড়গপুরের ধারেন্দা গ্রামের শ্যামানন্দ বর্ধমান জেলার অম্বিকার হৃদয়ানন্দ ঠাকুরের কাছে বৈষ্ণব মন্ত্রের দীক্ষা গ্রহণ করে নতুন নাম নেন কৃষ্ণদাস। এরপর তিনি বৃন্দাবনে যান এবং রাধাকৃষ্ণের লীলাস্থল মার্জনা করতে করতে শ্রীরাধার নূপুর কুড়িয়ে পান। শ্রীরাধার প্রিয় সখী ললিতা দেবী বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর বেশে সেই নূপুর ফেরত নিতে আসেন। এদিকে রাধিকার নূপুর স্পর্শে কৃষ্ণদাসের হৃদয়ে এক ভাবের সঞ্চার হয় এবং তিনি নূপুরের মালিককে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। ললিতা দেবীর অনুগ্রহে দিব্যচক্ষুর মাধ্যমে শ্রীরাধার চরণ দর্শন পান কৃষ্ণদাস। কৃষ্ণদাসের ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে শ্রীরাধা তার নাম রাখেন শ্যামানন্দ। শ্রীরাধা ওই নূপুরের মাঝখানে একটি বিন্দু প্রদান করে ললিতা দেবীকে আদেশ করেন কৃষ্ণদাসের মাথায় ওই নূপুর ছোঁয়াতে। কৃষ্ণদাস শ্যামানন্দ হয়ে পূর্বেকার তিলক ধারণ ও ভজন প্রণালীর পরিবর্তন করেন। এ খবরে ক্ষুব্ধ হয়ে গুরু হৃদয়ানন্দ নিজের হাতে শ্যামানন্দের তিলক নরুণ দিয়ে কেটে তুলে ফেলার চেষ্টা করেন। রাত্রে শ্রীহৃদয়ানন্দ স্বপ্নে দেখতে পান শ্রীচৈতন্য রক্তাক্ত দেহে তাঁর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। হৃদয়ানন্দ মহাপ্রভুর এরূপ দশার কারণ জানতে চাইলে মহাপ্রভু বলেন, তাঁর প্রিয় শিষ্য শ্যামানন্দের শরীরে আঘাত করে তিনি তাঁকেই আঘাত করেছেন। হৃদয়ানন্দ মহাপ্রভুর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে মহাপ্রভু তাঁকে দণ্ডস্বরূপ বারো দিনব্যাপী মহোৎসব পালন করে অপরাধ স্খালনের নিদান দেন। এইভাবে দণ্ডমহোৎসবের সূত্রপাত হয়। এই উৎসব গোপীবল্লভপুরে টানা ৩০০ বছর ধরে মহা আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে।
দণ্ডমহোৎসব উপলক্ষ্যে এখানে একটি বিরাট মেলা বসে। নানা স্থান থেকে মেলায় বহু সংখ্যক বৈষ্ণবের সমাবেশ হয়। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের এত বড় মেলা জেলায় দ্বিতীয়টি নেই। মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, সিংভূম থেকে প্রায় শতাধিক কীর্তনিয়ার দল এই উৎসব উপলক্ষ্যে সংকীর্তন করতে আসে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে গোপীবল্লভের মন্দিরে চলতে থাকা হরিনাম সংকীর্তনে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে।
মন্দিরের চারপাশে পায়ে পায়ে ঘুরে দেখে নেওয়া যায় গোকর্ণবট, গোস্বামীদের সমাধিক্ষেত্র ইত্যাদি।

মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সুবর্ণরেখা নদী। নদীর চিংড়ির স্বাদ অতুলনীয়। গোপীর বাজার বেশ বড়সড়। খেতের টাটকা ফসল, নদীর টাটকা মাছে সরগরম। এখানকার স্থানীয় মিষ্টি মাগধের সুনাম আছে।

শ্যামতরঙ্গিণী

গোপীবল্লভপুর পঞ্চায়েত সমিতির পাশ দিয়ে চার কিলোমিটার লাল রাস্তা অতিক্রম করলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে শ্যামতরঙ্গিণী বাঁধে। গাছগাছালির মধ্যে মনটা অন্য কোনওখানে চলে যাবে।

কেন্দুগাড়ি

অনেক সময় আমরা ব্যস্ত হয়ে উঠি অচেনা জায়গায় বেড়ানোর জন্য। নেট ঘেঁটে ছুটে যাই সেই অচেনা গন্তব্যে। সেইরকম এক গন্তব্য হল কেন্দুগাড়ি। গোপীবল্লভপুর থেকে অটোরিকশা বা মোটরে কেন্দুগাড়ির দূরত্ব ৮ কিলোমিটার। শাল, পিয়াল, মহুয়া কেন্দুর জঙ্গলে অবকাশ যাপনের কুহকী পরিবেশ নিয়ে অপেক্ষারত কেন্দুগাড়ি বনবাংলো। জঙ্গলের মধ্যে এক বিরাট জলাধার হাইওয়ে বরাবর। চারিদিকে সোনাঝুরি, সেগুন, চন্দনের রাশি। হলুদ বাংলোর বারান্দায় বসলে সামনে খুলে যাবে ছবির গ্যালারি। এ যেন এক অন্য পৃথিবী। চরাচর জুড়ে কেবল নিস্তব্ধতা, নির্জনতা। প্রকৃতির অনাবৃত রূপ আস্বাদন করতে হলে একবার আসতেই হবে কেন্দুগাড়িতে।

বনবাংলোয় থাকার জন্য লিখতে হবে এই ঠিকানায়-– ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার, পশ্চিম মেদিনীপুর, ডাক: ঝাড়গ্রাম, জেলা: পশ্চিম মেদিনীপুর। দূরভাষ: ০৩২২১-২৫৫০১০। এছাড়া অতিথি নিবাস– গোপীবল্লভপুর শ্রীপাট, চলভাষ: ৯৯৩২৫৬২১৮৬।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More