মন্দিরময় মলুটী

গ্রামটি ভৌগোলিকভাবে ঝাড়খণ্ডের সাঁওতাল পরগনার দুমকা জেলার অন্তর্গত হলেও গ্রামের শ-পাঁচেক পরিবার প্রায় সকলেই বাংলাভাষী।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রত্না ভট্টাচার্য্য
    শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

    এখন ঘরের বাইরে বেরোতেও মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। শুয়ে, বসে, গার্হস্থ্যকর্ম সেরেও সময় যেন কাটছে না। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

    বাংলা ঝাড়খণ্ডের সীমান্তে তুম্বনি। রামপুরহাট থেকে তুম্বনির দূরত্ব জিপে বা অটোতে মাত্র ৯ কিলোমিটার। বাবলা, সোনাঝুরি ও ইউক্যালিপটাসের ছায়ায় মোড়া পথ। এ-পথে যেতে পড়ে হালদাসা, সারসডাঙা, ডুমুরিয়া। গ্রামগুলি যেন পটে আঁকা ছবি। শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবন। ভারী ট্রাক, বাস বা জিপের চলাচলে যা কিছু ব্যস্ততা বা প্রাণচঞ্চলতা। মালভূমির মাথায় তুম্বনি। এ-পারে বৃক্ষোৎসব ওপারে ঝাড়খণ্ডের আদিগন্ত রুক্ষ, গৈরিক উদাসী খোয়াই। এই গ্রামের শেষপ্রান্তে একটি আবাসিক স্কুল আর এক বনবাংলো। তার পিছনে প্রশস্ত মাঠ। এই মাঠ পেরোলেই মাঝিপাড়া। সামনের পাকারাস্তা সোজা চলে গেছে দুমকার দিকে। তুম্বনির অদূরে অনুচ্চ মালভূমি। উন্মুক্ত পাহাড় টিলা আর উদার সবুজ বনের হাতছানি।
    তুম্বনির ইতিহাস দেড়শো বছরের প্রাচীন। অতীতের অঞ্চলটি ছিল রাজমহলের অন্তর্গত আর এখানকার বাসিন্দা ছিলেন সরল সাদাসিধে সাঁওতালরা। ক্রমে মহাজনদের অনুপ্রবেশে সাঁওতালরা জড়িয়ে গেলেন ঋণ-দাদনের ফাঁদে। বংশপরম্পরায় সুদের বিষে জর্জরিত হয়ে তারা অসন্তোষ শুরু করলেন। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন রাজমহল অঞ্চলে বীর সিং মাঝির নেতৃত্বে শুরু হল আন্দোলন। সিধু-কানু-চাঁদ ভৈরব দীর্ঘদিনের বঞ্চনার শোধ নিতে হত্যা আর অগ্নির তাণ্ডব শুরু করে দিলেন। তুম্বনি, মাসড়া, মৃত্যুঞ্জয়পুর, নারায়ণপুরে গণহত্যা ও গৃহদাহ চলতে থাকল।

    এখন আর সে তুম্বনি নেই। ঘরে ঘরে দূরদর্শন, আধুনিকতার ছাপ সর্বত্র। তবুও প্রকাণ্ড এক আকাশের নিচে শান্ত তুম্বনি, পরিত্যক্ত এক এয়ারপোর্টের কংক্রিটের নিশ্চুপ রানওয়ে, নীরব মিশন স্কুল, কিছু দূরে সাধক বামাখ্যাপা খ্যাত মলুটী গ্রাম, নারায়ণপুরে শীর্ণ নদী ব্রাহ্মণীর কিনারে রবিবারের হাট–- সব কিছু মিলিয়ে দু’দিন ছুটি কাটাবার পক্ষে আদর্শ জায়গা।
    তুম্বনি বনবাংলোর বুকিংয়ের জন্য যোগাযোগ–- ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার, সিউড়ি, বীরভূম, দূরভাষ: ০৩৪৬২-২৫৫২৬২।

    মলুটী

    বাজপাখির বদলে রাজ্যলাভ করা নিঃসন্দেহে একটি কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা। তবে এই রকম একটি ঘটনা সত্যি ঘটে ছিল পাঁচশত বছর আগে, তারই ফলে পত্তন হয়েছিল নানকার (করমুক্ত) রাজ্যের।
    নানকার রাজ্যের প্রথম রাজা বসন্ত রায় ওরফে বাজ বসন্ত প্রথমে বীরভূম জেলার মৌড়েশ্বর বা ময়ূরেশ্বরে রাজধানী স্থাপন করেন ও পরে তা ডামরা গ্রামে তুলে নিয়ে যান। বাজ বসন্তের বংশধর রাজচন্দ্র রায় খাজা কামাল খাঁর কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে মল্লহাটিতে চলে আসেন। কালক্রমে মল্লহাটি মলুটী হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজপরিবারের বংশধরগণ দালানকোঠা না তৈরি করে শতাধিক দেব-দেবীর মন্দির তৈরি করিয়েছিলেন। কালের ক্ষয় বুকে নিয়ে বেশ কিছু মন্দির তাদের অনুপম কীর্তির সাক্ষী হিসাবে আজও দাঁড়িয়ে আছে। পুরাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে সেগুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে।

    রামপুরহাট থেকে দুমকা বা দেওঘরগামী যে কোনও বাসে আধ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যাবে সুঁড়িচুয়া স্টপে। সুঁড়িচুয়ার অপর প্রান্তে রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত, পুরাতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় মাহাত্ম্যে ভরা মলুটী গ্রাম। রাস্তার মোড়ে মন্দিরের ছবি দেওয়া সাইনবোর্ডে লেখা-– গুপ্তকাশী মলুটী চলুন। মোড় থেকে মন্দিরের গ্রাম মলুটীর দূরত্ব ৪ কিলোমিটার। মোড়েই রিকশা বা ভ্যান-রিকশা পাওয়া যায়। রামপুরহাট থেকে সরাসরি মলুটী যেতে চাইলে রামপুরহাট স্টেশনের বাইরেই শেয়ারের জিপ বা ট্রেকার ভাড়া পাওয়া যায়।
    বর্তমানে গ্রামটি ভৌগোলিকভাবে ঝাড়খণ্ডের সাঁওতাল পরগনার দুমকা জেলার অন্তর্গত হলেও গ্রামের শ-পাঁচেক পরিবার প্রায় সকলেই বাংলাভাষী। প্রকৃতপক্ষে গ্রামটি একসময় বীরভূম জেলারই অন্তর্গত ছিল। ৫৫ কিলোমিটার দূরের জেলা সদর দুমকার চাইতে ১৫ কিলোমিটার দূরের রামপুরহাটের সঙ্গেই এর নাড়ির যোগ বেশি। লুপ লাইনের মল্লারপুর ও রামপুরহাটের মধ্যবর্তী স্টেশন তারাপীঠ আর পশ্চিমে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে টেরাকোটা মন্দিরে সমৃদ্ধ মলুটী। কিন্তু সরাসরি আসার রাস্তা নেই, তাই রামপুরহাট-সুঁড়িচুয়া হয়েই আসতে হবে।

    এবার ফিরে যাওয়া যাক পাঁচশো বছর অতীত ইতিহাসের স্মৃতিরোমন্থনে। বসন্ত রায় ছিলেন বীরভূম জেলার মৌড়েশ্বরের কাছাকাছি কাটিগ্রামের এক দরিদ্র পিতৃহীন ব্রাহ্মণ সন্তান। লোকের গরু-বাছুর চরিয়ে তার ও তার মায়ের দিন কেটে যেত কোনওরকমে। একদিন মাঠে গরু ছেড়ে দিয়ে ঘাসের ছায়ায় ঘুমাচ্ছেন, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে রোদ পড়ায় এক বিষধর সাপ ফণা তুলে তার রোদ আড়াল করে দাঁড়িয়ে রইল। কাশীর সুমেরু মঠের মহন্ত দণ্ডীস্বামী নিগমানন্দ মহারাজ সেই সময় ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি এই অলৌকিক ঘটনা দেখতে পেয়ে রাখাল বালকের কাছে যেতেই সাপটি লুকিয়ে পড়ল এবং তিনি ঘুমন্ত কিশোরের মুখে রাজা হবার লক্ষণ প্রত্যক্ষ করলেন। তিনি বসন্তের ঘুম ভাঙিয়ে তার মায়ের কাছে উপস্থিত হলেন এবং বললেন যে, বসন্ত শীঘ্রই রাজ্যলাভ করবে। নিগমানন্দ বসন্তকে সিংহবাহিনী মন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে শিষ্য করে নিলেন।
    এদিকে গৌড়ের বাদশা হোসেন শাহ উৎকল দেশ থেকে ফেরার পথে বিশ্রামের জন্য কাটিগ্রাম থেকে সামান্য দূরে ময়ূরাক্ষীর ধারে তাঁবু ফেলেছেন। হঠাৎ একদিন বেগমসাহেবের অতি প্রিয় এক পোষা বাজপাখি সোনার শিকল কেটে পালায়। বাজপাখির নাকে হীরে বসানো সোনার নোলক, পায়ে সোনার শিকল। পাখির শোকে মৃতপ্রায় রানিকে সান্ত্বনা দিতে সম্রাট ঘোষণা করলেন, যে ব্যক্তি পাখি ধরে এনে দিতে পারবে, তাকে সে যা চাইবে তাই দেবেন।
    বসন্তের পাতা ফাঁদে বাজপাখি আটকা পড়ে। পাখিকে নিয়ে বাদশার দরবারে উপস্থিত হতে সম্রাট যারপরনাই খুশি হয়ে হুকুম দিলেন, পরদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত বালক বসন্ত রায় ঘোড়ায় চেপে যতটা ঘুরতে পারবে সবটাই সে পাবে নানকার (করহীন) জমিদারি হিসাবে। এভাবেই বসন্ত রায় হলেন নানকার রাজ্যের রাজা আর বাজপাখি ধরে দেওয়ার সুবাদে তার নাম হল বাজ বসন্ত। এই বাজ বসন্তের বংশধররাই পরে মলুটীতে রাজধানী স্থাপন করলেন আর এক-এক করে গড়ে উঠল অপরূপ শিল্পসুষমা যুক্ত ১০৮টি মন্দির শতাধিক বছর ধরে।

    বর্তমানে ১০৮টি মন্দির আর নেই, রয়ে গেছে প্রায় ৭২টি মন্দির। মন্দিরগুলির অধিকাংশরই জীর্ণ দশা, উচ্চতা প্রায় একই এবং সবগুলিতেই শিবের অধিষ্ঠান। মন্দিরগুলির প্রবেশদ্বারের মাথার উপরে অথবা দরজার উপরের খিলান অংশে সংস্কৃত অথবা প্রাকৃত ভাষায় মন্দিরের প্রতিষ্ঠালিপি উৎকীর্ণ রয়েছে। টেরাকোটার প্যানেলগুলির বিষয়বস্তু মূলত রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের কাহিনি। মন্দিরগুলির প্রবেশদ্বারের মাথার উপরে মূল প্যানেলে রাম-রাবণের যুদ্ধ প্রাধান্য পেলেও রাজবাড়ি সংলগ্ন মন্দিরে কেবল দেখা যায় মহিষাসুরমর্দিনীর চিত্র। পোড়ামাটির কাজগুলির অধিকাংশই অক্ষত এবং জীবন্ত। বিগ্রহহীন তিনটি কালীমন্দির রয়েছে। কালীপুজোর দিন মলুটী গ্রাম যেন সেজে ওঠে। শতাধিক পুজো হয়, এ-ছাড়া ঘরে-ঘরে কালীপূজার চল। কালীপূজা হয় সাঁওতালপল্লিতেও। যত পুজো, তত বলি, আলোকসজ্জা, ঢাকের বাজনা, সাঁওতাল নৃত্য, অসংখ্য বাজির আলো ও শব্দে মলুটী গমগম করে ওঠে। এ সময় রাজবাড়ি থেকে আরম্ভ করে প্রতি গৃহস্থের বাড়িতেই আত্মীয়কুটুম্ব আসেন।

    গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মৌলীক্ষা মায়ের মন্দির বাংলা দো-চালা রীতির মন্দির, সামনে বারান্দা। পাঁচিল ঘেরা মন্দির এলাকা গাছপালায় ছাওয়া, স্নিগ্ধ পরিবেশ। মৌলী অর্থে মাথা আর ঈক্ষা অর্থে দেখা–- দুইয়ে মিলে গর্ভগৃহে ত্রিনয়নী মায়ের পাথরের তৈরি মাথা দেখা যায়, তারাপীঠের তারামায়ের মতো। জনশ্রুতি, বামাখ্যাপা প্রথম জীবনে মলুটীর জমিদারের মন্দিরের পূজারী হয়ে ফুল তোলা ও ভোগ রান্নার কাজ নিয়ে আসেন। তিনি প্রথমে মৌলীক্ষা মায়ের সিদ্ধিলাভ করে পরে তারাপীঠ তারামায়ের সিদ্ধিলাভ করেন। তাই গ্রামের লোক মৌলীক্ষা মাকে তারামায়ের বড় বোন বলে মানে ও শ্রদ্ধাভক্তি করে। গ্রামের মধ্যে অপেক্ষাকৃত নতুন একটি সমতল ছাদের ছোট মন্দিরে বামাখ্যাপার মার্বেল পাথরের মূর্তি আছে। মূর্তির পাশে রাখা আছে একটি ত্রিশূল ও শঙ্খ। ওই ত্রিশূল দিয়ে তিনি নাকি পূজার ফুল পাড়তেন। ত্রিশূলের পাশে স্থাপিত আছে মা কালীর একটি সুন্দর শিলামূর্তি।
    রাজবংশের প্রতিষ্ঠার কাহিনিসূত্রে কাশীর সুমেরু মঠের মহন্তের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্র ধরে সুমেরু মঠের মহন্তরা বংশানুক্রমে মলুটীর রাজবংশের গুরুর মর্যাদা পেয়ে এসেছেন এবং এখনও বছরে কয়েকদিনের জন্য মলুটী গ্রামে পায়ের ধুলো দিয়ে থাকেন।

    শাল, সেগুন, মহুয়া, আকাশমণি দিয়ে ঘেরা মনোরম ভাস্কর্যের খনি মলুটীতে থাকার ইচ্ছে থাকলে অনায়াসে থাকা যায়, কারণ একদম আধুনিক সাজে সজ্জিত হয়ে পর্যটকদের জন্য অপেক্ষা করে আছে সরকারি গেস্ট হাউস, মৌলাক্ষা মন্দিরের সামনে।
    আশার কথা এটুকু যে, বিলম্বে হলেও রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার মলুটীর পুরাতত্ত্ব সম্পদ সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য অধিগ্রহণ করেছে।

    মলুটীতে থাকার জন্য কলকাতায় যোগাযোগ–- ঝাড়খণ্ড ট্যুরিজম, ১২ এ, ক্যামাক স্ট্রিট, দূরাভাষ: ২২৮২০৬০১, চলভাষ: ৯৭৪৮৩৭২৮০৮।

    কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

    পায়ে পায়ে বাংলা 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More