সতীমায়ের কাছে

এখানে জাতিভেদ প্রথা নেই। নেই কোনও মন্দির বা মূর্তি। নিষ্কাম ধর্মসাধনাই শেষকথা। আউলচাঁদ সম্পর্কে জানতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কয়েকশো বছর।

২৫

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

এখন ঘরের বাইরে বেরোতেও মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। শুয়ে, বসে, গার্হস্থ্যকর্ম সেরেও সময় যেন কাটছে না। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে কল্যাণী সীমান্তের পথে কল্যাণীর পরে কল্যাণী শিল্পাঞ্চল, তার পরেই ঘোষপাড়া স্টেশন। ঘোষপাড়া কর্তাভজা সম্প্রদায়ের পুণ্যতীর্থ বা এককথায় বলা যায় ভজন-সাধনের মূল কেন্দ্র। বলাহাড়ি, সাহেবধনী সম্প্রদায়ের মতো নদিয়ার কর্তাভজা সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছিল আঠারো শতকের দ্বিতীয় ভাগে বাংলার অন্তজ শ্রেণিকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য।
কর্তাভজা সম্প্রদায়ের প্রবর্তক ছিলেন আউলচাঁদ। কিংবদন্তি বা লোকবিশ্বাস যে আউলচাঁদ ছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব। গৃহী মানুষকে বৈরাগ্যধর্ম শেখাতে শ্রীচৈতন্য আবির্ভূত হন আউলচাঁদ ফকির হয়ে। এখানে তাই জাতিভেদ প্রথা নেই। নেই কোনও মন্দির বা মূর্তি। নিষ্কাম ধর্মসাধনাই শেষকথা। আউলচাঁদ সম্পর্কে জানতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কয়েকশো বছর।

সেটা ১৬৯৫ সাল। নদিয়া জেলার প্রাচীন জনপদ উলা বীরনগরে মহাদেব বারুই নামে এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি বাস করতেন। তাঁর ছিল পানের বরজ। একদিন পানের বরজের ভেতর এক ফুটফুটে সুন্দর শিশুকে শুয়ে শুয়ে হাসতে-খেলতে দেখলেন তিনি। ভগবানের আশীর্বাদ ভেবে তাকে কোলে তুলে বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং লালনপালন করতে থাকেন মহাদেব। নাম দেন পূর্ণচন্দ্র। সংস্কৃত ভাষা শেখার জন্য তাকে পাঠানো হয় সে সময়কার বিখ্যাত বৈষ্ণবাচার্য হরিহরের কাছে।
বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণচন্দ্র নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান এবং নানাভাবে শিক্ষালাভ করেন। শেষপর্যন্ত সিদ্ধিলাভ করেন ও তাঁর নতুন নাম হয় ফকিরচাঁদ বা আউলচাঁদ। বহু দেশ ঘুরে যখন তিনি ঘোষপাড়ায় আসেন তখন পাগল মনে করে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে উত্ত্যক্ত করতে থাকে। ঘোষপাড়ার রামশরণ পাল নামে এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি তাঁকে আশ্রয় দেন। আউলচাঁদের ২২জন শিষ্য ছিলেন। তাঁদের মধ্যে রামশরণ পাল আউলচাঁদের মৃত্যুর পর গুরুপদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। আউলচাঁদই রামশরণ পালকে ধর্মপ্রচারের দায়িত্ব অর্পণ করেন আর সেই জন্য রামশরণ পালকে ‘কর্তা’ নামে ভূষিত করা হয়।

রামশরণের স্ত্রী সরস্বতী দেবী ছিলেন অতীব ধর্মপরায়ণা। শোনা যায়, আউলচাঁদ হিমসাগরের জল ও ডালিমতলার মাটির সাহায্যে সরস্বতী দেবীকে অলৌকিক উপায়ে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে তোলেন। কিছু দিন পর আউলচাঁদ চলে যেতে চাইলে তাঁরা ছাড়তে রাজি হলেন না। তিনি তখন ওই নাছোড় দম্পতিকে কথা দেন যে ভবিষ্যতে তাঁদের সন্তান হয়ে তিনি আবার ফিরে আসবেন। সেই সন্তানই দুলালচাঁদ যার সময়ে কর্তাভজা সম্প্রদায়ের খ্যাতি বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। এর পর তাঁর মা সরস্বতী দেবী ‘কর্তা মা’ বা ‘শচীমা’ বা ‘সতীমা’ নামে খ্যাতিলাভ করেন।
ঘোষপাড়ায় কোনও মন্দির বা মূর্তি নেই। রামশরণ পালের আদি ভিটেটুকু ভক্তদের কাছে অতি পবিত্র। ভিটের পাশেই ডালিমগাছ। এই গাছের নীচেই যেহেতু সতীমা সিদ্ধিলাভ করেছিলেন সেই হেতু ভক্তরা ওই ডালিম গাছের ডালে ঢিল বেঁধে মানত করেন। ডালিমতলার মাটি যেকোনও রোগের মহৌষধ হিসেবে মানুষ সংগ্রহ করেন। ছোট ছোট ডালিতে বাতাসা, কদমা, চিঁড়ে, মুড়কি দিয়ে নৈবেদ্য সাজিয়ে পুজো দেওয়ার রীতি।

ভিটের এক পাশে রয়েছে অতিথিশালা। তার পাশেই রয়েছে বহু পুরনো দিঘি হিমসাগর। লোকবিশ্বাস যে, হিমসাগরের জলে বহু রোগ নিরাময় হয়। কেবল তাই নয়, অন্ধ দৃষ্টিশক্তি লাভ করে, বোবা বাকশক্তি ফিরে পায়। ভেতরের মহলে যেখানে রামশরণ ও তাঁর পরবর্তী কর্তারা বাস করতেন সেখানে রয়েছে তাঁদের ব্যবহৃত বিছানা, চাদর, তোশক, বালিশ। ঘরে ঘরে কর্তাদের সুদৃশ্য তৈলচিত্র। মহলের আর এক পাশে রয়েছে ‘সতীমা’-র সমাধিস্থল। সতীমায়ের মৃত্যুর পর তাঁর ইচ্ছানুসারে সেখানে তাঁকে সমাধি দেওয়া হয়। ভেতরে রয়েছে সতীমার ছবি। উৎসবের দিনগুলিতে লাল পাড়, সাদা শাড়ি ও মাথায় মুকুট পরিয়ে রাখা হয়। উলটো দিকে, দুলালচাঁদের ঘর, বিছানার ওপর রাখা আছে তাঁর ব্যবহৃত খড়ম, কাঁথা। পাশে দুটো ছোট মাটির হাঁড়িতে পবিত্র অস্থি।
জনশ্রুতি শেষ বয়সে সরস্বতী দেবী সন্তানহারা হলে দোলপূর্ণিমার দিন গুরুপূজার আয়োজন করেন। সেই থেকেই দোল মেলার সূচনা। হাজার হাজার মানুষজনের সঙ্গে প্রচুর বাউলরাও আসেন। তাই এটি আউল-বাউলের মেলা নামেও খ্যাত। মেলার রেশ থাকে সাত দিন। এছাড়াও পায়ে পায়ে বাঁকাচাঁদের মন্দির শিবমন্দির ও সত্যনারায়ণের মন্দির ঘুরে দেখে নেওয়া যায়।

কুলিয়া

কল্যাণী থানার অন্তর্গত কল্যাণী স্টেশনের পূর্ব দিকে প্রায় দু’মাইল দূরে কুলিয়া গ্রাম। এটি বৈষ্ণবদের তীর্থক্ষেত্রেও বটে। অতীতে এই গ্রামের পাশ দিয়ে যমুনা নদী বয়ে যেত। বর্তমানে যমুনা জায়গায় জায়গায় মজে গেছে। সরকার থেকে বাঁধ দিয়ে মজা যমুনার বুকে কতগুলি ঝিল তৈরি হয়েছে। কল্যাণী গান্ধি মেমোরিয়াল হাসপাতালের পুব দিকে রয়েছে কুলিয়া ঝিল। এই ঝিলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কুলিয়া মৎস্য চাষ এবং মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র। কেন্দ্রটি গড়ে ওঠে ১৯৬০ সালে। এই ঝিলের পূর্ব তীর বরাবর এক বিরাট এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে মৎস্য চাষ ও মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের অফিস, কর্মচারীদের বাসগৃহ, মৎস্য চাষ শিক্ষাকেন্দ্র গবেষণার ও মৎস্য বিক্রয় কেন্দ্র। কুলিয়া মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের মিউজিয়ামটি দেখার মতো আকর্ষণীয়।

পাশেই মজে যাওয়া যমুনা নদী।

গান্ধি মেমোরিয়াল হাসপাতাল বা মৎস্য কেন্দ্রের প্রসিদ্ধির ইতিহাস যদি পঞ্চাশ-ষাট বছরের হয়, কুলিয়ার প্রসিদ্ধি কিন্তু তার অনেক আগেকার। সেই শ্রীচৈতন্যের সময় থেকে কুলিয়া অপরাধভঞ্জন বা কুলিয়ার পাট বলে পরিচিত পেয়ে আসছে। নেতাজি স্যানাটোরিয়াম ও গান্ধি হাসপাতালের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে সোজা পিচের রাস্তা ও তার পরই দিগন্তবিস্তৃত মাঠ। ঝিলের জলে পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা। এই রাস্তারই বাঁ দিক ঘেঁষে কুলের পাটের মন্দির বা বহু প্রাচীন গৌর-নিতাইয়ের মন্দির অবস্থিত।
মন্দিরটি দেউল শ্রেণির, দক্ষিণমুখী। সমতল ছাদ-বিশিষ্ট দালানের ওপর দেউল শিখর স্থাপিত। শিখরদেশ খাঁজকাটা। মন্দিরের ভেতরে গৌর-নিতাইয়ের দণ্ডায়মান অপরূপ কাঠের মূর্তি। গৌর-নিতাইয়ের বিগ্রহ ছাড়া মন্দিরে রয়েছে কৃষ্ণের কষ্টিপাথরের মূর্তি, অষ্টধাতু দিয়ে তৈরি শ্রীরাধারার বিগ্রহ ও দামোদর শালগ্রাম শিলা।
গল্পগাথা, কিংবদন্তি লোকশ্রুতি বাদ দিয়ে বাংলার মন্দির খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এ মন্দিরকেও জড়িয়ে রয়েছে একাধিক লোকশ্রুতি। যেটি বহুল প্রচলিত সেটি হল-– দেবানন্দ গোস্বামী ছিলেন কুলিয়ার এক গ্রামবাসী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিদ্বান ও শ্রীমদভগবতে তাঁর ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। শ্রীচৈতন্যদেবের পার্শ্বচর শ্রীবাস পণ্ডিত একদিন তাঁর বাড়িতে আসেন শ্রীমদভগবতের ব্যাখ্যা শোনার জন্য। ভগবত পাঠ শুনে শ্রীবাস ভাবাবেগে উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে শুরু করেন। দেবানন্দ ও তাঁর ছাত্রেরা এই অবস্থাকে শ্রীবাসের পাগলামি বা ভণ্ডামি মনে করে শ্রীবাসকে মেরেধরে তাড়িয়ে দেন। এই অপরাধে দেবানন্দ কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত হন। শ্রীচৈতন্যের কীর্তন-সঙ্গী বক্রেশ্বর পণ্ডিতের কৃপায় তাঁর ভক্তিতত্ত্বে বিশ্বাস জন্মায় এবং মহাপ্রভুই যে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। দেবানন্দ অনুতপ্ত হন শ্রীবাসের ওপর দুর্ব্যবহারের জন্য। মহাপ্রভু কুলিয়া গ্রাম হয়ে কুমারহট্ট আসার সময় দেবানন্দের শ্রীপাটের কাছে এলে দেবানন্দ মহাপ্রভুর কাছে দোষ স্বীকার করেন ও একখানা নতুন কুলোয় করে মুলো, পালংশাক ও চাল সিধা হিসেবে দেন। মহাপ্রভু দেবানন্দকে যমুনা নদীতে স্নান করে আসতে বলেন, আর আশ্চর্যের বিষয়, যমুনায় ডুব দেওয়ামাত্র দেবানন্দ কুষ্ঠরোগ হতে মুক্তি পান তৎক্ষণাৎ। অন্য দিকে মহাপ্রভু ওই সিধা রান্না করে একাদশী পালন করেন ও যমুনার ধারে সারারাত্রি ধরে কীর্তন করেন। কয়েক বছর পর ওই তিথিতেই দেবানন্দ দেহত্যাগ করেন। অগ্রহায়ণ মাসের কৃষ্ণ একাদশী তিথিতে দেবানন্দের অপরাধভঞ্জন হয়েছিল বলে সেই দিন থেকে ওই তিথিতে যমুনার ঘাটে দেবানন্দের সমাধির অপরাধভঞ্জনের মেলা হয়।
স্থানীয় মহিলাদের বিশ্বাস, দেবানন্দের তিরোভাবের দিন কুলিয়ার পাটে স্নান ও বনভোজন করলে জীবনের সমস্ত অপরাধ স্খালন হয় ও জন্মজন্মান্তর বৈধব্যযন্ত্রণা ভোগ করতে হয় না। তিন দিন ধরে মেলা চলে।


মেলার একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য। পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে কৃষকরা তাঁদের উৎপন্ন ফসল, বিশেষ করে পালংশাক, মুলো ও ফুলকপি বিক্রি করতে নিয়ে আসেন। যেহেতু কুলো দিয়ে পুজো দেবার রীতি তাই নতুন কুলোও বিক্রি হয় দেদার। যদিও মেলার সে জৌলুস বা জাঁকজমক আর আগের মতো নেই। বহু দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন ও মন্দিরের আশপাশে বসে রান্না করে বনভোজনের তৃপ্তিলাভ করেন।
গৌর-নিতাইয়ের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই স্থানে যেখানে শ্রীচৈতন্যদেব বসে পণ্ডিত দেবানন্দকে দীক্ষা দিয়েছিলেন। এই মূর্তি দু’টির ওপর মন্দির নির্মাণ করে দেন কলকাতার বাসিন্দা কানাইলাল ধর নামে একজন ধনী ভক্ত। বর্তমানে কুলিয়ার ঠাকুরবাড়ির সম্পত্তির মালিক কলকাতা পিঞ্জরাপোল সোসাইটি। গৌর-নিতাইয়ের মূল মন্দিরের পাশেই দেবানন্দ গোস্বামী ও চাঁপাল গোপালের সমাধিমন্দির রয়েছে। চাঁপাল গোপালের চারিত্রিক পরিবর্তন ঘটে মহাপ্রভুর কাছে দীক্ষা গ্রহণের পর। তার উত্তরে এক শিউলিগাছের ‘বাঞ্ছা কল্পতরু ষষ্ঠী’ বলা হয়। স্থানীয় ‘দ্বাদশ বকুল কুঞ্জ’ বৈষ্ণবদের কাছে অতি প্রিয়। সামনেই রয়েছে বিভিন্ন নামের বাঁধানো ঘাট। যেমন নিতাই-গৌর স্নান ঘাট, বিষ্ণুপ্রিয়া ঘাট, বিজলী ঘাট, গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর অপরাধভঞ্জন স্নানঘাট।
দেবদ্বিজ, মন্দির, পূজার্চনা, লোকশ্রুতি সব বাদ দিলেও জায়গাটি কিন্তু একদিনের আউটিংয়ের পক্ষে দারুণ মনোরম।
রাত্রিবাসের ঠিকানা-– দি কল্যাণী গেস্ট হাউস, সেন্ট্রাল পার্ক, দূরভাষ: ০৩৩ ৩২৯১৯৩৬৩, ৯৮৩০৫৬৬১২৬।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More