নদিয়ার অরণ্যে

পঞ্চাশ বছর আগে নাকি এ জঙ্গলে বাঘও ছিল। এখন বাঘ না থাকলেও আছে শিয়াল, সাপ, গোসাপ, বেজি ইত্যাদি। এই বনভূমিতে পথ হারানোর সম্ভাবনা নেই, কারণ চারপাশেই রয়েছে গ্রাম।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রত্না ভট্টাচার্য্য
    শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

    এখন ঘরের বাইরে বেরোতেও মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। শুয়ে, বসে, গার্হস্থ্যকর্ম সেরেও সময় যেন কাটছে না। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

    কেবল রূপকথার দেশেই নয়, নদিয়ার মতো ছোট জেলাতেও আছে সবুজের ঘন জঙ্গল। এখানে ঘুম ভাঙে পাখিদের গানে। কেবলমাত্র চোখের আরাম বা নির্জনতার কোলে মানসিক শান্তি নয়, দূষণমুক্ত পরিবেশ মনের সঙ্গে শরীরকেও চাঙ্গা করে তুলবে। এরকমই এক জঙ্গলের ঠিকানা হল ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের ওপর ব্যস্ত শহর কৃষ্ণনগর থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার উত্তরে বাহাদুরপুর অরণ্য, যার পাশ দিয়ে চলে গেছে কর্কটক্রান্তি রেখা। জাতীয় সড়কের ধারেই কাছাকাছি একটি বিজ্ঞপ্তিসূচক বোর্ডও লাগানো আছে। কর্কটক্রান্তির দৌলতে শীত-গ্রীষ্মের বাড়াবাড়ি তাই এখানে চরমে।

    শহরের পশ্চিমে জলঙ্গী নদীর সেতু। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে দৃষ্টি চারিয়ে দিলে চোখে ধরা পড়ে দিগন্তবিস্তারী উন্মুক্ত অঞ্চল। তারপর সেতু পেরিয়ে একটুখানি গেলেই অরণ্যের প্রবেশপথ। শেয়ালকাঁটা, ভাঁট, আঁশশ্যাওড়ার ঝোপ পেরিয়ে শুরু হবে সুবাবুল, নিম, আতাগাছের বসতি। তারপর বনভূমি দখল করেছে অর্জুন, সেগুন, আকাশমণি, ইউক্যালিপটাস, গামারি সোনাঝুরি, কুর্চিরা। বেশ কিছুটা যাবার পর সাক্ষাৎ হবে প্রাজ্ঞ বটগাছের সঙ্গে। বৃদ্ধ ঋষির জটার মতো সেও নামিয়েছে অজস্র ঝুরি। গাছের কোটরে অসংখ্য কাঠবিড়ালির বসত। বটগাছের তলাটা যেন মায়ের আঁচল।

    এই জঙ্গলকে সুললিত রাগে ভরিয়ে তোলে সারাদিন অসংখ্য বিচিত্র বর্ণের পাখি। দোয়েল, কোকিল, ছাতারে, ফিঙে, কুবো, হাঁড়িচাচা, বসন্তবৌরি, ঘুঘু, কাঠঠোকরা, বউ কথা কও, বাঁশপাতির দল। পঞ্চাশ বছর আগে নাকি এ জঙ্গলে বাঘও ছিল। এখন বাঘ না থাকলেও আছে শিয়াল, সাপ, গোসাপ, বেজি ইত্যাদি। এই বনভূমিতে পথ হারানোর সম্ভাবনা নেই, কারণ চারপাশেই রয়েছে গ্রাম। বনের পথ ধরে উত্তর দিকে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাওয়া যাবে চাষের মাঠে। শীতকাল হলে তো কথাই নেই। শীতের খেত আলো হয়ে রয়েছে টমেটো, মটরশুঁটি, লঙ্কায়। গরমে তিল, ধান, পটল, ঝিঙে। বর্ষার শেষে শশা, মুসুরি, ছোলা। সবুজ অরণ্যের সঙ্গে সবসময়ই চাষের খেতগুলি সঙ্গত করতে প্রস্তুত তাদের সবুজ পসরা নিয়ে।

    মাঠের আল ধরে আরও উত্তরে রয়েছে এই অরণ্যের বিউটি স্পট হাঁসডাঙার বিল। আসলে এটি হল অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ। অসংখ্য লুপ্তপ্রায় দেশি মাছ, যেমন খলসে, কেঁকলে, চ্যালা, গুঁতেল, চাঁদা, মায়া, সরপুঁটি, ভ্যাদা ইত্যাদির আঁতুড়ঘর। একটু দূরে বিলের মাঝ-বরাবর খেয়া পারাপারের নৌকো রয়েছে। ওপারেই বনগ্রাম। অর্থাৎ বনগাঁ। শীতকালে এ বিলে আসার রোমাঞ্চ অন্য রকম। নৌকো ভাড়া করে বিলে ঘুরে বেড়ালে এক বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হওয়া যায়। বিলের মাঝে মাঝে রয়েছে বাদামি রঙের ছোট ছোট গোল গোল দ্বীপ। ওদের কাছে গেলে বা হাততালি দিলে দ্বীপগুলো ডানা মেলে উড়ে যাবে ওই দূর নীলিমায়। ওগুলো আর কিছুই নয়, সরালের ঝাঁক। গরমের শুরুতে শামুকখোল আর সরালেরা ফিরে গেলেও থেকে যাবে পানকৌড়ি, বক, ডাহুক আর মাছরাঙারা। গরম ও বর্ষায় এ বিলের আকর্ষণ শীতের থেকে কিছু কম নয়। কত অজানা পাখিরা জলজ গাছে বাসা বাঁধতে শুরু করবে।

    বন ছেড়ে মাঝেমাঝে ভ্যান-রিকশায় সওয়ারি হয়ে গ্রামের ধূলিময় পথে পাড়ি দেওয়া যায়। মায়াকোল, সাহেবনগর, আনন্দনগর–- এইসব মায়াবী গ্রামের পথে চলতে চলতে মনে হবে এ জীবন বড় সুন্দর। এরকম অরণ্যে রাত কাটানোর ইচ্ছা অবশ্য না করাই ভাল। কারণ, থাকার কোনও রিসর্ট নেই। থাকতে গেলে কৃষ্ণনগর শহরে থাকতে হবে।
    কলকাতা থেকে বাহাদুরপুর-মায়াকোল ইকো-ট্যুরিজম স্পটে আসতে গেলে শিয়ালদা থেকে লোকাল ট্রেনে কৃষ্ণনগর এসে ধুবুলিয়া, বহরমপুরগামী লোকাল বাসে বাহাদুরপুর স্টপে নামতে হবে। লালগোলায় এলে সরাসরি বাহাদুরপুর স্টেশনেই নামা যায়। দূরপাল্লার সব বাস দাঁড়ায় না, তাই কন্ডাক্টরকে আগে থেকে বলে রাখতে হবে।

    বেথুয়াডহরি

    মন্দির, মসজিদ, বিভিন্ন স্থাপত্য একনাগাড়ে দেখতে দেখতে চোখ যখন ক্লান্ত হয়ে ওঠে তখন চোখ ও মনের আরামের জন্য চাই একটু সবুজ বনাঞ্চল। কৃষ্ণনগর থেকে ২৯ কিলোমিটার দূরে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে এই বেথুয়াডহরি বনাঞ্চল। এখানে নাকি বেথুয়া (বেথো) শাকের জলাভূমি (ডহর) ছিল, তা থেকেই বেথুয়াডহরি। এখানে ১৯৫৫ সাল থেকে গাছ পোঁতা শুরু হয়েছিল। এখন ৬.৭ হেক্টরের ভালই জঙ্গল। খাতায়-কলমে বেথুয়া অভয়ারণ্য হলেও আদতে সে মৃগদাব বা ডিয়ার পার্ক।

    সংরক্ষিত বনের ফটক দিয়ে ঢুকেই বাঁ দিকে প্রকৃতিবীক্ষণ কেন্দ্র। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নামে নামাঙ্কিত। ঘূর্ণির মৃৎশিল্পীদের নিপুণ সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলার প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ডান দিকে বনকর্মীদের আবাসনকে পিছনে ফেলে ইটবাঁধানো রাস্তা ধরে এগোলেই তিন রাস্তার মোড়। পথের দু’ধারে বনরাজি গার্ড অব অনার দিতে প্রস্তুত। পরিচিত ও অপরিচিত সব গাছই জড়াজড়ি করে রয়েছে। শাল, সেগুন, মেহগনি, অর্জুন, শিশুর পাশে রয়েছে আম, জাম, গাব, পিয়াশাল, নাগকেশর ইত্যাদি। তিন রাস্তার মোড়ের বাঁ দিকে ঘড়িয়াল পুকুর আর ডান দিকে কচ্ছপভরা পুকুর। এখানে নাগকেশরের ঝরা পাপড়িতে ঢেকে গিয়েছে গাছতলা। ঘড়িয়াল পুকুরের বাসিন্দারা নানান বিভঙ্গে থাকে। দেখতে বেশ লাগে।

    বেথুয়াডহরির অলংকার চিতল হরিণের দল। সংখ্যা ষাটের আশপাশে। যদিও হরিণগুলো বল্লভপুর ডিয়ার ফরেস্টের মতো সহজে দৃশ্যমান নয়। জঙ্গলের গভীরে গেলে দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়াও শজারু, মেছো বিড়াল, বেজি, ভাম, নানা ধরনের সাপ, ময়ূর, বাজ, পেঁচারাও এই জঙ্গলের বাসিন্দা।

    কাছেই রয়েছে কেয়ারি করা বাগান, চকচকে বাংলো, মাধবীলতায় ঢাকা পোর্টিকো। শান্ত, একাকী বাংলোটি যেন হাতছানি দিয়ে শ্রান্ত পথিকদের অনবরত প্রলোভন দেখাতে থাকে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। এখানে রাত কাটানোর রোমাঞ্চই আলাদা। এখানকার সবচেয়ে বড় সম্পদ আদিম নির্জনতার মাঝে পশুপাখিদের বিচিত্র আওয়াজ মনে ভয় ধরায় এবং গা ছমছমানির আমেজ এনে দেয়। আরণ্যক নির্জনতায় মনেই হবে না যে, মাত্র ২০০ গজ দূর দিয়ে জাতীয় সড়কের ওপর দিয়ে ছুটে চলেছে দ্রুতগামী ভারী সব যানবাহন।

    বাংলোর যোগাযোগের ঠিকানা-– ডিএফও, মুর্শিদাবাদ ডিভিশন, শংকর মিশনের কাছে, কৃষ্ণনগর, নদিয়া। দূরভাষ: ০৩৪৭২-২৫২৩৬২। এছাড়াও বেথুয়া বাজারে রয়েছে রেগুলেটেড মার্কেটের লজ ও বেশ কিছু পরিচ্ছন্ন হোটেল এবং লজ।

    শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে বেথুয়াডহরি। সেখান থেকে রিকশায় সংরক্ষিত বনের ফটক। ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে গাড়ি বা উত্তরবঙ্গ ও বহরমপুরগামী যে কোনও বাস ধরে আসা যায়।
    অরণ্যের নির্জনতার স্বাদ নিতে মাত্র ৪ টাকার বিনিময়ে এর অন্দরে প্রবেশ করা যায়। ছাত্রদের প্রবেশমূল্য মাত্র ২ টাকা।

    কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

    পায়ে পায়ে বাংলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More