বাহান্ন বাজার তিপান্ন গলির দেশ

‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরী’ থেকে জানা যায়, সেই সময়ে এখানকার রাজা ছিলেন হরিনারায়ণ ভান। যাঁকে জাহাঙ্গীর বিদ্রোহী রাজা বলে উল্লেখ করেছেন। শাহজাহানের ‘পাদশাহনামা’ থেকে জানা যায়, চন্দ্রকোণা তখন দিল্লির করদ রাজ্য ছিল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রত্না ভট্টাচার্য্য
    শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

    এখন ঘরের বাইরে বেরোতেও মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। শুয়ে, বসে, গার্হস্থ্যকর্ম সেরেও সময় যেন কাটছে না। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

    শিলাবতী নদীর তীরে ঘাটাল ব্যস্ত মহকুমা শহর। ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিসের কাজ প্রভৃতি কারণে এখানে এলেও বেড়াতে কম মানুষই আসেন। অথচ এই অঞ্চলে পর্যটনের বেশ কিছু সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিহাসসমৃদ্ধ এলাকা, পুরাকীর্তি, নদীর ধার, রাজবাড়ি, মন্দির দেবালয়, মনীষীদের জন্মস্থান, উৎসব, মেলা প্রভৃতি নিয়েই এই ঘাটাল সার্কিট। চন্দ্রকোণা, বীরসিংহ, ক্ষীরপাই, নাড়াজোল প্রভৃতির মতো পরিচিত স্থান যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে জাড়া, রামজীবনপুর, ঘাটাল, বাসুদেবপুর প্রভৃতি।

    চন্দ্রকোণা, ঘাটাল, দাসপুর থানা অঞ্চল ঘুরতে অন্তত চার দিন সময় দেওয়া উচিত। প্রথমদিনে চন্দ্রকোণা ঘুরে দেখতে গোটা একটা দিন লেগে যাবে। দ্বিতীয় দিনে ক্ষীরপাই, জাড়া, রামজীবনপুর, বীরসিংহ দেখা যেতে পারে। তৃতীয় দিনে ঘাটাল অঞ্চল, চতুর্থ দিনে দাসপুর অঞ্চল দেখে বাড়ির পথ ধরা যেতে পারে। এ পথে সব জায়গায় বাস ও ট্রেকার চলে তবে দু-এক জায়গায় একটু হাঁটতে হতে পারে।

    ঘাটাল অঞ্চলে আসার জন্য রেলপথে পাঁশকুড়া অথবা মেচেদা স্টেশন থেকে বাস যোগাযোগ আছে। এছাড়া মেদিনীপুর শহর, হাওড়া, কলকাতা, আরামবাগ-সহ বিভিন্ন জায়গার সঙ্গে বাস যোগাযোগ রয়েছে। এই সার্কিটে রাত্রিবাসের সুবিধা রয়েছে ঘাটাল শহরে। চন্দ্রকোণা রোড অথবা মেদিনীপুর শহরে রাত্রিবাস করেও এই অঞ্চলে ঘুরে নেওয়া যায়।

    চন্দ্রকোণা-– বাহান্ন বাজার তিপান্ন গলির দেশ

    অতীতের ভান দেশ আজকের চন্দ্রকোণা। প্রায় ৫০০ বছরের ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই শহর। কথিত আছে, বহুকাল আগে চন্দ্রকেতু নামে এক রাজার নাম অনুসারে চন্দ্রকোণা নাম হয়েছে। অষ্টম শতাব্দীর কোনও এক সময় মল্লবংশীয় রাজা খয়রামল্লকে পরাজিত করে রাজপুতবংশীয় চন্দ্রকেতু এখানে রাজা হয়েছিলেন। রাজা চন্দ্রকেতু বারোদুয়ারি দুর্গ তৈরি করেছিলেন। কংসাবতী, শিলাবতী, বকদ্বীপ (বগড়ি) ও মণ্ডলঘাট এই চার সীমান্তবর্তী প্রদেশটি ছিল ভান দেশ। তখন দেশের তিনটি প্রধান নগর ছিল চন্দ্রকোণা, ভূরিশ্রেষ্ঠ ও বলিয়ার। ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে ভ্যালেন্টিনের আঁকা মানচিত্রে চন্দ্রকোণার কথা পাওয়া যায়।

    ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরী’ থেকে জানা যায়, সেই সময়ে এখানকার রাজা ছিলেন হরিনারায়ণ ভান। যাঁকে জাহাঙ্গীর বিদ্রোহী রাজা বলে উল্লেখ করেছেন। শাহজাহানের ‘পাদশাহনামা’ থেকে জানা যায়, চন্দ্রকোণা তখন দিল্লির করদ রাজ্য ছিল। ১৬৫৫ খ্রিস্টাব্দে হরিনারায়ণের মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র মিত্রসেন। তিনি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে চন্দ্রকোণা রাজ্য বিষ্ণুপুর রাজ্যের অধীন হয়। আরও পরে চন্দ্রকোণা বর্ধমান রাজাদের অধীন হয়েছিল। ভগ্নাবশেষের মধ্যে হিন্দু রাজাদের কীর্তি নিয়েই চন্দ্রকোণা শহর।

    ভান দেশ সেই সময়ে দামি বস্ত্র তৈরির জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। কথিত আছে, সেই সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে এই দেশের এত সমৃদ্ধি ঘটেছিল যে, চন্দ্রকোণাকে তখন ‘বাহান্ন বাজার তিপান্ন গলির দেশ’ বলা হত। বর্তমান বাজারগুলি এখনও অতীত গৌরবের কিছুটা সাক্ষ্য দেয়। বর্তমান চন্দ্রকোণা আর পাঁচটা শহরের মতো ব্যস্ত শহর। অতীত ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরে থাকার মতো সময় নেই। যার ফলে চন্দ্রকোণার সমস্ত ইতিহাস খুঁড়ে বার করে দেখা একটু সমস্যার। কোনও ট্যুরিস্ট গাইড নেই। লিস্ট ধরে স্থানীয় রিকশাওয়ালাকে সাথি করে যেটুকু দেখে নেওয়া। বেশিরভাগ প্রাচীন জিনিসই ধ্বংসপ্রাপ্ত আর যেটুকু আছে তার রক্ষণাবেক্ষণও তেমন নেই। তবু এখনও যা আছে তা দেখতে ভাল লাগবে।

    চন্দ্রকোণার বিশেষ দর্শনীয় স্থানের মধ্যে ছিল চারটি প্রাচীন দুর্গ। দ্বাদশদ্বারী বা বারোদুয়ারি, লালগড়, রামগড় ও রঘুনাথগড় দুর্গ। তাদের আর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। রয়েছে মল্লেশ্বর, পার্বতীনাথ, শান্তিনাথ মহাদেব প্রভৃতির মন্দির। ভাগবত আশ্রম, উদাসীন মঠ, বেশ কিছু সায়র, তিনটি অস্থল, সদ্য গড়ে ওঠা ইকো পার্ক, অর্ধভগ্ন, নতুন করে সংস্কার হওয়া বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির।

    চন্দ্রকোণার দক্ষিণে মল্লেশ্বরপুর দিয়ে শুরু করা যাক। এটি চন্দ্রকোণার সবচেয়ে প্রাচীন এলাকা। এখানেই প্রাচীন হিন্দু রাজারা দ্বাদশদ্বারী বা বারোদুয়ারি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন যার কোনও অস্তিত্বই আর নেই। কিন্তু রাজবংশের প্রতিষ্ঠিত মল্লেশ্বর শিব ও উজ্জনাথ শিব এখনও বর্তমান। কথিত আছে, কালাপাহাড়ের অত্যাচার থেকে বাঁচতে পূজারীগণ মল্লেশ্বরকে পাথর দিয়ে মুড়ে ফেলেন ও উজ্জনাথকে একটি বটগাছের তলায় রেখে দেন। কালাপাহাড় মন্দির দু’টি ধ্বংস করলেও রক্ষা পেয়ে যায় মূর্তি দু’টি। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমানরাজ তেজচন্দ্র মল্লেশ্বরের পুরনো মন্দিরের ওপর নতুন পঞ্চরত্ন মন্দির তৈরি করে দেন। প্রায় ৪০ ফুট উচ্চতার মন্দিরটির বর্তমানে সংস্কার প্রয়োজন। এখনও কিছু পলেস্তারার কাজ দেখতে পাওয়া যায়। এই মন্দির থেকে কাছেই রাস্তার ধারে উজ্জনাথ মহাদেব ফাঁকা জায়গায় খোলা আকাশের নীচে রয়েছেন। যতবারই এই মহাদেবের মন্দির নির্মিত হয়েছে, ততবারই কোনও দুর্ঘটনায় তা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ফলে আর নতুন করে মন্দির করার কেউ সাহস দেখেননি। চন্দ্রকোণার এই দুই মহাদেব খুব প্রাচীন ও বিখ্যাত।

    এরপর দক্ষিণবাজারের দিকে এগোলে পড়বে বুড়োশিবের নবরত্ন মন্দির। ইনি শান্তিনাথজীউ নামেও খ্যাত। মন্দিরটিতে এখনও কিছু পোড়ামাটির কাজ দেখা যায়। বর্তমানে কাজগুলিকে রঙিন করে দেওয়া হয়েছে। এই এলাকায় একটি বিষ্ণুমন্দিরও রয়েছে। একটু এগোলে খিড়কিবাজার। প্রধান রাস্তার মোড়ে গাছের নীচে রয়েছে গাছশীতলা দেবী। রোজ পুজো হয় এখানে।

    পুরুষোত্তমপুরে রয়েছে ভাগবত আশ্রম নামে একটি বৈষ্ণব মঠ। এর মন্দিরটি অপেক্ষাকৃত নবীন ও সুদৃশ্য। এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন যাযাবর গোস্বামী মহারাজ। এই এলাকায় রয়েছে প্রায় ২৩ ফুট উচ্চতার ইটের তৈরি শান্তিনাথ শিবের মন্দির। এখানে যে বটতলা রয়েছে সেখানে গাজন উৎসব হয়। মন্দিরটিতে পঙ্খ ও পলেস্তারার কিছু কাজ আছে। এই এলাকাতেই রয়েছে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত চাবড়ি পরিবারের রাধাগোবিন্দ মন্দির। গোবিন্দপুর এলাকায় রয়েছে তাম্বুলি বণিকদের দ্বারা ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত খলশা শিব মন্দির। এই মন্দিরের সামনে নাটমন্দির ও নহবতখানাটি বেশ অভিনব। গাজিপুরে রয়েছে রঘুনাথ মন্দির, এটি ঝামাপাথরের তৈরি।

    ঠাকুরবাড়ি বাজার এলাকা বেশ জমজমাট। এখানে আঠারো শতকের প্রথমদিকে নির্মিত ২৭ ফুট উচ্চতায় ঝামাপাথরের একটি পঞ্চরত্ন মন্দির আছে, যার চূড়াগুলি ইটের। এটি লালজির রথের সময় মাসির বাড়ি বা গুণ্ডিচাবাড়ি নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে রঘুনাথবাড়ি রাজবাড়ির লালজীউ, রঘুনাথজীউ-সহ সমস্ত বিগ্রহ এখানে রক্ষিত আছে ও নিত্যপূজা পান। দুঃখের বিষয়, কিছুকাল আগে বেশ কিছু মূর্তি অপহৃত হয়েছে বলে জানা গেছে। ঠাকুরবাড়ি বাজারের কাছেই রয়েছে শিমসাগর বা শ্যামসাগর ও রণসাগর বা রানিসাগর নামে দু’টি দিঘি। বাজারের কাছেই রাধাকৃষ্ণপুর এলাকায় রয়েছে রামচন্দ্রজীউয়ের দালান মন্দির, ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত।

    পাশেই রঘুনাথপুর এলাকার প্রধান দ্রষ্টব্য হল পার্বতীনাথ শিবের সতেরো চূড়াবিশিষ্ট মন্দির। ৬৬ ফুট উঁচু এই মন্দিরটি প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। মন্দিরে বেশ কিছু দেবদেবীর মূর্তি ও পঙ্খসজ্জা রয়েছে। সামনে একটি স্তম্ভের ওপর ষাঁড় প্রতিষ্ঠিত আছে। এছাড়া এই এলাকায় রয়েছে রাধামদন গোপালজীউয়ের মন্দির ও বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের ঝামাপাথরের চারচালা রাধাবল্লভ মন্দির। মন্দিরগুলি বেশ প্রাচীন।

    এর পরের দ্রষ্টব্য স্থান হল অযোধ্যা আর অযোধ্যা মানেই রামচন্দ্র। এখানে একসময় রামচন্দ্র অর্থাৎ রঘুনাথের নামে ছিল গড়, ঠাকুরবাড়ি। তা থেকেই রঘুনাথগড় ঠাকুরবাড়ি বা রঘুনাথবাড়ি। উত্তরপ্রদেশে অযোধ্যায় আর রামরাজত্ব নেই, তেমনই চন্দ্রকোণার অযোধ্যা গ্রামেও ভান রাজাদের প্রতিষ্ঠিত দেবতা রামচন্দ্রের কোনও অস্তিত্ব নেই। আছে শুধু জঙ্গলে ঘেরা প্রশস্ত প্রাঙ্গণে কিছু ভাঙা ইটের খণ্ডহর।

    ভানরাজারা এই অঞ্চলেই রমরমিয়ে রাজত্ব করে মন্দির, দেবালয় প্রতিষ্ঠা করে আর এক রামভূমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রঘুনাথগড় দুর্গের আগে এখান থেকে অনতিদূরে রামগড় ও লালগড় নামে দু’টি দুর্গ তৈরি করেছিলেন। পরে ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে রঘুনাথগড় বর্ধমানের মহারাজা সংস্কার করেছিলেন এখানে আধিপত্য বিস্তার করার পর।

    এই চত্বরের উত্তরে বিরাট প্রাচীর ঘেরা আর একটি অঙ্গনে প্রবেশ করতে হবে বেশ জমকালো অলংকারসমৃদ্ধ তোরণদ্বারের মধ্য দিয়ে। এই চত্বরের মধ্যে রয়েছে রঘুনাথ ও লালজির মন্দির। যদিও বিগ্রহ বর্তমানে ঠাকুরবাড়ি বাজারের মধ্যে মন্দিরে রয়েছেন। প্রায় ৮২ ফুট উচ্চতার ঝামাপাথরের এক বিরাট সপ্তরথ শিখর দেউলে রঘুনাথজি নিত্যপূজা পেতেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি সতেরো শতকের শেষদিকে তৈরি হয়েছিল। রঘুনাথজি এই মন্দিরে আসার আগে ১৫২২ খ্রিস্টাব্দে রামগড় দুর্গে এই মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। রামগড় দুর্গ ধ্বংস হলে রঘুনাথজি এই মন্দিরে আসেন।

    এই মন্দিরের পাশেই লালজির মন্দির। আঠারো শতকে নির্মিত ঝামাপাথরের প্রায় ৪০ ফুট উচ্চতার মন্দিরটি ছিল আটচালা রীতির। মন্দিরের শীর্ষে তিনটি আমলক ও কলসের স্থাপনা ছিল বেশ অভিনব। মন্দিরটিতে পঙ্খ-পলেস্তারায় দশাবতার ও অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি রয়েছে। বর্তমানে খুবই জীর্ণ দশা। লালজীউ মন্দিরের পাশে ২৯ ফুট দৈর্ঘের ও ২৩ ফুট উচ্চতার ভোগমণ্ডপটি অন্যতম দর্শনীয়। লালজির পুরো নাম হল গিরিধারীজীউ লালজীউ। চন্দ্রকোণার প্রথম দুর্গ দ্বাদশদ্বারী থেকে ১৬৫৫ খ্রিস্টাব্দে গিরিধারীজীউকে এনে লালগড় দুর্গে স্থাপন করা হয়েছিল। সেখান থেকে যখন রঘুনাথবাড়িতে লালজীউ আসেন, তখন তিনি খ্যাত হন গিরিধারীজীউ লালজীউ নামে। লালগড় দুর্গের একটি প্রতিষ্ঠাফলক থেকে জানা যায়, ১৬৫৫ সালে রাজা হরিনারায়ণের পত্নী রানি লক্ষণাবতী, যিনি বীর ভানের পুত্রবধূ হোলরায়ের কন্যা ও নারায়ণ মল্লরাজের ভগিনী এবং মিত্রসেনের মাতা, তিনি এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। লালজীউ হলেন সবচেয়ে প্রাচীন দেবতা।

    এছাড়া এই ভগ্ন রঘুনাথবাড়ির মধ্যে ছিল নাটমন্দির, পাকগৃহ, বাদ্যগৃহ, প্রাচীন কূপ, স্নানগৃহ, সীতাকুণ্ড, বারান্দা, অন্যান্য ঘর প্রভৃতি। বর্তমান রঘুনাথবাড়ির সব মন্দির পরিত্যক্ত এবং দেবতাদের ঠাকুরবাড়ি বাজারে গুণ্ডিচাবাড়ি বা মাসির বাড়ি নামক পঞ্চরত্ন মন্দিরে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। কোনও রক্ষণাবেক্ষণ নেই এখানে। বর্তমানে ভগ্নস্তূপ ও জঙ্গল ভেঙে দেখা যায় অতীতের গৌরব, কিন্তু এখনও কোনও ব্যবস্থা যদি গ্রহণ না করা হয় তাহলে আর কিছু দিন বাদে কোনও অস্তিত্বই থাকবে না এই রঘুনাথবাড়ির।

    রঘুনাথবাড়ির কিছুটা দূরেই রয়েছে উদাসীন মঠ। একটি বড় এলাকায় শান্ত পরিবেশে প্রাচীরবেষ্টিত জায়গায় রয়েছে এই মঠ। গুরু নানকের স্মৃতিবিজড়িত মঠটি। ১৫১০ সালের জুন মাসে পুরী যাবার সময় গুরু নানক এখানে এসেছিলেন ও গাছতলায় বিশ্রাম নিয়েছিলেন। তার একটি ফলক গাছের গায়ে লাগানো আছে। উদাসীন মঠের এই এলাকাটি রামগড়। অতীতের প্রাচীন দুর্গের কোনও চিহ্ন আজ আর নেই। এই অঞ্চলে মাটির ভেতর থেকে কিছু পোড়া চাল পাওয়া গেছে, যা থেকে মনে হয় এগুলি হয়তো যুদ্ধবিধ্বস্ত গড়ের স্মৃতিচিহ্ন। রামগড়ের পাশেই লালগড়। এখানেও অতীতের দুর্গের কোনও স্মৃতিচিহ্ন নেই। এই লালগড়-রামগড় মৌজাটি কুঁয়াপুর পঞ্চায়েতের ধানকুড়িয়া বিটের অধীনে। এখানে শালের জঙ্গলে একটি ইকো-ট্যুরিজম পার্ক গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে।

    চন্দ্রকোণার অন্যতম দ্রষ্টব্য হল ছোট অস্থল, মাঝারি অস্থল ও বড় অস্থল। অস্থল হল আসলে মঠ বা আখড়া, মূলত রাম উপাসকের আস্তানা। চন্দ্রকোণার নয়াগঞ্জে ভগ্নপ্রায় বড় অস্থলটি নতুনভাবে সংস্কার হওয়ার পর বহু প্রাচীন জিনিস রক্ষা পেয়েছে। অস্থলের মূল প্রাচীন দেবতা রাম, লক্ষ্মণ, সীতা নতুন পঞ্চরত্ন মন্দিরে স্থান পেয়েছেন। সঙ্গে রয়েছেন গোপীনাথজীউ, রাধারানি, ভূদেবী-সহ অনেক বিগ্রহ ও প্রচুর শালগ্রাম শিলা। এখানে একটি হনুমান মন্দির আছে। এই মঠের প্রথম মহান্ত ছিলেন স্বরূপ রামানুজ দাস আচার্য। এই মঠটি হল রামানুচার্য মতাবলম্বী বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অস্থল, যাঁরা শ্রীসম্প্রদায় নামেও পরিচিত।

    বড় অস্থল থেকে কিছুটা দূরে নরহরিপুরে ছোট অস্থল বা রামনন্দ লস্করীয় মঠটি অবস্থিত। হাবড়া দাস মহান্ত এই মঠটির প্রতিষ্ঠাতা। তিনি রাজস্থানের জয়পুর থেকে রাম, লক্ষ্মণ, সীতার বিগ্রহ নিয়ে এসে স্থানীয় রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় এই মঠ ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মঠে একটি বড় দালানমন্দিরে রাম, লক্ষ্মণ, সীতা, মদনমোহন, রাধারানি, লক্ষ্মীনারায়ণ মূর্তি-সহ অনেক শালগ্রাম শিলা আছে। অস্থলগুলিতে এত নারায়ণ শিলা থাকার অর্থ, চন্দ্রকোণা বর্ধিষ্ণু থাকার সময় এখানে বহু বাড়িতে নারায়ণ শিলা পূজিত হতেন। অবস্থা খারাপ হলে সেই সমস্ত পরিবার বাড়ির নারায়ণ শিলাকে অস্থলে দিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। এই মঠের অবস্থা ভগ্নপ্রায়। কয়েকটি প্রাচীন মন্দির ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে। মাঝারি অস্থলের অবস্থা এইরকম। তারও প্রাচীন মন্দিরগুলি নিশ্চিহ্নপ্রায়।

    মিত্রসেনপুর এলাকায় ধর্মরাজের পঞ্চরত্ন মন্দিরটি দর্শনীয় তালিকায় পড়ে। এটি পারিবারিক মন্দির। এই এলাকায় আরও রয়েছে শান্তিনাথ শিবের নবরত্ন মন্দির, অনন্তদেবের দালানমন্দির ও রাধাবল্লভের মন্দির প্রভৃতি। লালবাজার এলাকায় রাঠা রসিক রায়ের মন্দিরটিও দ্রষ্টব্য। এর পশ্চিমে রয়েছে নহবতখানা ও রাসমঞ্চ।

    আরও অনেক ভগ্ন ও অক্ষত মন্দির রয়েছে চন্দ্রকোণা শহরে। অতীতে বাহান্ন বাজারের স্মৃতি নিয়ে রয়েছে খিড়কিবাজার, ভায়েরবাজার, সমাধিবাজার, বড়বাজার প্রভৃতি। রয়েছে রানিসায়র, শ্যামসাগর, রামসায়র, জহর দিঘি, রাজার মা-র পুকুর প্রভৃতি, যা অতীতে জলসমস্যা নিবারণ করত। দশহরা, শীতলাপূজা, মনসাপূজা, শিবরাত্রি, জন্মাষ্টমী, রামনবমী প্রভৃতি উৎসব এখনও হয় চন্দ্রকোণায়। রঘুনাথজীর পুষ্যা উৎসব ও দশহরার রথে বেশ বড় মেলা হয় চন্দ্রকোণায়।

    মেদিনীপুর শহর, ঘাটাল অথবা চন্দ্রকোণা রোডে রাত্রিবাস করে চন্দ্রকোণা দেখে নেওয়া সুবিধার হবে। এই জায়গাগুলিতে হোটেল রয়েছে। মেদিনীপুর শহর থেকে চন্দ্রকোণা ৪৫ কিলোমিটার ও চন্দ্রকোণা রোড থেকে ১৮ কিলোমিটার। এই সমস্ত জায়গা থেকে সকালে এসে একটি রিকশা নিয়ে ঘুরে দেখা যায়। ঘণ্টা পাঁচেক সময় লেগে যাবে। নিজেদের গাড়ি বা রিজার্ভ গাড়ি থাকলে ভাল। তবে জায়গা চেনার জন্য রিকশাচালক দাদারাই ভরসা।

    রাত্রিবাসের ঠিকানা-– হোটেল চন্দ্রপ্রয়াগ, সাতবাঁকুড়া, চন্দ্রকোণা রোড, দূরভাষ: ০৩২২৭ ২৮৩০০৩, চলভাষ: ৭৫৮৪৯৪৪০০১।

    কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

    পায়ে পায়ে বাংলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More