চিত্তরঞ্জন

রাঢ় বাংলার একেবারে পশ্চিমে বিস্ময়করভাবে সবুজ, কোলাহলহীন ও পরিচ্ছন্ন এই শহরটিতে প্রখর গ্রীষ্ম বাদে সবসময় যাওয়া যেতে পারে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

এখন ঘরের বাইরে বেরোতেও মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। শুয়ে, বসে, গার্হস্থ্যকর্ম সেরেও সময় যেন কাটছে না। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

রূপনারায়ণপুরের পরের স্টেশন মিহিজাম। খুব মিষ্টি নাম। এখনকার চিত্তরঞ্জন। বর্ধমান জেলার একেবারে প্রান্তিক শহর চিত্তরঞ্জন। ভারতীয় রেলের পরম গর্বের সম্পদ চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ ওয়ার্কস। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের নামে চিত্তরঞ্জন রেল ইঞ্জিন কারখানা ও শিল্পাঞ্চলের উদ্বোধন করেন তাঁর সহধর্মিণী বাসন্তীদেবী। এটি ভারতের এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম রেল ইঞ্জিন কারখানা। রাঢ় বাংলার একেবারে পশ্চিমে বিস্ময়করভাবে সবুজ, কোলাহলহীন ও পরিচ্ছন্ন এই শহরটিতে প্রখর গ্রীষ্ম বাদে সবসময় যাওয়া যেতে পারে। চিত্তরঞ্জন রেল ইঞ্জিন কারখানা ঘুরে দেখতে চাইলে কারখানার জনসংযোগ আধিকারিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

চিত্তরঞ্জন রেল স্টেশন এবং রেল-শহরের মধ্যে প্রাদেশিক সীমানা রয়েছে। একপাশে বাংলা অন্যপাশে ঝাড়খণ্ড। প্রায় ১৪ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত সমগ্র শহরটির সর্বত্র পিচের রাস্তা। চিত্তরঞ্জনের ফতেপুর থেকে ঝাড়খণ্ডের মারালো গ্রামে যাবার জন্য রেল কোম্পানি ১৯৯৩ সালে বানিয়েছে অজয়ের ওপরে একটি সেতু যার নাম সিধু-কানু সেতু। সেতুর তলায় পড়ে আছে ধু-ধু বালি বুকে নিয়ে শীর্ণ অজয় নদ। অজয়ের শীর্ণতা শীতকালে, অবশ্যই বর্ষায় নয়। সেতুর ওপর থেকে অজয়কে দেখা এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা। অজয়ের ধারের ল্যান্ডস্কেপ অসাধারণ। ডানদিকের অংশে নজর করলেই দেখতে পাওয়া যাবে গত ২০০০ সালে নদের জলের প্রবল তোড়ে ভেসে যাওয়া সেতুর দোমড়ানো ভগ্নাবশেষ। পুনরায় এই সেতুটি বানানো হয়েছে। সেতু পেরোলেই নজরে পড়বে দুই ভূমিপুত্র সিধু-কানুর মূর্তি। তাঁদের সংগ্রামের কথা মনে পড়ে গেলে একটুর জন্য হলেও বিচলিত হতে হবেই।

শহর জুড়ে গড়ে উঠেছে কয়েকটি বিশাল জলাধার যেগুলি শীতকালে হয়ে ওঠে পরিযায়ী পাখিদের আস্তানা। চিত্তরঞ্জন প্রশাসনিক ভবনের সামনে জলাধারটি পড়ন্ত রোদে অথবা বৈদ্যুতিক সাঁঝবাতির মোহিনী আলোয় অনবদ্য। গঙ্গা বোট ক্লাবটি পরিপাটি করে সাজানো। ইতিউতি ভেসে বেড়াচ্ছে প্যাডেল বোট। জলাধারের দিকে তাকিয়ে কেটে যাবে সোনালি বিকেল। ইচ্ছে করলে ভেসেও পড়া যায়। এর সঙ্গে আছে উপহার শিশু উদ্যান। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ১১টা থেকে ৫টা এবং মার্চ থেকে অক্টোবর ১০টা থেকে ১২টা ও ৪টা থেকে ৬.৩০ পর্যন্ত খোলা থাকে। বৃহস্পতিবার বন্ধ। প্রবেশমূল্য আছে। পার্কে রয়েছে ছোটদের হরেক রকম মজার আয়োজন আর বড়দের জন্য জগিং ট্র্যাক। প্রশাসনিক ভবনের লাগোয়া লোকো পার্কটিও বেশ সুন্দর। এই পার্কে রয়েছে টয় ট্রেনের সুবিধা। আর আছে চিত্তরঞ্জন কারখানায় তৈরি হওয়া বেশ কিছু পুরনো রেল ইঞ্জিন।

অজয় নদের তীরে গড়ে ওঠা হনুমান মন্দির সংলগ্ন স্থান শীতের দিনগুলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বনভোজনকারীদের কোলাহলে। ক্রশ রোড পার হলেই পাওয়া যাবে হনুমান মন্দির। পাশে রয়েছে আরপিএফ ব্যারাকের উপাসনাস্থল। পাশে সোনাঝুরি, ছাতিম, বাবলা, শিয়াকুল, শ্যাওড়া, মহুয়ার জঙ্গল আর বনতুলসীর ঝোপ। হনুমান মন্দিরের পরিবেশটি বেশ তপোবনের মতো। হনুমানজির মূর্তির পাশে রয়েছে নর্মদেশ্বর শিব মন্দির এবং গুহার মধ্যে বৈষ্ণোদেবীর মূর্তি। তোরণদ্বার নির্মিত হয়েছে ২০০৪ সালে। অযোধ্যার রামদাসী সম্প্রদায়ের মহন্ত রামদেবদাসজি রামায়ণী সন্ন্যাসী এটি নির্মাণ করেছেন। বহু সাধু-সন্ন্যাসী এখানে থাকেন ও অনেক সন্ন্যাসী কিছুদিনের জন্য এখানে আসেন। অজয়ের পারে এই মন্দির এলাকা জনপ্রিয় পিকনিক স্পট। যারা সুন্দরের সঙ্গে সময় কাটাতে চান তাদের উচিত হবে ডিসেম্বরের পনেরোর মধ্যে জায়গাটি ঘুরে যাওয়া। সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের প্রথম দিকে অজয়ের পারে সূর্যাস্ত মনে রাখার মতো। নভেম্বরের সূর্যোদয় আর ভরা বর্ষায় কানা ওপচানো জলও পছন্দ হয়ে যেতে পারে।

চিত্তরঞ্জনের গর্ব এর শৈলহরি হিলটপ। এটি একটি ছোট্ট টিলা। পাহাড়ের মাথায় সুন্দরভাবে ভিউ পয়েন্ট করা হয়েছে। গোটা চিত্তরঞ্জন শহরটাই ছোট-বড় নানা টিলার ওপর তৈরি। শৈলহরিতে উঠলে সমগ্র শহরটি একলহমায় চোখের সামনে চলে আসবে। ভীষণ আনন্দ হবে যখন দেখতে পাওয়া যাবে হিলটপের দিক নির্দেশিকা ফলক, যেখানে লেখা আছে পৃথিবীর প্রধান প্রধান দেশের রাজধানীর দূরত্ব। বেজিং, লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, মেলবোর্ন-– এমন নির্দেশিকা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। এছাড়াও গোল ভিউ পয়েন্টে নির্দেশিকা রয়েছে চিত্তরঞ্জনের ওভার গ্রাউন্ড, ডি ভি বয়েজ স্কুল, রেলস্টেশন, মাইথন জলাধার, ইঞ্জিন কারখানার। বসার ব্যবস্থাও রয়েছে। হিলটপের পাশেই ওয়াটার ফিল্টার হাউস এবং পাহাড়চূড়ায় ওঠার ঠিক বাঁ-হাতে পড়বে একটি বিশাল ওয়াটার ট্যাঙ্ক যা থেকে সমগ্র শহরে পরিশোধিত জল সরবরাহ করা হচ্ছে।

রয়েছে আর একটি পাহাড়ি টিলা কানগোই। এখানে প্রচুর বনতুলসী এবং অজানা সুগন্ধী ফুলেরা পাহাড় আলো করে ফুটে থাকে। স্বাস্থ্যসচেতন নগরবাসীরা রোজই এই পাহাড়ে জড়ো হন স্বাস্থ্য উদ্ধারের আশায়। পাহাড়ের মাথায় রয়েছে শিব মন্দির। বিশ্রাম নেবার জন্য বা যোগাভ্যাসের জন্য রয়েছে এক বিশাল চাতাল। হিলটপ এবং কানগোই চূড়া, দু’জায়গা থেকেই সূর্যাস্তের দৃশ্য মনোমুগ্ধকর। রূপনারায়ণপুরে রাত্রিবাস করে চিত্তরঞ্জন ঘুরে দেখা সুবিধার হবে।

মুক্তাইচণ্ডী

শিল্পনগরী আসানসোল থেকে যে রাস্তাটি সামডি-রূপনারায়ণ-চিত্তরঞ্জন অভিমুখে গিয়েছে সেই রাস্তার পাশেই পড়ে ফুলবেড়িয়া ও পাতাল গ্রাম। এখানে রয়েছে একটি নাতিউচ্চ পাহাড়, যার নাম মুক্তাইচণ্ডী। এখানে পূজিত দেবীর নামও মুক্তাইচণ্ডী। রূপনারায়ণপুরের ডাবর মোড় থেকে এখানে আসা যায়।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লৌকিক চণ্ডীর উদ্ভব হয়েছিল। এই চণ্ডী বৈদিক দেবতা নন। রামায়ণ, মহাভারত বা প্রাচীন কোনও পুরাণে এই দেবতার কোনও উল্লেখ নেই। আনুমানিক দ্বাদশ শতাব্দীর পরবর্তীকালে রচিত কয়েকটি সংস্কৃত পুরাণ যেমন ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ প্রভৃতিতে দেবী চণ্ডীর উল্লেখ আছে। অন্যান্য লৌকিক চণ্ডীর মতো মুক্তাইচণ্ডীও এক লৌকিক দেবী। কথিত আছে, সতীর দেহত্যাগের পর তাঁর দেহের অলঙ্কারের একটি মুক্তো খসে পড়ে এই পাহাড়ের ওপর। তাই এর নাম মুক্তাইচণ্ডী আর সেই থেকে এটি একটি পীঠস্থানরূপে বিবেচিত হয়ে আসছে। যদিও ৫১টি সতীপীঠে মুক্তাইচণ্ডীর নাম পাওয়া যায় না।

মুক্তাইচণ্ডী শিলাটির সঙ্গে একসময় ছোটনাগপুর অঞ্চলে বসবাসকারী ওরাঁও উপজাতির আরাধ্য যুদ্ধ ও শিকারের দেবতা ‘চাণ্ডী শিলা’-র প্রভূত সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য এই যে, ওরাঁও উপজাতির যুবকরা শিকারে যাওয়ার সময় চাণ্ডী শিলা নিজেদের সঙ্গে রাখতেন। তাঁদের বিশ্বাস, এই চাণ্ডী শিলা সঙ্গে থাকলে শিকারে কৃতিত্ব ও যুদ্ধে জয়লাভ করা যায়। ওরাঁও চাণ্ডী থেকেই যে মুক্তাইচণ্ডী শিলাটির পরিকল্পনা এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। যেহেতু মুক্তাইচণ্ডী পাহাড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি পূর্বে গভীর জঙ্গলে আবৃত ছিল তাই মনে করা হয় বহু পূর্বে ওরাঁওরা এখানে বাস করতেন, শিকারে বেরোতেন এবং তারাই উঁচু পাহাড়ের ওপর চাণ্ডী শিলা স্থাপন করেছিলেন।

বর্তমানে মুক্তাইচণ্ডীর স্থানে হিন্দুদের প্রাধান্যই বেশি। শাস্ত্রীয় চণ্ডীর ধ্যানে পূজা হয়। চক্রবর্তী ও মুখার্জি পরিবার দু’টি বংশানুক্রমিকভাবে মায়ের পূজা করে আসছেন। মুক্তাইচণ্ডী পাহাড়টিকে ঘিরে ধাপে ধাপে সুন্দর মন্দিরটিকে যেভাবে অলংকৃত করা হয়েছে তা প্রশংসার দাবি রাখে। একদম ওপরে রয়েছে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি। লহাট মোড়ে নির্মীয়মাণ তোরণদ্বার মন্দিরের শোভা বা আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে তুলবে আশা করা যায়। মন্দিরে ওঠার আগে বাঁদিকে রয়েছে বসার জায়গা, ডানদিকে রয়েছে মুক্তমঞ্চ, অনুষ্ঠানাদির জন্য।

মুক্তাইচণ্ডীর বার্ষিক পূজা হয় মাঘী পূর্ণিমায়। মেলা বসে, প্রচুর লোক সমাগম হয়। কোলিয়ারি অঞ্চলের প্রত্যেকটি মানুষ অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকেন এই মাঘী পূর্ণিমার দিকে। স্বামী অসীমানন্দ সরস্বতীর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ১৩৭০ সালের এক শুভলগ্নে স্বামী বাসুদেবানন্দ সরস্বতী এই মেলার সূচনা করেন। ফলে এই মেলা দেখতে দেখতে ৫৫ বছরে পদার্পণ করল। এটি নিঃসন্দেহে এক গৌরবোজ্জ্বল মেলা এ কথা স্বীকার করতেই হবে। এখানে যাওয়ার উপায় হল-–
১. চিত্তরঞ্জনগামী ভায়া সামডি মিনিবাসে লহাট মোড়ে নামলে মুক্তাইচণ্ডী পাহাড় ও মন্দির পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ।
২. আসানসোল-চিত্তরঞ্জনগামী বাস বা মিনিবাসে ডাবর মোড়ে (রূপনারায়ণপুর) নেমে সামডি যাবার অটো ধরে মুক্তাইচণ্ডী পাহাড় ও মন্দির পনেরো মিনিটের পথ।
৩. আসানসোল-গৌরান্ডীগামী মিনিবাসে লালগঞ্জে (সামডি মোড়) নেমে মুক্তাইচণ্ডী পাহাড় ও মন্দির পনেরো মিনিটের পথ।

রাত্রিবাসের ঠিকানা-– হোটেল রাজেশ্বরী, এইচ সি এল রোড, রূপনারায়ণপুর, চলভাষ: ৯৪৩৪১৪৭৩০১।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More